বিদেশি সাহিত্য পাঠের বেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুবাদকেই নির্ভর করে থাকেন বেশিরভাগ পাঠক। অনেক ভাল ইংরেজি বা অন্য ভাষা জানা পাঠককেও দেখা গেছে তাঁরা ঐ ভাষার সাহিত্যের অনুবাদের বই সংগ্রহ করছেন। কারণ অনুবাদক দীর্ঘ সময় ধরে যে অনুবাদটি পাঠকের উপযোগী ও মূলের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে করে থাকেন, সেটি মূল ভাষায় পাঠের ক্ষেত্রে হয়তো পাঠক ঠিক তাৎক্ষণিক বুঝে উঠতে পারেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অন্য ভাষা জানা পাঠক, কখনো অনূদিত সাহিত্য পড়ে মোটেও তৃপ্তি পান না। তাঁরা মূল ভাষায়ই তৃপ্তি খুঁজে পান।
কেউ পেশাগতভাবে বা বাণিজ্যিক কারণে অনুবাদ করেন, আবার কেউ সাহিত্যের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যও অনুবাদ করেন। দ্বিতীয় অনুবাদক বহুল পাঠকের কাছে নিজের মহত্ত্ব থেকেই সাহিত্যকর্মটি ছড়িয়ে দিতে চান। এই কাজগুলো সাধারণত বিভিন্ন ভাষার লেখকগণ করে থাকেন। তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনে বিদেশি সাহিত্য পাঠ করে অনেক ক্ষেত্রে তাঁর একটি ভাষান্তরিত রূপ পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করেন। এবং পাঠক সেখান থেকে ওই সাহিত্যের অনেকখানি রসাস্বাদন করতে পারেন।
বিশ্বসাহিত্যের খ্যাতিমান কবি-লেখকগণ এ জাতীয় অনুবাদের কাজ করেন তাঁদের মৌলিক লেখালেখির অবসরে। যখন লেখক বা কবি কাঙ্ক্ষিত লেখাটি লিখতে পারছেন না, তখন তিনি বসে বসে অনুবাদ করছেন, এমনটাই ঘটতে দেখা যায়। আমার জানা মতে, অন্য দেশের লেখকদের চেয়ে ফরাসি লেখকগণ মৌলিক লেখার পাশাপাশি প্রচুর অনুবাদের কাজ করেন। যেমন সমসামিয়ক কালের ইভ বনফোয়া, জাক দুঁপা, ফিলিপ জকোতের মতো বিখ্যাত কবিগণ তাঁদের মৌলিক কবিতা লেখার পাশাপাশি অসংখ্য অনুবাদের কাজ করেছেন। কিংবা আমাদের বুদ্ধদেব বসুর কথাই ধরি না কেন, অনুবাদের জন্য তাঁর কাছে আমাদের ঋণ স্বীকার না করে উপায় নাই। বিশেষ করে বরিস পাস্তারনাকের ‘ডাক্তার জিভাগো’, বোদলেয়ারের কবিতা, রাইনার মারিয়া রিলকের কবিতা ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদের কাজ আমাদেরকে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল জগতেপ্রবেশ করিয়েছে।
গত শতকের আমাদের পঞ্চাশের দশকের কবিদের মধ্যে অনেকেই কম বেশি অনুবাদের কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি বিদেশি ভাষার প্রচুর কবির সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ পাতিয়ে দিয়েছেন। তাঁর অনুবাদ বাঙালি পাঠকের জানার দরজাকে সম্প্রসারিত করেছে। তাঁর অঢেল কাব্যসম্ভার ও গদ্যসংগ্রহের পাশাপাশি দেখি তাঁর বিশাল অনুবাদের সংগ্রহ। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলি হলো— ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ, নিকোলাস গ্যিয়েনের কবিতা থেকে চিড়িয়াখানা ও অন্যান্য কবিতা, হয়বদন, বহুল দেবতা বহু স্বর, রক্তকল্যাণ, ইরাকি কবিতার ছায়ায়, মানুষ, ইকবাল থেকে এবং বন্ধুকবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত’ নামের বিখ্যাত অনুবাদ সংকলন।
তাঁর অনুবাদে সূচিবদ্ধ হয়েছেন জার্মান কবি ক্লাউস গ্লোথ, ফ্রিডরিশ নীৎসে, স্টেফান গেয়র্গে, হুগো ফন, হাইনরিশ হাইনে, বের্টোল্ট ব্রেখট প্রমুখ কবি এবং স্প্যানিশ ভাষার কবি আন্তনিও মাচাদো, পাবলো নেরুদা, আর্তুরো প্লাজা, হুয়ান রামোথ হিমেনেথ প্রমুখ। ফরাসি সাহিত্যের বিখ্যাত কবিদের কবিতার অনুবাদ থেকেও কবি শঙ্খ ঘোষ আমাদের বঞ্চিত করেননি। তিনি অনুবাদ করেছেন ফরাসি কবি পল এলুয়ার, পল রবসন, জাক প্রেভের, এইমে সেজারের মতো কবিদের কবিতা। পড়ে দেখা যাক শঙ্খ ঘোষ অনূদিত জাক প্রেভের ‘বোকা’ কবিতা থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি: “মাথা দিয়ে বলে ‘না’ / বুক দিয়ে বলে ‘হ্যাঁ’, / যা-কিছুকে সে বাসে ভালো, তাতে বলে ‘হ্যাঁ’ / ‘না’ বলে শিক্ষাগুরুকে”
এই অনুবাদে নিশ্চিত করেই একটি বার্তা রয়ে গেছে। হয়তো অলংকারের ভিন্নতা আছে, কিন্তু বিষয়ের তেমন পরিবর্তন হয়নি। সমাজের একটি বোকা চরিত্রের চেহারা উন্মোচন করেছেন কবি। কবিতার অনুবাদ নিয়ে নানা ধরনের কথা প্রচলিত থাকলেও; পাঠক কোনো বিদেশি কবিতার ভাল অনুবাদের বই পেলে তাঁর চেহারাটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কারণ বিদেশি সাহিত্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ। যদিও একথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এক ভাষার কবিতার স্বাদ অন্য ভাষায় কখনো পাওয়া সম্ভব নয়। তবে তার ঘ্রাণ নেয়া বা ছুঁয়ে দেখার আনন্দ অবশ্যই মেলে।
শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ গ্রন্থের একটি নির্বাচিত সংকলন প্রকাশিত হয়েছে “বহুল দেবতা বহু স্বর” নামে। এখানে তাঁর প্রায় প্রত্যেকটি গ্রন্থ থেকে বাছাই করা অনুবাদগুলি স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিমগ্ন হয়ে পাঠ করা যায়। যেমন ভাষা, তেমিন নান্দনিকতার উৎকর্ষে কবিতাগুলিকে মনেই হয়নি অনুবাদ কবিতা। কিন্তু অনুবাদ, সে তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই। এই কবিতাগুলি কতটা মূলের কাছাকাছি আর কতটা অনুবাদকের স্বাধীনতায় অনূদিত তা আমরা অনুবাদকের জবানিতে জানতে পারি। এই গ্রন্থের সূচনা বক্তব্যে শঙ্খ ঘোষ বলেন—
“অনেকের মতো আমিও একথা জানি যে কবিতার ঠিক-ঠিক অনুবাদ হয় না কিছুতেই, তবু করতেও চাই অনুবাদ, ভালোলাগার টানে। এসব লেখাকে অনুবাদ না বলে অনুসর্জন বলাই কি সংগত? কেননা সৃজনের আনন্দও যদি কিছুটা না লেগে থাকে এর গায়ে, তবে কেনই-বা এত আয়োজন! সৃজন কথাটার মানে অবশ্য এ নয় যে, তার নেশায় ইচ্ছেমতো সরে যাব দূরে, তৈরি করে তুলব একেবারেই নিজের মতো ছন্দ-শব্দ-ছবি নিয়ে খেলা রবার্ট লোয়েল যেমন ভেবেছিলেন তাঁর ‘ইমিটেশন্স্’ নামের বইতে।”
অনুবাদকের বক্তব্য এখানে স্পষ্ট যে, কবিতা আসলে ঠিক-ঠিক অনুবাদ না হলেও, তিনি ভাললাগা থেকে অনুবাদ করেন, অনুবাদ করে সৃজনের আনন্দ পান। আবার অনুবাদ প্রসঙ্গে ভালেরির কথা স্মরণ করে অনুবাদক শঙ্খ ঘোষ বলেন—
“অনুবাদের প্রসঙ্গে ভালেরি বলেছিলেন একটা ‘ধঢ়ঢ়ৎড়ীরসধঃরড়হ ড়ভ ভড়ৎস’-এর কথা। অনুবাদ্য কবিতার মূল নিশ্বাসের কাছে পৌঁছবার জন্য অনুবাদের ছন্দে শব্দে আনতে হয় তেমনি একটা তুল্য-রীতি মাত্র, একটা ধঢ়ঢ়ৎড়ীরসধঃরড়হ, সৃষ্টির স্বাধীনতা নেওয়া যায় সেই পর্যন্ত শুধু। আমি অন্তত আমার বোধবুদ্ধি মতো অনুগতই থাকতে চেয়েছি মূল লেখাগুলির কাছে, ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষার ক্ষেত্রে অন্যের সাহায্য নিয়ে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও সত্যি যে, অনুবাদের সময়ে মনে রাখতে চেয়েছি আমার ভাষার পাঠকদের কথা, লক্ষ্যে রাখতে চেয়েছি তাঁদের অভিজ্ঞতা আর প্রত্যাশার পরিধি।... নিজের ভাষার কবিতা হিসেবে পাঠযোগ্য আর স্ফুরণময় হয়ে ওঠাতেই অনুবাদ-কবিতার প্রধান সার্থকতা, আর সেই কাজে এটা হতেই পারে যে মূল কবির সঙ্গে এখানে মিশে থাকে অনুবাদকেরও সত্তা। এই অর্থে, কবিতার বিশুদ্ধ তদ্গত অনুবাদ শেষ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস হয় না।” [গ্রন্থ: বহুল দেবতা বহু স্বর, শঙ্খ ঘোষ]
শঙ্খ ঘোষ অত্যন্ত সততার সঙ্গে কথাগুলো হড়হড় করে বলে গেলেন। আমরা বুঝে নিলাম কবিতার বিশুদ্ধ তদ্গত অনুবাদ শেষ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যাবে না। অনুবাদের মূল নিশ্বাসের কাছে পৌঁছাতে হলে তাকে শব্দে এবং ছন্দে আনতে হবে এবং নিজের ভাষার কবিতা হিসেবে পাঠযোগ্য করে তুলতে হবে। আর শর্তহীনভাবেই অনুবাদকে মূল লেখার কাছে অনুগত থাকতে হবে। শঙ্খ ঘোষ যে একজন সচেতন ও দক্ষ অনুবাদক তা তাঁর বক্তব্যগুলি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। এবার আমরা তাঁর কিছু অবুনাদ কবিতার সঙ্গে পরিচিত হবো।
১
খোলস ভেঙে বেরুব কখন?
ডিমের মধ্যে আমাদের মহর্ষিরা
অল্পস্বল্প মাইনের জন্যে
ইনকুবেশনের সময় নিয়ে তর্ক জোড়েন,
একটা দিনও তাঁরা ঠাউরেছেন, ধরা যাক ‘ক’।
[ডিম্ববতী ভাইসব, গ্যুন্টার গ্রাস]
২
জানতে চাইবে: কোথায় গেল লাইলাকেরা?
আর পপিতে জড়ানো সেই তুরীয়তা?
আর সেইসব বৃষ্টিধারা, শব্দাঘাতে
গিরিখাত আর পাখির দলকে
জাগিয়ে তুলত যারা?
আজ তোমাদের বলব আমি ঠিক কী রকম আছি।
[দু-চার কথা বুঝিয়ে বলা, পাবলো নেরুদা]
৩
আকাশভরা পাখির দ্রুত ঝাপট,
ভিতরজলে মাছের খোলা সাঁতার।
হঠা কেন পথ গিয়েছে থেমে?
আমরা তবু চলব ঠিক, এ পথ সোজা হাঁটার।
[বেনহাই নদীর বিলাপ, ভিয়েৎনামি লোকসংগীত]
৪
কবিতা আমায় কখনো এমন মাতিয়ে রাখেনি আগে
কিন্তু এখন বন্দীদশায় কী আর করতে পারি?
শ্লোক গেঁথে গেঁথে দীর্ঘ সময় কেটে যাবে, ভাবি আজ
কবিতা হয়তো সহায় তোমার মুক্তি-প্রতীক্ষারই।
[জেলখানার ডায়েরি, হো চি মিন]
৫
যে-তুমি আজ গিয়েছ চলে আপন দেশ ছেড়ে
জবাব দাও, তুমি,
কোথায় রয়ে গিয়েছে হায় পিতৃ-পিতামহ
ক্রুশের নিচে ঘুমে,
কোথায় রেখে যাবে তোমার নিজের হাড় ভাবো
জবাব দাও, তুমি।
[জবাব দাও, তুমি : নিকোলাস গ্যিয়েন]
এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার পাঁচজন কবির পাঁচটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে। এগুলোতে যেমন বক্তব্য ও উপস্থাপনার ভিন্নতা লক্ষ্য করার মতো; তেমনি কবিতাগুলি যে একই অনুবাদকের অনুবাদ করা সেটিও লক্ষ্য করবার মতো। অর্থাৎ শঙ্খ ঘোষের ভাষায় যদি বলা যায়, তবে কবিতাগুলি মূলের কাছাকাছি আছে বলেই বক্তব্যের ভিন্নতা স্পষ্ট হয়েছে। এবং অনুবাদকের সত্তা মিশে থাকায় প্রতিটি কবিতাংশের ভাষা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে একটা সূক্ষ্ম মিলও রয়েছে। আরও লক্ষ্য করার মতো বিষয়, তিনি কবিতাগুলিকে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী ছন্দে ও শব্দে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি, শঙ্খ ঘোষের মৌলিক কবিতার যে ভাষাভঙ্গি ও উপস্থাপনা গুণের কারণে আমাদের আকৃষ্ট করে, ঠিক একই রকম ক্যারিসমা তিনি অনুবাদের ক্ষেত্রেও রক্ষা করেছেন বলে তাঁর অনুবাদ আমাদেরকে তাঁর কবিতার মতো আকৃষ্ট করে।
আর একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতায় যে আদর্শকে ধারণ করেছেন; অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি প্রায় একই রকম অসাম্প্রদায়িক, প্রতিবাদী ও মানবতাবাদী কবিতাগুলিকে বেছে নিয়েছেন। যেমন এখানে তেলেগু কবি চেরাবান্ডারাজুর একটি অসাম্প্রদায়িক মহৎ কবিতার অনুবাদ করেছেন তিনি:
কী আমাদের জাত, আর ধর্মই-বা কী
মাটি ছেনে যখন ইটের পাঁজা বানাচ্ছি
যে ইট দিয়ে তৈরি হবে তোমাদের ওই ঘর
খিদেয় ধুঁকে বইছি যখন শস্য এ বুকভর!
...
কী আমাদের জাত আর ধর্মই-বা কী
চুল কামিয়ে দিচ্ছি যখন হবে সন্ন্যাসী
ধুচ্ছি যখন ওই তোমাদের কাপড়জামার কাদা
ফিরিয়ে দিতে হবে বলে জুঁইয়ের মতো সাদা।
[কী আমাদের জাত]
শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘জাবাল সত্যকাম’ কবিতায় যেভাবে বংশপরিচয়কে আঘাত করে সমাজের দৃষ্টি ওই দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন, এখানে চেরাবান্ডারাজুও তাঁর এই কবিতাটিতে একই রকমভাবে প্রশ্ন তুলেছেন। বের্ট্রােল্ট ব্রেখটের কবিতাও প্রচণ্ড রকম সমাজ সচেতন রাজনৈতিক ও রূপকধর্মী। তাঁর নির্বাচিত বেশ কিছু কবিতার অনুবাদ করেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ।
ব্রেখটের ‘মানবধর্ম’ কবিতাটিতে আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গায় আলো ফেলেছেন কবি। শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিকে যা এড়িয়ে যায়নি বরং তিনি তাঁর পাঠক সমাজের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন অনুবাদের মাধ্যমে। “মাথার জোরে মানুষ বেঁচে থাকে / মাথাই তবু যথেষ্ট নয় বটে। / খুব বড়োজোর দেখতে পাবে উকুন / তাকাও যদি নিজের নিজের জটে।”
এরকম আরো অসংখ্য কবির অনেক কবিতার ভুবনে স্বাগত জানিয়ে আমাদেরকেই ঋদ্ধ করেছেন। তাই শঙ্খ ঘোষের ঋণ বাঙালি পাঠকের কাছে অপরিশোধ্য থেকে যাবে বুঝি। তাঁর এই মহত্ত্বকে আজীবনের শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে মূল্যায়ন করার বিকল্প নেই।
জার্মান কবি গেয়র্গ হেইমের ‘যুদ্ধ’ কবিতাটি একদিকে যেমন সব-শর্ত-পূরণকৃত একটি সার্থক কবিতার অনন্য প্রমাণ, অন্যদিকে এর চিরকালীন আবেদন কবিতার শরীরে সংযুক্ত উজ্জ্বল পালকগুচ্ছ। কবি শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে কবিতাটি যেন মূলের চেয়েও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এ যেন বাঙালি পাঠকেরই মনের কথা।
মুছে যায় নগরীর সান্ধ্য কলতান চারিধারে
বিরূপ আঁধার থেকে ঝরে পড়া ছায়ায়, তুষারে।
বিপণির ঘূর্ণ্যতাল চকিতে তুহিন নীরবতা;
এ ওর মুখের দিকে তাকায়, বোঝে না কোনো কথা।
...
এদিকে তো সে উদ্দাম পাহড়ে পাহাড়ে নৃত্যরত,
বিকট চিৎকার— ‘ওঠো যোদ্ধৃদল, ধাও শত্রু যত’।
আর সে নিকষ মাথা যখন ঝাঁকায় ঝন্ঝন্
সহস্র করোটিমালা ঘিরে তোলে সুতীব্র স্বনন।
পুরো কবিতাটি পড়লে আমদেরও মনে পড়ে ঔপনিবেশিক সময়ের হত্যা-নির্যাতনের কথা। মনে পড়ে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনে গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধে বীর যোদ্ধাদের সাহসী ভূমিকার কথা। এ কবিতা যেন সব দেশের, সব কালের, চিরকালের আবেদনময়।
শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতার বেলায় যেমন প্রচণ্ড রকমের ছন্দ-সচেতন, একইভাবে তিনি কবিতায় অন্ত্যমিলের ব্যাপারটাকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে ছন্দ ও অন্ত্যমিল ঠিক রেখে অনুবাদ সম্পন্ন করাটা কেবল একজন বড় কবি ও দক্ষ অনুবাদকের পক্ষেই সম্ভব। শঙ্খ ঘোষ এদিক থেকে একজন যথার্থ কবি ও অনুবাদক। তিনি যেসব অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতার অনুবাদ করেছেন, সেগুলো প্রকৃতই সুমোহিত গন্ধ ছড়িয়েছে পাঠক হৃদয়ে।
উদাহরণ হিসেবে হান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের অসাধারণ কবিতা ‘বিচরণ’-এর কথা বলা যায়। শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ:
প্রহরী কুকুর চেঁচিয়ে মরছে— দাঁতগুলি এত ধারালো।
প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালেন এক নারী
আহা রে কত-না নিঃস্বতা তাঁর পরিধানে আর দু’গালে,
গাইছেন গান, হাতে সুরসঞ্চারী।
[১ নং কবিতা]
কিংবা তাঁর ‘তুষাররাণী’ কবিতাটির অনুবাদাংশ পাঠ করে দেখা যাক:
ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে যেন পাল্লা দিচ্ছে গানে
ভরাট দু’গাল হয়ে উঠছে লাল
কালো মেঘের সওয়ার হয়ে আসছে তুষাররাণী
পেরিয়ে কত গ্রাম বা মাঠের আল।
একইভাবে অন্ত্যমিল রক্ষা করে তিনি বিভিন্ন কবির আরো অসংখ্য কবিতার অনুবাদ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে পড়া যাক মহাকবি গ্যোয়েটের ‘বসন্তগান’ কবিতার কয়েকটি লাইন:
এই প্রকৃতি আমার জন্য
দোখো কেমন উদ্ভাসিত।
জ্বলত কেমন সূর্য, কেমন
মাঠও হাসি ছড়িয়ে দিত!
কবি শঙ্খ ঘোষ একদিকে যেমন আমাদের বিচিত্র জীবনের অনুবাদ করেছেন তাঁর কবিতা ও গদ্যে; একইভাবে তিনি বিশ্বসাহিত্যের তাৎপর্যপূর্ণ কবিতাগুলিও অনুবাদ করে বাংলা ভাষার পাঠককে সমৃদ্ধ করেছেন। শঙ্খ ঘোষের অনুবাদের প্রধান গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি ব্যক্তি জীবনে দেশি-বিদেশি প্রচুর কবিতা / সাহিত্য পাঠ করেছেন, আইওয়াতে লেখক কর্মশালা করেছেন, বিশ্বের অসংখ্য কবির সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছেন, তাঁদের কবিতা পাঠ করেছেন, তাঁদের কবিতার অতল স্পর্শ করেছেন, বিদেশি কবিতার মেজাজ বুঝেছেন এবং তারই নিরিখে তিনি ভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় বা নিজস্ব ভাষায় তাঁর পাঠকদের উপযোগী করে অনুবাদ করেছেন। শুধু ইংরেজি বা বিদেশি ভাষা জানলেই অনুবাদ করা যায় না। সাহিত্যের অনুবাদ একটি শ্রমসাধ্য কাজ। বিশেষ করে কবিতার অুনবাদ। আমাদের কাছে কবিতাগুলো সহজে পেয়ে গেলেও, এর জন্য শঙ্খ ঘোষের যে রক্তক্ষরণ হয়েছে তা অনুবাদক নিজে ছাড়া অন্য কারো জানবার কথা নয়। শঙ্খ ঘোষের বিশ্ব কবিতার এই অনুবাদ আমাদের বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে চূড়াস্পর্শী সংযোজন হয়ে রইল।

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
বিদেশি সাহিত্য পাঠের বেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুবাদকেই নির্ভর করে থাকেন বেশিরভাগ পাঠক। অনেক ভাল ইংরেজি বা অন্য ভাষা জানা পাঠককেও দেখা গেছে তাঁরা ঐ ভাষার সাহিত্যের অনুবাদের বই সংগ্রহ করছেন। কারণ অনুবাদক দীর্ঘ সময় ধরে যে অনুবাদটি পাঠকের উপযোগী ও মূলের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে করে থাকেন, সেটি মূল ভাষায় পাঠের ক্ষেত্রে হয়তো পাঠক ঠিক তাৎক্ষণিক বুঝে উঠতে পারেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অন্য ভাষা জানা পাঠক, কখনো অনূদিত সাহিত্য পড়ে মোটেও তৃপ্তি পান না। তাঁরা মূল ভাষায়ই তৃপ্তি খুঁজে পান।
কেউ পেশাগতভাবে বা বাণিজ্যিক কারণে অনুবাদ করেন, আবার কেউ সাহিত্যের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যও অনুবাদ করেন। দ্বিতীয় অনুবাদক বহুল পাঠকের কাছে নিজের মহত্ত্ব থেকেই সাহিত্যকর্মটি ছড়িয়ে দিতে চান। এই কাজগুলো সাধারণত বিভিন্ন ভাষার লেখকগণ করে থাকেন। তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনে বিদেশি সাহিত্য পাঠ করে অনেক ক্ষেত্রে তাঁর একটি ভাষান্তরিত রূপ পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করেন। এবং পাঠক সেখান থেকে ওই সাহিত্যের অনেকখানি রসাস্বাদন করতে পারেন।
বিশ্বসাহিত্যের খ্যাতিমান কবি-লেখকগণ এ জাতীয় অনুবাদের কাজ করেন তাঁদের মৌলিক লেখালেখির অবসরে। যখন লেখক বা কবি কাঙ্ক্ষিত লেখাটি লিখতে পারছেন না, তখন তিনি বসে বসে অনুবাদ করছেন, এমনটাই ঘটতে দেখা যায়। আমার জানা মতে, অন্য দেশের লেখকদের চেয়ে ফরাসি লেখকগণ মৌলিক লেখার পাশাপাশি প্রচুর অনুবাদের কাজ করেন। যেমন সমসামিয়ক কালের ইভ বনফোয়া, জাক দুঁপা, ফিলিপ জকোতের মতো বিখ্যাত কবিগণ তাঁদের মৌলিক কবিতা লেখার পাশাপাশি অসংখ্য অনুবাদের কাজ করেছেন। কিংবা আমাদের বুদ্ধদেব বসুর কথাই ধরি না কেন, অনুবাদের জন্য তাঁর কাছে আমাদের ঋণ স্বীকার না করে উপায় নাই। বিশেষ করে বরিস পাস্তারনাকের ‘ডাক্তার জিভাগো’, বোদলেয়ারের কবিতা, রাইনার মারিয়া রিলকের কবিতা ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদের কাজ আমাদেরকে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল জগতেপ্রবেশ করিয়েছে।
গত শতকের আমাদের পঞ্চাশের দশকের কবিদের মধ্যে অনেকেই কম বেশি অনুবাদের কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি বিদেশি ভাষার প্রচুর কবির সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ পাতিয়ে দিয়েছেন। তাঁর অনুবাদ বাঙালি পাঠকের জানার দরজাকে সম্প্রসারিত করেছে। তাঁর অঢেল কাব্যসম্ভার ও গদ্যসংগ্রহের পাশাপাশি দেখি তাঁর বিশাল অনুবাদের সংগ্রহ। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলি হলো— ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ, নিকোলাস গ্যিয়েনের কবিতা থেকে চিড়িয়াখানা ও অন্যান্য কবিতা, হয়বদন, বহুল দেবতা বহু স্বর, রক্তকল্যাণ, ইরাকি কবিতার ছায়ায়, মানুষ, ইকবাল থেকে এবং বন্ধুকবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত’ নামের বিখ্যাত অনুবাদ সংকলন।
তাঁর অনুবাদে সূচিবদ্ধ হয়েছেন জার্মান কবি ক্লাউস গ্লোথ, ফ্রিডরিশ নীৎসে, স্টেফান গেয়র্গে, হুগো ফন, হাইনরিশ হাইনে, বের্টোল্ট ব্রেখট প্রমুখ কবি এবং স্প্যানিশ ভাষার কবি আন্তনিও মাচাদো, পাবলো নেরুদা, আর্তুরো প্লাজা, হুয়ান রামোথ হিমেনেথ প্রমুখ। ফরাসি সাহিত্যের বিখ্যাত কবিদের কবিতার অনুবাদ থেকেও কবি শঙ্খ ঘোষ আমাদের বঞ্চিত করেননি। তিনি অনুবাদ করেছেন ফরাসি কবি পল এলুয়ার, পল রবসন, জাক প্রেভের, এইমে সেজারের মতো কবিদের কবিতা। পড়ে দেখা যাক শঙ্খ ঘোষ অনূদিত জাক প্রেভের ‘বোকা’ কবিতা থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি: “মাথা দিয়ে বলে ‘না’ / বুক দিয়ে বলে ‘হ্যাঁ’, / যা-কিছুকে সে বাসে ভালো, তাতে বলে ‘হ্যাঁ’ / ‘না’ বলে শিক্ষাগুরুকে”
এই অনুবাদে নিশ্চিত করেই একটি বার্তা রয়ে গেছে। হয়তো অলংকারের ভিন্নতা আছে, কিন্তু বিষয়ের তেমন পরিবর্তন হয়নি। সমাজের একটি বোকা চরিত্রের চেহারা উন্মোচন করেছেন কবি। কবিতার অনুবাদ নিয়ে নানা ধরনের কথা প্রচলিত থাকলেও; পাঠক কোনো বিদেশি কবিতার ভাল অনুবাদের বই পেলে তাঁর চেহারাটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কারণ বিদেশি সাহিত্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ। যদিও একথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এক ভাষার কবিতার স্বাদ অন্য ভাষায় কখনো পাওয়া সম্ভব নয়। তবে তার ঘ্রাণ নেয়া বা ছুঁয়ে দেখার আনন্দ অবশ্যই মেলে।
শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ গ্রন্থের একটি নির্বাচিত সংকলন প্রকাশিত হয়েছে “বহুল দেবতা বহু স্বর” নামে। এখানে তাঁর প্রায় প্রত্যেকটি গ্রন্থ থেকে বাছাই করা অনুবাদগুলি স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিমগ্ন হয়ে পাঠ করা যায়। যেমন ভাষা, তেমিন নান্দনিকতার উৎকর্ষে কবিতাগুলিকে মনেই হয়নি অনুবাদ কবিতা। কিন্তু অনুবাদ, সে তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই। এই কবিতাগুলি কতটা মূলের কাছাকাছি আর কতটা অনুবাদকের স্বাধীনতায় অনূদিত তা আমরা অনুবাদকের জবানিতে জানতে পারি। এই গ্রন্থের সূচনা বক্তব্যে শঙ্খ ঘোষ বলেন—
“অনেকের মতো আমিও একথা জানি যে কবিতার ঠিক-ঠিক অনুবাদ হয় না কিছুতেই, তবু করতেও চাই অনুবাদ, ভালোলাগার টানে। এসব লেখাকে অনুবাদ না বলে অনুসর্জন বলাই কি সংগত? কেননা সৃজনের আনন্দও যদি কিছুটা না লেগে থাকে এর গায়ে, তবে কেনই-বা এত আয়োজন! সৃজন কথাটার মানে অবশ্য এ নয় যে, তার নেশায় ইচ্ছেমতো সরে যাব দূরে, তৈরি করে তুলব একেবারেই নিজের মতো ছন্দ-শব্দ-ছবি নিয়ে খেলা রবার্ট লোয়েল যেমন ভেবেছিলেন তাঁর ‘ইমিটেশন্স্’ নামের বইতে।”
অনুবাদকের বক্তব্য এখানে স্পষ্ট যে, কবিতা আসলে ঠিক-ঠিক অনুবাদ না হলেও, তিনি ভাললাগা থেকে অনুবাদ করেন, অনুবাদ করে সৃজনের আনন্দ পান। আবার অনুবাদ প্রসঙ্গে ভালেরির কথা স্মরণ করে অনুবাদক শঙ্খ ঘোষ বলেন—
“অনুবাদের প্রসঙ্গে ভালেরি বলেছিলেন একটা ‘ধঢ়ঢ়ৎড়ীরসধঃরড়হ ড়ভ ভড়ৎস’-এর কথা। অনুবাদ্য কবিতার মূল নিশ্বাসের কাছে পৌঁছবার জন্য অনুবাদের ছন্দে শব্দে আনতে হয় তেমনি একটা তুল্য-রীতি মাত্র, একটা ধঢ়ঢ়ৎড়ীরসধঃরড়হ, সৃষ্টির স্বাধীনতা নেওয়া যায় সেই পর্যন্ত শুধু। আমি অন্তত আমার বোধবুদ্ধি মতো অনুগতই থাকতে চেয়েছি মূল লেখাগুলির কাছে, ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষার ক্ষেত্রে অন্যের সাহায্য নিয়ে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও সত্যি যে, অনুবাদের সময়ে মনে রাখতে চেয়েছি আমার ভাষার পাঠকদের কথা, লক্ষ্যে রাখতে চেয়েছি তাঁদের অভিজ্ঞতা আর প্রত্যাশার পরিধি।... নিজের ভাষার কবিতা হিসেবে পাঠযোগ্য আর স্ফুরণময় হয়ে ওঠাতেই অনুবাদ-কবিতার প্রধান সার্থকতা, আর সেই কাজে এটা হতেই পারে যে মূল কবির সঙ্গে এখানে মিশে থাকে অনুবাদকেরও সত্তা। এই অর্থে, কবিতার বিশুদ্ধ তদ্গত অনুবাদ শেষ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস হয় না।” [গ্রন্থ: বহুল দেবতা বহু স্বর, শঙ্খ ঘোষ]
শঙ্খ ঘোষ অত্যন্ত সততার সঙ্গে কথাগুলো হড়হড় করে বলে গেলেন। আমরা বুঝে নিলাম কবিতার বিশুদ্ধ তদ্গত অনুবাদ শেষ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যাবে না। অনুবাদের মূল নিশ্বাসের কাছে পৌঁছাতে হলে তাকে শব্দে এবং ছন্দে আনতে হবে এবং নিজের ভাষার কবিতা হিসেবে পাঠযোগ্য করে তুলতে হবে। আর শর্তহীনভাবেই অনুবাদকে মূল লেখার কাছে অনুগত থাকতে হবে। শঙ্খ ঘোষ যে একজন সচেতন ও দক্ষ অনুবাদক তা তাঁর বক্তব্যগুলি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। এবার আমরা তাঁর কিছু অবুনাদ কবিতার সঙ্গে পরিচিত হবো।
১
খোলস ভেঙে বেরুব কখন?
ডিমের মধ্যে আমাদের মহর্ষিরা
অল্পস্বল্প মাইনের জন্যে
ইনকুবেশনের সময় নিয়ে তর্ক জোড়েন,
একটা দিনও তাঁরা ঠাউরেছেন, ধরা যাক ‘ক’।
[ডিম্ববতী ভাইসব, গ্যুন্টার গ্রাস]
২
জানতে চাইবে: কোথায় গেল লাইলাকেরা?
আর পপিতে জড়ানো সেই তুরীয়তা?
আর সেইসব বৃষ্টিধারা, শব্দাঘাতে
গিরিখাত আর পাখির দলকে
জাগিয়ে তুলত যারা?
আজ তোমাদের বলব আমি ঠিক কী রকম আছি।
[দু-চার কথা বুঝিয়ে বলা, পাবলো নেরুদা]
৩
আকাশভরা পাখির দ্রুত ঝাপট,
ভিতরজলে মাছের খোলা সাঁতার।
হঠা কেন পথ গিয়েছে থেমে?
আমরা তবু চলব ঠিক, এ পথ সোজা হাঁটার।
[বেনহাই নদীর বিলাপ, ভিয়েৎনামি লোকসংগীত]
৪
কবিতা আমায় কখনো এমন মাতিয়ে রাখেনি আগে
কিন্তু এখন বন্দীদশায় কী আর করতে পারি?
শ্লোক গেঁথে গেঁথে দীর্ঘ সময় কেটে যাবে, ভাবি আজ
কবিতা হয়তো সহায় তোমার মুক্তি-প্রতীক্ষারই।
[জেলখানার ডায়েরি, হো চি মিন]
৫
যে-তুমি আজ গিয়েছ চলে আপন দেশ ছেড়ে
জবাব দাও, তুমি,
কোথায় রয়ে গিয়েছে হায় পিতৃ-পিতামহ
ক্রুশের নিচে ঘুমে,
কোথায় রেখে যাবে তোমার নিজের হাড় ভাবো
জবাব দাও, তুমি।
[জবাব দাও, তুমি : নিকোলাস গ্যিয়েন]
এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার পাঁচজন কবির পাঁচটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে। এগুলোতে যেমন বক্তব্য ও উপস্থাপনার ভিন্নতা লক্ষ্য করার মতো; তেমনি কবিতাগুলি যে একই অনুবাদকের অনুবাদ করা সেটিও লক্ষ্য করবার মতো। অর্থাৎ শঙ্খ ঘোষের ভাষায় যদি বলা যায়, তবে কবিতাগুলি মূলের কাছাকাছি আছে বলেই বক্তব্যের ভিন্নতা স্পষ্ট হয়েছে। এবং অনুবাদকের সত্তা মিশে থাকায় প্রতিটি কবিতাংশের ভাষা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে একটা সূক্ষ্ম মিলও রয়েছে। আরও লক্ষ্য করার মতো বিষয়, তিনি কবিতাগুলিকে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী ছন্দে ও শব্দে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি, শঙ্খ ঘোষের মৌলিক কবিতার যে ভাষাভঙ্গি ও উপস্থাপনা গুণের কারণে আমাদের আকৃষ্ট করে, ঠিক একই রকম ক্যারিসমা তিনি অনুবাদের ক্ষেত্রেও রক্ষা করেছেন বলে তাঁর অনুবাদ আমাদেরকে তাঁর কবিতার মতো আকৃষ্ট করে।
আর একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতায় যে আদর্শকে ধারণ করেছেন; অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি প্রায় একই রকম অসাম্প্রদায়িক, প্রতিবাদী ও মানবতাবাদী কবিতাগুলিকে বেছে নিয়েছেন। যেমন এখানে তেলেগু কবি চেরাবান্ডারাজুর একটি অসাম্প্রদায়িক মহৎ কবিতার অনুবাদ করেছেন তিনি:
কী আমাদের জাত, আর ধর্মই-বা কী
মাটি ছেনে যখন ইটের পাঁজা বানাচ্ছি
যে ইট দিয়ে তৈরি হবে তোমাদের ওই ঘর
খিদেয় ধুঁকে বইছি যখন শস্য এ বুকভর!
...
কী আমাদের জাত আর ধর্মই-বা কী
চুল কামিয়ে দিচ্ছি যখন হবে সন্ন্যাসী
ধুচ্ছি যখন ওই তোমাদের কাপড়জামার কাদা
ফিরিয়ে দিতে হবে বলে জুঁইয়ের মতো সাদা।
[কী আমাদের জাত]
শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘জাবাল সত্যকাম’ কবিতায় যেভাবে বংশপরিচয়কে আঘাত করে সমাজের দৃষ্টি ওই দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন, এখানে চেরাবান্ডারাজুও তাঁর এই কবিতাটিতে একই রকমভাবে প্রশ্ন তুলেছেন। বের্ট্রােল্ট ব্রেখটের কবিতাও প্রচণ্ড রকম সমাজ সচেতন রাজনৈতিক ও রূপকধর্মী। তাঁর নির্বাচিত বেশ কিছু কবিতার অনুবাদ করেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ।
ব্রেখটের ‘মানবধর্ম’ কবিতাটিতে আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গায় আলো ফেলেছেন কবি। শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিকে যা এড়িয়ে যায়নি বরং তিনি তাঁর পাঠক সমাজের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন অনুবাদের মাধ্যমে। “মাথার জোরে মানুষ বেঁচে থাকে / মাথাই তবু যথেষ্ট নয় বটে। / খুব বড়োজোর দেখতে পাবে উকুন / তাকাও যদি নিজের নিজের জটে।”
এরকম আরো অসংখ্য কবির অনেক কবিতার ভুবনে স্বাগত জানিয়ে আমাদেরকেই ঋদ্ধ করেছেন। তাই শঙ্খ ঘোষের ঋণ বাঙালি পাঠকের কাছে অপরিশোধ্য থেকে যাবে বুঝি। তাঁর এই মহত্ত্বকে আজীবনের শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে মূল্যায়ন করার বিকল্প নেই।
জার্মান কবি গেয়র্গ হেইমের ‘যুদ্ধ’ কবিতাটি একদিকে যেমন সব-শর্ত-পূরণকৃত একটি সার্থক কবিতার অনন্য প্রমাণ, অন্যদিকে এর চিরকালীন আবেদন কবিতার শরীরে সংযুক্ত উজ্জ্বল পালকগুচ্ছ। কবি শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে কবিতাটি যেন মূলের চেয়েও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এ যেন বাঙালি পাঠকেরই মনের কথা।
মুছে যায় নগরীর সান্ধ্য কলতান চারিধারে
বিরূপ আঁধার থেকে ঝরে পড়া ছায়ায়, তুষারে।
বিপণির ঘূর্ণ্যতাল চকিতে তুহিন নীরবতা;
এ ওর মুখের দিকে তাকায়, বোঝে না কোনো কথা।
...
এদিকে তো সে উদ্দাম পাহড়ে পাহাড়ে নৃত্যরত,
বিকট চিৎকার— ‘ওঠো যোদ্ধৃদল, ধাও শত্রু যত’।
আর সে নিকষ মাথা যখন ঝাঁকায় ঝন্ঝন্
সহস্র করোটিমালা ঘিরে তোলে সুতীব্র স্বনন।
পুরো কবিতাটি পড়লে আমদেরও মনে পড়ে ঔপনিবেশিক সময়ের হত্যা-নির্যাতনের কথা। মনে পড়ে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনে গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধে বীর যোদ্ধাদের সাহসী ভূমিকার কথা। এ কবিতা যেন সব দেশের, সব কালের, চিরকালের আবেদনময়।
শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতার বেলায় যেমন প্রচণ্ড রকমের ছন্দ-সচেতন, একইভাবে তিনি কবিতায় অন্ত্যমিলের ব্যাপারটাকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে ছন্দ ও অন্ত্যমিল ঠিক রেখে অনুবাদ সম্পন্ন করাটা কেবল একজন বড় কবি ও দক্ষ অনুবাদকের পক্ষেই সম্ভব। শঙ্খ ঘোষ এদিক থেকে একজন যথার্থ কবি ও অনুবাদক। তিনি যেসব অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতার অনুবাদ করেছেন, সেগুলো প্রকৃতই সুমোহিত গন্ধ ছড়িয়েছে পাঠক হৃদয়ে।
উদাহরণ হিসেবে হান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের অসাধারণ কবিতা ‘বিচরণ’-এর কথা বলা যায়। শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ:
প্রহরী কুকুর চেঁচিয়ে মরছে— দাঁতগুলি এত ধারালো।
প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালেন এক নারী
আহা রে কত-না নিঃস্বতা তাঁর পরিধানে আর দু’গালে,
গাইছেন গান, হাতে সুরসঞ্চারী।
[১ নং কবিতা]
কিংবা তাঁর ‘তুষাররাণী’ কবিতাটির অনুবাদাংশ পাঠ করে দেখা যাক:
ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে যেন পাল্লা দিচ্ছে গানে
ভরাট দু’গাল হয়ে উঠছে লাল
কালো মেঘের সওয়ার হয়ে আসছে তুষাররাণী
পেরিয়ে কত গ্রাম বা মাঠের আল।
একইভাবে অন্ত্যমিল রক্ষা করে তিনি বিভিন্ন কবির আরো অসংখ্য কবিতার অনুবাদ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে পড়া যাক মহাকবি গ্যোয়েটের ‘বসন্তগান’ কবিতার কয়েকটি লাইন:
এই প্রকৃতি আমার জন্য
দোখো কেমন উদ্ভাসিত।
জ্বলত কেমন সূর্য, কেমন
মাঠও হাসি ছড়িয়ে দিত!
কবি শঙ্খ ঘোষ একদিকে যেমন আমাদের বিচিত্র জীবনের অনুবাদ করেছেন তাঁর কবিতা ও গদ্যে; একইভাবে তিনি বিশ্বসাহিত্যের তাৎপর্যপূর্ণ কবিতাগুলিও অনুবাদ করে বাংলা ভাষার পাঠককে সমৃদ্ধ করেছেন। শঙ্খ ঘোষের অনুবাদের প্রধান গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি ব্যক্তি জীবনে দেশি-বিদেশি প্রচুর কবিতা / সাহিত্য পাঠ করেছেন, আইওয়াতে লেখক কর্মশালা করেছেন, বিশ্বের অসংখ্য কবির সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছেন, তাঁদের কবিতা পাঠ করেছেন, তাঁদের কবিতার অতল স্পর্শ করেছেন, বিদেশি কবিতার মেজাজ বুঝেছেন এবং তারই নিরিখে তিনি ভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় বা নিজস্ব ভাষায় তাঁর পাঠকদের উপযোগী করে অনুবাদ করেছেন। শুধু ইংরেজি বা বিদেশি ভাষা জানলেই অনুবাদ করা যায় না। সাহিত্যের অনুবাদ একটি শ্রমসাধ্য কাজ। বিশেষ করে কবিতার অুনবাদ। আমাদের কাছে কবিতাগুলো সহজে পেয়ে গেলেও, এর জন্য শঙ্খ ঘোষের যে রক্তক্ষরণ হয়েছে তা অনুবাদক নিজে ছাড়া অন্য কারো জানবার কথা নয়। শঙ্খ ঘোষের বিশ্ব কবিতার এই অনুবাদ আমাদের বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে চূড়াস্পর্শী সংযোজন হয়ে রইল।

আপনার মতামত লিখুন