সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

চরফ্যাসনে অবৈধ সেচ পাম্পের দৌরাত্ম্য

শুকিয়ে যাচ্ছে টিউবওয়েল, বাড়ছে জনদুর্ভোগ



শুকিয়ে যাচ্ছে টিউবওয়েল, বাড়ছে জনদুর্ভোগ
ছবি : সংবাদ

ভোলার চরফ্যাসন উপজেলায় অবৈধ সেচ পাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নেমে গেছে। এতে উপজেলার পাঁচটি এলাকার প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৯৪ জন মানুষ সুপেয় পানির অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কৃষি কাজের জন্য সাবমারসিবল পাম্প দিয়ে অবৈধভাবে মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে হস্তচালিত প্রায় দেড় হাজার নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

উপজেলা বিএডিসি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জিন্নাগড়, মাদ্রাজ, হাজারীগঞ্জ, জাহানপুর ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বেসরকারিভাবে ১০০টি সাবমারসিবল সেচ পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প থেকে কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন আট ঘণ্টায় গড়ে ৮ লাখ ৬ হাজার ৪০০ লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

সুপেয় পানির সংকটে পড়া এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আগে যেখানে হস্তচালিত টিউবওয়েল থেকে সহজেই সুপেয় পানি মিলত, সেখানে এখন কয়েক মিনিট চাপ দিলেও পানি উঠছে না। কৃষিকাজ, মাছের ঘের ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অনেকেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাবমারসিবল পাম্প ব্যবহার করছেন। এসব পাম্প ঘণ্টার পর ঘণ্টা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

গত কয়েক মাস ধরে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবারকে দূর-দূরান্ত থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বাজার এলাকায়ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে কৃষকরা বোরো আবাদের জন্য প্রতিনিয়ত সাবমারসিবল পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করছেন। এছাড়া প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গভীর নলকূপে শক্তিশালী সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করে অতিরিক্ত হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছেন। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং আশপাশের গভীর টিউবওয়েলগুলোতেও পানি উঠছে না। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ তাদের পক্ষে মোটরচালিত পাম্প ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

চর মাদ্রাজ এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে আমাদের বাড়ির টিউবওয়েলে সারা বছর পানি থাকত। এখন এক ফোঁটাও উঠছে না। পাশের বাড়িতে গভীর নলকূপে সাবমারসিবল পাম্প বসানোর পর থেকেই এই সমস্যা শুরু।’

একই অভিযোগ জিন্নাগড় এলাকার গৃহিণী নাসিমা বেগমের। তিনি বলেন, ‘বিলের মধ্যে অবৈধভাবে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করে পানি উত্তোলনের ফলে আমাদের নলকূপে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন ভোরে দূরের একটি নলকূপ থেকে পানি আনতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কষ্টকর। এমনকি অনেক সময় পুকুরের পানি পান করতে হচ্ছে এবং রান্নার কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে।’

সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনকারী জিন্নাগড় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ফারুক কেরানী বলেন, ‘খাল শুকিয়ে যাওয়ায় আমরা বিকল্প পদ্ধতিতে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করতে বাধ্য হয়েছি। বোরো আবাদ বাঁচাতে সাবমারসিবল পাম্প ব্যবহার করছি।’

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই এলাকায় একাধিক গভীর নলকূপ ও শক্তিশালী সাবমারসিবল পাম্প ব্যবহারের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় দেড় হাজার অগভীর টিউবওয়েল অচল হয়ে পড়েছে। চরফ্যাসন পৌরসভাসহ ২১টি ইউনিয়নে ১০ হাজার ৭৩টি হস্তচালিত নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৮৫১টি সচল ও ২২২টি অকেজো রয়েছে। এ পর্যন্ত ২৮টি মেরামত করা হয়েছে। তবে হস্তচালিত নলকূপের সংখ্যা উপজেলা জনস্বাস্থ্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ১০ হাজার ৭৩টি হলেও সরেজমিনে এর পরিমাণ প্রায় চার গুণ। এ উপজেলার ৬০ শতাংশ বাসিন্দা নিজস্ব অর্থায়নে গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন, যার মধ্যে ৪০ শতাংশের নলকূপ অকেজো।

জিন্নাগড় ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি জামাল মোল্লা বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো অনুমতি বা পরিবেশগত যাচাই ছাড়াই সাবমারসিবল পাম্প বসানো হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, ‘নিরাপদ পানির অভাবে মানুষ পুকুর, খাল বা দূষিত উৎসের পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়বে।’

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘জানুয়ারির পর যখন সেচকাজের জন্য পানি উত্তোলন শুরু হয়, তখন পানির স্তর দ্রুত হারে নামতে থাকে। অবৈধভাবে স্থাপন করা সাবমারসিবল পাম্পগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করলে সুপেয় পানির সাম্প্রতিক সংকট থেকে সাধারণ মানুষ রেহাই পেত।’

উপসহকারী প্রকৌশলী (বিএডিসি) আরিফ হোসেন বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। অবৈধভাবে স্থাপিত সাবমারসিবল পাম্পগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল।’

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হোসেন বলেন, ‘অবৈধ সাবমারসিবল পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬


শুকিয়ে যাচ্ছে টিউবওয়েল, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভোলার চরফ্যাসন উপজেলায় অবৈধ সেচ পাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নেমে গেছে। এতে উপজেলার পাঁচটি এলাকার প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৯৪ জন মানুষ সুপেয় পানির অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কৃষি কাজের জন্য সাবমারসিবল পাম্প দিয়ে অবৈধভাবে মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে হস্তচালিত প্রায় দেড় হাজার নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

উপজেলা বিএডিসি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জিন্নাগড়, মাদ্রাজ, হাজারীগঞ্জ, জাহানপুর ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বেসরকারিভাবে ১০০টি সাবমারসিবল সেচ পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প থেকে কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন আট ঘণ্টায় গড়ে ৮ লাখ ৬ হাজার ৪০০ লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

সুপেয় পানির সংকটে পড়া এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আগে যেখানে হস্তচালিত টিউবওয়েল থেকে সহজেই সুপেয় পানি মিলত, সেখানে এখন কয়েক মিনিট চাপ দিলেও পানি উঠছে না। কৃষিকাজ, মাছের ঘের ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অনেকেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাবমারসিবল পাম্প ব্যবহার করছেন। এসব পাম্প ঘণ্টার পর ঘণ্টা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

গত কয়েক মাস ধরে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবারকে দূর-দূরান্ত থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বাজার এলাকায়ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে কৃষকরা বোরো আবাদের জন্য প্রতিনিয়ত সাবমারসিবল পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করছেন। এছাড়া প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গভীর নলকূপে শক্তিশালী সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করে অতিরিক্ত হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছেন। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং আশপাশের গভীর টিউবওয়েলগুলোতেও পানি উঠছে না। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ তাদের পক্ষে মোটরচালিত পাম্প ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

চর মাদ্রাজ এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে আমাদের বাড়ির টিউবওয়েলে সারা বছর পানি থাকত। এখন এক ফোঁটাও উঠছে না। পাশের বাড়িতে গভীর নলকূপে সাবমারসিবল পাম্প বসানোর পর থেকেই এই সমস্যা শুরু।’

একই অভিযোগ জিন্নাগড় এলাকার গৃহিণী নাসিমা বেগমের। তিনি বলেন, ‘বিলের মধ্যে অবৈধভাবে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করে পানি উত্তোলনের ফলে আমাদের নলকূপে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন ভোরে দূরের একটি নলকূপ থেকে পানি আনতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কষ্টকর। এমনকি অনেক সময় পুকুরের পানি পান করতে হচ্ছে এবং রান্নার কাজে ব্যবহার করতে হচ্ছে।’

সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনকারী জিন্নাগড় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ফারুক কেরানী বলেন, ‘খাল শুকিয়ে যাওয়ায় আমরা বিকল্প পদ্ধতিতে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করতে বাধ্য হয়েছি। বোরো আবাদ বাঁচাতে সাবমারসিবল পাম্প ব্যবহার করছি।’

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই এলাকায় একাধিক গভীর নলকূপ ও শক্তিশালী সাবমারসিবল পাম্প ব্যবহারের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় দেড় হাজার অগভীর টিউবওয়েল অচল হয়ে পড়েছে। চরফ্যাসন পৌরসভাসহ ২১টি ইউনিয়নে ১০ হাজার ৭৩টি হস্তচালিত নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৮৫১টি সচল ও ২২২টি অকেজো রয়েছে। এ পর্যন্ত ২৮টি মেরামত করা হয়েছে। তবে হস্তচালিত নলকূপের সংখ্যা উপজেলা জনস্বাস্থ্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ১০ হাজার ৭৩টি হলেও সরেজমিনে এর পরিমাণ প্রায় চার গুণ। এ উপজেলার ৬০ শতাংশ বাসিন্দা নিজস্ব অর্থায়নে গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন, যার মধ্যে ৪০ শতাংশের নলকূপ অকেজো।

জিন্নাগড় ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি জামাল মোল্লা বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো অনুমতি বা পরিবেশগত যাচাই ছাড়াই সাবমারসিবল পাম্প বসানো হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, ‘নিরাপদ পানির অভাবে মানুষ পুকুর, খাল বা দূষিত উৎসের পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়বে।’

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘জানুয়ারির পর যখন সেচকাজের জন্য পানি উত্তোলন শুরু হয়, তখন পানির স্তর দ্রুত হারে নামতে থাকে। অবৈধভাবে স্থাপন করা সাবমারসিবল পাম্পগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করলে সুপেয় পানির সাম্প্রতিক সংকট থেকে সাধারণ মানুষ রেহাই পেত।’

উপসহকারী প্রকৌশলী (বিএডিসি) আরিফ হোসেন বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। অবৈধভাবে স্থাপিত সাবমারসিবল পাম্পগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছিল।’

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হোসেন বলেন, ‘অবৈধ সাবমারসিবল পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত