পর্দার রঙ ম্লান হয়ে যায়। শব্দ হারিয়ে যায়। আলো নিভে যায়। কিন্তু কিছু ছবি, কিছু মুখ সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও কখনোই পুরনো হয় না। এমনই এক চিরসবুজ প্রেয়সীর নাম সুচিত্রা সেন। বাঁকা ঠোঁটের হাসি, তির্যক চোখের চাহনি, ছিপছিপে দেহে এক স্বতঃস্ফূর্ত অস্থিরতা- যাকে একবার দেখলে ফিরে ফিরে দেখতে ইচ্ছে করতো।
শুধু পর্দার গল্প নয়, তার নিজের জীবনটাও ছিল এক অনন্য উপন্যাসের মতো। একদিকে যেমন দূরের পাহাড়, অন্যদিকে গভীর নিঃসঙ্গতা। যেখানে ছিলেন, সেখান থেকেও ছিলেন দূরে। আর এই দূরত্বটুকুতেই লুকিয়ে ছিল তার প্রকৃত সত্তা।
১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল। পাবনার এক জমজমাট পরিবারে এসেছিলো মেজো মেয়েটি। গায়ের রঙ একটু চাপা বলে ঠাকুরদা জগবন্ধু দাশগুপ্ত নাম রাখেন কৃষ্ণা। কিন্তু বাবা করুণাময়ের সাধ করে বসলেন আরেক নাম- রমা। আর তখন থেকেই কৃষ্ণা আস্তে আস্তে ঢাকা পড়ে গেল ‘রমা’র আড়ালে।
ছোটবেলা থেকেই একটু অন্য রকম ছিলেন রমা।কাশের অরণ্য, জামরুল বাগান, ইছামতী নদীর চর- সব সময় যেতেন দূরের পথে, একা। নিঃসঙ্গতা পুষতে ভালোবাসতেন। হয়তো এই নিঃসঙ্গতার সুবাসেই পরে গড়ে উঠেছিল এক মহানায়িকার আত্মবিশ্বাস। হয়তো এখান থেকেই তিনি শিখেছিলেন- নিজেকে দূর থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখতে।সতেরো বছর বয়সে ফ্রক ছাড়তে না ছাড়তেই বাজল বিয়ের বাদ্যি। পুরীতে বেড়াতে গিয়ে পছন্দ হয়ে গেলেন দিবানাথ সেনের ঠাকুমার। বাবা ব্যারিস্টার আদিনাথ সেন একবার দেখেই বুঝে ফেললেন- উনিই হবেন পুত্রবধূ।
তবে বিয়ের পর রমা আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন নতুন পরিবেশে। যেন রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তি। সেই নিঃসঙ্গতাই একদিন তাকে ঠেলে দিল অভিনয়ের মঞ্চে। পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা প্রথম টেনে নিয়ে গেল ‘নটীর পূজা’ নাটকে। সেখান থেকেই তার খ্যাতি পৌঁছুলো কলকাতার স্টুডিও পাড়ায়।
‘রমা’ থেকে ‘সুচিত্রা’
নেপথ্য গায়িকা হতে গিয়েও পর্দায় চলে এলেন। অনেক না করেও শেষ পর্যন্ত মানতেই হলো- কারণ তাঁর রূপ আর অভিনয়কে আর লুকোনো যায়নি। ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ দিয়ে শুরু হলেও ছবিটি শেষ হয়নি। তবে থেমে থাকেননি তিনি।
সুকুমার দাশগুপ্তর ‘সাত নম্বর কয়েদী’ সিনেমা থেকে নিয়মিত হলেন রমা। না, রমা নয়- সেই ছবির নাম দিলেন নীতীশ রায়, ‘সুচিত্রা’। আর ‘কাজরী’ ছবির মাধ্যমে পুরোদমে ‘সুচিত্রা সেন’ হয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন বাংলা সিনেমার রূপোলি পর্দায়।সুচিত্রা মানেই উত্তম কুমার, আর উত্তম মানেই সুচিত্রা-এ যেন বাঙালির চিরচেনা এক প্রেমকাহিনি। ১৯৫৪ সালের ‘অগ্নিপরীক্ষা’ তাদের জুটিকে এনে দিয়েছিল অমরত্ব। টানা ১৫ সপ্তাহ প্রেক্ষাগৃহে কাঁপিয়েছিল সেই ছবি।
পর্দায় তাদের রসায়ন এতটাই সত্যি লাগতো যে দর্শক ভাবতেন, হয়তো সত্যি সত্যিই তারা ‘এক’। আর সেই সম্পর্কের গভীরতা বোঝা গেল উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। মধ্যরাতে উত্তমের শেষ সাক্ষাৎ নিতে ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়েছিলেন সুচিত্রা। সবাই ফিরে গেলেও উনি গিয়েছিলেন। সেদিন উত্তমের ছবিতে মালা পরিয়ে চিরবিদায় নিয়েছিলেন নিভৃতে। কেউ কেউ বলে, সেই শোক থেকেই তিনি ধীরে ধীরে অন্তরালে চলে যান। কিন্তু আসলে তিনি সরে গিয়েছিলেন তার দীক্ষাগুরুর মৃত্যুর পর।
সুচিত্রা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শুধু অভিনয়ে নয়, পারিশ্রমিকেও। ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় তার পারিশ্রমিক ছিলো দুই লাখ টাকা- যা সেসময় যেকোনো নায়কের চেয়েও বেশি।সুচিত্রা কখনো রাজ কাপুরের প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলেননি, সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী চৌধুরানী’তেও কাজ করতে ‘না’ করে দিয়েছিলেন- শুধু সময় মেলেনি বলে। পরে দীনেন গুপ্তের ছবিতেই তিনি সেটা করেছিলেন। তিনি যেখানে কাজ করবেন, কীভাবে করবেন- সেটা শুধু তিনিই জানতেন।
প্রত্যাখ্যান
১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর সিলভার প্রাইজ জেতেন সুচিত্রা। তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি আন্তর্জাতিক উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছেন।
১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী দেয়। আর ২০০৫ সালে যখন ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ দেওয়ার কথা ওঠে, তিনি স্পষ্ট জানান- পুরস্কার ঘরে পাঠিয়ে দিতে। তিনি আর ফিরতে চাননি চাকচিক্যের জগতে। আর সেজন্যই পুরস্কারটি তিনি আর পাননি।
চিরস্থায়ী
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি এই অভিনেত্রী। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে নিভে যায় তার বাঁকা হাসির আলো।
কিন্তু সত্যি কি তিনি নিভেছেন? প্রতিটি পুরনো বাংলা ছবির ফ্রেমে, প্রতিটি নীল রাতের নিঃশ্বাসে, এখনো উঁকি দেয় তার সেই টলটলে চোখ, কানে দুলতে থাকা ঝুমকো আর আধমোলে ঠোঁটের বাঁকা হাসি।সুচিত্রা সেন এক চিরসবুজ প্রেয়সী। যার বয়স পর্দার ফ্রেমে আটকে গেছে, আর সেই ফ্রেম ভাঙার সাধ্য কারো নেই। কিংবদন্তি চিরসবুজ সেই প্রেয়সী সুচিত্রা সেনের আজ জন্মদিন।তার এই জন্মদিনে নীরবে কোটি হৃদয়ের স্মৃতির পাতা দুলে উঠবে অন্যরকম অনুভূতিতে।

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
পর্দার রঙ ম্লান হয়ে যায়। শব্দ হারিয়ে যায়। আলো নিভে যায়। কিন্তু কিছু ছবি, কিছু মুখ সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও কখনোই পুরনো হয় না। এমনই এক চিরসবুজ প্রেয়সীর নাম সুচিত্রা সেন। বাঁকা ঠোঁটের হাসি, তির্যক চোখের চাহনি, ছিপছিপে দেহে এক স্বতঃস্ফূর্ত অস্থিরতা- যাকে একবার দেখলে ফিরে ফিরে দেখতে ইচ্ছে করতো।
শুধু পর্দার গল্প নয়, তার নিজের জীবনটাও ছিল এক অনন্য উপন্যাসের মতো। একদিকে যেমন দূরের পাহাড়, অন্যদিকে গভীর নিঃসঙ্গতা। যেখানে ছিলেন, সেখান থেকেও ছিলেন দূরে। আর এই দূরত্বটুকুতেই লুকিয়ে ছিল তার প্রকৃত সত্তা।
১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল। পাবনার এক জমজমাট পরিবারে এসেছিলো মেজো মেয়েটি। গায়ের রঙ একটু চাপা বলে ঠাকুরদা জগবন্ধু দাশগুপ্ত নাম রাখেন কৃষ্ণা। কিন্তু বাবা করুণাময়ের সাধ করে বসলেন আরেক নাম- রমা। আর তখন থেকেই কৃষ্ণা আস্তে আস্তে ঢাকা পড়ে গেল ‘রমা’র আড়ালে।
ছোটবেলা থেকেই একটু অন্য রকম ছিলেন রমা।কাশের অরণ্য, জামরুল বাগান, ইছামতী নদীর চর- সব সময় যেতেন দূরের পথে, একা। নিঃসঙ্গতা পুষতে ভালোবাসতেন। হয়তো এই নিঃসঙ্গতার সুবাসেই পরে গড়ে উঠেছিল এক মহানায়িকার আত্মবিশ্বাস। হয়তো এখান থেকেই তিনি শিখেছিলেন- নিজেকে দূর থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখতে।সতেরো বছর বয়সে ফ্রক ছাড়তে না ছাড়তেই বাজল বিয়ের বাদ্যি। পুরীতে বেড়াতে গিয়ে পছন্দ হয়ে গেলেন দিবানাথ সেনের ঠাকুমার। বাবা ব্যারিস্টার আদিনাথ সেন একবার দেখেই বুঝে ফেললেন- উনিই হবেন পুত্রবধূ।
তবে বিয়ের পর রমা আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন নতুন পরিবেশে। যেন রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তি। সেই নিঃসঙ্গতাই একদিন তাকে ঠেলে দিল অভিনয়ের মঞ্চে। পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা প্রথম টেনে নিয়ে গেল ‘নটীর পূজা’ নাটকে। সেখান থেকেই তার খ্যাতি পৌঁছুলো কলকাতার স্টুডিও পাড়ায়।
‘রমা’ থেকে ‘সুচিত্রা’
নেপথ্য গায়িকা হতে গিয়েও পর্দায় চলে এলেন। অনেক না করেও শেষ পর্যন্ত মানতেই হলো- কারণ তাঁর রূপ আর অভিনয়কে আর লুকোনো যায়নি। ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ দিয়ে শুরু হলেও ছবিটি শেষ হয়নি। তবে থেমে থাকেননি তিনি।
সুকুমার দাশগুপ্তর ‘সাত নম্বর কয়েদী’ সিনেমা থেকে নিয়মিত হলেন রমা। না, রমা নয়- সেই ছবির নাম দিলেন নীতীশ রায়, ‘সুচিত্রা’। আর ‘কাজরী’ ছবির মাধ্যমে পুরোদমে ‘সুচিত্রা সেন’ হয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন বাংলা সিনেমার রূপোলি পর্দায়।সুচিত্রা মানেই উত্তম কুমার, আর উত্তম মানেই সুচিত্রা-এ যেন বাঙালির চিরচেনা এক প্রেমকাহিনি। ১৯৫৪ সালের ‘অগ্নিপরীক্ষা’ তাদের জুটিকে এনে দিয়েছিল অমরত্ব। টানা ১৫ সপ্তাহ প্রেক্ষাগৃহে কাঁপিয়েছিল সেই ছবি।
পর্দায় তাদের রসায়ন এতটাই সত্যি লাগতো যে দর্শক ভাবতেন, হয়তো সত্যি সত্যিই তারা ‘এক’। আর সেই সম্পর্কের গভীরতা বোঝা গেল উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। মধ্যরাতে উত্তমের শেষ সাক্ষাৎ নিতে ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়েছিলেন সুচিত্রা। সবাই ফিরে গেলেও উনি গিয়েছিলেন। সেদিন উত্তমের ছবিতে মালা পরিয়ে চিরবিদায় নিয়েছিলেন নিভৃতে। কেউ কেউ বলে, সেই শোক থেকেই তিনি ধীরে ধীরে অন্তরালে চলে যান। কিন্তু আসলে তিনি সরে গিয়েছিলেন তার দীক্ষাগুরুর মৃত্যুর পর।
সুচিত্রা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শুধু অভিনয়ে নয়, পারিশ্রমিকেও। ‘সপ্তপদী’ সিনেমায় তার পারিশ্রমিক ছিলো দুই লাখ টাকা- যা সেসময় যেকোনো নায়কের চেয়েও বেশি।সুচিত্রা কখনো রাজ কাপুরের প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলেননি, সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী চৌধুরানী’তেও কাজ করতে ‘না’ করে দিয়েছিলেন- শুধু সময় মেলেনি বলে। পরে দীনেন গুপ্তের ছবিতেই তিনি সেটা করেছিলেন। তিনি যেখানে কাজ করবেন, কীভাবে করবেন- সেটা শুধু তিনিই জানতেন।
প্রত্যাখ্যান
১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর সিলভার প্রাইজ জেতেন সুচিত্রা। তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি আন্তর্জাতিক উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছেন।
১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী দেয়। আর ২০০৫ সালে যখন ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ দেওয়ার কথা ওঠে, তিনি স্পষ্ট জানান- পুরস্কার ঘরে পাঠিয়ে দিতে। তিনি আর ফিরতে চাননি চাকচিক্যের জগতে। আর সেজন্যই পুরস্কারটি তিনি আর পাননি।
চিরস্থায়ী
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি এই অভিনেত্রী। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে নিভে যায় তার বাঁকা হাসির আলো।
কিন্তু সত্যি কি তিনি নিভেছেন? প্রতিটি পুরনো বাংলা ছবির ফ্রেমে, প্রতিটি নীল রাতের নিঃশ্বাসে, এখনো উঁকি দেয় তার সেই টলটলে চোখ, কানে দুলতে থাকা ঝুমকো আর আধমোলে ঠোঁটের বাঁকা হাসি।সুচিত্রা সেন এক চিরসবুজ প্রেয়সী। যার বয়স পর্দার ফ্রেমে আটকে গেছে, আর সেই ফ্রেম ভাঙার সাধ্য কারো নেই। কিংবদন্তি চিরসবুজ সেই প্রেয়সী সুচিত্রা সেনের আজ জন্মদিন।তার এই জন্মদিনে নীরবে কোটি হৃদয়ের স্মৃতির পাতা দুলে উঠবে অন্যরকম অনুভূতিতে।

আপনার মতামত লিখুন