শক্তিমান কবি আবুল হাসানের বই ‘রাজা যায় রাজা আসে।’ ভাবনার নকল নয়, সমর্থন জারি রেখে শিরোনাম করেছি—রাজা গিয়ে রাজা আসে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন বক্তব্য লোকমুখের কিংবদন্তি। এর উত্তম নমুনা নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার ১৩ বছর ঠেকিয়ে রাখা।
রাষ্ট্র বদলায়, সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়—এরপরও যদি অবিচার থাকে, সেই পরিবর্তনের মূল্য কী? প্রশ্নটি আজ আবার সামনে এসেছে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের তেরো বছর পূর্তিতে।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে অপহৃত হয়েছিল এক মেধাবী কিশোর। দুই দিন পর, ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। সেই কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা এবং একটি রাষ্ট্রের বিবেক—সবকিছুকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল সেই দিনে।
তেরো বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই হত্যার বিচার এখনও শুরুই হয়নি। এটি শুধু একটি মামলার বিলম্ব নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো—অপরাধ হলে বিচার হবে। কিন্তু যখন সেই বিচারই বছরের পর বছর আটকে থাকে, তখন মানুষের মনে ভয় জন্মায়— রাষ্ট্র কি সত্যিই তার নাগরিককে রক্ষা করতে সক্ষম?
খুনের দায় খুনির। এটি একটি নৈতিক ও আইনি সত্য। কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ খুনের বিচার শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নয়; এটি সমগ্র সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ত্বকী হত্যাকাণ্ড সেই কারণেই আজ একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে—ক্ষমতার ছায়ায় আটকে থাকা ন্যায়বিচারের প্রতীক।
ঘটনার পর তদন্তে একাধিকবার অগ্রগতির দাবি এসেছে। আবার সেই অগ্রগতি থেমেও গেছে রহস্যময়ভাবে। তদন্তে উঠে এসেছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, এসেছে হত্যার বিস্তারিত বিবরণ। মামলার আসামি সুলতান শওকত ভ্রমর এবং ইউসুফ হোসেন লিটন ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন লোমহর্ষক তথ্য—তৎকালীন প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের টর্চার সেলে আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল।
২০১৪ সালে র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছিলেন। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো—তারপরও এক যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও মামলার চার্জশিট আদালতে জমা পড়েনি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে আছে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্র কি সত্যিই এই হত্যার বিচার করতে চায়? না কি ক্ষমতার প্রভাবের কাছে বিচার প্রক্রিয়া বারবার থেমে যায়?
একসময় নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা প্রায় কিংবদন্তির মতো শোনা যেত। সেই প্রভাবের ছায়া কি এখনও বিচার প্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছে? যদি তাই হয়, তবে এটি শুধু একটি পরিবারের অপরাধের প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতার নির্মম স্বীকারোক্তি।
এখন আর শুধু ওসমান পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তেরো বছর ধরে বিচার না হওয়া মানে রাষ্ট্র নিজেই একটি নীরব দায় বহন করছে।
একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার—মৃত্যুর কোনো প্রতিস্থাপন নেই। কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো সান্ত¡না, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য—কিছুই একটি সন্তানের মৃত্যু পূরণ করতে পারে না। যে পরিবার সন্তান হারায়, তাদের জীবনে সেই শূন্যতা আজীবনের। সুতরাং ত্বকীর বাবা-মায়ের কাছে বিচারও হয়তো সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।
তবুও বিচার দরকার। কেন?
কারণ বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; বিচার মানে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। বিচার মানে এই বার্তা দেয়া—এই সমাজে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না। বিচার মানে রাষ্ট্র খুনির পক্ষে নয়, মানুষের পক্ষে।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি সেই লড়াইটাই করে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি মাসের ৮ তারিখ মোমবাতি হাতে আলোকপ্রজ্ব¡লন কর্মসূচি যেন রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেয়Ñ একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও বাকি।
এটি শুধু একটি পরিবারের শোকের অনুষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক জাগানোর চেষ্টা।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিচার চাওয়ার ‘অপরাধে’ ত্বকীর পরিবার ও আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে এসেছে দমন-পীড়ন। সাতটি মিথ্যা মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হয়রানি, প্রাণনাশের হুমকি—এসবের মধ্য দিয়েও আন্দোলন থামেনি। বরং দেশের সীমানা পেরিয়ে ২৩টি দেশেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হয়েছে।
এই দৃশ্য বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের জন্য গৌরবের। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন—হয়তো এবার দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটবে। কিন্তু এখনও সেই আশার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দেড় বছর পার করে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এতে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—খুনিদের প্রভাব কি এখনও এতটাই শক্তিশালী যে, রাষ্ট্রও তাদের সামনে নীরব?
যদি সেটিই সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় বিচারিক ব্যর্থতা।
আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বহু ঘটনায় দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাহলে একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে? ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কি এখনও ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের কাগজে নেই; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন।
সংবিধান কোনো সরকারকে নাগরিক হত্যার বিচার আটকে রাখার অধিকার দেয় না। আইনের শাসনের মৌলিক নীতি একটাই—অপরাধীর বিচার হতে হবে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সেই নীতির পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।
ত্বকী হত্যার তেরো বছর পর এসে তাই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই হত্যার বিচার কি সত্যিই হবে? নাকি এটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার দীর্ঘ তালিকায় আরেকটি নাম হয়ে থাকবে?
রাষ্ট্রের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে—আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই পথের প্রথম পরীক্ষাগুলোর একটি ত্বকী হত্যার বিচার।
কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যই সরল।
খুনের দায় খুনির।
আর বিচারের দায় বিচার ব্যবস্থার।
এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই।
[লেখক : কবি ও সাংবাদিক]

শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬
শক্তিমান কবি আবুল হাসানের বই ‘রাজা যায় রাজা আসে।’ ভাবনার নকল নয়, সমর্থন জারি রেখে শিরোনাম করেছি—রাজা গিয়ে রাজা আসে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন বক্তব্য লোকমুখের কিংবদন্তি। এর উত্তম নমুনা নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার ১৩ বছর ঠেকিয়ে রাখা।
রাষ্ট্র বদলায়, সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়—এরপরও যদি অবিচার থাকে, সেই পরিবর্তনের মূল্য কী? প্রশ্নটি আজ আবার সামনে এসেছে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের তেরো বছর পূর্তিতে।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে অপহৃত হয়েছিল এক মেধাবী কিশোর। দুই দিন পর, ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। সেই কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা এবং একটি রাষ্ট্রের বিবেক—সবকিছুকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল সেই দিনে।
তেরো বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই হত্যার বিচার এখনও শুরুই হয়নি। এটি শুধু একটি মামলার বিলম্ব নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হলো—অপরাধ হলে বিচার হবে। কিন্তু যখন সেই বিচারই বছরের পর বছর আটকে থাকে, তখন মানুষের মনে ভয় জন্মায়— রাষ্ট্র কি সত্যিই তার নাগরিককে রক্ষা করতে সক্ষম?
খুনের দায় খুনির। এটি একটি নৈতিক ও আইনি সত্য। কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ খুনের বিচার শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নয়; এটি সমগ্র সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
ত্বকী হত্যাকাণ্ড সেই কারণেই আজ একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে—ক্ষমতার ছায়ায় আটকে থাকা ন্যায়বিচারের প্রতীক।
ঘটনার পর তদন্তে একাধিকবার অগ্রগতির দাবি এসেছে। আবার সেই অগ্রগতি থেমেও গেছে রহস্যময়ভাবে। তদন্তে উঠে এসেছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, এসেছে হত্যার বিস্তারিত বিবরণ। মামলার আসামি সুলতান শওকত ভ্রমর এবং ইউসুফ হোসেন লিটন ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন লোমহর্ষক তথ্য—তৎকালীন প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের টর্চার সেলে আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং শ্বাসরোধ করে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছিল।
২০১৪ সালে র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান সংবাদ সম্মেলনে এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছিলেন। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো—তারপরও এক যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও মামলার চার্জশিট আদালতে জমা পড়েনি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে আছে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্র কি সত্যিই এই হত্যার বিচার করতে চায়? না কি ক্ষমতার প্রভাবের কাছে বিচার প্রক্রিয়া বারবার থেমে যায়?
একসময় নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা প্রায় কিংবদন্তির মতো শোনা যেত। সেই প্রভাবের ছায়া কি এখনও বিচার প্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছে? যদি তাই হয়, তবে এটি শুধু একটি পরিবারের অপরাধের প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতার নির্মম স্বীকারোক্তি।
এখন আর শুধু ওসমান পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তেরো বছর ধরে বিচার না হওয়া মানে রাষ্ট্র নিজেই একটি নীরব দায় বহন করছে।
একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার—মৃত্যুর কোনো প্রতিস্থাপন নেই। কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো সান্ত¡না, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য—কিছুই একটি সন্তানের মৃত্যু পূরণ করতে পারে না। যে পরিবার সন্তান হারায়, তাদের জীবনে সেই শূন্যতা আজীবনের। সুতরাং ত্বকীর বাবা-মায়ের কাছে বিচারও হয়তো সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।
তবুও বিচার দরকার। কেন?
কারণ বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; বিচার মানে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। বিচার মানে এই বার্তা দেয়া—এই সমাজে অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না। বিচার মানে রাষ্ট্র খুনির পক্ষে নয়, মানুষের পক্ষে।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি সেই লড়াইটাই করে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি মাসের ৮ তারিখ মোমবাতি হাতে আলোকপ্রজ্ব¡লন কর্মসূচি যেন রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেয়Ñ একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও বাকি।
এটি শুধু একটি পরিবারের শোকের অনুষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক জাগানোর চেষ্টা।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিচার চাওয়ার ‘অপরাধে’ ত্বকীর পরিবার ও আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে এসেছে দমন-পীড়ন। সাতটি মিথ্যা মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হয়রানি, প্রাণনাশের হুমকি—এসবের মধ্য দিয়েও আন্দোলন থামেনি। বরং দেশের সীমানা পেরিয়ে ২৩টি দেশেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ হয়েছে।
এই দৃশ্য বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের জন্য গৌরবের। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন—হয়তো এবার দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটবে। কিন্তু এখনও সেই আশার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দেড় বছর পার করে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এতে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—খুনিদের প্রভাব কি এখনও এতটাই শক্তিশালী যে, রাষ্ট্রও তাদের সামনে নীরব?
যদি সেটিই সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় বিচারিক ব্যর্থতা।
আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বহু ঘটনায় দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তাহলে একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে? ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কি এখনও ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের কাগজে নেই; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন।
সংবিধান কোনো সরকারকে নাগরিক হত্যার বিচার আটকে রাখার অধিকার দেয় না। আইনের শাসনের মৌলিক নীতি একটাই—অপরাধীর বিচার হতে হবে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সেই নীতির পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়।
ত্বকী হত্যার তেরো বছর পর এসে তাই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই হত্যার বিচার কি সত্যিই হবে? নাকি এটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার দীর্ঘ তালিকায় আরেকটি নাম হয়ে থাকবে?
রাষ্ট্রের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে—আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই পথের প্রথম পরীক্ষাগুলোর একটি ত্বকী হত্যার বিচার।
কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যই সরল।
খুনের দায় খুনির।
আর বিচারের দায় বিচার ব্যবস্থার।
এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই।
[লেখক : কবি ও সাংবাদিক]

আপনার মতামত লিখুন