পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের তিন শতাধিক প্রজাতির প্রাণিকুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে লাজুক প্রাণী হরিণের। দর্শনার্থীরা বনের বাঁকে বাঁকে, খাল বা নদীর ধারে হরহামেশা দলবেঁধে হরিণের চলাফেরার দৃশ্য দেখতে পান। তবে, হঠাৎ করেই হরিণ শিকারিচক্রের দৌরাত্ম্য দেখা যাচ্ছে।
সুন্দরবনসংশ্লিষ্ট পরিবেশকর্মীরা বলছেন, হরিণের সংখ্যা বাড়লেও শিকার বন্ধ হচ্ছে না। যথেচ্ছভাবে শিকার হচ্ছে মায়াবী প্রাণী হরিণ। কিছু অসৎ বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের সহায়তায় সারা বছরই সুন্দরবনে হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারিচক্র। এসব শিকারীদের ফাঁদে শুধু হরিণই নয় অটকা পড়ছে বন্য শুকর ও বাঘ।
বনবিভাগের তথ্যে জানা যায়, সম্প্রতি বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফাঁদে আটকাপড়া এবং জবাই করা হরিণ, হরিণের মাংস-চামড়া, ফাঁদসহ আটক হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটক হরিণ শিকারিদের তথ্যে দেখা গেছে, স্থানীয়রাই হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে সুন্দরবন প্রভাবিত খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মানুষ বেশি হরিণ শিকার করেন। এসব উপজেলার গ্রামগুলোতে বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। তাদের প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ সুন্দরবনকেন্দ্রিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ও পশ্চিম-এ দুই প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, একশ্রেণীর চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে সুন্দরবনের প্রাণীসম্পদ। সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারি ও বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র। এদের কেউ কেউ বংশপরম্পরা সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারে জড়িত। এসব বনঅপরাধী চক্রের রয়েছে গডফাদার। তাদের কেউ কেউ আবার চলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়।
বনসংলগ্ন গ্রামবাসী জানান, উৎসব আসলেই সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় হরিণের মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। অবৈধ জেনেও হরিণের মাংস কেনেন অনেক মানুষ। ধনাঢ্যব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠে স্থানীয় চোরা শিকারিচক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সুন্দরবনে দেড়শ’রও অধিক চোরাশিকারি চক্র সক্রিয়। এসব পেশাদার শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করে হরিণের যাতায়াতের পথে পেতে রাখেন। চলাচলের সময় প্রাণীগুলো সেই ফাঁদে আটকা পড়ে।
পরে বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়। শিকার শেষে ফিরে যাওয়ার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। সময়-সুযোগ মিললে তারা আবার শিকারে আসেন।
এসব শিকারিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এই এজেন্টদের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিক্রি করা হয়। এই চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের মাংস। ক্রেতারাও অনেক সময় প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে মাংস কিনতে চান না। চোরাশিকারিরা তখন জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করেন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন জনপদে সারা বছরই হরিণের মাংসের চাহিদা রয়েছে। উৎসব-পার্বণ ছাড়াও কেউ কেউ স্বজনদের হরিণের মাংস উপহার দেন। আবার বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্যও কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস সরবরাহ করা হয়। হরিণের চামড়া-শিং সৌখিনব্যক্তিরা সংগ্রহ করে ড্রইংরুম সাজান।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। স্থানীয় চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারিচক্র সারা বছরই এই অনৈতিক কাজে জড়িত।
সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, যে পরিমাণ হরিণের মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণ হরিণ শিকার করা হয়। মাঝেমধ্যে দুই একটি অভিযানে হরিণের মাংস, চামড়া, মাথা উদ্ধার হলেও মূল চোরাশিকারি ও পাচারকারী আটক হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরিণের মাংস বহনকারীরাই ধরা পড়ে। আর যারা আটক হন, তারা দুর্বল আইনের কারণে কয়েকদিন পর জেল থেকে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন।
তবে অপরাধ দমনে শুধু টহলই যথেষ্ট নয়, বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানও তৈরি করা জরুরি।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন অপরাধ দমনে বন বিভাগ সবসময় তৎপর রয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন, ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু হয়েছে। মৌয়ালরা এখন সুন্দরবনে। দুই মাস ধরে চলবে মধু আহরণ।
তিনি বলেন, একশ্রেণির অসাধু লোকজন সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা চালায়। বনজসম্পদ রক্ষা, হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে বিশেষ সতর্কতা ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জনবল সংকটসহ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা-প্রহরীরা। প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক প্রয়োগে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জালসহ সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা জেলেদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে বিচ্ছিন্ন কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও সেটা আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই মাংসসহ হরিণ শিকারি ধরা পড়ছে। বিপুল পরিমাণে ফাঁদ জব্দ হচ্ছে।
এ বিষয়ে কার্যক্রম জানতে চেয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনে (মোংলা সদর দফতর) যোগাযোগ করা হলে মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল দস্যুমুক্ত এবং চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন এবং এর প্রাণীদের রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সুন্দরবন সুরক্ষা ও উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। কোনো অনৈতিক কাজে বন বিভাগের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের তিন শতাধিক প্রজাতির প্রাণিকুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা মেলে লাজুক প্রাণী হরিণের। দর্শনার্থীরা বনের বাঁকে বাঁকে, খাল বা নদীর ধারে হরহামেশা দলবেঁধে হরিণের চলাফেরার দৃশ্য দেখতে পান। তবে, হঠাৎ করেই হরিণ শিকারিচক্রের দৌরাত্ম্য দেখা যাচ্ছে।
সুন্দরবনসংশ্লিষ্ট পরিবেশকর্মীরা বলছেন, হরিণের সংখ্যা বাড়লেও শিকার বন্ধ হচ্ছে না। যথেচ্ছভাবে শিকার হচ্ছে মায়াবী প্রাণী হরিণ। কিছু অসৎ বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের সহায়তায় সারা বছরই সুন্দরবনে হরিণ শিকার করে স্থানীয় চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারিচক্র। এসব শিকারীদের ফাঁদে শুধু হরিণই নয় অটকা পড়ছে বন্য শুকর ও বাঘ।
বনবিভাগের তথ্যে জানা যায়, সম্প্রতি বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফাঁদে আটকাপড়া এবং জবাই করা হরিণ, হরিণের মাংস-চামড়া, ফাঁদসহ আটক হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটক হরিণ শিকারিদের তথ্যে দেখা গেছে, স্থানীয়রাই হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে সুন্দরবন প্রভাবিত খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মানুষ বেশি হরিণ শিকার করেন। এসব উপজেলার গ্রামগুলোতে বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। তাদের প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ সুন্দরবনকেন্দ্রিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ও পশ্চিম-এ দুই প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, একশ্রেণীর চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে সুন্দরবনের প্রাণীসম্পদ। সুন্দরবন-সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারি ও বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র। এদের কেউ কেউ বংশপরম্পরা সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকারে জড়িত। এসব বনঅপরাধী চক্রের রয়েছে গডফাদার। তাদের কেউ কেউ আবার চলেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়।
বনসংলগ্ন গ্রামবাসী জানান, উৎসব আসলেই সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় হরিণের মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। অবৈধ জেনেও হরিণের মাংস কেনেন অনেক মানুষ। ধনাঢ্যব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠে স্থানীয় চোরা শিকারিচক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সুন্দরবনে দেড়শ’রও অধিক চোরাশিকারি চক্র সক্রিয়। এসব পেশাদার শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান। বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে হরিণ ধরার ফাঁদ তৈরি করে হরিণের যাতায়াতের পথে পেতে রাখেন। চলাচলের সময় প্রাণীগুলো সেই ফাঁদে আটকা পড়ে।
পরে বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়। শিকার শেষে ফিরে যাওয়ার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। সময়-সুযোগ মিললে তারা আবার শিকারে আসেন।
এসব শিকারিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এই এজেন্টদের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিক্রি করা হয়। এই চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের মাংস। ক্রেতারাও অনেক সময় প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে মাংস কিনতে চান না। চোরাশিকারিরা তখন জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করেন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন জনপদে সারা বছরই হরিণের মাংসের চাহিদা রয়েছে। উৎসব-পার্বণ ছাড়াও কেউ কেউ স্বজনদের হরিণের মাংস উপহার দেন। আবার বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্যও কর্তাব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস সরবরাহ করা হয়। হরিণের চামড়া-শিং সৌখিনব্যক্তিরা সংগ্রহ করে ড্রইংরুম সাজান।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। স্থানীয় চিহ্নিত কিছু চোরা শিকারিচক্র সারা বছরই এই অনৈতিক কাজে জড়িত।
সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, যে পরিমাণ হরিণের মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণ হরিণ শিকার করা হয়। মাঝেমধ্যে দুই একটি অভিযানে হরিণের মাংস, চামড়া, মাথা উদ্ধার হলেও মূল চোরাশিকারি ও পাচারকারী আটক হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরিণের মাংস বহনকারীরাই ধরা পড়ে। আর যারা আটক হন, তারা দুর্বল আইনের কারণে কয়েকদিন পর জেল থেকে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন।
তবে অপরাধ দমনে শুধু টহলই যথেষ্ট নয়, বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানও তৈরি করা জরুরি।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন অপরাধ দমনে বন বিভাগ সবসময় তৎপর রয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন, ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু হয়েছে। মৌয়ালরা এখন সুন্দরবনে। দুই মাস ধরে চলবে মধু আহরণ।
তিনি বলেন, একশ্রেণির অসাধু লোকজন সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা চালায়। বনজসম্পদ রক্ষা, হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে বিশেষ সতর্কতা ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জনবল সংকটসহ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা-প্রহরীরা। প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক প্রয়োগে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জালসহ সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা জেলেদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে বিচ্ছিন্ন কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও সেটা আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই মাংসসহ হরিণ শিকারি ধরা পড়ছে। বিপুল পরিমাণে ফাঁদ জব্দ হচ্ছে।
এ বিষয়ে কার্যক্রম জানতে চেয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনে (মোংলা সদর দফতর) যোগাযোগ করা হলে মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল দস্যুমুক্ত এবং চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন এবং এর প্রাণীদের রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সুন্দরবন সুরক্ষা ও উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। কোনো অনৈতিক কাজে বন বিভাগের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন