সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

মাত্র ৩০০ টাকার যন্ত্রে বাঁচবে অর্ধেক প্রাণ

হামে শিশুমৃত্যু ঠেকাবে দেশি উদ্ভাবন ‘বাবল সিপ্যাপ’


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

হামে শিশুমৃত্যু ঠেকাবে দেশি উদ্ভাবন ‘বাবল সিপ্যাপ’

সারাদেশে হামজনিত নিউমোনিয়া তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচাতে আশার আলো দেখাচ্ছে সাশ্রয়ী মূল্যের এক অনন্য উদ্ভাবনবাবল সিপ্যাপ

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) উদ্ভাবিত এই শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়ক যন্ত্রটি ব্যবহারের ফলে শিশুদের মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে ফুসফুসের জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে এই প্রযুক্তি সরবরাহ শুরু হয়েছে।

দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে জীবনরক্ষাকারী এই প্রযুক্তি

মহাখালীর আইসিডিডিআর,বি’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাবল কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার (বিসিপ্যাপ) এর ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয় বিস্তৃত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

এপ্রিল পর্যন্ত ২৯ জন শিশু এই বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেছে। স্বল্পমূল্যের এই জীবনরক্ষাকারী পদ্ধতি সময়মতো প্রয়োগের ফলে জটিল ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়েছে, যাদের জন্য ব্যয়বহুল বা জটিল চিকিৎসা প্রদান করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিলো।

এই উদ্ভাবন নিয়ে আইসিডিডিআর,বি’র সিনিয়র সায়েন্টিস্ট মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী বলেন, “বাবল সিপ্যাপ একটি সহজলভ্য কার্যকর শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়তা পদ্ধতি। এটি গুরুতর নিউমোনিয়া রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতায় (হাইপোক্সেমিয়া) আক্রান্ত শিশুদের ফুসফুস সচল রাখতে এবং শরীরে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিতে অনন্য ভূমিকা রাখে।

আইসিডিডিআর,বি’র নির্বাহী পরিচালক ড. থ্যাডিয়াস ডেভিস মে এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, “বাংলাদেশে গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিটি কেবল ঢাকার হাসপাতালেই নয়, বরং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশেও শিশুদের প্রাণ রক্ষা করছে। সীমিত সম্পদের পরিবেশে এর কার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত।

দেশজুড়ে প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ কার্যক্রম

স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এই কার্যক্রমের সম্প্রসারণ চলছে। আইসিডিডিআর,বি এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। আইসিডিডিআর,বিতে আয়োজিত তৃতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণে সিলেট এমএজি ওসমানী, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, মাগুরা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলা হাসপাতালের ৩০ জন সেবাদানকারী অংশ নেন। এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী ৩০টিরও বেশি হাসপাতালের ৭৫ জনের বেশি চিকিৎসক নার্সকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে দ্রুত এই সেবা শুরু করতে পারবেন।

স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাবল সিপ্যাপের সময়োপযোগী ব্যবহার হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টে শিশুদের মৃত্যু কমাতে সাহায্য করছে। আমরা সারাদেশে এর ব্যবহার আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।

কঠোরভাবে পালনের নির্দেশনা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

চিকিৎসকদের জন্য একটি আদর্শ কার্যপ্রণালী বা এসওপি তুলে ধরেন অধ্যাপক ড. চৌধুরী আলী কাউসার ড. চিশতী। তারা বলেন, “সঠিক রোগী নির্বাচন অক্সিজেনের মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসার সর্বোচ্চ ফল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের এই প্রটোকলগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

পরবর্তী ধাপে রাজশাহী, বরগুনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং নাটোরে সরাসরি প্রশিক্ষণ মেন্টরশিপ কার্যক্রম শুরু হবে। আইসিডিডিআর,বি এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিনামূল্যে বাবল সিপ্যাপ সেটআপসহ সার্বক্ষণিক ক্লিনিক্যাল সাপোর্ট হটলাইন সেবা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে বাবল সিপ্যাপ

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু আইসিইউ বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. শামীম আরা সুলতানা বিথী জানান, বাবল সিপ্যাপ অসুস্থ শিশুদের শ্বাস নিতে সাহায্য করার জন্য একটি নন-ইনভেসিভ কৌশল। এটি ফুসফুস খোলা রাখে এবং অক্সিজেন গ্রহণ বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর ছাড়াই শিশুকে সুস্থ রাখা সম্ভব হয়।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বাবল সিপ্যাপ যন্ত্রটি অত্যন্ত উন্নত কার্যকর। এর দামও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে।

আইসিডিডিআর,বি সূত্র জানায়, এই সহায়ক যন্ত্রটির মূল্য হবে মাত্র ৩০০ টাকার মতো, যা সাধারণ যেকোনো পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬


হামে শিশুমৃত্যু ঠেকাবে দেশি উদ্ভাবন ‘বাবল সিপ্যাপ’

প্রকাশের তারিখ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সারাদেশে হামজনিত নিউমোনিয়া তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচাতে আশার আলো দেখাচ্ছে সাশ্রয়ী মূল্যের এক অনন্য উদ্ভাবনবাবল সিপ্যাপ

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) উদ্ভাবিত এই শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়ক যন্ত্রটি ব্যবহারের ফলে শিশুদের মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে ফুসফুসের জটিল রোগের ঝুঁকি কমাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে এই প্রযুক্তি সরবরাহ শুরু হয়েছে।

দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে জীবনরক্ষাকারী এই প্রযুক্তি

মহাখালীর আইসিডিডিআর,বি’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাবল কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার (বিসিপ্যাপ) এর ব্যবহার দ্রুত জনপ্রিয় বিস্তৃত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

এপ্রিল পর্যন্ত ২৯ জন শিশু এই বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেছে। স্বল্পমূল্যের এই জীবনরক্ষাকারী পদ্ধতি সময়মতো প্রয়োগের ফলে জটিল ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়েছে, যাদের জন্য ব্যয়বহুল বা জটিল চিকিৎসা প্রদান করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিলো।

এই উদ্ভাবন নিয়ে আইসিডিডিআর,বি’র সিনিয়র সায়েন্টিস্ট মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী বলেন, “বাবল সিপ্যাপ একটি সহজলভ্য কার্যকর শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়তা পদ্ধতি। এটি গুরুতর নিউমোনিয়া রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতায় (হাইপোক্সেমিয়া) আক্রান্ত শিশুদের ফুসফুস সচল রাখতে এবং শরীরে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিতে অনন্য ভূমিকা রাখে।

আইসিডিডিআর,বি’র নির্বাহী পরিচালক ড. থ্যাডিয়াস ডেভিস মে এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, “বাংলাদেশে গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিটি কেবল ঢাকার হাসপাতালেই নয়, বরং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশেও শিশুদের প্রাণ রক্ষা করছে। সীমিত সম্পদের পরিবেশে এর কার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত।

দেশজুড়ে প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ কার্যক্রম

স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এই কার্যক্রমের সম্প্রসারণ চলছে। আইসিডিডিআর,বি এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। আইসিডিডিআর,বিতে আয়োজিত তৃতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণে সিলেট এমএজি ওসমানী, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, মাগুরা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলা হাসপাতালের ৩০ জন সেবাদানকারী অংশ নেন। এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী ৩০টিরও বেশি হাসপাতালের ৭৫ জনের বেশি চিকিৎসক নার্সকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে দ্রুত এই সেবা শুরু করতে পারবেন।

স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাবল সিপ্যাপের সময়োপযোগী ব্যবহার হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টে শিশুদের মৃত্যু কমাতে সাহায্য করছে। আমরা সারাদেশে এর ব্যবহার আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।

কঠোরভাবে পালনের নির্দেশনা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

চিকিৎসকদের জন্য একটি আদর্শ কার্যপ্রণালী বা এসওপি তুলে ধরেন অধ্যাপক ড. চৌধুরী আলী কাউসার ড. চিশতী। তারা বলেন, “সঠিক রোগী নির্বাচন অক্সিজেনের মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসার সর্বোচ্চ ফল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের এই প্রটোকলগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

পরবর্তী ধাপে রাজশাহী, বরগুনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং নাটোরে সরাসরি প্রশিক্ষণ মেন্টরশিপ কার্যক্রম শুরু হবে। আইসিডিডিআর,বি এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিনামূল্যে বাবল সিপ্যাপ সেটআপসহ সার্বক্ষণিক ক্লিনিক্যাল সাপোর্ট হটলাইন সেবা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে বাবল সিপ্যাপ

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু আইসিইউ বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. শামীম আরা সুলতানা বিথী জানান, বাবল সিপ্যাপ অসুস্থ শিশুদের শ্বাস নিতে সাহায্য করার জন্য একটি নন-ইনভেসিভ কৌশল। এটি ফুসফুস খোলা রাখে এবং অক্সিজেন গ্রহণ বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর ছাড়াই শিশুকে সুস্থ রাখা সম্ভব হয়।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বাবল সিপ্যাপ যন্ত্রটি অত্যন্ত উন্নত কার্যকর। এর দামও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে।

আইসিডিডিআর,বি সূত্র জানায়, এই সহায়ক যন্ত্রটির মূল্য হবে মাত্র ৩০০ টাকার মতো, যা সাধারণ যেকোনো পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত