সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

গল্প / ঈদ সংখ্যা ২০২৬

কুটুমবাড়ি


আনিস রহমান
আনিস রহমান
প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২০ পিএম

কুটুমবাড়ি
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন

মনে হলো আমার কথা শুনে বেশ খুশিই হয়েছে।

ওর কথার ক্ষিপ্রতা, ব্যতিব্যস্ততা ও নির্ভরতা এবং কণ্ঠে ব্যাকুলতা যেন তাই বলে! সেসঙ্গে আমাকে সবরকম আশ্বাস ও নির্ভার করার চেষ্টা! বললো, “তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। টাকা! টাকার দরকার! সে নিয়ে তুমি মোটেও ভেবো না। কতো লাগবে? পাঁচ হাজার! দশ হাজার! না হয় কুড়িই হলো! অসুবিধা নেই। আমি যতক্ষণ আছি তোমার পাশে তুমি চোখ বন্ধ করে থাকো। চিন্তা সব আমার মাথায় পাঠিয়ে দাও।”

“আমার জ্যাবের মধ্যে সবসময় কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকা থাকেই। তোমার যা দরকার নিও। তবু অনুষ্ঠানের যেন কমতি না থাকে। আমার কাকীমার মৃত্যু দিবস বলে কথা!”

মুকু আখন্দের কথায় আর আশ্বাসে সত্যি নির্ভার হলাম। 

গত বিশ বছর সৌদি আরব কাটিয়ে সদ্য দেশে ফিরেছে মুকু। মাঝে কয়েকবার শুধু দেশে এসেছিলো। মাস দুয়েক কাটিয়ে ফের ফিরে গেছে। এবার পাকাপোক্তভাবে ফিরে এসেছে। মেয়ে এমএ পড়ছে। বিয়ে দিতে হবে না! সুতরাং দেশে এবার আঁটঘাঁট বেঁধে এসেছে মুকু। মেয়ের জন্যে গয়না গড়িয়ে এনেছে দশ ভরি। অনেকে ফিসাফাস করে বলে, “এইডা প্রকাশ্য। আউলে যে আরও কত ভরি আছে তা তো কয় না মুকু! তবে ওর হাবভাবে এমনটাই আন্দাজ করছে পাড়াপড়শির কৌতূহলীরা।”

মুকু আখন্দ নাই কাজ খই ভাজলেও ঘরে বসে থাকার মানুষ নয়। পইপই করে এপাড়া-ওপাড়ায় ঘুরে বেড়ায় আর রূপান্তর দেখে। রূপান্তর দেখে আর বলে কতো চেঞ্জ! না এলে বিশ্বাসই হতো না! মানুষের ঘরবাড়ি, রাস্তা ঘাট, মানুষের পোশাক পরিচ্ছদ সব জায়গাতেই পরিবর্তন। নতুনের হাওয়া! তখন বলে, “বাহঃ উন্নতি! বেশ উন্নতি চারদিকে! তোমরা আবার ভেবো না আমি বসে বসে খাওয়ার ধান্দা করছি। কিছু একটা তো করতেই হবে! বসে বসে খেলে রাজার ভাণ্ডও তো ফুরিয়ে যায়!”

সুতরাং ভাণ্ড ধরে রাখবে বলে নানা কাজের ফিকিরে যখন এদিক-ওদিক ঘুরছে মুকু আখন্দ, তখন ছোট হোক, একটা কাজ তো পেয়েছে। একাজে অবশ্যি অর্থনৈতিক মুনাফা নেই। তবে সামাজিক কর্মের যেটুকু আনন্দ, যেটুকু স্বাচ্ছন্দ্য তা অবশ্যি আছে! মুকু বলে, দুটো দিন তো অন্তত ব্যস্ততায় কাটবে! মানুষের সঙ্গে দু-চার কথা বলার সুযোগ হবে। নানা পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে হবে! সুতরাং মুকুর মন বেশ চনমনে শ্রাবণের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকেই। এদুদিন আর এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে কাটাতে হবে না! রাস্তার ধারে বটের ঝুরি ধরে না হয় মোটা শেকড়ের ওপর বসে কাঁচা বয়েসি ছেলেপুলেদের সঙ্গে গল্প জুড়ে বসতে হবে না। কিংবা টঙ ঘরের বেঞ্চিতে বসে এর বাড়ি-ওর বাড়ির খবর নিয়ে এবং চায়ে চুমুক দিয়ে সময় কাটাতে হবে না। না হয় ঘুমটি ঘরে সিগন্যালম্যানের পাশে বসে ট্রেনের আসা-যাওয়া দেখতে হবে না। একে একে রেলের বগির সংখ্যা গুনতে হবে না! ব্যস্ততা! অনেক ব্যস্ততা আজ মুকু আখন্দের! তাই আগেভাগেই স্নানপর্ব সেরে গায়ে শাদা আলাখাল্লা চাপাতে ভুল করে না মুকু! মাথায় গোলগাল এক টুপি। টুপির ওপর লাল-কালো ডুরে এক উড়নি চাপানো। উড়নির ওপর কালো বেশ শক্ত এক বীড়া চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ে মুকু আখন্দ। দুপা এগোতেই কী ভেবে পেছন ফেরে মুকু—ওঃ তোমাকে তো বলতে ভুলেই গেছি। তোমার পালা মুরগি থেকে এটা মুরগি কেটে ভুনা করবে। ডিমের তরকারি করবে। সম্ভব হলে একটু পোলাও কোরো—ঢাকা থেকে শ্রাবণ আসবে। মঞ্জু বিরক্ত হয় না। বরং খুশিই হয়। শ্রাবণের সংগে ওর ব্যস্ততা। সময় কাটবে। মন্দ কী! ওর মুখ ভরা পান। তবু কথা বলতে বাধে না—“এট্টু মাছের ছালুন না দিলে ক্যামনে হয়।”

মুকু দেরি করে না। মাছের জন্যে লোক পাঠিয়ে দেয় নয়াবাজারে! রুই মাছ আনবি তাজা দেখে!

বুক যেন আরও খানিকটা ফুলে উঠেছে আনন্দে! মঞ্জুর সায় পেলে মন এমনিতেই খুশিতে খলবল করে ওঠে। এ আনন্দকে এবার সুবাসিত করতে আতর সেবায় মনোযোগ দেয় মুকু। ওর কাছে অনেকরকম আতর আছে। সকালে একটা—বিকেলে আরেকটা মাখে শরীরে-জামায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় না। বুক পকেট থেকে যথারীতি আতরের শিশি বের করে পাঞ্জাবির কলার, উড়নির গায়ে মাখায়। অনামিকার ডগায় একটু আতর ছুঁইয়ে দুই নাকের ফুটোয় ঢুকিয়ে দেয়। কী এক আবেশে চোখ বুজে আসে যেন! একটু পরপর দুপাশে টেনেমেনে উড়নি-রুমালের ঝুল বাড়ানোর চেষ্টা! উড়নির ওপর বীড়ার চাপ আরও একটু বাড়ানোর কসরৎ। যাতে বাতাসে আবার নড়ে না যায়, উড়ে না যায়। বেয়ারা বাডার বলে কথা। চলার পথে থেমে থেমে উড়নির যত্ন নিতে ভুল করে না মুকু। রোজকার মতো আজকের সাজসজ্জাতেও কোনো হেরফের হয়নি। বরং কিছু বাড়তি আয়োজন চোখে পড়ে।

পায়ে পায়ে বড় রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায় মুকু। উত্তরে-দক্ষিণে এ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার। সে তুলনায় তেমন ব্যস্ততা নেই সড়কের। মাঝে মাঝে দু-একটা ট্রাক্টর না হয় অটোরিকশার যাতায়াত শুধু।

সড়কের এপাড়ে-ওপাড়ে পায়চারি করছে মুকু। স্থির-গম্ভীর। তবে ভেতরে ভেতরে যে তার চঞ্চলতা-অস্থিরতা কাজ করছে ঢের, তা বাইরে থেকে ঠিকই বোঝা যায়। হাতে একটা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে কখনও এধারে কখনও ওধারে ঝোপের গায়ে সপাং সপাং করে মারছে। যেন কারও ওপর রাগ ঝাড়ছে ঝোপঝাড়ের গায়ে মেরে। রিকশার শব্দ পেলে মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে—কে এলো?

মাঝে মাঝে মাথার বীড়ার তল থেকে লাল-কালো ডুরে উড়নি টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা! কখনও ত্রিভুজাকৃতি আঁক কষে মাটিতে হাতের কঞ্চি দিয়ে, কখনও গামছার মতো ডান কাঁধে ঝুলিয়ে রাখছে আরেকটা উড়নি। সবই আসলে দুর্বোধ্য। খানিক সময় আপন মনে বিড়বিড় করে মুকু—মন শান্ত হ, শান্ত হ। যেন ঘোড়ার ঘাড়ের কেশরে হাত বুলিয়ে নিজের মনকে বোঝাচ্ছে। শেষে পরম তৃপ্তির চোখে আশপাশে তাকার মুকু আখন্দ। উড়নির গায়ে মাখা আতরের গন্ধ নাক ডুবিয়ে টেনে নেয় অনেকক্ষণ ধরে। বেহেশতের উড়নি বলে কথা! এমনটাই মনে করে মুকু। তবে এ নিয়ে গাঁয়ের অনেকের নানা প্রশ্ন থাকলেও সবাই চুপ। কোনো প্রশ্ন নেই কারও। তবে মাঝে মাঝে ছেলে-ছোকড়ারা কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলে, “কাকা আপনার বেহেশতি রুমাল কয়ডা আছে। আমাগও দেন। গুনায় গলা আন্দাজ টইটম্বুর! রুমাল গায়ে দিয়া যদি পুলসেরাত পার অইতে পারি!”

মুকু মিটিমিটি হাসে। “বেহেশত কী ভাদ্দর মাসের তালরে। ধুপুস-ধাপুস পড়বো আর খাবলা দিয়া ধরমু।” তার আগে তোদের জিন্স ছাড়তে হবে। দ্বিনের পথে আসতে হবে।

তা কাকা এই রুমাল যে বেহেশতে দেখা যাইবো। তা কেডায় কইলো কাকা? কোনো হাদিস কিংবা কারও বক্তৃতা!

দেখ বেশি কথা বলা নাজায়েজ। তা তাছাড়া অপ্রয়োজনীর কথা বলা, আল্লাহপাকের একবারেই না পছন্দ। কমপ্লিটসে না-পছন্দ! সুতরাং কাজের কথা বল্। 

কখনও রুমালাখানি ছুঁয়ে কেউ বলে কী মোলায়েম! চোখে বেহেশতি ঘুম আসে। কেউ রুমাল ছুঁয়ে দিয়ে বলে কী সুন্দর সুবাস! সৌদি থেইকা আনছো বুঝি! মুকু কপাল কুঁচকে শুধু বলে, হুম! ভেতরে গদগদ একটা ভাব। উপচে পড়বে যেন।

মানু বেশ আহলাদের কণ্ঠে বলে, মুকু মামা, বেহেশতীর রুমালের গল্পডা এট্টু কওনা! 

বেয়াদব! বেত্তামিজ! এটা গল্প! এটা গল্প! হিসেব করে কথা বলবি। তা না হলে মুখে কীরা (পোকামাকড়) জমে জিভ খসে খসে পড়বে! 

এমনি আলাপ-সালাপে গাঁয়ের মানুষ নানা রঙ চড়ানোর চেষ্টা করলেও মুকু আখন্দ কখনও ধৈর্য হারায় না। বলে, “মনে রাখিস, ডাকতারের ওপর কি রোগ নিয়া কথা কওয়া যায়! নাকি কথা বলা সঙ্গত?”

সবাই মাথা নাড়ে।

মুকু আখন্দ মনে করে, তার ওপর কথা বলা ধৃষ্টতা। তার সঙ্গে ওপরচালাকি করা রীতিমতো পাপ! পবিত্র জায়গায় ধুলোবালি থেকে আসা এই দেহ। 

জীবন-যৌবন সব শেষ করে সৌদি আরব থেকে ফিরেছে মুকু। পবিত্র মক্কা-মদিনা কোথায় না থেকেছে ও। তিনবার হজ্ব করেছে। সাতবার ওমরাহ করেছে এ দীর্ঘ বিশ বছরে। পবিত্র মাটির ছোঁয়ায় তার দেহও আজ পুতপবিত্র! এমনটাই মনে করে মুকু।

তার মন সবসময় পবিত্র। দীর্ঘ সময় ধরে পবিত্র বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া তার ফুসফুস পবিত্র না হয়ে কী পারে! অসম্ভব পবিত্র। সুতরাং এই দেহ থেকে বের হওয়া প্রতিটি কথাও ভীষণ পবিত্র। তখন এমনি পবিত্র দেহের ভেতর থেকে আসা কথা নিয়ে মশকারি করা একেবারেই না-জায়েজ। এমনটিই মনে করে মুকু। এবং সেভাবেই অনেককে সাবধান করে দেয় নানা সময়ে। এসব গভীর বোধের কথা যখন বলে মুকু তখন ওর দৃষ্টি থাকে মাটির দিকে নিবদ্ধ। মুকু বলে মৃত্তিকামুখী থেকে পথ চলবে, কথা বলবে। তখন ওর শরীর কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায়।

সুতরাং এ রুমালের মাহাত্ম্যকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একথা বোঝাতে বোঝাতে মুকু এখন ক্লান্ত। আজও বাস্তার ধারে রুমাল বিষয়ে কথা বলছিলো যেন কার সংগে। তখনই আমার রিকশা এসে থামলো মুকুর সামনে। মুকু আমার দিকে খানিক সময় অপলকে তাকিয়ে বলে, তুমি শ্রাবণ না! 

এ মুকুও আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। বিশ বছর পর আজ ওর সংগে দেখা। এ রকম সৌদী লেবাসে ওকে দেখবো কখনও ভাবিনি। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক মুকু। আমার চোখে বিস্ময়—তুমি মুকু না! 

রিকশাআলা দাঁত কেলিয়ে হাসে—হ্যায়ই তো মুকু! অহন অইছে মুকু হাজী!

মুকু বলে খামোশ! তোর কথার তাছির তো বালা না। কোন বাড়ির পোলা তুই। তবে মুকুর ঠোঁটে মিটি মিটি হাসি। চোখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য। এবার আমার দিকে চোখ রেখে—এতো দেরি! বলেই রিকশায় উঠে বসে মুকু আখন্দ।

ঘাড় ঘুরিয়ে খানিক সময় আমাকে দেখে মুকু—আহালান ওয়া সাহালান। 

ধন্যবাদ।

ধন্যবাদ কেন?

মুকু এবার বলে, কাইফা হালুকা। 

আমি মুকুর দিকে লজ্জাবনত চোখে তাকিয়ে থাকি। মুকু সেলফি তোলার ভঙ্গিতে মোবাইলের স্ক্রিনে ওর চেহারাটা ভাসিয়ে তোলে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবে নিজের চেহারাখানি দেখে। শেষে আলখাল্লার পকেট থেকে চিরুনি বের করে থুতনির একছটাক দাড়ির ওপর বুলিয়ে নেয় কতক্ষণ! এবার অন্য পকেট থেকে সুরমাদানি বের করে দু-চোখে সুরমা আঁকে খুব আয়েস করে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও একবার চোখে সুরমা দিয়েছিলো মুকু। সুরমা চোখে ফের সুরমা দেবার মাজেজাটা কি তা বুঝতে পারি না ঠিকঠাক। সুরমাদানি ফের বাঁ পকেটে রেখে আলখাল্লার বুকপকেট থেকে এবার সুন্দর, বেশ কারুকার্যখচিত আতরদানি বের করে নিজের জামায়, ঘাড়ে কানের লতিতে আতর ছুঁইয়ে ইশারায় আমাকে হাত পাততে বলে।

আমি ডান হাতের চেটো বাড়িয়ে দিতেই খানিক আতর মেখে আমার চেটো ভিজিয়ে দেয়। শেষে আতরদানি বুকপকেটে রেখে বলে, মানে কেমন আছো? তেমনি মিটিমিটি হাসি ঠোঁটের কার্নিশে!

আমি এবার হাসি আরও ছড়িয়ে বলি, ভালো আছি।

মুকু ঘাড় নেড়ে না না—বলো, আনাকোয়েস মানে বা ভালো আছি।

বাড়ির সবাই কেমন আছে?...

সবাই ভালো। মেয়েটা খানিক অসুস্থ।

কাকা, যাইবেন কোনো ফাই! না গেলে এমনেরা গাছতলায় খাড়াইয়া আরবি শিক্ষা করেন কিন্তু আমারে বিদায় দেন। ধৈর্যচ্যুতির আভাস রিকশাঅলার কণ্ঠে স্পষ্ট! মুকুর এবার যেন সম্বিৎ ফেরে। বলে, বিলম্বের জন্যে তুমি যথারীতি হাদিয়া পাইবে। তখন এতো অস্থিরতা কেন! তোমার কথায় কিঞ্চিৎ বেয়াদবির সুরও পাইতেছি! মোটেই ভালো লক্ষণ নয়! রিকশাঅলা মুখে কিছু না বলে পাশের পুকুর ঘাটের দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। মুকু আরেক দফা আতরের সুবাস নিতে নিতে বলে, উনা মাসে খালে পানি থাহে না। ক্ষেতি করলে কেমনি হয়। বিড়বিড় করে আপন মনে কথাগুলো বলে মুকু। শেষে রিকশাঅলাকে বলে, মার্কেটে যাও!

ধূ ধূ জমি। সবুজ জুড়ে উতল হাওয়া বইছে। তার চারদিকে ডোবানালা। সবুজ উপড়ে ফেলে ছড়ির্য়ে-ছিটিয়ে কিছু দালান বাড়ি উঠেছে সম্প্রতি। 

এর কোনোটা কাপড়ের, কোনোটা তৈজষপত্র, কোনোটা ঘর নির্মাণের সরঞ্জাম—ঢেউটিন থেকে সিমেন্ট। ফাঁকে ফাঁকে আছে সেলুন, লন্ড্রি, ফার্মেসি, মিষ্টির দোকান, স্টেশনারি আরও কতো কী! অনেকে বলে নিও মার্কেট। মুকু নিউ বলে না, বলে শুধু মার্কেট। মার্কেট বলতেই যেন ওর স্বাচ্ছন্দ্য।

তো মার্কেটে যেতে যেতে অনেক কথার ভিড়ে অনেক স্মৃতিচারণে দুজনে তখন মগ্ন। কাপাসিয়া রোড ধরে অনেকটা উত্তরে চলে আসে ওদের রিকশা। হঠাৎ যেন ইলেকট্রিকের শক খেলো মুকু। থামো থামো কই যাও তুমি!

কিছুতো কন নাই! কানে খাটো নাকি তুমি! বললাম না। 

মার্কেটে যাও! মিষ্টি কিনবো। মিষ্টির দোকানে যাও, ভালো মিষ্টির ঘর কার? রিকশাঅলা এদিক ওদিক, ডানে বাঁয়ে ঘুরে শেষে এক মিষ্টির দোকানে এসে দাঁড়ায়।

কাকা খুব ভালো মিষ্টি! বিয়াশাদীর মিষ্টি সব ওরাই সাপ্লাই দেয়। 

রিকশা থেকে না নেমেই দালান ঘরটির নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বেশ কবার চোখ বোলায় মুকু আখন্দ। সাইনবোর্ডের ওপর চোখ স্থির রেখে বললো, এটা কোথায় আনলা। এটাতো ঘোষেদের দোকান!

মিষ্টি তো ঘোষেরাই বানায় কাকা! অগো বংশগত কারবারই তো মিষ্টি বেচন। মিষ্টির মা-বাবা ঘোষেরা!

ঘোষ না ঘোষ না, মোসলমানের মিষ্টির ঘর কোনটা?

বালা জ্বালাতনে পড়লাম! অহন আমি মোসলমানের মিষ্টির ঘর কই খুঁইজা পামু!

না না, মিষ্টি না পেলেও ঘোষেদের মিষ্টি কিনবো না! মোসলমানের মিষ্টি দরকার।

রিকশাঅলা সিটে বসতে বসতে বলে, ঘোষেরা এমনেরে চিমডি দিছে না কামুর দিছে! ঘোষের মিষ্টি নিবেন না! হগ্গলে ঘোষের মিষ্টির পাগল! ঘোষের মিষ্টি অহন কামারের ঘরে খুঁজলে কী অইবো! বলেই সে ট্যাঁ ট্যাঁ হর্ন বাজিয়ে এগোতে থাকে। 

চিমটি দেবে কেন? এরপর চুপ হয়ে যায় মুকু আখন্দ। ভাবে, বিশ বছরে সৌদি হাওয়া-বাতাসে পবিত্র তার শরীর। বারবার হজ্ব আর ওমরাহ করে খোদার ঘরে কতো চোখের জল ফেলেছে। লাগাতার পূণ্য অর্জন করেছে গত বিশ বছর ধরে। এতো পূণ্য অর্জন করে এখন ঘোষেদের মিষ্টি খেয়ে সব নষ্ট করতে পারবে না! মুসলমানের দোকানের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মুকু আখন্দ! “মুসলমানের দোকান পাইলা!”

গণি রা করে না। 

ভালো করে খোঁজো। মার্কেটে কয়ডা আর দোকান! তার মধ্যে মুসলমানের দোকান তো চোখ বন্ধ কইরাই খুঁইজা বাইর করা যায়। জিগাও না কাউরে!

গণি বেজায় বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলে না। শত হলেও বড়ঘরের পোলা! সৌদি পয়সার বেজায় তমতমি। অহন আর ঘোষেগো চিনে না!

ওদের রিকশা চক্কর খেতে খেতে টাল হবার যোগাড়! একবার এদিকে যায় ওদিকে থামে। আবার ওদিকে যায় এদিকে এসে থামে। একে ওকে জিজ্ঞেস করে। খোঁজে মুসলমানের মিষ্টির দোকান! অনেক ভেবে শেষে একজন বললো কুটুমবাড়ি যাও!

রিকশা এগোয়। শ্রাবণের সংগে দু-চার কথা বলে ফের মনোযোগ দেয় রিকশাঅলার দিকে, ও গণি ...!

রিকশাঅলার মেজাজ তখন তুঙ্গে। আরও কতো কী দেখুম! কন, কী কইবেন!

এদিক-ওদিক ডানে-বাঁয়ে দু-তিনটে বাঁক নিয়ে ঝড়ো বেগে কুটুমবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় ও। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। ভিটি অনেক উঁচু করে তবে ঘর তুলেছে। অর্ধেক সিঁড়ি উঠতেই এক চাঁদ কপালিকে চোখে পড়ে ওর। কপালে কালো দাগ। চোখে সুরমা। গায়ে ঘি-রঙা পাঞ্জাবি! মাথায় টুপি! বসে আছে ক্যাশবাক্স আগলে। রফি মাস্টার! এ নামেই ওকে ডাকে লোকে। 

মাস্টর! বালা মিষ্টির খোঁজ করতে করতে এমনের ঘরে আইলাম। 

রফি মাস্টার দাঁড়িয়ে দুহাত মেলায় মুকুর সঙ্গে। আমাকে ইশারায় সালাম। ওদের সামনে বড় বড় সসপ্যানে, টাবে নানারকম মিষ্টি হাবুডুবু খাচ্ছে রসের তলে।

রসগোল্লা, কালোজাম, লালমোহন আর ছানার জিলাপি।

এতো ভালো দোকান! অথচ সারা রক্তারপুর পইপই কইরা ঘুইরা বেড়াইলা গণি!

গণি দাঁত কেলিয়ে শুধু হাসে, কাহা গো!

মুকু আখন্দ শুধু হাতের ইশারায় থামতে বলে ওকে।

নিজেই ক্যাশ থেকে উঠে আসে রাফি মাস্টার। বড় থালায় সব পদের মিষ্টি সাজিয়ে মুকুর সামনে তুলে ধরে, খেয়ে দেখেন। টাটকা মিষ্টি। মাত্র চুলা থেইকা নামাইছে। 

সব পদ থেকে একটু একটু করে চেখে দেখে ওরা। রিকশাআলা গণিও বাদ যায় না! 

খাঁটি ছানার তৈরি।

ময়দার ভেজাল নাই তো!

রফি মাস্টার জিভ কাটে। দুকানে আঙুল দেয়, কী সব্বনাশা কথা! কতো মণ দুধ আসে কটুমবাড়িতে একটু খোঁজ  নিয়ে দেখতে পারেন।

খোঁজ নেয়ার দরকার নেই! তবে মিষ্টি খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেলাম মাস্টর! পরে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কথা হাছা কইলাম না মিছা কইলাম, শ্রাবণ স্যার।

আমি সম্মতি দিতেই রফি মাস্টার লোক ডেকে মিষ্টির প্যাকেটগুলো অটোতে তুলে দিতে বলে।

মিষ্টি খেয়ে এবাড়ি-ওবাড়ি—মসজিদের সকলের মুখে প্রশংসা। কোন জায়গার মিষ্টিগো! ঢাহার মিষ্টি বুঝি!

কিসের ঢাকা! মার্কেটের দোকান—কুটুমবাড়ি। মুকু আখন্দের কথায় দাপুটে ভাব! 

কুটুমবাড়ির নাম মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে এ তল্লাটে।

পরদিন যথারীতি ঘুমটি ঘর, চায়ের স্টল বটতলা হয়ে মার্কেটে এসে মাসুম চাকলাদের কাঠের দোকানে এসে বসে মুকু আখন্দ। দেশীয়-আন্তর্জাতিক সামাজিক পারিবারিক নানা বিষয়ে তামাম তামাম গল্প করে নিরোগালয়ে এসে দাঁড়ায় মুকু—ওষুধ কিনতে হবে। 

ট্যাবলেট সিরাপ, ওর-স্যালাইন—এন্টিবায়োটিকসহ নানাপদের ওষুধ কিনে একটু আনমনা হাঁটতে থাকে মুকু। মাথাটা নিচু, পায়ের গতি শ্লথ। মন যেন ওর পথের ঘাস ধুলো আনাচে-কানাচের ঝোপঝাঁড়ের মাথা ছুঁয়ে ফুটে থাকা ছোট ছোট বুনোফুলের গভীরে যেন সেধিয়ে যাচ্ছে। আসলে দীর্ঘ প্রবাস জীবনে পূণ্য যেমনি কামিয়েছে হজ্ব-ওমরাহ করে; তেমনি পয়সাও কামিয়েছে ঢের। কিন্তু অসুখ বাঁধিয়ে এনেছে অনেকগুলো। নানা কিসিমের অসুখ। একইসঙ্গে স্বামীহীন জীবনে না পাওয়া নানা কষ্ট, নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা, সংসারের ঘানি আর প্রবঞ্চক সমাজের নানা কপটতা সামলাতে সামলাতে মিতুর শরীরও আজ রাজ্যির অসুখের ভাগাড়। মাস জুড়ে দুজনের প্রায় বারো-তেরো হাজার টাকার ওষুধ লাগে। ডাক্তার-পথ্যি-টেস্ট তো আলাদা! 

এমনি ভাবনায় যখন নিমগ্ন মুকু আখন্দ; তখন পেছন থেকে কে যেন ওর কাঁধে হাত রাখে। খানিক চমকে ফিরে তাকায়—জগদিশ যে, কেমন আছো? বাড়ির সবাই ভালো।

জোগেশ, ওর ছোট ভাই গণেশ—এরা সবাই কেমন আছে।

ভালোয়-মন্দে আছি।

তোমারে আমি দূর থেইকা দেখছি—মনে অইলো মুকুর মতো লাগে! পরে পিছে পিছে আইলাম। তা কবে ফিরলা দেশে—

দিন পনেরো।

আবার করে যাইবা?

আর না! মেলা প্রবাস কাটাইছি। আর কতো!

তা ঠিক। তোমগো মিষ্টির কারবার না আছিলো। আছে অহনও।

খানিকসময় চুপ করে থাকে জগদিশ। আর বোকার মতো দাঁত কেলিয়ে শুধু হাসে। সে হাসিতে কোনো শব্দ নেই। নীরতায় চাপা। সে হাসিতে কোনো মুখ নেই। যন্ত্রণার আভাস!

কী গো রা করো না ক্যা! কোনো সমস্যা? 

জগদিশের চোখে এবার জল চিকচিক করে ওঠে। অপ্রস্তুত হয়ে যায় মুকু। অসুবিধা থাকলে বলার দরকার নাই জগোদিশ—না বুইঝা তোমারে মনে হয় কষ্ট দিলাম। 

কষ্টের জীবনে আর কী কষ্ট দিবা!

জগদিশের বাবা-কাকারা তিন ভাই! নয়াবাজারে দুটো আর বক্তারপুর বাজারে একটি মিষ্টির দোকান ছিলো ওদের। যৌথ কারবার। জগদিশের বাবাই সবার বড়। মিষ্টির রমরমা কারবার ওদের। এ তল্লাটে একচেটে মিষ্টির ব্যবসা তখন জগদিশদের। জগদিশের বাবা শক্তিপদের ওপর পুরো ব্যবসা এবং সংসারের নিয়ন্ত্রণ। তার ছোট গুরুপদ আর তারাপদ। 

একবার বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় ওদের তিন-তিনটে দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। আবার কার যেন পবিত্র দাড়ি চুরি হওয়ার অভিযোগে না হয় আল্লাহর পবিত্র ঘর নাকি অপবিত্র করার অভিযোগে হিন্দুদের সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলো। আরেকবার এরশাদ জমানায় ধর্মের খেলা চললো। সরকারবিরোধী আন্দোলন দমাতে ধর্মকে দারুণ কুশলী হাতে ব্যবহার করলো এরশাদ! শেষমেষ ২০০১ এর নির্বাচনের পর একেবারে নিঃশেষ জগদিশের পরিবার। দু-দুবার দাঁড়ারার চেষ্টা করেছিলো। ঘরবাড়ি-মেরামত করে ফের ব্যবসা শুরু করেছিলো। দোকান থেকে দেব-দেবির আর কুম্ভমেলার ছবি সরিয়ে আজমির শরীফের ছবি তোলা হলো। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। তৃতীয় দফায় সব পুড়ে ছাই হয়নি শুধু। একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দিলো সব। 

কথা শেষ করে জগদিশ বলে, “আইচ্ছা কওতো কোনফাই কোন বাবরি মসজিদ কে ভাঙলো, কে কার দাড়ি চুরি না অপবিত্র করলো তার দায় আমরা বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর পড়ে ক্যান্! তিন তিনবার আগুন দিলে ব্যবসার আর কী থাহে!”

“তিনবারের সময় কাবা শরীফ, আজমীর শরীফেন ছবি তোলা না খালি, নামাজি দেইখা বাবা একটা নামাজী ম্যানেজারও রাখলো। নামাজ পরতে পরতে কপাল কহর পইরা গেছে এমন নামাজী! তাতেও শেষ রক্ষা অইলো না। শেষবার দোতলা ঘরটাও আগুনে পুড়লো। খালি পুড়লো—ঘরের সব ক্যাশ টাকাসহ পুড়লো! বাবার আবার ব্যাংকের ওপর কেন যেন বিশ্বাস আছিলো না। সব ক্যাশ ঘরেই থাকতো। আগুনে মাথার আশ্রয়, পকেটের সম্বল হগ্গল শেষ।”

কেমন যেন মুষড়ে পড়ে মুকু আখন্দ। বিপন্ন বোধ করে। বিষণ্নতা আর লজ্জা ওকে ঢেকে ফেলে মুহূর্তেই। সৌদিতেও তো অন্য ধর্মের লোক আছে। এমনটি কোথাও দেখি নাই। খুব লজ্জার। খুব লজ্জার কথা! বলে, জগদিশের মাথার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় মুকু আখন্দ। দুঃসময় সবসময় থাকে না জগো! ধৈর্য ধরো। সবর করো। এসব অন্যায় মানা যায় না!

বারবার এমন তাণ্ডব সহ্য করতে না পেরে জগদিশের ছোট দুই কাকা, গুরুপদ আর তারাপদ দেশ ছেড়ে চলে যায়। কাকাদের পরিবারের কেউ নেই। ওর বাবা শক্তিপদকে অনেক চেষ্টা করেও রাজি করাতে পারেনি দেশ ছাড়ার জন্যে। ওর এক কথা, “নিজের ভিটি-বাড়ি ছাইড়া কই যামু। আমার নাড়ি পোতা এই বাড়িতে। আমার শিকড় এই মাটিতে। এরে ছিন্ন করা সম্ভব না।” বাবার এক রাও, “আমরা কী শিকড় ছাড়া গাছ! বাতাস দিলো আর ধুপ কইরা পইড়া গেলাম! তোরা যা।”

অগত্য দুভাই আর পেছন ফিরে তাকায়নি। ছেলেমেয়ের হাত ধরে ভিটি ছেড়ে পথে পা রাখে। শোকে, দুঃখে শক্তিপদ উঠোন আঁকড়েই বসে থাকে। ওদের বিদায় দিতে দুকদমও সামনে এগিয়ে যায়নি।

শিকড় ছিন্ন না হলেও শিকড় যে বড্ড দুর্বল হয়ে গেছে এটা ঠিকই বোঝে জগদিশ। বলে, মুকু শিকড় থাকলেও শিকড়ের বিস্তার কিন্তু বন্ধ হইয়া গ্যাছে।

কেমন?

“দুইডা কাকা আছিলো গেছে গিয়া। এতোগুলো কাকাতো ভাইবোন আছিলো—ভিটিশূন্য কইরা গেছে গিয়া।” 

শুধু তাই নয়, দুই ভাইয়ের ভিটি বিক্রি হয়ে গেছে। পুব পাড়ার পোদ্দাররা এসে ঘোষ পাড়ার ভিটি কিনেছে। এ দুঃখ-কষ্ট আর লজ্জা সবসময় দহন করে বেড়ায় জগদিশকে। ওর বাবা-ভাইকে। পোদ্দাররা ঘর করেছে ওদের ভিটিতে। দু-ভিটিতে দু-দুটো দালান ঘর। দোতলা। সেসব দালানের কাছে জগদিশের ঘর দুটো নেহায়েৎ ভিখিরির আশ্রয় ছাড়া আর কী! নিজেদের ভিটিতে এখন পরবাসী হয়ে থাকে জগদিশরা!

শুধু কী তাই! ভাই ভাই সম্পর্কের যে শক্তি, এর শেকড়ের যে বিস্তার, এর শেকড়ের যে গভীরতা এবং সবচেয়ে বড় কথা একই বংশ একই রক্তধারার যে বন্ধন! তা তো আসলে একই আত্মার বিস্তার—এমনটাই মনে করে জগদিশ ও তার বাবা শক্তিপদ। সেই শক্তিতে টান পড়েছে। বেজায় টান পড়েছে ভাইরা চলে যাওয়ার পর। কাকারা দেশ ছাড়ার পর। “বাবা মাঝে মাঝে উডানের মাডি খামচায়, বুক চাপড়ায় আর কান্দে! হেঁকুর পাইড়া কান্দে! ভাই-ভাইগো আমার!

তাহলে তোমরা এখন কী করছো! কাকার শরীর এখন কেমন? 

জগদিশ বলে, “বাবার শরীর অনেকটাই ভাঙনের মুখে।” 

ভাইবোনদের দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি বাবা। বাবা সবসময় বলে তোদের কাকা জ্যাঠা পিসি কেউ নাই। তোরা তিন ভাই একজোট থাকবি। সেভাবেই চলবি সবসময়। তিন ভাইয়ের ছয় হাত—অনেক বড় শক্তি!

কাকা তো ভুল কিছু বলেননি। তার কথা মেনে চলবে। তা মিষ্টির ব্যবসা ছেড়ে এখন তাহলে কী করছো তোমরা—খেতখামারী?

“না, কৃষি কাজ করমু কোত্থাইকা। জমি জমা নাই। আমরা অহন মিষ্টির দোকানে কাম করি।” 

তিন ভাইই মিষ্টির কারিগর। বাবা দেখভাল করে। দুইতিন ঘণ্টা থাকে ওদের সংগে। দেখিয়ে দেয়। পরামর্শ দেয়। মিষ্টির কোয়ালিটি বাবাই দেখশোন্ করে।

এবার মুকু আখন্দ জানতে চায়—কোন মিষ্টির দোকানের কারিগর তোমরা।

কুটুমবাড়ি!

কুটুমবাড়ি! মেজাজ যেন মুহূর্তে কেমন খিঁচড়ে ওঠে মুকুর। অইডাতো রফি মাস্টরের দোকান!

রফি মাস্টার খালি টাহা দেয় আর ক্যাশে বইয়া থাহে। 

আর!

আর কী! বাকি সব চালাই আমরা তিনভাই আর বাবা।

অনাহূতভাবে পরপর তিনটে হাঁচি আসে মুকুর নাক-মুখ ঝেড়ে।

আমাগো শুধু চাকরি দিয়াই খ্যান্ত হয় নাই মাস্টর! মাস্টর মিষ্টির প্যাকেটের গায়ে লেখতে চাইছিলো “আদি শক্তিপদ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কারিগর দ্বারা পরিচালিত”।

বাবা মানা করলো। হাতজোর কইরা মানা করলো—রফি মাস্টররে কইলো, তাইলে আগুন থেইকা কুটুমবাড়িও আর বাঁচবো না মাস্টর! কুটুমবাড়ি আমাগো রুটিরুজি, কুটুমবাড়ি আমগ আশ্রয়! কুটুমবাড়ি বাঁচলে আমরাও বাঁচুম! কুটুমবাড়ি বাঁচুক। বাঁইচা থাকুক অনেক অনেকদিন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬


কুটুমবাড়ি

প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মনে হলো আমার কথা শুনে বেশ খুশিই হয়েছে।

ওর কথার ক্ষিপ্রতা, ব্যতিব্যস্ততা ও নির্ভরতা এবং কণ্ঠে ব্যাকুলতা যেন তাই বলে! সেসঙ্গে আমাকে সবরকম আশ্বাস ও নির্ভার করার চেষ্টা! বললো, “তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। টাকা! টাকার দরকার! সে নিয়ে তুমি মোটেও ভেবো না। কতো লাগবে? পাঁচ হাজার! দশ হাজার! না হয় কুড়িই হলো! অসুবিধা নেই। আমি যতক্ষণ আছি তোমার পাশে তুমি চোখ বন্ধ করে থাকো। চিন্তা সব আমার মাথায় পাঠিয়ে দাও।”

“আমার জ্যাবের মধ্যে সবসময় কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকা থাকেই। তোমার যা দরকার নিও। তবু অনুষ্ঠানের যেন কমতি না থাকে। আমার কাকীমার মৃত্যু দিবস বলে কথা!”

মুকু আখন্দের কথায় আর আশ্বাসে সত্যি নির্ভার হলাম। 

গত বিশ বছর সৌদি আরব কাটিয়ে সদ্য দেশে ফিরেছে মুকু। মাঝে কয়েকবার শুধু দেশে এসেছিলো। মাস দুয়েক কাটিয়ে ফের ফিরে গেছে। এবার পাকাপোক্তভাবে ফিরে এসেছে। মেয়ে এমএ পড়ছে। বিয়ে দিতে হবে না! সুতরাং দেশে এবার আঁটঘাঁট বেঁধে এসেছে মুকু। মেয়ের জন্যে গয়না গড়িয়ে এনেছে দশ ভরি। অনেকে ফিসাফাস করে বলে, “এইডা প্রকাশ্য। আউলে যে আরও কত ভরি আছে তা তো কয় না মুকু! তবে ওর হাবভাবে এমনটাই আন্দাজ করছে পাড়াপড়শির কৌতূহলীরা।”

মুকু আখন্দ নাই কাজ খই ভাজলেও ঘরে বসে থাকার মানুষ নয়। পইপই করে এপাড়া-ওপাড়ায় ঘুরে বেড়ায় আর রূপান্তর দেখে। রূপান্তর দেখে আর বলে কতো চেঞ্জ! না এলে বিশ্বাসই হতো না! মানুষের ঘরবাড়ি, রাস্তা ঘাট, মানুষের পোশাক পরিচ্ছদ সব জায়গাতেই পরিবর্তন। নতুনের হাওয়া! তখন বলে, “বাহঃ উন্নতি! বেশ উন্নতি চারদিকে! তোমরা আবার ভেবো না আমি বসে বসে খাওয়ার ধান্দা করছি। কিছু একটা তো করতেই হবে! বসে বসে খেলে রাজার ভাণ্ডও তো ফুরিয়ে যায়!”

সুতরাং ভাণ্ড ধরে রাখবে বলে নানা কাজের ফিকিরে যখন এদিক-ওদিক ঘুরছে মুকু আখন্দ, তখন ছোট হোক, একটা কাজ তো পেয়েছে। একাজে অবশ্যি অর্থনৈতিক মুনাফা নেই। তবে সামাজিক কর্মের যেটুকু আনন্দ, যেটুকু স্বাচ্ছন্দ্য তা অবশ্যি আছে! মুকু বলে, দুটো দিন তো অন্তত ব্যস্ততায় কাটবে! মানুষের সঙ্গে দু-চার কথা বলার সুযোগ হবে। নানা পরিকল্পনা করতে হবে। পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে হবে! সুতরাং মুকুর মন বেশ চনমনে শ্রাবণের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকেই। এদুদিন আর এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে কাটাতে হবে না! রাস্তার ধারে বটের ঝুরি ধরে না হয় মোটা শেকড়ের ওপর বসে কাঁচা বয়েসি ছেলেপুলেদের সঙ্গে গল্প জুড়ে বসতে হবে না। কিংবা টঙ ঘরের বেঞ্চিতে বসে এর বাড়ি-ওর বাড়ির খবর নিয়ে এবং চায়ে চুমুক দিয়ে সময় কাটাতে হবে না। না হয় ঘুমটি ঘরে সিগন্যালম্যানের পাশে বসে ট্রেনের আসা-যাওয়া দেখতে হবে না। একে একে রেলের বগির সংখ্যা গুনতে হবে না! ব্যস্ততা! অনেক ব্যস্ততা আজ মুকু আখন্দের! তাই আগেভাগেই স্নানপর্ব সেরে গায়ে শাদা আলাখাল্লা চাপাতে ভুল করে না মুকু! মাথায় গোলগাল এক টুপি। টুপির ওপর লাল-কালো ডুরে এক উড়নি চাপানো। উড়নির ওপর কালো বেশ শক্ত এক বীড়া চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ে মুকু আখন্দ। দুপা এগোতেই কী ভেবে পেছন ফেরে মুকু—ওঃ তোমাকে তো বলতে ভুলেই গেছি। তোমার পালা মুরগি থেকে এটা মুরগি কেটে ভুনা করবে। ডিমের তরকারি করবে। সম্ভব হলে একটু পোলাও কোরো—ঢাকা থেকে শ্রাবণ আসবে। মঞ্জু বিরক্ত হয় না। বরং খুশিই হয়। শ্রাবণের সংগে ওর ব্যস্ততা। সময় কাটবে। মন্দ কী! ওর মুখ ভরা পান। তবু কথা বলতে বাধে না—“এট্টু মাছের ছালুন না দিলে ক্যামনে হয়।”

মুকু দেরি করে না। মাছের জন্যে লোক পাঠিয়ে দেয় নয়াবাজারে! রুই মাছ আনবি তাজা দেখে!

বুক যেন আরও খানিকটা ফুলে উঠেছে আনন্দে! মঞ্জুর সায় পেলে মন এমনিতেই খুশিতে খলবল করে ওঠে। এ আনন্দকে এবার সুবাসিত করতে আতর সেবায় মনোযোগ দেয় মুকু। ওর কাছে অনেকরকম আতর আছে। সকালে একটা—বিকেলে আরেকটা মাখে শরীরে-জামায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় না। বুক পকেট থেকে যথারীতি আতরের শিশি বের করে পাঞ্জাবির কলার, উড়নির গায়ে মাখায়। অনামিকার ডগায় একটু আতর ছুঁইয়ে দুই নাকের ফুটোয় ঢুকিয়ে দেয়। কী এক আবেশে চোখ বুজে আসে যেন! একটু পরপর দুপাশে টেনেমেনে উড়নি-রুমালের ঝুল বাড়ানোর চেষ্টা! উড়নির ওপর বীড়ার চাপ আরও একটু বাড়ানোর কসরৎ। যাতে বাতাসে আবার নড়ে না যায়, উড়ে না যায়। বেয়ারা বাডার বলে কথা। চলার পথে থেমে থেমে উড়নির যত্ন নিতে ভুল করে না মুকু। রোজকার মতো আজকের সাজসজ্জাতেও কোনো হেরফের হয়নি। বরং কিছু বাড়তি আয়োজন চোখে পড়ে।

পায়ে পায়ে বড় রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায় মুকু। উত্তরে-দক্ষিণে এ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার। সে তুলনায় তেমন ব্যস্ততা নেই সড়কের। মাঝে মাঝে দু-একটা ট্রাক্টর না হয় অটোরিকশার যাতায়াত শুধু।

সড়কের এপাড়ে-ওপাড়ে পায়চারি করছে মুকু। স্থির-গম্ভীর। তবে ভেতরে ভেতরে যে তার চঞ্চলতা-অস্থিরতা কাজ করছে ঢের, তা বাইরে থেকে ঠিকই বোঝা যায়। হাতে একটা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে কখনও এধারে কখনও ওধারে ঝোপের গায়ে সপাং সপাং করে মারছে। যেন কারও ওপর রাগ ঝাড়ছে ঝোপঝাড়ের গায়ে মেরে। রিকশার শব্দ পেলে মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে—কে এলো?

মাঝে মাঝে মাথার বীড়ার তল থেকে লাল-কালো ডুরে উড়নি টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা! কখনও ত্রিভুজাকৃতি আঁক কষে মাটিতে হাতের কঞ্চি দিয়ে, কখনও গামছার মতো ডান কাঁধে ঝুলিয়ে রাখছে আরেকটা উড়নি। সবই আসলে দুর্বোধ্য। খানিক সময় আপন মনে বিড়বিড় করে মুকু—মন শান্ত হ, শান্ত হ। যেন ঘোড়ার ঘাড়ের কেশরে হাত বুলিয়ে নিজের মনকে বোঝাচ্ছে। শেষে পরম তৃপ্তির চোখে আশপাশে তাকার মুকু আখন্দ। উড়নির গায়ে মাখা আতরের গন্ধ নাক ডুবিয়ে টেনে নেয় অনেকক্ষণ ধরে। বেহেশতের উড়নি বলে কথা! এমনটাই মনে করে মুকু। তবে এ নিয়ে গাঁয়ের অনেকের নানা প্রশ্ন থাকলেও সবাই চুপ। কোনো প্রশ্ন নেই কারও। তবে মাঝে মাঝে ছেলে-ছোকড়ারা কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলে, “কাকা আপনার বেহেশতি রুমাল কয়ডা আছে। আমাগও দেন। গুনায় গলা আন্দাজ টইটম্বুর! রুমাল গায়ে দিয়া যদি পুলসেরাত পার অইতে পারি!”

মুকু মিটিমিটি হাসে। “বেহেশত কী ভাদ্দর মাসের তালরে। ধুপুস-ধাপুস পড়বো আর খাবলা দিয়া ধরমু।” তার আগে তোদের জিন্স ছাড়তে হবে। দ্বিনের পথে আসতে হবে।

তা কাকা এই রুমাল যে বেহেশতে দেখা যাইবো। তা কেডায় কইলো কাকা? কোনো হাদিস কিংবা কারও বক্তৃতা!

দেখ বেশি কথা বলা নাজায়েজ। তা তাছাড়া অপ্রয়োজনীর কথা বলা, আল্লাহপাকের একবারেই না পছন্দ। কমপ্লিটসে না-পছন্দ! সুতরাং কাজের কথা বল্। 

কখনও রুমালাখানি ছুঁয়ে কেউ বলে কী মোলায়েম! চোখে বেহেশতি ঘুম আসে। কেউ রুমাল ছুঁয়ে দিয়ে বলে কী সুন্দর সুবাস! সৌদি থেইকা আনছো বুঝি! মুকু কপাল কুঁচকে শুধু বলে, হুম! ভেতরে গদগদ একটা ভাব। উপচে পড়বে যেন।

মানু বেশ আহলাদের কণ্ঠে বলে, মুকু মামা, বেহেশতীর রুমালের গল্পডা এট্টু কওনা! 

বেয়াদব! বেত্তামিজ! এটা গল্প! এটা গল্প! হিসেব করে কথা বলবি। তা না হলে মুখে কীরা (পোকামাকড়) জমে জিভ খসে খসে পড়বে! 

এমনি আলাপ-সালাপে গাঁয়ের মানুষ নানা রঙ চড়ানোর চেষ্টা করলেও মুকু আখন্দ কখনও ধৈর্য হারায় না। বলে, “মনে রাখিস, ডাকতারের ওপর কি রোগ নিয়া কথা কওয়া যায়! নাকি কথা বলা সঙ্গত?”

সবাই মাথা নাড়ে।

মুকু আখন্দ মনে করে, তার ওপর কথা বলা ধৃষ্টতা। তার সঙ্গে ওপরচালাকি করা রীতিমতো পাপ! পবিত্র জায়গায় ধুলোবালি থেকে আসা এই দেহ। 

জীবন-যৌবন সব শেষ করে সৌদি আরব থেকে ফিরেছে মুকু। পবিত্র মক্কা-মদিনা কোথায় না থেকেছে ও। তিনবার হজ্ব করেছে। সাতবার ওমরাহ করেছে এ দীর্ঘ বিশ বছরে। পবিত্র মাটির ছোঁয়ায় তার দেহও আজ পুতপবিত্র! এমনটাই মনে করে মুকু।

তার মন সবসময় পবিত্র। দীর্ঘ সময় ধরে পবিত্র বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া তার ফুসফুস পবিত্র না হয়ে কী পারে! অসম্ভব পবিত্র। সুতরাং এই দেহ থেকে বের হওয়া প্রতিটি কথাও ভীষণ পবিত্র। তখন এমনি পবিত্র দেহের ভেতর থেকে আসা কথা নিয়ে মশকারি করা একেবারেই না-জায়েজ। এমনটিই মনে করে মুকু। এবং সেভাবেই অনেককে সাবধান করে দেয় নানা সময়ে। এসব গভীর বোধের কথা যখন বলে মুকু তখন ওর দৃষ্টি থাকে মাটির দিকে নিবদ্ধ। মুকু বলে মৃত্তিকামুখী থেকে পথ চলবে, কথা বলবে। তখন ওর শরীর কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায়।

সুতরাং এ রুমালের মাহাত্ম্যকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একথা বোঝাতে বোঝাতে মুকু এখন ক্লান্ত। আজও বাস্তার ধারে রুমাল বিষয়ে কথা বলছিলো যেন কার সংগে। তখনই আমার রিকশা এসে থামলো মুকুর সামনে। মুকু আমার দিকে খানিক সময় অপলকে তাকিয়ে বলে, তুমি শ্রাবণ না! 

এ মুকুও আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। বিশ বছর পর আজ ওর সংগে দেখা। এ রকম সৌদী লেবাসে ওকে দেখবো কখনও ভাবিনি। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক মুকু। আমার চোখে বিস্ময়—তুমি মুকু না! 

রিকশাআলা দাঁত কেলিয়ে হাসে—হ্যায়ই তো মুকু! অহন অইছে মুকু হাজী!

মুকু বলে খামোশ! তোর কথার তাছির তো বালা না। কোন বাড়ির পোলা তুই। তবে মুকুর ঠোঁটে মিটি মিটি হাসি। চোখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য। এবার আমার দিকে চোখ রেখে—এতো দেরি! বলেই রিকশায় উঠে বসে মুকু আখন্দ।

ঘাড় ঘুরিয়ে খানিক সময় আমাকে দেখে মুকু—আহালান ওয়া সাহালান। 

ধন্যবাদ।

ধন্যবাদ কেন?

মুকু এবার বলে, কাইফা হালুকা। 

আমি মুকুর দিকে লজ্জাবনত চোখে তাকিয়ে থাকি। মুকু সেলফি তোলার ভঙ্গিতে মোবাইলের স্ক্রিনে ওর চেহারাটা ভাসিয়ে তোলে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানাভাবে নিজের চেহারাখানি দেখে। শেষে আলখাল্লার পকেট থেকে চিরুনি বের করে থুতনির একছটাক দাড়ির ওপর বুলিয়ে নেয় কতক্ষণ! এবার অন্য পকেট থেকে সুরমাদানি বের করে দু-চোখে সুরমা আঁকে খুব আয়েস করে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও একবার চোখে সুরমা দিয়েছিলো মুকু। সুরমা চোখে ফের সুরমা দেবার মাজেজাটা কি তা বুঝতে পারি না ঠিকঠাক। সুরমাদানি ফের বাঁ পকেটে রেখে আলখাল্লার বুকপকেট থেকে এবার সুন্দর, বেশ কারুকার্যখচিত আতরদানি বের করে নিজের জামায়, ঘাড়ে কানের লতিতে আতর ছুঁইয়ে ইশারায় আমাকে হাত পাততে বলে।

আমি ডান হাতের চেটো বাড়িয়ে দিতেই খানিক আতর মেখে আমার চেটো ভিজিয়ে দেয়। শেষে আতরদানি বুকপকেটে রেখে বলে, মানে কেমন আছো? তেমনি মিটিমিটি হাসি ঠোঁটের কার্নিশে!

আমি এবার হাসি আরও ছড়িয়ে বলি, ভালো আছি।

মুকু ঘাড় নেড়ে না না—বলো, আনাকোয়েস মানে বা ভালো আছি।

বাড়ির সবাই কেমন আছে?...

সবাই ভালো। মেয়েটা খানিক অসুস্থ।

কাকা, যাইবেন কোনো ফাই! না গেলে এমনেরা গাছতলায় খাড়াইয়া আরবি শিক্ষা করেন কিন্তু আমারে বিদায় দেন। ধৈর্যচ্যুতির আভাস রিকশাঅলার কণ্ঠে স্পষ্ট! মুকুর এবার যেন সম্বিৎ ফেরে। বলে, বিলম্বের জন্যে তুমি যথারীতি হাদিয়া পাইবে। তখন এতো অস্থিরতা কেন! তোমার কথায় কিঞ্চিৎ বেয়াদবির সুরও পাইতেছি! মোটেই ভালো লক্ষণ নয়! রিকশাঅলা মুখে কিছু না বলে পাশের পুকুর ঘাটের দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। মুকু আরেক দফা আতরের সুবাস নিতে নিতে বলে, উনা মাসে খালে পানি থাহে না। ক্ষেতি করলে কেমনি হয়। বিড়বিড় করে আপন মনে কথাগুলো বলে মুকু। শেষে রিকশাঅলাকে বলে, মার্কেটে যাও!

ধূ ধূ জমি। সবুজ জুড়ে উতল হাওয়া বইছে। তার চারদিকে ডোবানালা। সবুজ উপড়ে ফেলে ছড়ির্য়ে-ছিটিয়ে কিছু দালান বাড়ি উঠেছে সম্প্রতি। 

এর কোনোটা কাপড়ের, কোনোটা তৈজষপত্র, কোনোটা ঘর নির্মাণের সরঞ্জাম—ঢেউটিন থেকে সিমেন্ট। ফাঁকে ফাঁকে আছে সেলুন, লন্ড্রি, ফার্মেসি, মিষ্টির দোকান, স্টেশনারি আরও কতো কী! অনেকে বলে নিও মার্কেট। মুকু নিউ বলে না, বলে শুধু মার্কেট। মার্কেট বলতেই যেন ওর স্বাচ্ছন্দ্য।

তো মার্কেটে যেতে যেতে অনেক কথার ভিড়ে অনেক স্মৃতিচারণে দুজনে তখন মগ্ন। কাপাসিয়া রোড ধরে অনেকটা উত্তরে চলে আসে ওদের রিকশা। হঠাৎ যেন ইলেকট্রিকের শক খেলো মুকু। থামো থামো কই যাও তুমি!

কিছুতো কন নাই! কানে খাটো নাকি তুমি! বললাম না। 

মার্কেটে যাও! মিষ্টি কিনবো। মিষ্টির দোকানে যাও, ভালো মিষ্টির ঘর কার? রিকশাঅলা এদিক ওদিক, ডানে বাঁয়ে ঘুরে শেষে এক মিষ্টির দোকানে এসে দাঁড়ায়।

কাকা খুব ভালো মিষ্টি! বিয়াশাদীর মিষ্টি সব ওরাই সাপ্লাই দেয়। 

রিকশা থেকে না নেমেই দালান ঘরটির নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বেশ কবার চোখ বোলায় মুকু আখন্দ। সাইনবোর্ডের ওপর চোখ স্থির রেখে বললো, এটা কোথায় আনলা। এটাতো ঘোষেদের দোকান!

মিষ্টি তো ঘোষেরাই বানায় কাকা! অগো বংশগত কারবারই তো মিষ্টি বেচন। মিষ্টির মা-বাবা ঘোষেরা!

ঘোষ না ঘোষ না, মোসলমানের মিষ্টির ঘর কোনটা?

বালা জ্বালাতনে পড়লাম! অহন আমি মোসলমানের মিষ্টির ঘর কই খুঁইজা পামু!

না না, মিষ্টি না পেলেও ঘোষেদের মিষ্টি কিনবো না! মোসলমানের মিষ্টি দরকার।

রিকশাঅলা সিটে বসতে বসতে বলে, ঘোষেরা এমনেরে চিমডি দিছে না কামুর দিছে! ঘোষের মিষ্টি নিবেন না! হগ্গলে ঘোষের মিষ্টির পাগল! ঘোষের মিষ্টি অহন কামারের ঘরে খুঁজলে কী অইবো! বলেই সে ট্যাঁ ট্যাঁ হর্ন বাজিয়ে এগোতে থাকে। 

চিমটি দেবে কেন? এরপর চুপ হয়ে যায় মুকু আখন্দ। ভাবে, বিশ বছরে সৌদি হাওয়া-বাতাসে পবিত্র তার শরীর। বারবার হজ্ব আর ওমরাহ করে খোদার ঘরে কতো চোখের জল ফেলেছে। লাগাতার পূণ্য অর্জন করেছে গত বিশ বছর ধরে। এতো পূণ্য অর্জন করে এখন ঘোষেদের মিষ্টি খেয়ে সব নষ্ট করতে পারবে না! মুসলমানের দোকানের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মুকু আখন্দ! “মুসলমানের দোকান পাইলা!”

গণি রা করে না। 

ভালো করে খোঁজো। মার্কেটে কয়ডা আর দোকান! তার মধ্যে মুসলমানের দোকান তো চোখ বন্ধ কইরাই খুঁইজা বাইর করা যায়। জিগাও না কাউরে!

গণি বেজায় বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলে না। শত হলেও বড়ঘরের পোলা! সৌদি পয়সার বেজায় তমতমি। অহন আর ঘোষেগো চিনে না!

ওদের রিকশা চক্কর খেতে খেতে টাল হবার যোগাড়! একবার এদিকে যায় ওদিকে থামে। আবার ওদিকে যায় এদিকে এসে থামে। একে ওকে জিজ্ঞেস করে। খোঁজে মুসলমানের মিষ্টির দোকান! অনেক ভেবে শেষে একজন বললো কুটুমবাড়ি যাও!

রিকশা এগোয়। শ্রাবণের সংগে দু-চার কথা বলে ফের মনোযোগ দেয় রিকশাঅলার দিকে, ও গণি ...!

রিকশাঅলার মেজাজ তখন তুঙ্গে। আরও কতো কী দেখুম! কন, কী কইবেন!

এদিক-ওদিক ডানে-বাঁয়ে দু-তিনটে বাঁক নিয়ে ঝড়ো বেগে কুটুমবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় ও। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। ভিটি অনেক উঁচু করে তবে ঘর তুলেছে। অর্ধেক সিঁড়ি উঠতেই এক চাঁদ কপালিকে চোখে পড়ে ওর। কপালে কালো দাগ। চোখে সুরমা। গায়ে ঘি-রঙা পাঞ্জাবি! মাথায় টুপি! বসে আছে ক্যাশবাক্স আগলে। রফি মাস্টার! এ নামেই ওকে ডাকে লোকে। 

মাস্টর! বালা মিষ্টির খোঁজ করতে করতে এমনের ঘরে আইলাম। 

রফি মাস্টার দাঁড়িয়ে দুহাত মেলায় মুকুর সঙ্গে। আমাকে ইশারায় সালাম। ওদের সামনে বড় বড় সসপ্যানে, টাবে নানারকম মিষ্টি হাবুডুবু খাচ্ছে রসের তলে।

রসগোল্লা, কালোজাম, লালমোহন আর ছানার জিলাপি।

এতো ভালো দোকান! অথচ সারা রক্তারপুর পইপই কইরা ঘুইরা বেড়াইলা গণি!

গণি দাঁত কেলিয়ে শুধু হাসে, কাহা গো!

মুকু আখন্দ শুধু হাতের ইশারায় থামতে বলে ওকে।

নিজেই ক্যাশ থেকে উঠে আসে রাফি মাস্টার। বড় থালায় সব পদের মিষ্টি সাজিয়ে মুকুর সামনে তুলে ধরে, খেয়ে দেখেন। টাটকা মিষ্টি। মাত্র চুলা থেইকা নামাইছে। 

সব পদ থেকে একটু একটু করে চেখে দেখে ওরা। রিকশাআলা গণিও বাদ যায় না! 

খাঁটি ছানার তৈরি।

ময়দার ভেজাল নাই তো!

রফি মাস্টার জিভ কাটে। দুকানে আঙুল দেয়, কী সব্বনাশা কথা! কতো মণ দুধ আসে কটুমবাড়িতে একটু খোঁজ  নিয়ে দেখতে পারেন।

খোঁজ নেয়ার দরকার নেই! তবে মিষ্টি খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেলাম মাস্টর! পরে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কথা হাছা কইলাম না মিছা কইলাম, শ্রাবণ স্যার।

আমি সম্মতি দিতেই রফি মাস্টার লোক ডেকে মিষ্টির প্যাকেটগুলো অটোতে তুলে দিতে বলে।

মিষ্টি খেয়ে এবাড়ি-ওবাড়ি—মসজিদের সকলের মুখে প্রশংসা। কোন জায়গার মিষ্টিগো! ঢাহার মিষ্টি বুঝি!

কিসের ঢাকা! মার্কেটের দোকান—কুটুমবাড়ি। মুকু আখন্দের কথায় দাপুটে ভাব! 

কুটুমবাড়ির নাম মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে এ তল্লাটে।

পরদিন যথারীতি ঘুমটি ঘর, চায়ের স্টল বটতলা হয়ে মার্কেটে এসে মাসুম চাকলাদের কাঠের দোকানে এসে বসে মুকু আখন্দ। দেশীয়-আন্তর্জাতিক সামাজিক পারিবারিক নানা বিষয়ে তামাম তামাম গল্প করে নিরোগালয়ে এসে দাঁড়ায় মুকু—ওষুধ কিনতে হবে। 

ট্যাবলেট সিরাপ, ওর-স্যালাইন—এন্টিবায়োটিকসহ নানাপদের ওষুধ কিনে একটু আনমনা হাঁটতে থাকে মুকু। মাথাটা নিচু, পায়ের গতি শ্লথ। মন যেন ওর পথের ঘাস ধুলো আনাচে-কানাচের ঝোপঝাঁড়ের মাথা ছুঁয়ে ফুটে থাকা ছোট ছোট বুনোফুলের গভীরে যেন সেধিয়ে যাচ্ছে। আসলে দীর্ঘ প্রবাস জীবনে পূণ্য যেমনি কামিয়েছে হজ্ব-ওমরাহ করে; তেমনি পয়সাও কামিয়েছে ঢের। কিন্তু অসুখ বাঁধিয়ে এনেছে অনেকগুলো। নানা কিসিমের অসুখ। একইসঙ্গে স্বামীহীন জীবনে না পাওয়া নানা কষ্ট, নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা, সংসারের ঘানি আর প্রবঞ্চক সমাজের নানা কপটতা সামলাতে সামলাতে মিতুর শরীরও আজ রাজ্যির অসুখের ভাগাড়। মাস জুড়ে দুজনের প্রায় বারো-তেরো হাজার টাকার ওষুধ লাগে। ডাক্তার-পথ্যি-টেস্ট তো আলাদা! 

এমনি ভাবনায় যখন নিমগ্ন মুকু আখন্দ; তখন পেছন থেকে কে যেন ওর কাঁধে হাত রাখে। খানিক চমকে ফিরে তাকায়—জগদিশ যে, কেমন আছো? বাড়ির সবাই ভালো।

জোগেশ, ওর ছোট ভাই গণেশ—এরা সবাই কেমন আছে।

ভালোয়-মন্দে আছি।

তোমারে আমি দূর থেইকা দেখছি—মনে অইলো মুকুর মতো লাগে! পরে পিছে পিছে আইলাম। তা কবে ফিরলা দেশে—

দিন পনেরো।

আবার করে যাইবা?

আর না! মেলা প্রবাস কাটাইছি। আর কতো!

তা ঠিক। তোমগো মিষ্টির কারবার না আছিলো। আছে অহনও।

খানিকসময় চুপ করে থাকে জগদিশ। আর বোকার মতো দাঁত কেলিয়ে শুধু হাসে। সে হাসিতে কোনো শব্দ নেই। নীরতায় চাপা। সে হাসিতে কোনো মুখ নেই। যন্ত্রণার আভাস!

কী গো রা করো না ক্যা! কোনো সমস্যা? 

জগদিশের চোখে এবার জল চিকচিক করে ওঠে। অপ্রস্তুত হয়ে যায় মুকু। অসুবিধা থাকলে বলার দরকার নাই জগোদিশ—না বুইঝা তোমারে মনে হয় কষ্ট দিলাম। 

কষ্টের জীবনে আর কী কষ্ট দিবা!

জগদিশের বাবা-কাকারা তিন ভাই! নয়াবাজারে দুটো আর বক্তারপুর বাজারে একটি মিষ্টির দোকান ছিলো ওদের। যৌথ কারবার। জগদিশের বাবাই সবার বড়। মিষ্টির রমরমা কারবার ওদের। এ তল্লাটে একচেটে মিষ্টির ব্যবসা তখন জগদিশদের। জগদিশের বাবা শক্তিপদের ওপর পুরো ব্যবসা এবং সংসারের নিয়ন্ত্রণ। তার ছোট গুরুপদ আর তারাপদ। 

একবার বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় ওদের তিন-তিনটে দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। আবার কার যেন পবিত্র দাড়ি চুরি হওয়ার অভিযোগে না হয় আল্লাহর পবিত্র ঘর নাকি অপবিত্র করার অভিযোগে হিন্দুদের সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলো। আরেকবার এরশাদ জমানায় ধর্মের খেলা চললো। সরকারবিরোধী আন্দোলন দমাতে ধর্মকে দারুণ কুশলী হাতে ব্যবহার করলো এরশাদ! শেষমেষ ২০০১ এর নির্বাচনের পর একেবারে নিঃশেষ জগদিশের পরিবার। দু-দুবার দাঁড়ারার চেষ্টা করেছিলো। ঘরবাড়ি-মেরামত করে ফের ব্যবসা শুরু করেছিলো। দোকান থেকে দেব-দেবির আর কুম্ভমেলার ছবি সরিয়ে আজমির শরীফের ছবি তোলা হলো। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। তৃতীয় দফায় সব পুড়ে ছাই হয়নি শুধু। একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দিলো সব। 

কথা শেষ করে জগদিশ বলে, “আইচ্ছা কওতো কোনফাই কোন বাবরি মসজিদ কে ভাঙলো, কে কার দাড়ি চুরি না অপবিত্র করলো তার দায় আমরা বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর পড়ে ক্যান্! তিন তিনবার আগুন দিলে ব্যবসার আর কী থাহে!”

“তিনবারের সময় কাবা শরীফ, আজমীর শরীফেন ছবি তোলা না খালি, নামাজি দেইখা বাবা একটা নামাজী ম্যানেজারও রাখলো। নামাজ পরতে পরতে কপাল কহর পইরা গেছে এমন নামাজী! তাতেও শেষ রক্ষা অইলো না। শেষবার দোতলা ঘরটাও আগুনে পুড়লো। খালি পুড়লো—ঘরের সব ক্যাশ টাকাসহ পুড়লো! বাবার আবার ব্যাংকের ওপর কেন যেন বিশ্বাস আছিলো না। সব ক্যাশ ঘরেই থাকতো। আগুনে মাথার আশ্রয়, পকেটের সম্বল হগ্গল শেষ।”

কেমন যেন মুষড়ে পড়ে মুকু আখন্দ। বিপন্ন বোধ করে। বিষণ্নতা আর লজ্জা ওকে ঢেকে ফেলে মুহূর্তেই। সৌদিতেও তো অন্য ধর্মের লোক আছে। এমনটি কোথাও দেখি নাই। খুব লজ্জার। খুব লজ্জার কথা! বলে, জগদিশের মাথার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় মুকু আখন্দ। দুঃসময় সবসময় থাকে না জগো! ধৈর্য ধরো। সবর করো। এসব অন্যায় মানা যায় না!

বারবার এমন তাণ্ডব সহ্য করতে না পেরে জগদিশের ছোট দুই কাকা, গুরুপদ আর তারাপদ দেশ ছেড়ে চলে যায়। কাকাদের পরিবারের কেউ নেই। ওর বাবা শক্তিপদকে অনেক চেষ্টা করেও রাজি করাতে পারেনি দেশ ছাড়ার জন্যে। ওর এক কথা, “নিজের ভিটি-বাড়ি ছাইড়া কই যামু। আমার নাড়ি পোতা এই বাড়িতে। আমার শিকড় এই মাটিতে। এরে ছিন্ন করা সম্ভব না।” বাবার এক রাও, “আমরা কী শিকড় ছাড়া গাছ! বাতাস দিলো আর ধুপ কইরা পইড়া গেলাম! তোরা যা।”

অগত্য দুভাই আর পেছন ফিরে তাকায়নি। ছেলেমেয়ের হাত ধরে ভিটি ছেড়ে পথে পা রাখে। শোকে, দুঃখে শক্তিপদ উঠোন আঁকড়েই বসে থাকে। ওদের বিদায় দিতে দুকদমও সামনে এগিয়ে যায়নি।

শিকড় ছিন্ন না হলেও শিকড় যে বড্ড দুর্বল হয়ে গেছে এটা ঠিকই বোঝে জগদিশ। বলে, মুকু শিকড় থাকলেও শিকড়ের বিস্তার কিন্তু বন্ধ হইয়া গ্যাছে।

কেমন?

“দুইডা কাকা আছিলো গেছে গিয়া। এতোগুলো কাকাতো ভাইবোন আছিলো—ভিটিশূন্য কইরা গেছে গিয়া।” 

শুধু তাই নয়, দুই ভাইয়ের ভিটি বিক্রি হয়ে গেছে। পুব পাড়ার পোদ্দাররা এসে ঘোষ পাড়ার ভিটি কিনেছে। এ দুঃখ-কষ্ট আর লজ্জা সবসময় দহন করে বেড়ায় জগদিশকে। ওর বাবা-ভাইকে। পোদ্দাররা ঘর করেছে ওদের ভিটিতে। দু-ভিটিতে দু-দুটো দালান ঘর। দোতলা। সেসব দালানের কাছে জগদিশের ঘর দুটো নেহায়েৎ ভিখিরির আশ্রয় ছাড়া আর কী! নিজেদের ভিটিতে এখন পরবাসী হয়ে থাকে জগদিশরা!

শুধু কী তাই! ভাই ভাই সম্পর্কের যে শক্তি, এর শেকড়ের যে বিস্তার, এর শেকড়ের যে গভীরতা এবং সবচেয়ে বড় কথা একই বংশ একই রক্তধারার যে বন্ধন! তা তো আসলে একই আত্মার বিস্তার—এমনটাই মনে করে জগদিশ ও তার বাবা শক্তিপদ। সেই শক্তিতে টান পড়েছে। বেজায় টান পড়েছে ভাইরা চলে যাওয়ার পর। কাকারা দেশ ছাড়ার পর। “বাবা মাঝে মাঝে উডানের মাডি খামচায়, বুক চাপড়ায় আর কান্দে! হেঁকুর পাইড়া কান্দে! ভাই-ভাইগো আমার!

তাহলে তোমরা এখন কী করছো! কাকার শরীর এখন কেমন? 

জগদিশ বলে, “বাবার শরীর অনেকটাই ভাঙনের মুখে।” 

ভাইবোনদের দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি বাবা। বাবা সবসময় বলে তোদের কাকা জ্যাঠা পিসি কেউ নাই। তোরা তিন ভাই একজোট থাকবি। সেভাবেই চলবি সবসময়। তিন ভাইয়ের ছয় হাত—অনেক বড় শক্তি!

কাকা তো ভুল কিছু বলেননি। তার কথা মেনে চলবে। তা মিষ্টির ব্যবসা ছেড়ে এখন তাহলে কী করছো তোমরা—খেতখামারী?

“না, কৃষি কাজ করমু কোত্থাইকা। জমি জমা নাই। আমরা অহন মিষ্টির দোকানে কাম করি।” 

তিন ভাইই মিষ্টির কারিগর। বাবা দেখভাল করে। দুইতিন ঘণ্টা থাকে ওদের সংগে। দেখিয়ে দেয়। পরামর্শ দেয়। মিষ্টির কোয়ালিটি বাবাই দেখশোন্ করে।

এবার মুকু আখন্দ জানতে চায়—কোন মিষ্টির দোকানের কারিগর তোমরা।

কুটুমবাড়ি!

কুটুমবাড়ি! মেজাজ যেন মুহূর্তে কেমন খিঁচড়ে ওঠে মুকুর। অইডাতো রফি মাস্টরের দোকান!

রফি মাস্টার খালি টাহা দেয় আর ক্যাশে বইয়া থাহে। 

আর!

আর কী! বাকি সব চালাই আমরা তিনভাই আর বাবা।

অনাহূতভাবে পরপর তিনটে হাঁচি আসে মুকুর নাক-মুখ ঝেড়ে।

আমাগো শুধু চাকরি দিয়াই খ্যান্ত হয় নাই মাস্টর! মাস্টর মিষ্টির প্যাকেটের গায়ে লেখতে চাইছিলো “আদি শক্তিপদ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কারিগর দ্বারা পরিচালিত”।

বাবা মানা করলো। হাতজোর কইরা মানা করলো—রফি মাস্টররে কইলো, তাইলে আগুন থেইকা কুটুমবাড়িও আর বাঁচবো না মাস্টর! কুটুমবাড়ি আমাগো রুটিরুজি, কুটুমবাড়ি আমগ আশ্রয়! কুটুমবাড়ি বাঁচলে আমরাও বাঁচুম! কুটুমবাড়ি বাঁচুক। বাঁইচা থাকুক অনেক অনেকদিন।



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত