পাহাড় আর হ্রদবেষ্টিত জেলা রাঙ্গামাটির বিখ্যাত ভাসমান বাজার ‘সমতাঘাটে’ মৌসুমী ফল আনারসের বেচাকেনা জমে উঠেছে। তবে রমজানের শুরুতে চড়া দাম থাকলেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
সরেজমিনে শহরের বনরূপা বাজারের এ ভাসমান হাট ঘুরে দেখা যায়, হ্রদের বুকে আনারস বোঝাই অসংখ্য নৌকা ভিড়েছে। রমজানের এক সপ্তাহ আগে আকারভেদে যেখানে প্রতিটি আনারস ১০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ২২ টাকা দরে। দাম কমে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কৃষকরা, তবে বাজারের এই স্বাভাবিক ওঠানামাকে মেনে নিয়েছেন তারা।
জেলার লংগদু উপজেলার কাট্টলী থেকে আনারস নিয়ে আসা ব্যবসায়ী মধু চাকমা জানান, বুধবার তিনি ৯ হাজার ৭শ পিস আনারস ১৮ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘রোজার শুরুতে প্রতিপিস ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন চাহিদা কমায় দামও কমছে। এছাড়া বৃষ্টি না হওয়ায় আনারসের সাইজও ছোট হচ্ছে।’
দীর্ঘ ৩০ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মধু চাকমা আরও বলেন, তিনি গ্রামের কৃষকদের চাষের সময় অগ্রিম টাকা দিয়ে থাকেন। ফলন হলেই তা সংগ্রহ করে এই বাজারে নিয়ে আসেন।
তার মতে, এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে আনারস কেনায় দাম পড়েছে ১২ থেকে ১৪ টাকা, যা তুলনামূলক ভালো। তবে বৃষ্টি শুরু হলে দাম আরও কমবে বলে আশঙ্কা তার।
অন্যদিকে, নানিয়ারচর উপজেলার তরুণ কৃষক ডিকু চাকমা পড়ালেখার পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে আনারস চাষ করছেন। এ বছর তিনি ৩০ হাজার চারার বাগান থেকে ইতোমধ্যে ১৬ হাজার পিস আনারস বিক্রি করেছেন।
তিনি জানান, রোজার আগে ভালো দাম পেলেও এখন ব্যবসায়ীরা জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাত দেখাচ্ছেন। তবে উৎপাদন খরচ তুলে দাম এখনও ভালো আছে বলেও মন্তব্য করেন এই তরুণ কৃষক।
তিনি আরও বলেন, কৃষকরা ফল মৌসুমের আগেই বাজারে আনতে হরমোন প্রয়োগ করেন, যাতে ভালো দাম পাওয়া যায়।
তবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাদের লোকসানের কথা জানিয়েছেন। ঢাকার ব্যবসায়ী আমিরুল হক বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা কম থাকায় গত সপ্তাহে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।
নীলফামারী থেকে আসা ব্যবসায়ী ছাদেকুল ইসলাম জানান, আনারস কেনার চেয়ে পরিবহন খরচই বেশি ভোগাচ্ছে। এক ট্রাক আনারস নীলফামারী নিতে শুধু ট্রাক ভাড়াই ৪৫ হাজার টাকা, যা ব্যবসা অলাভজনক করে তুলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, প্রকৃতিতে এখনও শীতের আমেজ থাকায় বাজারে আনারসের চাহিদা কিছুটা কম। আবার অনেক কৃষক রমজানকে কেন্দ্র করে ফল উৎপাদন করায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। বর্তমান দামে কৃষকদের লোকসানের কোনো আশঙ্কা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে খুচরা বাজারে যাতে সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে দাম না বাড়ানো হয়, সেদিকে নজর রাখার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটিতে এ বছর ২ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮ হাজার মেট্রিকটন। প্রতি সপ্তাহের শনি ও বুধবার এই ভাসমান পাইকারি বাজার বসে।

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মার্চ ২০২৬
পাহাড় আর হ্রদবেষ্টিত জেলা রাঙ্গামাটির বিখ্যাত ভাসমান বাজার ‘সমতাঘাটে’ মৌসুমী ফল আনারসের বেচাকেনা জমে উঠেছে। তবে রমজানের শুরুতে চড়া দাম থাকলেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
সরেজমিনে শহরের বনরূপা বাজারের এ ভাসমান হাট ঘুরে দেখা যায়, হ্রদের বুকে আনারস বোঝাই অসংখ্য নৌকা ভিড়েছে। রমজানের এক সপ্তাহ আগে আকারভেদে যেখানে প্রতিটি আনারস ১০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ২২ টাকা দরে। দাম কমে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কৃষকরা, তবে বাজারের এই স্বাভাবিক ওঠানামাকে মেনে নিয়েছেন তারা।
জেলার লংগদু উপজেলার কাট্টলী থেকে আনারস নিয়ে আসা ব্যবসায়ী মধু চাকমা জানান, বুধবার তিনি ৯ হাজার ৭শ পিস আনারস ১৮ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘রোজার শুরুতে প্রতিপিস ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন চাহিদা কমায় দামও কমছে। এছাড়া বৃষ্টি না হওয়ায় আনারসের সাইজও ছোট হচ্ছে।’
দীর্ঘ ৩০ বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মধু চাকমা আরও বলেন, তিনি গ্রামের কৃষকদের চাষের সময় অগ্রিম টাকা দিয়ে থাকেন। ফলন হলেই তা সংগ্রহ করে এই বাজারে নিয়ে আসেন।
তার মতে, এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে আনারস কেনায় দাম পড়েছে ১২ থেকে ১৪ টাকা, যা তুলনামূলক ভালো। তবে বৃষ্টি শুরু হলে দাম আরও কমবে বলে আশঙ্কা তার।
অন্যদিকে, নানিয়ারচর উপজেলার তরুণ কৃষক ডিকু চাকমা পড়ালেখার পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে আনারস চাষ করছেন। এ বছর তিনি ৩০ হাজার চারার বাগান থেকে ইতোমধ্যে ১৬ হাজার পিস আনারস বিক্রি করেছেন।
তিনি জানান, রোজার আগে ভালো দাম পেলেও এখন ব্যবসায়ীরা জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাত দেখাচ্ছেন। তবে উৎপাদন খরচ তুলে দাম এখনও ভালো আছে বলেও মন্তব্য করেন এই তরুণ কৃষক।
তিনি আরও বলেন, কৃষকরা ফল মৌসুমের আগেই বাজারে আনতে হরমোন প্রয়োগ করেন, যাতে ভালো দাম পাওয়া যায়।
তবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাদের লোকসানের কথা জানিয়েছেন। ঢাকার ব্যবসায়ী আমিরুল হক বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে চাহিদা কম থাকায় গত সপ্তাহে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।
নীলফামারী থেকে আসা ব্যবসায়ী ছাদেকুল ইসলাম জানান, আনারস কেনার চেয়ে পরিবহন খরচই বেশি ভোগাচ্ছে। এক ট্রাক আনারস নীলফামারী নিতে শুধু ট্রাক ভাড়াই ৪৫ হাজার টাকা, যা ব্যবসা অলাভজনক করে তুলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, প্রকৃতিতে এখনও শীতের আমেজ থাকায় বাজারে আনারসের চাহিদা কিছুটা কম। আবার অনেক কৃষক রমজানকে কেন্দ্র করে ফল উৎপাদন করায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। বর্তমান দামে কৃষকদের লোকসানের কোনো আশঙ্কা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে খুচরা বাজারে যাতে সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে দাম না বাড়ানো হয়, সেদিকে নজর রাখার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটিতে এ বছর ২ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮ হাজার মেট্রিকটন। প্রতি সপ্তাহের শনি ও বুধবার এই ভাসমান পাইকারি বাজার বসে।

আপনার মতামত লিখুন