ফিরে দাও রাজবংশ
মহাদেব সাহা
দূতাবাসে উড়ছে পতাকা
অর্থাৎ স্বাধীন আমরা এ-কথা মানতেই
হয়, রাষ্ট্রীয় সনদ আছে দেশে
দেশে আমরা স্বাধীন;
তবু মনে হয় এ যুগে কোথাও কোনো স্বাধীনতা
নেই, বরং এ যুগে মানুষ যেন
পোষ-মানা দুর্বল মহিষ, নিজের যৌবন
আজ তার কাছে সবচেয়ে বড়ো অপরাধ, নিজের
বিবেক আজ তার সবচেয়ে
বিদগ্ধ কসাই;
যেখানেই বলো না কেন আমাদের
আজ কোনো স্বাধীনতা নেই,
না কথা বলার, না হাসার, কাঁদার
সবখানে সব দেশে মানুষ আজ স্বাধীনতাহীন
ভীষণ নির্জীব, বিষণ্ন বস্তিতে কিংবা বুর্জোয়া বিলেতে
এখনো প্রত্যহ দেখি গ্রেফতারী
পরোয়ানা হাতে ফেরে নগরপুলিশ;
মানুষ কি পারে তার যৌবনকে ভালোবেসে
বাগানে বেড়াতে
মানুষ কি পারে তার নিজের মনের
শব্দ টেলিগ্রামে ভরে ভরে দূরত্বে পাঠাতে?
মানুষ কি পারে তার নিজের আকৃতি
খুলে স্বচক্ষে দেখতে কখনো?
মানুষ কি আঁকতে পারে নিজের আদলে কোনো
জ্যান্ত বাঘের মুখ? এ যুগে
মানুষ বুঝি বড়ো বেশি কিছুই পারে না
কেবল আইনের হাত ধরে কিছুটা রাস্তা হাঁটা ছাড়া
এ যুগে মানুষ বুঝি
কিছুই পারে না;
অথচ এখন কোনো রাজা নেই, রাজ্য নেই
কেবল আছে রাজ্যশাসন
আমরা এখন কারো প্রজা নই
প্রজাস্বত্ব সর্বত্র প্রবল
তাই কি আমরা এই প্রজাতন্ত্রে এমন বন্দী স্বাধীন?
তাহলে কি আমরা সবাই আজ বাস
করি পাথরের ঘরে
মানুষ কি কোনোদিনই পারবে না
জন্ম দিতে নিজের যৌবন?
নিজের বুকের মধ্যে পারবে না পুষতে
সে বিশ্বাসের বিশুদ্ধ মৌচাক?
তার চেয়ে আমাদের ফিরে দাও রাজবংশ, রাজকীয়
অলীক বিশ্বাস
রাজকুমার তোমার রক্তে জন্ম নিক
জান্তব যৌবন, যুদ্ধ করে মরি।
[এই গৃহ এই সন্ন্যাস, ১৯৭২]
১৯৭১
নির্মলেন্দু গুণ
যুদ্ধের মাঠে বিজয় পতাকা ওড়ানো একাত্তর,
লক্ষ প্রাণের মূল্যে মুক্ত আমার এ বাংলাদেশ,
না জনাব, যে ভুলে ভুলুক, আমি ভুলিবো না—
আমার গর্বের ধন, —আমি কভু ভুলিবো না।
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যারা চেয়েছিল স্বাধীনতা,
তাঁরা আমাদের ভাই, তাঁরা আমাদের বোন,
তাঁরা আমাদের বন্ধু, তাঁরা আমাদের পিতা-মাতা ।
খুনের বাঁধন যে খুলে খুলুক, আমি খুলিবো না।
আঁধার রজনী শেষে জানি আসিবে সূর্যভোর,
যতদিন রবে এই বাংলাদেশ, রহিবে একাত্তর।
মহা উত্থানে ভেসে যাবে তুমি
নাসির আহমেদ
কী সহজে তুমি ‘নিষিদ্ধ’ লিখে দিচ্ছো আমার লাল সবুজের পতাকার বুকে! দেশের জাতীয় সঙ্গীতও আজ পাল্টে দেবার ধৃষ্টতা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ খুব!
এমনকি ঐ রক্তআখরে লেখা পবিত্র সংবিধানেও
অরুচি তোমার; রিসেট বাটনে মুছে দিতে চাও সব!
ঘৃণা-বিস্ময়ে ইতিহাস দেখো নীরবে তাকিয়ে রয়েছে তোমার দিকে! একাত্তরের মহাসমুদ্র চাইছো থামিয়ে দিতে? অন্ধকারের মতো কালো হাত শুভ্র দেয়াল ফুঁড়ে— বেরিয়ে আসতে উদ্যত আজ!
বিষণ্নতায় কান্নার মতো মাঝপথে আজ
থেমে যায় গান: আমার সোনার বাংলা... এমন
ঐতিহাসিক মহা মার্চেও! রাইফেল তাক করে আছো এই প্রিয় পতাকায়, জয় বাংলায়!
একাত্তরের রক্তে ধৌত যে মাটি আমার, সে মাটিতে তুমি এ দুঃসাহস দেখাও কী করে? তুমি পরাজিত, মৌনতা তুমি, হঠাৎ এতটা উচ্চকণ্ঠ?
সত্যের মহা-উত্থানে তুমি আবারও প্লাবনে ভেসে যাবে নিশ্চিত।
তাকডুম তাকডুম বাজে...
মিনার মনসুর
জীবিতরা নিরুদ্দেশ। বিউগল বাজেনি, হয়নি একুশবার তোপধ্বনি; তার পরও জয় বাংলার রক্ত গালিচায় ঢেকে সসম্ভ্রমে যাদের রেখে এসেছিলাম তোমার জিম্মায়, আমি তাদের ফিরিয়ে নিতে এসেছি। হে বিবর্ণ আম্রকানন, ফিরিয়ে দাও আমার যৌবন! অকস্মাৎ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন। হিমশীতল জলের চাবুকে আর্তনাদ করে ওঠে বেআব্রু বনভূমি। সেই বার্তা পৌঁছে যায় বটতলায় কবিদের আড্ডায়।
কী এক অলৌকিক উচ্ছ্বাসে রাতুল দেববর্মণের রাজসিক চোখ থেকে মুখ থেকে রাশি রাশি নক্ষত্র ঝরে পড়ে। ‘বুঝলানি বাংলার কবি, আমি তহন বাইশের যুবক। লিচু বাগানে লাইন ধইর্যা হেরারে ঘুম পাড়াইয়া রাখছিল। ছুডু ছুডু পোলাপাইন সব। ব্যানার্জি বাড়ির লিচু, কী যে মজা আছিল তার! অহন কিচ্ছুই খুঁইজ্যা পাইবা নারে পরানের ভাই। তাকডুম তাকডুম বাজে...!’
‘কেডা কইছে, নাই? আছে, আছে, হ¹লতেই আছে। ফরেস্ট রিসার্চ সেন্টারের কংক্রীটের তলে ঘাপটি মাইর্যা আছে!’ গোমতী হাসে। ‘মেলাঘর, তুমারে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। বুঝি বুঝি, তোমারও বুক চিনচিন করে! পাহাড়ের বেডি আমি। হাজার বছর ধইর্যা ঘর করি পাষাণের লগে। কিন্তু মানুষ এমুন পাষাণ ক্যান— বুঝি নারে ভাই!’
কোটি প্রাণের ঐকতানে
হাসান হাফিজ
আগুনে বারুদে ঝাঁঝে বিস্ফোরণে
অনন্য ভাস্বর হয়ে আছো তুমি
মৃত্তিকা ও সবুজে শ্যামলে শস্যে
উদার নিঃসীম নভোনীলে
সর্বত্রই স্বাগত নন্দিত শুদ্ধ
তোমার উত্থান অস্তিত্ব তোমার
সাড়ে সাত কোটি প্রাণ একাত্তরে
ঐকতানে বেজে উঠেছিল
বিজয়ের মহতী ঝঙ্কারে
আত্মশক্তি উদ্বোধনে
অর্জিত হয়েছে শেষে মাটি ও মায়ের মুক্তি
অগণন তাজা প্রাণ বিসর্জনে
সম্ভ্রমের বিনিময়ে
আমরা পেয়েছি শুদ্ধ রক্তেভেজা দেশ
কখনো কিছুতে এই
অর্জনের লয় নেই
অহংয়ের ক্ষয় বলতে কিছু নেই
আছে শুধু জাগরণ, আছে শুধু প্রত্যয়ের উদযাপন...
সারাৎসার
জাহিদ হায়দার
সবার সামনে ওই চোখ কখনো কাঁদে না।
ব্যক্তিগত বৃষ্টি পড়ে বহমান জলে।
পতনক্ষরণধ্বনি কেবল আমিই শুনি।
আড়াল ভেঙে একটা হাত ডেকেছিল নতুন আড়ালে।
যাক
ভেসে যাক তরণীর জোছনাভাঙা দিন।
উত্তরফাল্গুনীর অতলে ছিলাম দৃশ্য মুখোমুখি।
অনেক ঋতুর পরে শান্তি ভেজালো দুই চোখ।
তুমি কী বলবে,
কেঁদেছি তখন?
ঘুমন্তে জাগন্তে একই স্বপ্ন
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
নিশুতি রাত তিনটা কুড়ি, আমার শহরে
আর তোমার নিষিদ্ধ শহরে
এখন দুপুর দুটো
দুই প্রান্তে রাতদিনের দূরত্ব ১১,৬০০ কিলোমিটার।
আমার শান্ত শহরে শীতকালীন শৈত্যপ্রবাহ
মাইনাস সাত, স্নো ঝরছে,
ঝির ঝির
ঝির ঝির।
আর তোমার অস্থির ঢাকায় রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
খণ্ড খণ্ড মিছিল
অগ্নি মিছিল থেকে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে স্লোগান।
দুই শহরের স্বপ্ন একটাই।
আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি
তুমি স্বপ্ন দেখছো অপরাহ্ণে, দিবালোকে
অথচ আমরা একই স্বপ্ন দেখছি।
কখনো জানতে চেও না
মাহফুজ আল-হোসেন
হে আধবুড়ো অর্বাচীন বালক, জন্মদাত্রী মাকে যেন ভুলেও জিজ্ঞেস করতে যেও না তোমার রক্তাক্ত জন্মক্ষণের কথা;
সেই কালরাত্রিতে রক্তের ভয়াবহ হোলি খেলায় গগনবিদারী লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র আর্তচিৎকার যখন সপ্তম আসমানকে বিদীর্ণ করছিল পেঁজা তুলোর মতো— ঠিক সেমুহূর্তে তোমার আগমনী কান্নাও কি ওই অভিন্ন কোরাসে গলা মিলিয়েছিল কিনা, এটি তাকে আর জিজ্ঞেস করতে যেও না নির্বোধ ঔৎসুক্যে;
আর তার সহস্রবর্ষের নির্ঘুম আকাঙ্ক্ষার অবদমিত কুসুমকলি কোনো এক অচিন বীজমন্ত্রে সেই লাভাতপ্ত লৌহশলাকার অগ্নিভ দহনদিনে ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বুকজুড়ে দাবায়ে রাখা বরাহ বুটের তলদেশ ছিদ্র করে লিবার্টাসের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল কিনা সেটিও তুমি জানতে চেও না আবাল্য মূর্খতায়।
লিখে রাখি
মোহাম্মদ হোসাইন
নিজেকে মেলে ধরবার জন্য যেটুকু পরিসর দরকার
সেটুকু জমিন কি সবাই পায়? সবার কি থাকে এক খণ্ড অখণ্ড আকাশ! পাহাড়ে টিলায়, নদীতে লাবণ্যে বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে ঘুরেফিরে দেখার উজ্জ্বল উচ্ছ্বাস!?
ভেবেছিলাম একদিন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। ভেবেছিলাম ছোটখাটো অস্বস্তি, বিবাদ বিসম্বাদ কিংবা এলোমেলো অগোছালো জীবন নিটোল নিরুপমা হয়ে যাবে। হয়ে যাবে ধানের বরজে লেখা নাম, সবুজের গীতালি মাখা প্রেম, দুপুর কিম্বা বিকেলের অদ্ভুত আলোর বাখান!
কানে বাজে বারবার। রাতের ভিতরে গুঁড়ো মরিচের গন্ধ, কাটা আঙুল নিয়ে কাঁচপুর ব্রিজে ছুরি চালিয়ে দেওয়া একতাড়া সঙ্ঘবদ্ধ কড়কড়ে নোট— তদুপরি স্নাইপার তাক করে বসে থাকা ভিনগ্রহী চাঁদ। এমনকি বৃষ্টিকে, রোদকেও গলায় মাদুলি পরানো আশ্চর্য রমণীয় লোভ-অ্যালসেসিয়ান!
এসব আমাকে বেশ ফুরফুরে করে। আমি মাতাল হতে গিয়েও গ্রাম্য ধুলোর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। ধনুকের ছিলার মতো হয়ে যাই টান টান। অথচ, যতবারই অস্বীকার করি মা কিম্বা মায়ের স্পর্শ জড়ানো শরৎকাল— ততবার ততবারই পৃথিবী ওলট-পালট হয়ে যায়...!
আমি জানি, বনলতা সেন আজ বেমানান
বেমানান অজস্র সোনার মোহর পরাণের গহীন ভিতর। তবুও, ধ্যান করে দেখি নিজেরে, দেখি চিরন্তন সূর্যের রং, ভোর, ভোরের নিশান...
আর লিখে রাখি দীর্ঘশ্বাস তোমার আমার...!
অ্যাকোয়ারিয়াম
চয়ন শায়েরী
মুছে দিই কবিতালাইন
খাপছাড়া ভাবটা জিইয়ে রেখে
কালিক সীমান্তে সীমাবদ্ধতার মতো
ভাবনার কাঁটাতার বেড়া দিয়ে রাখে
ডিঙাতে পারি না
— উচিত-অনুচিতের উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ—
কল্পনার পৃথিবীর পথে
পৃথিবীকে অ্যাকোয়ারিয়াম ভেবে ভেবে
ভাববার গ্যাঁড়াকলে ফেঁসে গিয়ে দেখি
এ কী
কল্পনার অ্যাকোয়ারিয়ামও সীমাবদ্ধ!
মানুষের কোনো ভিসাহীন কল্পনাও নেই— নেই লেখবার স্বাধীনতা।
নেই কোনো ইচ্ছেমতো উড়ালের আকাশ কিংবা ভালোবাসার পৃথিবী—
আমরা সবখানে সীমাবদ্ধ— আমরা রঙিন মাছ অ্যাকোয়ারিয়ামে।
পাখি ও গাছেদের গল্প
শুক্লা গাঙ্গুলি
কতিপয় পাখিরা স্বাধীনতা চেয়ে আর্জি জানাতেই— বৃদ্ধ ব্যাধ তার
মেলে দেওয়া কাঁটাঝেরা জালটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললো
নির্দ্বিধায় আর তখনই—
দূরে কোথাও কোনো স্কুলে
ছুটির ঘণ্টা বেজে ওঠে—
ঢং ঢং ঢং
প্রথম ঘণ্টায় পাখিরা ডানা মেললো—
এরপর শিস দিতে দিতে আকাশ নদী পাহাড় সব পাড়ি দিতে লাগলো পরমানন্দে—
সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সম্মিলিত গাছেরা ডাক পাঠালো পক্ষিকুলে
স্বাধীনতা মানে সব ছেড়ে চলে যাওয়া নয়—
স্বাধীনতা মানে নিজের কাছে নিজের ফেরা মাথা উঁচু করে!
জলভরা পিতলের ঘটি
কামরুল ইসলাম
অনিঃশেষ যাত্রার দিনে খুলে যায় আকাশের জংধরা জানালা
বাতাসের গোপন বাগান থেকে ঘাসফুলের কচি কচি গান
ছড়িয়ে পড়ে পথে; একটি মায়াবী হাত রাতের সিঁড়ি ভেঙে
নিয়ে আসে মাছরাঙার সরল ডানায় ঘুমিয়ে পড়া উড়ালের কথা
আর আমরা সেই কাহিনি থেকে, শাল-পিয়ালের ডায়ালগ থেকে
সমুদ্রের ঢেউ আঁকা হারানো জানালার আলোবীজ খুঁজি—
নৃ-তত্ত্বের আড়ালে বসে সমুদ্র-ফেরত আয়নাগুলো জেনে গেছে
লঙ্ঘনের সীমা, অতিক্রান্ত দুঃখ নিয়ে নিষাদেরা ফিরেনি গৃহে
মরে যাওয়া পথগুলো ঘাস-পাতায় শোকনামা লিখে সরে যায় দূরে
সারা গ্রাম আলস্যে ভিজে গেলে আকাশের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে
নেমে আসে জলভরা পিতলের ঘটি। মায়াবী হাতের জাদুতে
সেই জলে ভেসে ওঠে আমাদের কাঙাল নদীগুলো ভোরের আকাশে—
একাত্তর— আগুনের অধিকার
সাইফুল্লাহ আল মামুন
মার্চের রাতে জ্বলে উঠল বিদ্রোহের অগ্নিধার,
রাজপথজুড়ে লিখল মানুষ স্বাধীনতার অধিকার।
নিঃশব্দ শহর ভেঙে দিল গোলার বিকট অগ্নিঝড়,
কণ্ঠে উঠল অটল শপথ— স্বাধীনতাই আমাদের ঘর।
মায়ের চোখে জ্বলে উঠল আগুন— অশ্রুর ভাষা,
সন্তানের হাতে রাইফেল— স্বাধীনতার দৃঢ় আশা।
নদীর স্রোতে ছড়িয়ে গেল প্রতিরোধের অগ্নিস্রোত,
রক্ত দিয়ে লিখল মানুষ— স্বাধীনতাই চূড়ান্ত শপথ।
নয় মাসজুড়ে জেগে থাকল অগ্নি-অঙ্গীকার,
অন্ধকার ভেঙে উঠল লাল-সবুজের সূর্যদ্বার।
একাত্তর শুধু ইতিহাস নয়— প্রেরণার অগ্নিঝড়,
বাংলাদেশ মানে আজও স্বাধীনতার জাগ্রত ঘর।
ছাব্বিশে মার্চ এলেই
ফারুক ফয়সল
পরাধীনতার সাথে বরাবর আছে দাসত্বের চুক্তি
দাসপ্রথার বিলুপ্তি হলেও মানুষের পায়ে পায়ে আজো দাসত্বের শৃঙ্খল
অন্যের অধীন থেকে মুক্ত হলেও নিজের অধীন হওয়া সহজ না
হাতের পায়ের শিকল দিয়ে খুলে, স্বেচ্ছাবন্দীর মুক্তি মেলে না!
সীমাহীন আকাশ বিচরণে বিহঙ্গের যে স্বাধীনতা,
মুক্তির সেই অনাস্বাদিত স্বাদ, সেই দুর্লভ আনন্দ, মানুষের নেই!
অষ্টপ্রহর পাখিও নয় নিরাপদ, ধায় তাকে ব্যাধের লক্ষ্যভেদী তীর,
কালা কানুন, সামাজিক অনাচার, একচোখা মূল্যবোধ
অগ্রযাত্রার পিছু টেনে ধরে!
নিষেধের শত বেড়ায় ঘেরা, মুক্ত চিন্তার মাথায় পাথর চাপা
আইন রাঙায় চোখ, পুলিশী নির্যাতন, রাজনীতির সন্ত্রাস
ধর্মধাপ্পা আর শাসানি শত বাহু মেলে আঁকড়ে ধরে— যেন অক্টোপাস,
লুটপাট আর পাচারে রাজকোষ খালি, দেশটার সর্বনাশ!
এই ঘনঘোর আঁধার যামিনী পেরুলে, নতুন দিনের অরুণোদয়
রক্তস্নান শেষে মুক্তিসেনারা একাত্তর আঁকে লাল সবুজ জমিনময়।
স্বাধীনতা, সুগন্ধি হাওয়াফুল
ওবায়েদ আকাশ
যে যখন যেদিকে চাওয়া চলে যেতে পারে—
এই এক ভাবনায় অস্থির হয়ো না
কারো কারো দাঁড়াবার স্থান অবিকল অকৃত্রিম থাকে
হাড় মাংস জ্বালিয়ে দিলেও কঙ্কালেই ফুল ফোটে
তোমার আকাশে চিরবিশ্বস্ত রক্ষক তারাই
এই মতো পুষ্পময় ঘ্রাণে বিমোহিত তোমার গৌরব
ভাবছ তো— ভস্মাধারে ডুবে যায় যারা
তারা আর বিভ্রান্ত দ্বিধায় প্রবল সাঁতারে
বলে না যে ‘আছি’?
টেকোর মাথায় দু’একটি মাত্র কেশ দেখে বলো—
আহা একদা বাংলার নদনদী বিলঝিল সরোবর খাল কি
কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল!!
দিকে দিকে হাওয়া-প্লাবনের ধারা শুরু যদি হয়—
অসময়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে বয় বিশ্বাস
আজও তো প্রাজ্ঞ স্থৈর্যে হাওয়াফুল— বিমুগ্ধ করছে চারিপাশ
অর্বাচীন যারা পচাডোবা ঘ্রাণে অশান্ত-ব্যাকুল
তারা আছে, তারা নেই এমন অভ্যস্ত চিরকাল
হিরক ডানার বিশ্বস্ত নাচন হাওয়াফুলের প্রসিদ্ধ সম্বল
স্বাধীনতা
শাহেদ কায়েস
স্বাধীনতার ভোর আসে আজও— রক্তের ভেতর দিয়ে
ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে আলো
মানচিত্রের শিরায় শিরায়।
স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়— এ এক অদৃশ্য আগুন
এখনো জ্বলে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে
চোখের ভেতর, ভাষার ভেতর, প্রতিবাদের ভেতর।
যখন হাঁটি, পায়ের নিচে কাঁপে ছাব্বিশে মার্চের সেই মাটি
যেখানে প্রতিটি পদচিহ্ন ছিল প্রতিজ্ঞা
প্রতিটি রক্তবিন্দু একটি অসমাপ্ত বাক্য।
স্বাধীনতা— একটি নদীর মতো
থামতে জানে না, শুধু রূপ বদলায়—
কখনো স্লোগানে, কখনো গানে, কখনো নীরব প্রতিরোধে।
আমরা দাঁড়িয়ে আছি সেই দীর্ঘ যাত্রার ভেতর—
প্রশ্ন করি নিজেদেরই— সত্যিই কী আমরা মুক্ত?
নাকি এখনও লিখে চলেছি স্বাধীনতার শেষ পঙ্ক্তিটি?
বায়ান্ন থেকে একাত্তর
হাদিউল ইসলাম
পলাশ আর শিমুল
আমাদের বর্ণমালা অ আ ক খ
যেন বর্ণের শরীর থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে
বিদীর্ণ মায়ের বুকে
বায়ান্নর একুশের পূর্বেও কি
শিমুল পলাশ এরকম লাল ছিল বাংলায়?
সম্ভবত নয়, সম্ভবত বলছি কেন, ছিলো না
সালাম রফিক বরকত বলে গেছে
এখন ফেব্রুয়ারি এলে
বিচিত্র বর্ণের অক্ষর গাছেরা শীর্ষ উঁচিয়ে
মানুষেরে বীরত্বের কথিকা শোনায়
এভাবেই কৃষ্ণচূড়া রক্তজবা স্বাধীনতা আসে
সময়ের সমরযাত্রা
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
চলনে-বচনে বোধে-বিচরণে জলপাই-দানবের বৈরিতার ভিড়ে
অনমনীয় সময় অভিযাত্রী হলো হিমালয়ের শীর্ষে চড়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়
পথে যেতে যেতে সাথী হলো দুপুর বালিকার নূপুর সরলা গ্রাম ব্যস্ত গঞ্জ
হালধরা কৃষক জাল হাতে জেলে আর হাপর টানতে টানতে কামারের মন
হাঁটা পথ শেষ করে ছুটে আসে নদী নীল জলের হ্রদ মাছ ভরা পুকুর
সূর্যের তেজ চাঁদের কিরণ রাতের মৌন মুখ প্রভাতের মুখরতা ফুলের পরাগ
মুক্তির অন্বেষণে সময়ের সাহসী যাত্রায় এলো সবুজ ঘাস মাটির দীর্ঘশ্বাস
মাঝির ভাটিয়ালি গাড়োয়ানের ভাওয়াইয়া আর রাখালের উদাস দুপুরের ক্লান্তি
পরমাণু অণু হলো অণুগুলোর জোট হতে খণ্ড অখণ্ড হলো
জনমতের জোয়ারে সময়ের পালে লাগে হাওয়া, দূর আসে নিকটে, নিকট আরও নিবিড় হয়
মাঠ সাগর হয়, সাগর লাল হয় ঢেউ উত্তাল হয় গুঞ্জন গর্জন হয়ে প্রকম্পিত করে চরাচর
অতঃপর শেকল ভেঙে সমর-সবল সময় উঠে যায় হিমালয়ের তর্জনিতে
বেড়ি বাঁধা সময় বৈরিতার আগল ভেঙে জন্মকান্নার মহানাদে জানান দেয় তার মুক্তি বাণী
‘আর আমাদের দাবায়া রাখতে পারবা না।’
বাক্স খোলার পর
মিলু শামস
যেসব গল্প বাক্সবন্দি আছে বহুকাল
চলো, খুলে দেই সেসব—
‘ক্ষান্তপিসির দিদি শাশুড়িদের’
টাকাকড়ির মতো হাওয়া খাক ওরা
‘খোলা জানলায়’ আর
আমাদেরও অবলোকন থাক—
গবাক্ষ পথে যেভাবে থাকতো
মোগল চর কিংবা রাজপুত সেনা ছাউনির
উৎকর্ণ পদাতিকের;
কালের যে দলিল প্রামাণ্য মানে মানুষেরা
কারণে ও অকারণে
তা কি সত্যিই চিহ্ন রাখে
হায়ারোগ্লিফিক কিংবা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আদেশক্রমে?
অবলোকন করা যাক
গল্পের শরীর কী কী ঘটায় বাক্স ভাঙার পর
আপাতত চনমনে হাওয়া আর
সজীব অক্সিজেন প্রবাহে নড়ুকচড়ুক
কথা বলুক ওরা।
গণতন্ত্র, স্বাধীনতা
বিনয় বর্মন
ফিকে আলো আর কতক্ষণ টিকে থাকে?
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যু সংবাদ
সন্ধ্যার লাশ ঝুলছে রাতের আকাশে
তবুও স্বস্তি ফিরে এসেছে বস্তিতে
আগুন নিভেছে, লাফাচ্ছে পতঙ্গকুল
এখন আর কারো পুড়ে মরার ভয় নেই
বিড়ালেরা বসেছে গোলটেবিল বৈঠকে
সভাপতির আসনে একটি নেড়ি কুকুর
পুকুরের ধারে শেয়াল শ্রোতৃমণ্ডলি
ঝিঁঝিদের হাতে হাতে মশাল, পতাকা
সকলে সমস্বরে চিৎকার করে বলছে
গণতন্ত্র, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা!
মেঘের নোলক
জাফর সাদেক
ভুলের জীবন তো একটাই
তোমাকে বিবরণে পাঠ করতে করতে তবু জানি
পৃথিবীর সব ভাষাই আদিম ক্ষুধার মতো নিরপেক্ষ
যেকোনও ভাষার অক্ষর যে একই রক্তপ্রবাহ
চৈত্রের দুপুরে নাকি হও কণ্ঠতরির আর্তনাদ
মনে করো দেহ এখনও জাগায় জল-কুয়ায়
যদি বলো ছুটে যাবো শুধু অক্ষরের তৃষ্ণায়
নির্মাণ করবো শব্দ-জল— নদীকাব্যের চরণ
তবুও বলি তৃষিত থাকলে যেকোনও ভাষায়
দেহ পুনর্বণ্টন করে বলে দেয়া যায়
শীতের সরষে ফুলের এই দিগন্ত পেরোলেই
আসছে দিনগুলোতে তুমি ফাগুন পার্বণ
নদীর সুন্দরে আগাম বর্ষার মেঘের নোলক
নদী শিশুর অধিক
এলিজা খাতুন
মনুষ্য সমাজ ইথারে, হাতের নাগালে
সংবেদনশীল পর্দায় অঙ্গুলির স্বাধীন সোয়াইপ
হুতোম প্যাঁচার ডাক ও পুলিশের বাঁশি এড়িয়ে
অনায়াস ঘোরাফেরা সমাজের অলিগলি, সভা, সমাবেশ
জিহ্বার তলদেশের ধূর্ত শব্দ ছড়িয়ে পড়া সভাগৃহে
প্রতিদিন যারা দূষিত করে অতলান্ত নদীর ফুসফুস
তারা নিশ্চিত জানে না— নদী নেয় সব কিছু
অবুঝ শিশুর মতো হা-করে
এদিকে তারা জলের মতো সকল পাত্রেই পাত্ররূপ
নিখুঁত নৈপুণ্যে সর্বক্ষেত্রে সমাদৃত
মানুষের অস্থির ভ্রমণে স্বাধীন মেঘ ও স্রোত
পা বাড়ায় দুঃখী প্রাচীন নগরে।
নদী ও নগরী দিয়েছে কি ধরা— কোনো বহিরাগতের কাছে!?
স্বাধীনতার নদী টলোমলো হাঁটে
শিশুর মতো মুখ থুবড়ে পড়ে
তবু মাটি ছুঁয়ে দাঁড়ায়,
ছুটতে চায় ঐশ্বর্য-অনন্তে...
আমার আমিকে খুঁজে
চরু হক
আমার আমিকে খুঁজে এসেছি অনেক দূরে, দূরান্তরে
এসে গেছি শ্যামরঙা শাড়িপরা রমণীর কোলে।
অতঃপর হয়ে গেছি তার সেই নীলাম্বরী আঁচলের ভাঁজ।
গায়ে তার মায়াডোর।
আজ আমি দেখছি সবই
দেখছি নয়ন মেলে সেই সব অপূর্ব কিঙ্কিণীময় লাবণ্যের চ্ছটা
কত না শালিক বক দুখানা ডানায় খেলা করে
আর হৃদয়ের মাঝখানে সেই মায়া রমণীর অপূর্ব কপোল দুটি আঁকে।
শুনলাম নৃত্যরত বিধ্বস্ত পাহাড় আর পুষ্পকলিদের রিনিরিনি ধ্বনি
হিজল, তমাল আর শিমুলের স্মৃতিপটে আঁকা কত দুঃখময় সুখ
সবই অনুভব করি কড়ি ও কোমলে, আরো অনুভব করি সেই অপরূপ কান্তাটিকে
যার আছে ময়না হৃদয়।
মায়ের মুখে
কুমকুম দত্ত
শুনেছি মায়ের মুখে
তখন মৃত্যুর মতো অন্ধকার রাত
শব্দ নখর পায়ের বুট
কুয়াশা চাঁদের রক্তে হাহাকার আলো।
শুনেছি মায়ের মুখে
বেজন্মা বেহায়া ওরা
রাতের গভীরে দেখি ওল্টানো চাঁদ
ইতিহাস ছেঁড়া পাতা ইয়াহিয়া।
এখন ওসব কথা থাক
মেহনাজ মুস্তারিন
থাক না এসব কথা এখন এত এত বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কিনা
ওসব কথা এখন থাক
এখন চলো সুরমা নদীর পাড়ে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি
শুষ্ক জলে আঁকি স্বাধীন মানুষের হৃদয়ের নীল সব স্বপ্ন
চলো ঘুরে আসি
ওখানে সূর্যাস্তে মার্চের আলো আঁধারের খেলা দেখবো
সবকিছুই তো সবকিছুর মধ্যে থেকে যায়
অভিমানের মধ্যে যেমন প্রেম
বঞ্চনার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে বিপ্লব
অর্কিডের উজ্জ্বল শিকড়ের মতো আঁকড়ে ধরে
দেখি, তোমার তামাটে মুখখানায় দাউ দাউ করে জ্বলে বাঁধভাঙা মানুষের প্রাণ
সূর্য অস্ত যাবার আগে ক্ষীণ বিবেক
আমরা হাঁটু পর্যন্ত জলস্রোতে ভিজিয়ে নিই
পাথর ভাঙার গানে

মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ফিরে দাও রাজবংশ
মহাদেব সাহা
দূতাবাসে উড়ছে পতাকা
অর্থাৎ স্বাধীন আমরা এ-কথা মানতেই
হয়, রাষ্ট্রীয় সনদ আছে দেশে
দেশে আমরা স্বাধীন;
তবু মনে হয় এ যুগে কোথাও কোনো স্বাধীনতা
নেই, বরং এ যুগে মানুষ যেন
পোষ-মানা দুর্বল মহিষ, নিজের যৌবন
আজ তার কাছে সবচেয়ে বড়ো অপরাধ, নিজের
বিবেক আজ তার সবচেয়ে
বিদগ্ধ কসাই;
যেখানেই বলো না কেন আমাদের
আজ কোনো স্বাধীনতা নেই,
না কথা বলার, না হাসার, কাঁদার
সবখানে সব দেশে মানুষ আজ স্বাধীনতাহীন
ভীষণ নির্জীব, বিষণ্ন বস্তিতে কিংবা বুর্জোয়া বিলেতে
এখনো প্রত্যহ দেখি গ্রেফতারী
পরোয়ানা হাতে ফেরে নগরপুলিশ;
মানুষ কি পারে তার যৌবনকে ভালোবেসে
বাগানে বেড়াতে
মানুষ কি পারে তার নিজের মনের
শব্দ টেলিগ্রামে ভরে ভরে দূরত্বে পাঠাতে?
মানুষ কি পারে তার নিজের আকৃতি
খুলে স্বচক্ষে দেখতে কখনো?
মানুষ কি আঁকতে পারে নিজের আদলে কোনো
জ্যান্ত বাঘের মুখ? এ যুগে
মানুষ বুঝি বড়ো বেশি কিছুই পারে না
কেবল আইনের হাত ধরে কিছুটা রাস্তা হাঁটা ছাড়া
এ যুগে মানুষ বুঝি
কিছুই পারে না;
অথচ এখন কোনো রাজা নেই, রাজ্য নেই
কেবল আছে রাজ্যশাসন
আমরা এখন কারো প্রজা নই
প্রজাস্বত্ব সর্বত্র প্রবল
তাই কি আমরা এই প্রজাতন্ত্রে এমন বন্দী স্বাধীন?
তাহলে কি আমরা সবাই আজ বাস
করি পাথরের ঘরে
মানুষ কি কোনোদিনই পারবে না
জন্ম দিতে নিজের যৌবন?
নিজের বুকের মধ্যে পারবে না পুষতে
সে বিশ্বাসের বিশুদ্ধ মৌচাক?
তার চেয়ে আমাদের ফিরে দাও রাজবংশ, রাজকীয়
অলীক বিশ্বাস
রাজকুমার তোমার রক্তে জন্ম নিক
জান্তব যৌবন, যুদ্ধ করে মরি।
[এই গৃহ এই সন্ন্যাস, ১৯৭২]
১৯৭১
নির্মলেন্দু গুণ
যুদ্ধের মাঠে বিজয় পতাকা ওড়ানো একাত্তর,
লক্ষ প্রাণের মূল্যে মুক্ত আমার এ বাংলাদেশ,
না জনাব, যে ভুলে ভুলুক, আমি ভুলিবো না—
আমার গর্বের ধন, —আমি কভু ভুলিবো না।
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যারা চেয়েছিল স্বাধীনতা,
তাঁরা আমাদের ভাই, তাঁরা আমাদের বোন,
তাঁরা আমাদের বন্ধু, তাঁরা আমাদের পিতা-মাতা ।
খুনের বাঁধন যে খুলে খুলুক, আমি খুলিবো না।
আঁধার রজনী শেষে জানি আসিবে সূর্যভোর,
যতদিন রবে এই বাংলাদেশ, রহিবে একাত্তর।
মহা উত্থানে ভেসে যাবে তুমি
নাসির আহমেদ
কী সহজে তুমি ‘নিষিদ্ধ’ লিখে দিচ্ছো আমার লাল সবুজের পতাকার বুকে! দেশের জাতীয় সঙ্গীতও আজ পাল্টে দেবার ধৃষ্টতা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ খুব!
এমনকি ঐ রক্তআখরে লেখা পবিত্র সংবিধানেও
অরুচি তোমার; রিসেট বাটনে মুছে দিতে চাও সব!
ঘৃণা-বিস্ময়ে ইতিহাস দেখো নীরবে তাকিয়ে রয়েছে তোমার দিকে! একাত্তরের মহাসমুদ্র চাইছো থামিয়ে দিতে? অন্ধকারের মতো কালো হাত শুভ্র দেয়াল ফুঁড়ে— বেরিয়ে আসতে উদ্যত আজ!
বিষণ্নতায় কান্নার মতো মাঝপথে আজ
থেমে যায় গান: আমার সোনার বাংলা... এমন
ঐতিহাসিক মহা মার্চেও! রাইফেল তাক করে আছো এই প্রিয় পতাকায়, জয় বাংলায়!
একাত্তরের রক্তে ধৌত যে মাটি আমার, সে মাটিতে তুমি এ দুঃসাহস দেখাও কী করে? তুমি পরাজিত, মৌনতা তুমি, হঠাৎ এতটা উচ্চকণ্ঠ?
সত্যের মহা-উত্থানে তুমি আবারও প্লাবনে ভেসে যাবে নিশ্চিত।
তাকডুম তাকডুম বাজে...
মিনার মনসুর
জীবিতরা নিরুদ্দেশ। বিউগল বাজেনি, হয়নি একুশবার তোপধ্বনি; তার পরও জয় বাংলার রক্ত গালিচায় ঢেকে সসম্ভ্রমে যাদের রেখে এসেছিলাম তোমার জিম্মায়, আমি তাদের ফিরিয়ে নিতে এসেছি। হে বিবর্ণ আম্রকানন, ফিরিয়ে দাও আমার যৌবন! অকস্মাৎ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন। হিমশীতল জলের চাবুকে আর্তনাদ করে ওঠে বেআব্রু বনভূমি। সেই বার্তা পৌঁছে যায় বটতলায় কবিদের আড্ডায়।
কী এক অলৌকিক উচ্ছ্বাসে রাতুল দেববর্মণের রাজসিক চোখ থেকে মুখ থেকে রাশি রাশি নক্ষত্র ঝরে পড়ে। ‘বুঝলানি বাংলার কবি, আমি তহন বাইশের যুবক। লিচু বাগানে লাইন ধইর্যা হেরারে ঘুম পাড়াইয়া রাখছিল। ছুডু ছুডু পোলাপাইন সব। ব্যানার্জি বাড়ির লিচু, কী যে মজা আছিল তার! অহন কিচ্ছুই খুঁইজ্যা পাইবা নারে পরানের ভাই। তাকডুম তাকডুম বাজে...!’
‘কেডা কইছে, নাই? আছে, আছে, হ¹লতেই আছে। ফরেস্ট রিসার্চ সেন্টারের কংক্রীটের তলে ঘাপটি মাইর্যা আছে!’ গোমতী হাসে। ‘মেলাঘর, তুমারে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। বুঝি বুঝি, তোমারও বুক চিনচিন করে! পাহাড়ের বেডি আমি। হাজার বছর ধইর্যা ঘর করি পাষাণের লগে। কিন্তু মানুষ এমুন পাষাণ ক্যান— বুঝি নারে ভাই!’
কোটি প্রাণের ঐকতানে
হাসান হাফিজ
আগুনে বারুদে ঝাঁঝে বিস্ফোরণে
অনন্য ভাস্বর হয়ে আছো তুমি
মৃত্তিকা ও সবুজে শ্যামলে শস্যে
উদার নিঃসীম নভোনীলে
সর্বত্রই স্বাগত নন্দিত শুদ্ধ
তোমার উত্থান অস্তিত্ব তোমার
সাড়ে সাত কোটি প্রাণ একাত্তরে
ঐকতানে বেজে উঠেছিল
বিজয়ের মহতী ঝঙ্কারে
আত্মশক্তি উদ্বোধনে
অর্জিত হয়েছে শেষে মাটি ও মায়ের মুক্তি
অগণন তাজা প্রাণ বিসর্জনে
সম্ভ্রমের বিনিময়ে
আমরা পেয়েছি শুদ্ধ রক্তেভেজা দেশ
কখনো কিছুতে এই
অর্জনের লয় নেই
অহংয়ের ক্ষয় বলতে কিছু নেই
আছে শুধু জাগরণ, আছে শুধু প্রত্যয়ের উদযাপন...
সারাৎসার
জাহিদ হায়দার
সবার সামনে ওই চোখ কখনো কাঁদে না।
ব্যক্তিগত বৃষ্টি পড়ে বহমান জলে।
পতনক্ষরণধ্বনি কেবল আমিই শুনি।
আড়াল ভেঙে একটা হাত ডেকেছিল নতুন আড়ালে।
যাক
ভেসে যাক তরণীর জোছনাভাঙা দিন।
উত্তরফাল্গুনীর অতলে ছিলাম দৃশ্য মুখোমুখি।
অনেক ঋতুর পরে শান্তি ভেজালো দুই চোখ।
তুমি কী বলবে,
কেঁদেছি তখন?
ঘুমন্তে জাগন্তে একই স্বপ্ন
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
নিশুতি রাত তিনটা কুড়ি, আমার শহরে
আর তোমার নিষিদ্ধ শহরে
এখন দুপুর দুটো
দুই প্রান্তে রাতদিনের দূরত্ব ১১,৬০০ কিলোমিটার।
আমার শান্ত শহরে শীতকালীন শৈত্যপ্রবাহ
মাইনাস সাত, স্নো ঝরছে,
ঝির ঝির
ঝির ঝির।
আর তোমার অস্থির ঢাকায় রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা
খণ্ড খণ্ড মিছিল
অগ্নি মিছিল থেকে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে স্লোগান।
দুই শহরের স্বপ্ন একটাই।
আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি
তুমি স্বপ্ন দেখছো অপরাহ্ণে, দিবালোকে
অথচ আমরা একই স্বপ্ন দেখছি।
কখনো জানতে চেও না
মাহফুজ আল-হোসেন
হে আধবুড়ো অর্বাচীন বালক, জন্মদাত্রী মাকে যেন ভুলেও জিজ্ঞেস করতে যেও না তোমার রক্তাক্ত জন্মক্ষণের কথা;
সেই কালরাত্রিতে রক্তের ভয়াবহ হোলি খেলায় গগনবিদারী লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র আর্তচিৎকার যখন সপ্তম আসমানকে বিদীর্ণ করছিল পেঁজা তুলোর মতো— ঠিক সেমুহূর্তে তোমার আগমনী কান্নাও কি ওই অভিন্ন কোরাসে গলা মিলিয়েছিল কিনা, এটি তাকে আর জিজ্ঞেস করতে যেও না নির্বোধ ঔৎসুক্যে;
আর তার সহস্রবর্ষের নির্ঘুম আকাঙ্ক্ষার অবদমিত কুসুমকলি কোনো এক অচিন বীজমন্ত্রে সেই লাভাতপ্ত লৌহশলাকার অগ্নিভ দহনদিনে ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বুকজুড়ে দাবায়ে রাখা বরাহ বুটের তলদেশ ছিদ্র করে লিবার্টাসের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল কিনা সেটিও তুমি জানতে চেও না আবাল্য মূর্খতায়।
লিখে রাখি
মোহাম্মদ হোসাইন
নিজেকে মেলে ধরবার জন্য যেটুকু পরিসর দরকার
সেটুকু জমিন কি সবাই পায়? সবার কি থাকে এক খণ্ড অখণ্ড আকাশ! পাহাড়ে টিলায়, নদীতে লাবণ্যে বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে ঘুরেফিরে দেখার উজ্জ্বল উচ্ছ্বাস!?
ভেবেছিলাম একদিন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। ভেবেছিলাম ছোটখাটো অস্বস্তি, বিবাদ বিসম্বাদ কিংবা এলোমেলো অগোছালো জীবন নিটোল নিরুপমা হয়ে যাবে। হয়ে যাবে ধানের বরজে লেখা নাম, সবুজের গীতালি মাখা প্রেম, দুপুর কিম্বা বিকেলের অদ্ভুত আলোর বাখান!
কানে বাজে বারবার। রাতের ভিতরে গুঁড়ো মরিচের গন্ধ, কাটা আঙুল নিয়ে কাঁচপুর ব্রিজে ছুরি চালিয়ে দেওয়া একতাড়া সঙ্ঘবদ্ধ কড়কড়ে নোট— তদুপরি স্নাইপার তাক করে বসে থাকা ভিনগ্রহী চাঁদ। এমনকি বৃষ্টিকে, রোদকেও গলায় মাদুলি পরানো আশ্চর্য রমণীয় লোভ-অ্যালসেসিয়ান!
এসব আমাকে বেশ ফুরফুরে করে। আমি মাতাল হতে গিয়েও গ্রাম্য ধুলোর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। ধনুকের ছিলার মতো হয়ে যাই টান টান। অথচ, যতবারই অস্বীকার করি মা কিম্বা মায়ের স্পর্শ জড়ানো শরৎকাল— ততবার ততবারই পৃথিবী ওলট-পালট হয়ে যায়...!
আমি জানি, বনলতা সেন আজ বেমানান
বেমানান অজস্র সোনার মোহর পরাণের গহীন ভিতর। তবুও, ধ্যান করে দেখি নিজেরে, দেখি চিরন্তন সূর্যের রং, ভোর, ভোরের নিশান...
আর লিখে রাখি দীর্ঘশ্বাস তোমার আমার...!
অ্যাকোয়ারিয়াম
চয়ন শায়েরী
মুছে দিই কবিতালাইন
খাপছাড়া ভাবটা জিইয়ে রেখে
কালিক সীমান্তে সীমাবদ্ধতার মতো
ভাবনার কাঁটাতার বেড়া দিয়ে রাখে
ডিঙাতে পারি না
— উচিত-অনুচিতের উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ—
কল্পনার পৃথিবীর পথে
পৃথিবীকে অ্যাকোয়ারিয়াম ভেবে ভেবে
ভাববার গ্যাঁড়াকলে ফেঁসে গিয়ে দেখি
এ কী
কল্পনার অ্যাকোয়ারিয়ামও সীমাবদ্ধ!
মানুষের কোনো ভিসাহীন কল্পনাও নেই— নেই লেখবার স্বাধীনতা।
নেই কোনো ইচ্ছেমতো উড়ালের আকাশ কিংবা ভালোবাসার পৃথিবী—
আমরা সবখানে সীমাবদ্ধ— আমরা রঙিন মাছ অ্যাকোয়ারিয়ামে।
পাখি ও গাছেদের গল্প
শুক্লা গাঙ্গুলি
কতিপয় পাখিরা স্বাধীনতা চেয়ে আর্জি জানাতেই— বৃদ্ধ ব্যাধ তার
মেলে দেওয়া কাঁটাঝেরা জালটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললো
নির্দ্বিধায় আর তখনই—
দূরে কোথাও কোনো স্কুলে
ছুটির ঘণ্টা বেজে ওঠে—
ঢং ঢং ঢং
প্রথম ঘণ্টায় পাখিরা ডানা মেললো—
এরপর শিস দিতে দিতে আকাশ নদী পাহাড় সব পাড়ি দিতে লাগলো পরমানন্দে—
সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সম্মিলিত গাছেরা ডাক পাঠালো পক্ষিকুলে
স্বাধীনতা মানে সব ছেড়ে চলে যাওয়া নয়—
স্বাধীনতা মানে নিজের কাছে নিজের ফেরা মাথা উঁচু করে!
জলভরা পিতলের ঘটি
কামরুল ইসলাম
অনিঃশেষ যাত্রার দিনে খুলে যায় আকাশের জংধরা জানালা
বাতাসের গোপন বাগান থেকে ঘাসফুলের কচি কচি গান
ছড়িয়ে পড়ে পথে; একটি মায়াবী হাত রাতের সিঁড়ি ভেঙে
নিয়ে আসে মাছরাঙার সরল ডানায় ঘুমিয়ে পড়া উড়ালের কথা
আর আমরা সেই কাহিনি থেকে, শাল-পিয়ালের ডায়ালগ থেকে
সমুদ্রের ঢেউ আঁকা হারানো জানালার আলোবীজ খুঁজি—
নৃ-তত্ত্বের আড়ালে বসে সমুদ্র-ফেরত আয়নাগুলো জেনে গেছে
লঙ্ঘনের সীমা, অতিক্রান্ত দুঃখ নিয়ে নিষাদেরা ফিরেনি গৃহে
মরে যাওয়া পথগুলো ঘাস-পাতায় শোকনামা লিখে সরে যায় দূরে
সারা গ্রাম আলস্যে ভিজে গেলে আকাশের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে
নেমে আসে জলভরা পিতলের ঘটি। মায়াবী হাতের জাদুতে
সেই জলে ভেসে ওঠে আমাদের কাঙাল নদীগুলো ভোরের আকাশে—
একাত্তর— আগুনের অধিকার
সাইফুল্লাহ আল মামুন
মার্চের রাতে জ্বলে উঠল বিদ্রোহের অগ্নিধার,
রাজপথজুড়ে লিখল মানুষ স্বাধীনতার অধিকার।
নিঃশব্দ শহর ভেঙে দিল গোলার বিকট অগ্নিঝড়,
কণ্ঠে উঠল অটল শপথ— স্বাধীনতাই আমাদের ঘর।
মায়ের চোখে জ্বলে উঠল আগুন— অশ্রুর ভাষা,
সন্তানের হাতে রাইফেল— স্বাধীনতার দৃঢ় আশা।
নদীর স্রোতে ছড়িয়ে গেল প্রতিরোধের অগ্নিস্রোত,
রক্ত দিয়ে লিখল মানুষ— স্বাধীনতাই চূড়ান্ত শপথ।
নয় মাসজুড়ে জেগে থাকল অগ্নি-অঙ্গীকার,
অন্ধকার ভেঙে উঠল লাল-সবুজের সূর্যদ্বার।
একাত্তর শুধু ইতিহাস নয়— প্রেরণার অগ্নিঝড়,
বাংলাদেশ মানে আজও স্বাধীনতার জাগ্রত ঘর।
ছাব্বিশে মার্চ এলেই
ফারুক ফয়সল
পরাধীনতার সাথে বরাবর আছে দাসত্বের চুক্তি
দাসপ্রথার বিলুপ্তি হলেও মানুষের পায়ে পায়ে আজো দাসত্বের শৃঙ্খল
অন্যের অধীন থেকে মুক্ত হলেও নিজের অধীন হওয়া সহজ না
হাতের পায়ের শিকল দিয়ে খুলে, স্বেচ্ছাবন্দীর মুক্তি মেলে না!
সীমাহীন আকাশ বিচরণে বিহঙ্গের যে স্বাধীনতা,
মুক্তির সেই অনাস্বাদিত স্বাদ, সেই দুর্লভ আনন্দ, মানুষের নেই!
অষ্টপ্রহর পাখিও নয় নিরাপদ, ধায় তাকে ব্যাধের লক্ষ্যভেদী তীর,
কালা কানুন, সামাজিক অনাচার, একচোখা মূল্যবোধ
অগ্রযাত্রার পিছু টেনে ধরে!
নিষেধের শত বেড়ায় ঘেরা, মুক্ত চিন্তার মাথায় পাথর চাপা
আইন রাঙায় চোখ, পুলিশী নির্যাতন, রাজনীতির সন্ত্রাস
ধর্মধাপ্পা আর শাসানি শত বাহু মেলে আঁকড়ে ধরে— যেন অক্টোপাস,
লুটপাট আর পাচারে রাজকোষ খালি, দেশটার সর্বনাশ!
এই ঘনঘোর আঁধার যামিনী পেরুলে, নতুন দিনের অরুণোদয়
রক্তস্নান শেষে মুক্তিসেনারা একাত্তর আঁকে লাল সবুজ জমিনময়।
স্বাধীনতা, সুগন্ধি হাওয়াফুল
ওবায়েদ আকাশ
যে যখন যেদিকে চাওয়া চলে যেতে পারে—
এই এক ভাবনায় অস্থির হয়ো না
কারো কারো দাঁড়াবার স্থান অবিকল অকৃত্রিম থাকে
হাড় মাংস জ্বালিয়ে দিলেও কঙ্কালেই ফুল ফোটে
তোমার আকাশে চিরবিশ্বস্ত রক্ষক তারাই
এই মতো পুষ্পময় ঘ্রাণে বিমোহিত তোমার গৌরব
ভাবছ তো— ভস্মাধারে ডুবে যায় যারা
তারা আর বিভ্রান্ত দ্বিধায় প্রবল সাঁতারে
বলে না যে ‘আছি’?
টেকোর মাথায় দু’একটি মাত্র কেশ দেখে বলো—
আহা একদা বাংলার নদনদী বিলঝিল সরোবর খাল কি
কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল!!
দিকে দিকে হাওয়া-প্লাবনের ধারা শুরু যদি হয়—
অসময়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে বয় বিশ্বাস
আজও তো প্রাজ্ঞ স্থৈর্যে হাওয়াফুল— বিমুগ্ধ করছে চারিপাশ
অর্বাচীন যারা পচাডোবা ঘ্রাণে অশান্ত-ব্যাকুল
তারা আছে, তারা নেই এমন অভ্যস্ত চিরকাল
হিরক ডানার বিশ্বস্ত নাচন হাওয়াফুলের প্রসিদ্ধ সম্বল
স্বাধীনতা
শাহেদ কায়েস
স্বাধীনতার ভোর আসে আজও— রক্তের ভেতর দিয়ে
ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে আলো
মানচিত্রের শিরায় শিরায়।
স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়— এ এক অদৃশ্য আগুন
এখনো জ্বলে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে
চোখের ভেতর, ভাষার ভেতর, প্রতিবাদের ভেতর।
যখন হাঁটি, পায়ের নিচে কাঁপে ছাব্বিশে মার্চের সেই মাটি
যেখানে প্রতিটি পদচিহ্ন ছিল প্রতিজ্ঞা
প্রতিটি রক্তবিন্দু একটি অসমাপ্ত বাক্য।
স্বাধীনতা— একটি নদীর মতো
থামতে জানে না, শুধু রূপ বদলায়—
কখনো স্লোগানে, কখনো গানে, কখনো নীরব প্রতিরোধে।
আমরা দাঁড়িয়ে আছি সেই দীর্ঘ যাত্রার ভেতর—
প্রশ্ন করি নিজেদেরই— সত্যিই কী আমরা মুক্ত?
নাকি এখনও লিখে চলেছি স্বাধীনতার শেষ পঙ্ক্তিটি?
বায়ান্ন থেকে একাত্তর
হাদিউল ইসলাম
পলাশ আর শিমুল
আমাদের বর্ণমালা অ আ ক খ
যেন বর্ণের শরীর থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে
বিদীর্ণ মায়ের বুকে
বায়ান্নর একুশের পূর্বেও কি
শিমুল পলাশ এরকম লাল ছিল বাংলায়?
সম্ভবত নয়, সম্ভবত বলছি কেন, ছিলো না
সালাম রফিক বরকত বলে গেছে
এখন ফেব্রুয়ারি এলে
বিচিত্র বর্ণের অক্ষর গাছেরা শীর্ষ উঁচিয়ে
মানুষেরে বীরত্বের কথিকা শোনায়
এভাবেই কৃষ্ণচূড়া রক্তজবা স্বাধীনতা আসে
সময়ের সমরযাত্রা
পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
চলনে-বচনে বোধে-বিচরণে জলপাই-দানবের বৈরিতার ভিড়ে
অনমনীয় সময় অভিযাত্রী হলো হিমালয়ের শীর্ষে চড়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়
পথে যেতে যেতে সাথী হলো দুপুর বালিকার নূপুর সরলা গ্রাম ব্যস্ত গঞ্জ
হালধরা কৃষক জাল হাতে জেলে আর হাপর টানতে টানতে কামারের মন
হাঁটা পথ শেষ করে ছুটে আসে নদী নীল জলের হ্রদ মাছ ভরা পুকুর
সূর্যের তেজ চাঁদের কিরণ রাতের মৌন মুখ প্রভাতের মুখরতা ফুলের পরাগ
মুক্তির অন্বেষণে সময়ের সাহসী যাত্রায় এলো সবুজ ঘাস মাটির দীর্ঘশ্বাস
মাঝির ভাটিয়ালি গাড়োয়ানের ভাওয়াইয়া আর রাখালের উদাস দুপুরের ক্লান্তি
পরমাণু অণু হলো অণুগুলোর জোট হতে খণ্ড অখণ্ড হলো
জনমতের জোয়ারে সময়ের পালে লাগে হাওয়া, দূর আসে নিকটে, নিকট আরও নিবিড় হয়
মাঠ সাগর হয়, সাগর লাল হয় ঢেউ উত্তাল হয় গুঞ্জন গর্জন হয়ে প্রকম্পিত করে চরাচর
অতঃপর শেকল ভেঙে সমর-সবল সময় উঠে যায় হিমালয়ের তর্জনিতে
বেড়ি বাঁধা সময় বৈরিতার আগল ভেঙে জন্মকান্নার মহানাদে জানান দেয় তার মুক্তি বাণী
‘আর আমাদের দাবায়া রাখতে পারবা না।’
বাক্স খোলার পর
মিলু শামস
যেসব গল্প বাক্সবন্দি আছে বহুকাল
চলো, খুলে দেই সেসব—
‘ক্ষান্তপিসির দিদি শাশুড়িদের’
টাকাকড়ির মতো হাওয়া খাক ওরা
‘খোলা জানলায়’ আর
আমাদেরও অবলোকন থাক—
গবাক্ষ পথে যেভাবে থাকতো
মোগল চর কিংবা রাজপুত সেনা ছাউনির
উৎকর্ণ পদাতিকের;
কালের যে দলিল প্রামাণ্য মানে মানুষেরা
কারণে ও অকারণে
তা কি সত্যিই চিহ্ন রাখে
হায়ারোগ্লিফিক কিংবা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আদেশক্রমে?
অবলোকন করা যাক
গল্পের শরীর কী কী ঘটায় বাক্স ভাঙার পর
আপাতত চনমনে হাওয়া আর
সজীব অক্সিজেন প্রবাহে নড়ুকচড়ুক
কথা বলুক ওরা।
গণতন্ত্র, স্বাধীনতা
বিনয় বর্মন
ফিকে আলো আর কতক্ষণ টিকে থাকে?
দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যু সংবাদ
সন্ধ্যার লাশ ঝুলছে রাতের আকাশে
তবুও স্বস্তি ফিরে এসেছে বস্তিতে
আগুন নিভেছে, লাফাচ্ছে পতঙ্গকুল
এখন আর কারো পুড়ে মরার ভয় নেই
বিড়ালেরা বসেছে গোলটেবিল বৈঠকে
সভাপতির আসনে একটি নেড়ি কুকুর
পুকুরের ধারে শেয়াল শ্রোতৃমণ্ডলি
ঝিঁঝিদের হাতে হাতে মশাল, পতাকা
সকলে সমস্বরে চিৎকার করে বলছে
গণতন্ত্র, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা!
মেঘের নোলক
জাফর সাদেক
ভুলের জীবন তো একটাই
তোমাকে বিবরণে পাঠ করতে করতে তবু জানি
পৃথিবীর সব ভাষাই আদিম ক্ষুধার মতো নিরপেক্ষ
যেকোনও ভাষার অক্ষর যে একই রক্তপ্রবাহ
চৈত্রের দুপুরে নাকি হও কণ্ঠতরির আর্তনাদ
মনে করো দেহ এখনও জাগায় জল-কুয়ায়
যদি বলো ছুটে যাবো শুধু অক্ষরের তৃষ্ণায়
নির্মাণ করবো শব্দ-জল— নদীকাব্যের চরণ
তবুও বলি তৃষিত থাকলে যেকোনও ভাষায়
দেহ পুনর্বণ্টন করে বলে দেয়া যায়
শীতের সরষে ফুলের এই দিগন্ত পেরোলেই
আসছে দিনগুলোতে তুমি ফাগুন পার্বণ
নদীর সুন্দরে আগাম বর্ষার মেঘের নোলক
নদী শিশুর অধিক
এলিজা খাতুন
মনুষ্য সমাজ ইথারে, হাতের নাগালে
সংবেদনশীল পর্দায় অঙ্গুলির স্বাধীন সোয়াইপ
হুতোম প্যাঁচার ডাক ও পুলিশের বাঁশি এড়িয়ে
অনায়াস ঘোরাফেরা সমাজের অলিগলি, সভা, সমাবেশ
জিহ্বার তলদেশের ধূর্ত শব্দ ছড়িয়ে পড়া সভাগৃহে
প্রতিদিন যারা দূষিত করে অতলান্ত নদীর ফুসফুস
তারা নিশ্চিত জানে না— নদী নেয় সব কিছু
অবুঝ শিশুর মতো হা-করে
এদিকে তারা জলের মতো সকল পাত্রেই পাত্ররূপ
নিখুঁত নৈপুণ্যে সর্বক্ষেত্রে সমাদৃত
মানুষের অস্থির ভ্রমণে স্বাধীন মেঘ ও স্রোত
পা বাড়ায় দুঃখী প্রাচীন নগরে।
নদী ও নগরী দিয়েছে কি ধরা— কোনো বহিরাগতের কাছে!?
স্বাধীনতার নদী টলোমলো হাঁটে
শিশুর মতো মুখ থুবড়ে পড়ে
তবু মাটি ছুঁয়ে দাঁড়ায়,
ছুটতে চায় ঐশ্বর্য-অনন্তে...
আমার আমিকে খুঁজে
চরু হক
আমার আমিকে খুঁজে এসেছি অনেক দূরে, দূরান্তরে
এসে গেছি শ্যামরঙা শাড়িপরা রমণীর কোলে।
অতঃপর হয়ে গেছি তার সেই নীলাম্বরী আঁচলের ভাঁজ।
গায়ে তার মায়াডোর।
আজ আমি দেখছি সবই
দেখছি নয়ন মেলে সেই সব অপূর্ব কিঙ্কিণীময় লাবণ্যের চ্ছটা
কত না শালিক বক দুখানা ডানায় খেলা করে
আর হৃদয়ের মাঝখানে সেই মায়া রমণীর অপূর্ব কপোল দুটি আঁকে।
শুনলাম নৃত্যরত বিধ্বস্ত পাহাড় আর পুষ্পকলিদের রিনিরিনি ধ্বনি
হিজল, তমাল আর শিমুলের স্মৃতিপটে আঁকা কত দুঃখময় সুখ
সবই অনুভব করি কড়ি ও কোমলে, আরো অনুভব করি সেই অপরূপ কান্তাটিকে
যার আছে ময়না হৃদয়।
মায়ের মুখে
কুমকুম দত্ত
শুনেছি মায়ের মুখে
তখন মৃত্যুর মতো অন্ধকার রাত
শব্দ নখর পায়ের বুট
কুয়াশা চাঁদের রক্তে হাহাকার আলো।
শুনেছি মায়ের মুখে
বেজন্মা বেহায়া ওরা
রাতের গভীরে দেখি ওল্টানো চাঁদ
ইতিহাস ছেঁড়া পাতা ইয়াহিয়া।
এখন ওসব কথা থাক
মেহনাজ মুস্তারিন
থাক না এসব কথা এখন এত এত বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কিনা
ওসব কথা এখন থাক
এখন চলো সুরমা নদীর পাড়ে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি
শুষ্ক জলে আঁকি স্বাধীন মানুষের হৃদয়ের নীল সব স্বপ্ন
চলো ঘুরে আসি
ওখানে সূর্যাস্তে মার্চের আলো আঁধারের খেলা দেখবো
সবকিছুই তো সবকিছুর মধ্যে থেকে যায়
অভিমানের মধ্যে যেমন প্রেম
বঞ্চনার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে বিপ্লব
অর্কিডের উজ্জ্বল শিকড়ের মতো আঁকড়ে ধরে
দেখি, তোমার তামাটে মুখখানায় দাউ দাউ করে জ্বলে বাঁধভাঙা মানুষের প্রাণ
সূর্য অস্ত যাবার আগে ক্ষীণ বিবেক
আমরা হাঁটু পর্যন্ত জলস্রোতে ভিজিয়ে নিই
পাথর ভাঙার গানে

আপনার মতামত লিখুন