রাত কতটা হয়েছে, ঠিক বুঝতে পারছে না পরশ। চোখ সরায়নি এক মুহূর্তের জন্যও— চাঁদের আলোয় স্থির দৃষ্টি তার। সমস্যা হলো, এখন এক চোখে ঠিকমতো কিছুই দেখা যায় না।
অবিশ্বাস্য লাগে ভাবতে— গত বছর এই সময়েও চোখ দুটি ছিল অক্ষত, স্বচ্ছ, প্রাণভরা। সেই চোখ দিয়েই পুষ্পিতার দিকে তাকিয়ে থাকত সে, এক অনন্ত মুগ্ধতায়। তখন তার জীবন ছিল পরিপূর্ণ— প্রেমে, স্বপ্নে, আলোয়।
মানুষ সময় থাকতে কোনো কিছুর মূল্য বোঝে না। কিন্তু একবার হারিয়ে গেলে, আফসোসেরও সীমা থাকে না।
বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ের মাচায় বসে পুরোনো দিনের কথা ভাবছে পরশ। সেদিনও এমন ভরা পূর্ণিমা ছিল। পুষ্পিতা আর সে রেললাইনের ওপর হাত ধরাধরি করে হাঁটছিল। সেদিন পুষ্পিতার অনার্সের রেজাল্ট বেরিয়েছে। খুশিতে তার যেন পাখা গজিয়েছে। থেকে থেকে খিলখিলিয়ে হাসছিল সে— এক নির্মল, দীপ্ত হাসি।
সেই রাতে পুষ্পিতা বলেছিল, বাবাকে জানাবে তাদের সম্পর্কের কথা। মা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনিও বুঝিয়ে বলবেন। কিন্তু কথাটা বলতে বলতে কপালে ঘাম জমে উঠেছিল মায়ের।
— ঘামছো কেন মা?
— তোর বাবার যা রাগ রে মা...
হ্যাঁ রে, পরশের ব্যবসা কেমন চলছে?
— ভালো। এই বছর খামারে আরও বিশটা গরু কিনেছে পরশ ভাই। মোট একশ’ বিশটা গরু হলো এখন।
প্রতি মাসে দুধ বেচেই বেশ টাকাপয়সা আসে।
ওর মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষ শহরে চাকরির পেছনে না ছুটে, গ্রামে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে— লোকজনের কর্মসংস্থানও করছে— অনেক বড় কথা মা!
— হুম... এই সাহস সবার থাকে না। তবুও ব্যবসায় রিস্ক অনেক রে মা।
মায়ের সঙ্গে সেদিনের কথাগুলো মনে পড়তেই খানিকটা আনমনা হয়ে পড়ে পুষ্পিতা।
— এই যে পুষ্পরাণী, কী ভাবছেন আপনি?
— কিছু না।
— উহু, কিছু না তো হতে পারে না!
দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে পরশ বলেছিল, “জানো, ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই অঢ়ড়ষষড়১১-এর কমান্ডার নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের বুকে পা রেখে বলেছিলেন, ‘ঞযধঃ’ং ড়হব ংসধষষ ংঃবঢ় ভড়ৎ ধ সধহ, ড়হব মরধহঃ ষবধঢ় ভড়ৎ সধহশরহফ.’
মানব জাতির ইতিহাসে প্রথম পদচিহ্ন তিনি রেখেছিলেন চাঁদের বুকে। অবতরণের জায়গাটার নাম ছিল ঝবধ ড়ভ ঞৎধহয়ঁরষরঃু — বাংলায় প্রশান্তির সাগর। পূর্ণিমার রাতে খালি চোখেও সেই কালচে অঞ্চল দেখা যায়। তখন মানুষ ভেবেছিল ওটা আসলেই সাগর!
কিন্তু পরে বিজ্ঞানীরা জানালেন— এগুলো বিশাল গর্ত, যেখানে উল্কাপিণ্ডের সংঘর্ষে তৈরি খাঁজ ভরে গেছে কালো লাভায়। তবুও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধায় আজও আমরা বলি— চাঁদের সাগর।”
চাঁদের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে পুষ্পিতা জিজ্ঞেস করেছিল,
— আপনি এত জানেন কীভাবে?
— অনলাইনে ফারজানা আপার একটা পোস্ট পড়েছিলাম। সারাংশটা তোমাকে বললাম।
— দারুণ ইন্টারেস্টিং তো!
— তবে আমার ধারণা, চাঁদের বুড়ি এখনো আছেন। তিনি ঠিকই সুতা বুনছেন।
— পরশ ভাই... আমাকে একবার জড়িয়ে ধরবেন? প্লিজ...
— আরে, কী বলো এসব...
মুহূর্তেই বদলে গেল চারপাশের আবহ। ভরা জোছনায় দুজন তরুণ-তরুণী নিঃশব্দে জড়িয়ে আছে একে অপরকে। চাঁদ যেন থমকে দাঁড়াল।
হঠাৎ পরশ নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। পুষ্পিতার চোখ তখনও বন্ধ।
— পুষ্প!
— হুম? ওদিক দিয়ে কেউ আসছে মনে হয়...
— আসুক।
— চলো, তোমাকে বাড়ি দিয়ে আসি।
— না, আর কিছুক্ষণ থাকি। বাবা গঞ্জে গেছে, ফিরতে রাত হবে।
— হোক, তবু চলো।
ঠিক তখনই পাঁচজন লোক এগিয়ে এলো। একজন ছিল পরিচিত— পুষ্পিতার বাবার ম্যানেজার, হারুন।
— কী ব্যাপার, হারুন ভাই?
— আপা, দ্রুত বাসায় চলেন। চাচা খুব রাগী আছেন, মেহমান আসিছে।
পরশ ও পুষ্পিতা একসঙ্গে হাঁটছিল।
হঠাৎ এক অপরিচিত লোক পরশকে থামতে বলল—
— মিয়া ভাই, আপনার সাথৎ একনা কথা আছে। আপামণি, আপনি হাঁটা দেন।
রাগে পুষ্পিতার শরীর কেঁপে উঠল। মুখে কথা আসছে না। হারুন এসে তার হাত ধরে টান দিল—
— আপা, তাড়াতাড়ি হাঁটেন, চাচা খুব রাগী মানুষ।
পুষ্পিতা জোরে হাত ছাড়িয়ে নিতেই ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা। চোখের পলকে ধারালো অস্ত্রের কোপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল পরশের দেহ। মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে রইল সে।
চাঁদের আলোয় রক্তের স্রোতগুলোকে পুষ্পিতা মনে করল কুচকুচে কালো পানির সাগর। পূর্ণিমার চাঁদ যেন সেই স্রোতে ভেসে যেতে লাগল। পৃথিবী দুলে উঠল, সব আলো নিভে গেল।
মুহূর্তেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল পুষ্পিতা।
ভাগ্যক্রমে, পরশ সেদিন বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু হারিয়েছে এক চোখের দৃষ্টি, বাম হাত আর ডান পায়ের জোর। সেদিনের পর কেউ আর পুষ্পিতাকে দেখেনি।
তবুও প্রতি পূর্ণিমার রাতে পরশ অপেক্ষা করে। পুষ্পিতা তো কথা দিয়েছিল—
সে জানে, একদিন সে ঠিক ফিরবে।
পুষ্পিতাকে ফিরতেই হবে।

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
রাত কতটা হয়েছে, ঠিক বুঝতে পারছে না পরশ। চোখ সরায়নি এক মুহূর্তের জন্যও— চাঁদের আলোয় স্থির দৃষ্টি তার। সমস্যা হলো, এখন এক চোখে ঠিকমতো কিছুই দেখা যায় না।
অবিশ্বাস্য লাগে ভাবতে— গত বছর এই সময়েও চোখ দুটি ছিল অক্ষত, স্বচ্ছ, প্রাণভরা। সেই চোখ দিয়েই পুষ্পিতার দিকে তাকিয়ে থাকত সে, এক অনন্ত মুগ্ধতায়। তখন তার জীবন ছিল পরিপূর্ণ— প্রেমে, স্বপ্নে, আলোয়।
মানুষ সময় থাকতে কোনো কিছুর মূল্য বোঝে না। কিন্তু একবার হারিয়ে গেলে, আফসোসেরও সীমা থাকে না।
বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ের মাচায় বসে পুরোনো দিনের কথা ভাবছে পরশ। সেদিনও এমন ভরা পূর্ণিমা ছিল। পুষ্পিতা আর সে রেললাইনের ওপর হাত ধরাধরি করে হাঁটছিল। সেদিন পুষ্পিতার অনার্সের রেজাল্ট বেরিয়েছে। খুশিতে তার যেন পাখা গজিয়েছে। থেকে থেকে খিলখিলিয়ে হাসছিল সে— এক নির্মল, দীপ্ত হাসি।
সেই রাতে পুষ্পিতা বলেছিল, বাবাকে জানাবে তাদের সম্পর্কের কথা। মা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনিও বুঝিয়ে বলবেন। কিন্তু কথাটা বলতে বলতে কপালে ঘাম জমে উঠেছিল মায়ের।
— ঘামছো কেন মা?
— তোর বাবার যা রাগ রে মা...
হ্যাঁ রে, পরশের ব্যবসা কেমন চলছে?
— ভালো। এই বছর খামারে আরও বিশটা গরু কিনেছে পরশ ভাই। মোট একশ’ বিশটা গরু হলো এখন।
প্রতি মাসে দুধ বেচেই বেশ টাকাপয়সা আসে।
ওর মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষ শহরে চাকরির পেছনে না ছুটে, গ্রামে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে— লোকজনের কর্মসংস্থানও করছে— অনেক বড় কথা মা!
— হুম... এই সাহস সবার থাকে না। তবুও ব্যবসায় রিস্ক অনেক রে মা।
মায়ের সঙ্গে সেদিনের কথাগুলো মনে পড়তেই খানিকটা আনমনা হয়ে পড়ে পুষ্পিতা।
— এই যে পুষ্পরাণী, কী ভাবছেন আপনি?
— কিছু না।
— উহু, কিছু না তো হতে পারে না!
দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে পরশ বলেছিল, “জানো, ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই অঢ়ড়ষষড়১১-এর কমান্ডার নীল আর্মস্ট্রং চাঁদের বুকে পা রেখে বলেছিলেন, ‘ঞযধঃ’ং ড়হব ংসধষষ ংঃবঢ় ভড়ৎ ধ সধহ, ড়হব মরধহঃ ষবধঢ় ভড়ৎ সধহশরহফ.’
মানব জাতির ইতিহাসে প্রথম পদচিহ্ন তিনি রেখেছিলেন চাঁদের বুকে। অবতরণের জায়গাটার নাম ছিল ঝবধ ড়ভ ঞৎধহয়ঁরষরঃু — বাংলায় প্রশান্তির সাগর। পূর্ণিমার রাতে খালি চোখেও সেই কালচে অঞ্চল দেখা যায়। তখন মানুষ ভেবেছিল ওটা আসলেই সাগর!
কিন্তু পরে বিজ্ঞানীরা জানালেন— এগুলো বিশাল গর্ত, যেখানে উল্কাপিণ্ডের সংঘর্ষে তৈরি খাঁজ ভরে গেছে কালো লাভায়। তবুও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধায় আজও আমরা বলি— চাঁদের সাগর।”
চাঁদের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে পুষ্পিতা জিজ্ঞেস করেছিল,
— আপনি এত জানেন কীভাবে?
— অনলাইনে ফারজানা আপার একটা পোস্ট পড়েছিলাম। সারাংশটা তোমাকে বললাম।
— দারুণ ইন্টারেস্টিং তো!
— তবে আমার ধারণা, চাঁদের বুড়ি এখনো আছেন। তিনি ঠিকই সুতা বুনছেন।
— পরশ ভাই... আমাকে একবার জড়িয়ে ধরবেন? প্লিজ...
— আরে, কী বলো এসব...
মুহূর্তেই বদলে গেল চারপাশের আবহ। ভরা জোছনায় দুজন তরুণ-তরুণী নিঃশব্দে জড়িয়ে আছে একে অপরকে। চাঁদ যেন থমকে দাঁড়াল।
হঠাৎ পরশ নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। পুষ্পিতার চোখ তখনও বন্ধ।
— পুষ্প!
— হুম? ওদিক দিয়ে কেউ আসছে মনে হয়...
— আসুক।
— চলো, তোমাকে বাড়ি দিয়ে আসি।
— না, আর কিছুক্ষণ থাকি। বাবা গঞ্জে গেছে, ফিরতে রাত হবে।
— হোক, তবু চলো।
ঠিক তখনই পাঁচজন লোক এগিয়ে এলো। একজন ছিল পরিচিত— পুষ্পিতার বাবার ম্যানেজার, হারুন।
— কী ব্যাপার, হারুন ভাই?
— আপা, দ্রুত বাসায় চলেন। চাচা খুব রাগী আছেন, মেহমান আসিছে।
পরশ ও পুষ্পিতা একসঙ্গে হাঁটছিল।
হঠাৎ এক অপরিচিত লোক পরশকে থামতে বলল—
— মিয়া ভাই, আপনার সাথৎ একনা কথা আছে। আপামণি, আপনি হাঁটা দেন।
রাগে পুষ্পিতার শরীর কেঁপে উঠল। মুখে কথা আসছে না। হারুন এসে তার হাত ধরে টান দিল—
— আপা, তাড়াতাড়ি হাঁটেন, চাচা খুব রাগী মানুষ।
পুষ্পিতা জোরে হাত ছাড়িয়ে নিতেই ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা। চোখের পলকে ধারালো অস্ত্রের কোপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল পরশের দেহ। মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে রইল সে।
চাঁদের আলোয় রক্তের স্রোতগুলোকে পুষ্পিতা মনে করল কুচকুচে কালো পানির সাগর। পূর্ণিমার চাঁদ যেন সেই স্রোতে ভেসে যেতে লাগল। পৃথিবী দুলে উঠল, সব আলো নিভে গেল।
মুহূর্তেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল পুষ্পিতা।
ভাগ্যক্রমে, পরশ সেদিন বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু হারিয়েছে এক চোখের দৃষ্টি, বাম হাত আর ডান পায়ের জোর। সেদিনের পর কেউ আর পুষ্পিতাকে দেখেনি।
তবুও প্রতি পূর্ণিমার রাতে পরশ অপেক্ষা করে। পুষ্পিতা তো কথা দিয়েছিল—
সে জানে, একদিন সে ঠিক ফিরবে।
পুষ্পিতাকে ফিরতেই হবে।

আপনার মতামত লিখুন