সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বিশ্বসাহিত্যে উৎসব


আরণ্যক শামছ
আরণ্যক শামছ
প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৮ এএম

বিশ্বসাহিত্যে উৎসব
শিল্পী: যামিনী রায়

মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে উৎসব হলো মানুষের সামষ্টিক অস্তিত্বের এক অবিনাশী প্রকাশ। উৎসব কেবল ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট কোনো দিন নয়, বরং এটি একটি জাতির মনন, ইতিহাস এবং আধ্যাত্মিক চেতনার দর্পণ। সাহিত্য সেই দর্পণকে ধারণ করে অক্ষরের ফ্রেমে। বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে উৎসব কখনো এসেছে দেবতাকুলকে তুষ্ট করার উপচার হিসেবে, কখনো এসেছে প্রকৃতির পালাবদলে কৃষকের হাসিকান্না হয়ে, আবার কখনো তা হয়ে উঠেছে শোষিতের মুক্তির আনন্দধ্বনি। বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে সুদূর লাতিন আমেরিকা কিংবা নর্ডিক অঞ্চলের সাহিত্য, সর্বত্রই উৎসব এক অমোঘ চালিকাশক্তি। উৎসব মানেই বিচ্ছিন্ন মানবের মহামিলন, আর সাহিত্য সেই মিলনের মহাকাব্য। প্রাচীন মহাকাব্যের রণধ্বনি থেকে আধুনিক উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সবখানি জুড়েই উৎসব কোনো না কোনোভাবে তার বর্ণিল উপস্থিতি জানান দিয়ে গেছে।

প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যে উৎসবের আদিম রূপটি ধরা পড়ে। পশ্চিমা সাহিত্যের সূতিকাগার বলা হয় প্রাচীন গ্রিসকে। গ্রিক সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মূলত উৎসবকে কেন্দ্র করেই। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সে দেবতা ডায়োনিসাসকে উৎসর্গ করে আয়োজিত হতো ‘সিটি ডায়োনিসিয়া’। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নাট্যপ্রতিযোগিতা। বিশ্বখ্যাত নাট্যকার সফোক্লিস যখন তাঁর কালজয়ী নাটক ঈডিপাস রেক্স (Oedipus Rex) লিখছেন, কিংবা ইউরিপিদিস যখন মিডিয়া (Medea) রচনা করছেন, তাঁদের অবচেতনে কাজ করছিল উৎসবের সেই বিশাল মঞ্চ। এরিস্টোফেনিসের কৌতুকনাটক লাইসিস্ট্রাটা (Lysistrata) পাঠ করলে বোঝা যায়, যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝেও উৎসব কীভাবে মানুষের মনে প্রাণের সঞ্চার করত। উৎসবের এই মঞ্চ থেকেই জন্ম নিয়েছিল ট্র্যাজেডি এবং কমেডির মতো শক্তিশালী সাহিত্যিক ধারা।

রোমান সাহিত্যে উৎসবের চিত্রটি ছিল আরও খানিকটা বৈপ্লবিক। রোমানদের ‘স্যাটার্নালিয়া’ (Saturnalia) উৎসব ছিল সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার উৎসব। দেবতা শনি বা স্যাটার্নকে উৎসর্গ করা এই শীতকালীন উৎসবে দাসেরা পেত সাময়িক মুক্তি, আর মালিকেরা সেজে বসত দাসের বেশে। রোমান কবি ক্যাটুলাস এই উৎসবকে ‘the best of days’ বা ‘দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ’ বলে অভিহিত করেছেন। প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গার তাঁর পত্রাবলিতে উৎসবের যে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন, তা সমাজতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব এখানে কেবল আমোদ নয়, বরং শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে সাহিত্যের এক নীরব প্রতিবাদ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় ও রেনেসাঁ সাহিত্যে উৎসবের বিবর্তন ছিল লক্ষণীয়। মধ্যযুগের ইউরোপীয় জীবন ছিল গির্জা ও ধর্মকেন্দ্রিক। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়ের সাহিত্যে ক্রিসমাস ও ইস্টার উৎসবের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যায়। জিওফ্রে চসারের ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’ (The Canterbury Tales) আখ্যানমূলক কাব্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, তীর্থযাত্রীরা যখন থমাস বেকেটের মাজারের দিকে যাত্রা করছেন, তখন তাঁদের গল্পগুলোর পরতে পরতে মিশে আছে ধর্মীয় উৎসবের নৈতিকতা ও আনন্দ। উইলিয়াম শেক্সপিয়রও তাঁর লেখায় উৎসবকে মানবিক আবেদন ও মনস্তত্ত্বের স্তরে নিয়ে যান। তাঁর টুয়েলফথ নাইট (Twelfth Night) নাটকটি ক্রিসমাসের পরবর্তী দ্বাদশ রাতের উৎসবের প্রেক্ষাপটে রচিত। এখানে উৎসব মানেই বিশৃঙ্খলা, ছদ্মবেশ এবং শেষমেশ সত্যের উন্মোচন। শেক্সপিয়র দেখিয়েছিলেন, উৎসবের আবহে মানুষ তার কৃত্রিম আবরণ খুলে আসল রূপে আবির্ভূত হয়। পরবর্তীতে চার্লস ডিকেন্স তাঁর এ ক্রিসমাস ক্যারল (A Christmas Carol) উপন্যাসের মাধ্যমে বড়দিনকে একটি বিশ্বজনীন মানবিক উৎসবে রূপ দেন। কৃপণ এবেনিজার স্ক্রুজ চরিত্রটি যখন উৎসবের প্রেতাত্মাদের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়, তখন সেটি কেবল একটি গল্প থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তনের ইশতেহার। 

রাশিয়ান ও জার্মান সাহিত্যে উৎসবের গূঢ় মনস্তত্ত্ব ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। রাশিয়ান সাহিত্যের দিকপালদের লেখায় উৎসব এসেছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে। ফিওদর দস্তয়েভস্কি তাঁর অপরাধ ও শাস্তি (Crime and Punishment) উপন্যাসে রাশিয়ান অর্থোডক্স ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আবহের ভেতর দিয়ে মানুষের অপরাধবোধ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ধর্মীয় অনুষঙ্গগুলো সেখানে কেবল সামাজিক চিহ্ন নয়, বরং আত্মশুদ্ধির এক কঠোর পরীক্ষা। লিও তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তি (War and Peace) উপন্যাসে বড়দিন বা ম্যাসকারড-এর যে বর্ণনা আছে, তা আভিজাত্য ও সাধারণ মানুষের জীবনের মেলবন্ধনের এক অনুপম চিত্র।

জার্মান সাহিত্যের মহীরুহ জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে তাঁর অমর সৃষ্টি ফাউস্ট (Faust)-এ ‘ওয়ালপুর্গিস নাইট’ (Walpurgis Night) বা বসন্তের প্রাক্কালের এক জাদুকরী উৎসবের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে উৎসব মানেই হলো অন্ধকার শক্তির সঙ্গে আলোর লড়াই এবং শেষমেশ প্রকৃতির পুনর্জাগরণ। গ্যেটের বর্ণনায় উৎসব এক মহাজাগতিক রূপ পায়, যেখানে মানুষ আর অতিপ্রাকৃত শক্তি এক সুতোয় গাঁথা পড়ে।

ফরাসি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সাহিত্যে উৎসবের এক বৈচিত্র্যময় রূপ পরিলক্ষিত হয়। সামাজিক দর্পণ ও প্রকৃতির জয়গানকে এই অঞ্চলের সাহিত্যে উৎসবের প্রধান উপজীব্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফরাসি সাহিত্যে উৎসব মানেই সামাজিক বৈচিত্র্েযর বহিঃপ্রকাশ। ভিক্টর হুগো তাঁর ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নটর ডেম’ (The Hunchback of Notre-Dame) উপন্যাসে মধ্যযুগীয় প্যারিসের উৎসবগুলোর যে জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন, তা শোষিত মানুষের ক্ষোভ আর আনন্দের এক মিশ্র আখ্যান। মার্সেল প্রুস্ত তাঁর ‘ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম’ উপন্যাসচক্রে অভিজাত শ্রেণির ডিনার পার্টি বা উৎসবগুলোকে সময়ের এক স্থির প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বা নর্ডিক দেশগুলোতে উৎসব মানেই দীর্ঘ অন্ধকারের পর আলোর আবাহন। নুট হ্যামসুন তাঁর মাটির টান (Growth of the Soil) উপন্যাসে দেখিয়েছেন, ফসল কাটার উৎসব কীভাবে মানুষের আদিম সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। আগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের নাটকে সুইডিশ ‘মিডসামার’ উৎসবের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা যেন মানুষের অবদমিত কামনা আর স্বপ্নের এক বিস্ফোরণ।

ভারতীয় ও পারস্য সাহিত্যের উৎসবের মধ্যে ভক্তি, সুফিবাদ ও ঈদের সাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতীয় উপমহাদেশে উৎসবের ধারণাটি অত্যন্ত প্রাচীন। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে আধুনিক ভারতীয় সাহিত্য, সবখানেই উৎসব এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কালিদাসের ঋতুসংহার বা অভিজ্ঞান শকুন্তলম-এ প্রকৃতির উৎসব যেভাবে এসেছে, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। ভক্তিকালের কবি সুরদাস যখন তাঁর সুরসাগর-এ বর্ণনা করেন— “বসন্ত আইও, হোলি খেলে রাধা-শ্যাম”, তখন তা কেবল রঙের খেলা থাকে না, তা হয়ে ওঠে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের উৎসব।

পারস্য সাহিত্যে হাফিজ শিরাজি ও জালালুদ্দিন রুমি উৎসবকে দেখছেন আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যম হিসেবে। রুমি তাঁর মসনবী-তে রোজার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে উপবাসকে আত্মিক শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক স্থানে তিনি উপবাসকে আত্মার জাগরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—

‘Fasting is the first principle of medicine; fast, and behold the strength of the spirit.’

অর্থাৎ “উপবাস হলো চিকিৎসার আদি নীতি; রোজা রাখো এবং আত্মার শক্তি অবলোকন করো।”

আধুনিক কালে মুন্সি প্রেমচাঁদের কালজয়ী গল্প ঈদগাহ (Eidgah) দারিদ্র্েযর কশাঘাতে পিষ্ট এক শৈশবের মহানুভবতার আখ্যান। শিশু হামিদ যখন মেলার খেলনা ত্যাগ করে তার দাদির জন্য একটি চিমটা কেনে, তখন ঈদ উৎসবটি সহমর্মিতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাহিত্যে উৎসবের এক ভিন্নতর রূপ পরিলক্ষিত হয়। ফসলের উৎসব ও ড্রাগন নৃত্যসহ পূর্ব এশীয় সাহিত্যে চন্দ্র উৎসব এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাং যুগের কবি দু’ফু তাঁর “Moonlit Night” কবিতায় প্রিয়জনদের স্মরণ করে লিখেছেন—

‘Tonight the bright moon rises... I think of my brothers in distant lands.’

অর্থাৎ “আজ রাতে উজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে... আমি দূর দেশে থাকা আমার ভাইদের কথা ভাবছি।’

জাপানি সাহিত্যে ‘সাকুরা’ বা চেরি ব্লসম উৎসব জীবনের নশ্বরতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। কোরিয়ান সাহিত্যে ‘চুসক’ (Chuseok) উৎসবের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মিলন আর পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশীয় বা থাই সাহিত্যে ছায়ানৃত্য ও জল উৎসবের মাধ্যমে লৌকিক বিশ্বাসের যে প্রকাশ ঘটে, তা প্রাচ্যের সাহিত্যকে এক অনন্য মহিমা দান করেছে।

আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে উৎসব হলো আদিমতা ও জাদুবাস্তবতা কেন্দ্রিক। আফ্রিকান সাহিত্যে উৎসব মানেই মাটির সাথে সংযোগ। চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ উপন্যাসে ‘নতুন ওল উৎসব’ বা ‘নিউ ইয়াম ফেস্টিভ্যাল’ আদিম সংহতির প্রতীক। তিনি লিখেছেন:

‘The Feast of the New Yam was held every year before the harvest began, to honor the earth goddess and the ancestral spirits of the clan.’

অর্থাৎ “প্রতি বছর ফসল কাটা শুরুর আগে ‘নতুন ওল উৎসব’ অনুষ্ঠিত হতো ধরিত্রী দেবী এবং বংশের পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি সম্মান জানাতে।”

লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউড’ উপন্যাসে মেলা আর জাদুকরী উৎসবগুলো যেন এক মায়াবী জগত। অন্যদিকে মেক্সিকান লেখক অক্টাভিও পাজ তাঁর ‘The Labyrinth of Solitude’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মেক্সিকানদের কাছে মৃত্যুও কীভাবে একটি উৎসবে পরিণত হয়, যা মানুষের একাকীত্বকে ঘুচিয়ে দেয়।

বাংলা সাহিত্যে উৎসবের প্রধান বিষয়বস্তু হলো প্রাণের স্পন্দন ও সাম্যবাদ।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে উৎসবই বাঙালির প্রাণশক্তি। মঙ্গলকাব্যগুলোতে লৌকিক দেব-দেবীর আশীর্বাদ ধন্য হওয়ার জন্য যে মেলা ও উৎসবের আয়োজন হতো, তা ছিল গ্রামীণ ঐক্যের ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসবের দর্শনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে উৎসব মানে ‘ব্যক্তির থেকে বিশ্বমানবে’ উত্তরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, উৎসব মানুষের ভেতরের সংকীর্ণতাকে দূর করে উদারতা দান করে। তাঁর বিসর্জন নাটকে আমরা দেখি উৎসবের নামে যে রক্তপাত, তার বিরুদ্ধে মানবতার জয়গান।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে দুর্গোৎসবের যে প্রেক্ষাপট, তা গ্রামবাংলার সামাজিক চিত্র তুলে ধরে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঈদকে নিয়ে এসেছিলেন সাম্যের তূর্যধ্বনি হিসেবে। তাঁর সেই বিখ্যাত গান— “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ”, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার দলিল। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় উৎসব আসে এক মায়াবী কুয়াশার মতো, যেখানে ‘কার্তিকের নবান্ন’ হয়ে ওঠে চিরন্তন বাংলার রূপ। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু উপন্যাসে মাজার-কেন্দ্রিক উৎসব বা ‘ওরস’-এর যে বর্ণনা আছে, তা একদিকে যেমন মানুষের ধর্মীয় আবেগ, অন্যদিকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে উৎসবের এক নির্মোহ বিশ্লেষণ। আল মাহমুদের সোনালী কাবিন-এ লোকজ উৎসবের মরমি এবং মাটির সোঁদা ঘ্রাণ বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মাপে ঋদ্ধ করেছে। ঈদ, পূজা, বড়দিন আর পহেলা বৈশাখ— এই উৎসবগুলো আমাদের সাহিত্যে কেবল ধর্মীয় নয়, বরং এক অসাম্প্রদায়িক মানবিক মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।

উপসংহারে বলা যায়, সাহিত্যের অলিগলি ভ্রমণ করলে একটি সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষের আনন্দ ও কান্নার ভাষা সব দেশে, সব কালেই এক। উৎসবের রূপভেদ থাকতে পারে, পালনের রীতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার পেছনের মানবিক আকাঙ্ক্ষাটি অভিন্ন। প্রাচীন গ্রিসের ডায়োনিসিয়া থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলার পহেলা বৈশাখ... সব উৎসবই শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়গান গায়।

সাহিত্যের কাজ হলো উৎসবের এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া। যখন কোনো পাঠক ডিকেন্স পড়েন, তখন তিনি লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন বড়দিনকে অনুভব করেন; আবার যখন আচেবে পড়েন, তখন তিনি নাইজেরিয়ার তপ্ত রোদে নতুন ওল উৎসবের ঘ্রাণ পান। উৎসবের এই যে বিশ্বজনীনতা, সাহিত্যই তার প্রধান বাহক। উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নই, বরং আমরা এক বিশাল মানব-মহাসমুদ্রের অংশ। আর সাহিত্য সেই সমুদ্রের ঢেউগুলোকে শব্দের মালা দিয়ে গেঁথে রাখে আগামী প্রজন্মের জন্য। উৎসবের মধ্য দিয়েই মানুষ বারবার ফিরে পায় তার হারানো শৈশব, তার ঐতিহ্য এবং তার বেঁচে থাকার পরম সার্থকতা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬


বিশ্বসাহিত্যে উৎসব

প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে উৎসব হলো মানুষের সামষ্টিক অস্তিত্বের এক অবিনাশী প্রকাশ। উৎসব কেবল ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট কোনো দিন নয়, বরং এটি একটি জাতির মনন, ইতিহাস এবং আধ্যাত্মিক চেতনার দর্পণ। সাহিত্য সেই দর্পণকে ধারণ করে অক্ষরের ফ্রেমে। বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে উৎসব কখনো এসেছে দেবতাকুলকে তুষ্ট করার উপচার হিসেবে, কখনো এসেছে প্রকৃতির পালাবদলে কৃষকের হাসিকান্না হয়ে, আবার কখনো তা হয়ে উঠেছে শোষিতের মুক্তির আনন্দধ্বনি। বাংলা সাহিত্য থেকে শুরু করে সুদূর লাতিন আমেরিকা কিংবা নর্ডিক অঞ্চলের সাহিত্য, সর্বত্রই উৎসব এক অমোঘ চালিকাশক্তি। উৎসব মানেই বিচ্ছিন্ন মানবের মহামিলন, আর সাহিত্য সেই মিলনের মহাকাব্য। প্রাচীন মহাকাব্যের রণধ্বনি থেকে আধুনিক উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সবখানি জুড়েই উৎসব কোনো না কোনোভাবে তার বর্ণিল উপস্থিতি জানান দিয়ে গেছে।

প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যে উৎসবের আদিম রূপটি ধরা পড়ে। পশ্চিমা সাহিত্যের সূতিকাগার বলা হয় প্রাচীন গ্রিসকে। গ্রিক সাহিত্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মূলত উৎসবকে কেন্দ্র করেই। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সে দেবতা ডায়োনিসাসকে উৎসর্গ করে আয়োজিত হতো ‘সিটি ডায়োনিসিয়া’। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নাট্যপ্রতিযোগিতা। বিশ্বখ্যাত নাট্যকার সফোক্লিস যখন তাঁর কালজয়ী নাটক ঈডিপাস রেক্স (Oedipus Rex) লিখছেন, কিংবা ইউরিপিদিস যখন মিডিয়া (Medea) রচনা করছেন, তাঁদের অবচেতনে কাজ করছিল উৎসবের সেই বিশাল মঞ্চ। এরিস্টোফেনিসের কৌতুকনাটক লাইসিস্ট্রাটা (Lysistrata) পাঠ করলে বোঝা যায়, যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝেও উৎসব কীভাবে মানুষের মনে প্রাণের সঞ্চার করত। উৎসবের এই মঞ্চ থেকেই জন্ম নিয়েছিল ট্র্যাজেডি এবং কমেডির মতো শক্তিশালী সাহিত্যিক ধারা।

রোমান সাহিত্যে উৎসবের চিত্রটি ছিল আরও খানিকটা বৈপ্লবিক। রোমানদের ‘স্যাটার্নালিয়া’ (Saturnalia) উৎসব ছিল সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার উৎসব। দেবতা শনি বা স্যাটার্নকে উৎসর্গ করা এই শীতকালীন উৎসবে দাসেরা পেত সাময়িক মুক্তি, আর মালিকেরা সেজে বসত দাসের বেশে। রোমান কবি ক্যাটুলাস এই উৎসবকে ‘the best of days’ বা ‘দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ’ বলে অভিহিত করেছেন। প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গার তাঁর পত্রাবলিতে উৎসবের যে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন, তা সমাজতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব এখানে কেবল আমোদ নয়, বরং শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে সাহিত্যের এক নীরব প্রতিবাদ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় ও রেনেসাঁ সাহিত্যে উৎসবের বিবর্তন ছিল লক্ষণীয়। মধ্যযুগের ইউরোপীয় জীবন ছিল গির্জা ও ধর্মকেন্দ্রিক। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়ের সাহিত্যে ক্রিসমাস ও ইস্টার উৎসবের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যায়। জিওফ্রে চসারের ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’ (The Canterbury Tales) আখ্যানমূলক কাব্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, তীর্থযাত্রীরা যখন থমাস বেকেটের মাজারের দিকে যাত্রা করছেন, তখন তাঁদের গল্পগুলোর পরতে পরতে মিশে আছে ধর্মীয় উৎসবের নৈতিকতা ও আনন্দ। উইলিয়াম শেক্সপিয়রও তাঁর লেখায় উৎসবকে মানবিক আবেদন ও মনস্তত্ত্বের স্তরে নিয়ে যান। তাঁর টুয়েলফথ নাইট (Twelfth Night) নাটকটি ক্রিসমাসের পরবর্তী দ্বাদশ রাতের উৎসবের প্রেক্ষাপটে রচিত। এখানে উৎসব মানেই বিশৃঙ্খলা, ছদ্মবেশ এবং শেষমেশ সত্যের উন্মোচন। শেক্সপিয়র দেখিয়েছিলেন, উৎসবের আবহে মানুষ তার কৃত্রিম আবরণ খুলে আসল রূপে আবির্ভূত হয়। পরবর্তীতে চার্লস ডিকেন্স তাঁর এ ক্রিসমাস ক্যারল (A Christmas Carol) উপন্যাসের মাধ্যমে বড়দিনকে একটি বিশ্বজনীন মানবিক উৎসবে রূপ দেন। কৃপণ এবেনিজার স্ক্রুজ চরিত্রটি যখন উৎসবের প্রেতাত্মাদের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়, তখন সেটি কেবল একটি গল্প থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তনের ইশতেহার। 

রাশিয়ান ও জার্মান সাহিত্যে উৎসবের গূঢ় মনস্তত্ত্ব ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। রাশিয়ান সাহিত্যের দিকপালদের লেখায় উৎসব এসেছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে। ফিওদর দস্তয়েভস্কি তাঁর অপরাধ ও শাস্তি (Crime and Punishment) উপন্যাসে রাশিয়ান অর্থোডক্স ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আবহের ভেতর দিয়ে মানুষের অপরাধবোধ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ধর্মীয় অনুষঙ্গগুলো সেখানে কেবল সামাজিক চিহ্ন নয়, বরং আত্মশুদ্ধির এক কঠোর পরীক্ষা। লিও তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তি (War and Peace) উপন্যাসে বড়দিন বা ম্যাসকারড-এর যে বর্ণনা আছে, তা আভিজাত্য ও সাধারণ মানুষের জীবনের মেলবন্ধনের এক অনুপম চিত্র।

জার্মান সাহিত্যের মহীরুহ জোহান উলফগ্যাং ফন গ্যেটে তাঁর অমর সৃষ্টি ফাউস্ট (Faust)-এ ‘ওয়ালপুর্গিস নাইট’ (Walpurgis Night) বা বসন্তের প্রাক্কালের এক জাদুকরী উৎসবের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে উৎসব মানেই হলো অন্ধকার শক্তির সঙ্গে আলোর লড়াই এবং শেষমেশ প্রকৃতির পুনর্জাগরণ। গ্যেটের বর্ণনায় উৎসব এক মহাজাগতিক রূপ পায়, যেখানে মানুষ আর অতিপ্রাকৃত শক্তি এক সুতোয় গাঁথা পড়ে।

ফরাসি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সাহিত্যে উৎসবের এক বৈচিত্র্যময় রূপ পরিলক্ষিত হয়। সামাজিক দর্পণ ও প্রকৃতির জয়গানকে এই অঞ্চলের সাহিত্যে উৎসবের প্রধান উপজীব্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফরাসি সাহিত্যে উৎসব মানেই সামাজিক বৈচিত্র্েযর বহিঃপ্রকাশ। ভিক্টর হুগো তাঁর ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নটর ডেম’ (The Hunchback of Notre-Dame) উপন্যাসে মধ্যযুগীয় প্যারিসের উৎসবগুলোর যে জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন, তা শোষিত মানুষের ক্ষোভ আর আনন্দের এক মিশ্র আখ্যান। মার্সেল প্রুস্ত তাঁর ‘ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম’ উপন্যাসচক্রে অভিজাত শ্রেণির ডিনার পার্টি বা উৎসবগুলোকে সময়ের এক স্থির প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বা নর্ডিক দেশগুলোতে উৎসব মানেই দীর্ঘ অন্ধকারের পর আলোর আবাহন। নুট হ্যামসুন তাঁর মাটির টান (Growth of the Soil) উপন্যাসে দেখিয়েছেন, ফসল কাটার উৎসব কীভাবে মানুষের আদিম সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। আগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের নাটকে সুইডিশ ‘মিডসামার’ উৎসবের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা যেন মানুষের অবদমিত কামনা আর স্বপ্নের এক বিস্ফোরণ।

ভারতীয় ও পারস্য সাহিত্যের উৎসবের মধ্যে ভক্তি, সুফিবাদ ও ঈদের সাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতীয় উপমহাদেশে উৎসবের ধারণাটি অত্যন্ত প্রাচীন। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে আধুনিক ভারতীয় সাহিত্য, সবখানেই উৎসব এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কালিদাসের ঋতুসংহার বা অভিজ্ঞান শকুন্তলম-এ প্রকৃতির উৎসব যেভাবে এসেছে, তা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। ভক্তিকালের কবি সুরদাস যখন তাঁর সুরসাগর-এ বর্ণনা করেন— “বসন্ত আইও, হোলি খেলে রাধা-শ্যাম”, তখন তা কেবল রঙের খেলা থাকে না, তা হয়ে ওঠে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের উৎসব।

পারস্য সাহিত্যে হাফিজ শিরাজি ও জালালুদ্দিন রুমি উৎসবকে দেখছেন আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যম হিসেবে। রুমি তাঁর মসনবী-তে রোজার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে উপবাসকে আত্মিক শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক স্থানে তিনি উপবাসকে আত্মার জাগরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—

‘Fasting is the first principle of medicine; fast, and behold the strength of the spirit.’

অর্থাৎ “উপবাস হলো চিকিৎসার আদি নীতি; রোজা রাখো এবং আত্মার শক্তি অবলোকন করো।”

আধুনিক কালে মুন্সি প্রেমচাঁদের কালজয়ী গল্প ঈদগাহ (Eidgah) দারিদ্র্েযর কশাঘাতে পিষ্ট এক শৈশবের মহানুভবতার আখ্যান। শিশু হামিদ যখন মেলার খেলনা ত্যাগ করে তার দাদির জন্য একটি চিমটা কেনে, তখন ঈদ উৎসবটি সহমর্মিতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাহিত্যে উৎসবের এক ভিন্নতর রূপ পরিলক্ষিত হয়। ফসলের উৎসব ও ড্রাগন নৃত্যসহ পূর্ব এশীয় সাহিত্যে চন্দ্র উৎসব এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাং যুগের কবি দু’ফু তাঁর “Moonlit Night” কবিতায় প্রিয়জনদের স্মরণ করে লিখেছেন—

‘Tonight the bright moon rises... I think of my brothers in distant lands.’

অর্থাৎ “আজ রাতে উজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে... আমি দূর দেশে থাকা আমার ভাইদের কথা ভাবছি।’

জাপানি সাহিত্যে ‘সাকুরা’ বা চেরি ব্লসম উৎসব জীবনের নশ্বরতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। কোরিয়ান সাহিত্যে ‘চুসক’ (Chuseok) উৎসবের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মিলন আর পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশীয় বা থাই সাহিত্যে ছায়ানৃত্য ও জল উৎসবের মাধ্যমে লৌকিক বিশ্বাসের যে প্রকাশ ঘটে, তা প্রাচ্যের সাহিত্যকে এক অনন্য মহিমা দান করেছে।

আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে উৎসব হলো আদিমতা ও জাদুবাস্তবতা কেন্দ্রিক। আফ্রিকান সাহিত্যে উৎসব মানেই মাটির সাথে সংযোগ। চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ উপন্যাসে ‘নতুন ওল উৎসব’ বা ‘নিউ ইয়াম ফেস্টিভ্যাল’ আদিম সংহতির প্রতীক। তিনি লিখেছেন:

‘The Feast of the New Yam was held every year before the harvest began, to honor the earth goddess and the ancestral spirits of the clan.’

অর্থাৎ “প্রতি বছর ফসল কাটা শুরুর আগে ‘নতুন ওল উৎসব’ অনুষ্ঠিত হতো ধরিত্রী দেবী এবং বংশের পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি সম্মান জানাতে।”

লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউড’ উপন্যাসে মেলা আর জাদুকরী উৎসবগুলো যেন এক মায়াবী জগত। অন্যদিকে মেক্সিকান লেখক অক্টাভিও পাজ তাঁর ‘The Labyrinth of Solitude’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মেক্সিকানদের কাছে মৃত্যুও কীভাবে একটি উৎসবে পরিণত হয়, যা মানুষের একাকীত্বকে ঘুচিয়ে দেয়।

বাংলা সাহিত্যে উৎসবের প্রধান বিষয়বস্তু হলো প্রাণের স্পন্দন ও সাম্যবাদ।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে উৎসবই বাঙালির প্রাণশক্তি। মঙ্গলকাব্যগুলোতে লৌকিক দেব-দেবীর আশীর্বাদ ধন্য হওয়ার জন্য যে মেলা ও উৎসবের আয়োজন হতো, তা ছিল গ্রামীণ ঐক্যের ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসবের দর্শনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে উৎসব মানে ‘ব্যক্তির থেকে বিশ্বমানবে’ উত্তরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, উৎসব মানুষের ভেতরের সংকীর্ণতাকে দূর করে উদারতা দান করে। তাঁর বিসর্জন নাটকে আমরা দেখি উৎসবের নামে যে রক্তপাত, তার বিরুদ্ধে মানবতার জয়গান।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে দুর্গোৎসবের যে প্রেক্ষাপট, তা গ্রামবাংলার সামাজিক চিত্র তুলে ধরে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঈদকে নিয়ে এসেছিলেন সাম্যের তূর্যধ্বনি হিসেবে। তাঁর সেই বিখ্যাত গান— “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ”, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার দলিল। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় উৎসব আসে এক মায়াবী কুয়াশার মতো, যেখানে ‘কার্তিকের নবান্ন’ হয়ে ওঠে চিরন্তন বাংলার রূপ। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু উপন্যাসে মাজার-কেন্দ্রিক উৎসব বা ‘ওরস’-এর যে বর্ণনা আছে, তা একদিকে যেমন মানুষের ধর্মীয় আবেগ, অন্যদিকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে উৎসবের এক নির্মোহ বিশ্লেষণ। আল মাহমুদের সোনালী কাবিন-এ লোকজ উৎসবের মরমি এবং মাটির সোঁদা ঘ্রাণ বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মাপে ঋদ্ধ করেছে। ঈদ, পূজা, বড়দিন আর পহেলা বৈশাখ— এই উৎসবগুলো আমাদের সাহিত্যে কেবল ধর্মীয় নয়, বরং এক অসাম্প্রদায়িক মানবিক মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে।

উপসংহারে বলা যায়, সাহিত্যের অলিগলি ভ্রমণ করলে একটি সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষের আনন্দ ও কান্নার ভাষা সব দেশে, সব কালেই এক। উৎসবের রূপভেদ থাকতে পারে, পালনের রীতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার পেছনের মানবিক আকাঙ্ক্ষাটি অভিন্ন। প্রাচীন গ্রিসের ডায়োনিসিয়া থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলার পহেলা বৈশাখ... সব উৎসবই শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়গান গায়।

সাহিত্যের কাজ হলো উৎসবের এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া। যখন কোনো পাঠক ডিকেন্স পড়েন, তখন তিনি লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন বড়দিনকে অনুভব করেন; আবার যখন আচেবে পড়েন, তখন তিনি নাইজেরিয়ার তপ্ত রোদে নতুন ওল উৎসবের ঘ্রাণ পান। উৎসবের এই যে বিশ্বজনীনতা, সাহিত্যই তার প্রধান বাহক। উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নই, বরং আমরা এক বিশাল মানব-মহাসমুদ্রের অংশ। আর সাহিত্য সেই সমুদ্রের ঢেউগুলোকে শব্দের মালা দিয়ে গেঁথে রাখে আগামী প্রজন্মের জন্য। উৎসবের মধ্য দিয়েই মানুষ বারবার ফিরে পায় তার হারানো শৈশব, তার ঐতিহ্য এবং তার বেঁচে থাকার পরম সার্থকতা।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত