ভোলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলার চরফ্যাশন সদর, দুলারহাট, শশীভূষণ ও দক্ষিণ আইচা এলাকায় গড়ে ওঠা ৩৩টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ১৬টির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। বাকি ১৭টি ভাটা অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসন প্রতিবছর অভিযান চালালেও কিছুদিন পরই প্রভাব খাটিয়ে ভাটাগুলো পুনরায় চালু করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ৩৩টি ইটভাটার বেশির ভাগই জনবসতি এলাকায় গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রাত্রী, নাভা, আকন, সোনালী, তেঁতুলিয়া, আব্দুল্লাহ ও মিজান ব্রিকসসহ অন্তত ১৭টি ভাটায় অবৈধ ড্রাম চিমনি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি এসব ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
এদিকে আসলামপুর ইউনিয়নে মেঘনা নদীর তীরবর্তী আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্র বেতুয়া প্রশান্তি পার্কের প্রবেশমুখেই গড়ে উঠেছে অন্তত ছয়টি ইটভাটা। নদী, সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শান্ত নিরিবিলি আবহের কারণে পার্কটি স্থানীয় ও দূরদূরান্তের পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে ইটভাটার ধোঁয়া, ধুলাবালি এবং ভারী যানবাহনের চলাচলে পর্যটন এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এতে একদিকে পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইটভাটার ধোঁয়া ও ছাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কৃষিজমিতে জমে ফসলের ক্ষতি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ধান, শাকসবজি ও ফলগাছ ঠিকমতো বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এছাড়া ভাটায় জ্বালানি হিসেবে গাছ কাটার প্রবণতা থাকায় আশপাশের বনজ সম্পদও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
দক্ষিণ আইচা এলাকার কৃষক বাবুল বলেন, ‘আমি প্রায় দেড় একর জমিতে রবি শস্য করেছি। পাশেই ইটভাটা থাকায় গাছ ঠিকমতো বাড়ে না, অনেক সময় গাছ খিঁচুনি দেয়। ফলে ফসলও ভালো হয় না। আমরা এসব ইটভাটা বন্ধের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই।’
দুলারহাট এলাকার বাসিন্দা হারুন বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে ‘ঢাকা ব্রিকস’ নামে একটি ভাটা রয়েছে। এই ভাটায় কাঠ পোড়ানো হয়। এর ধোঁয়া ও ধুলাবালুর কারণে আমাদের পরিবারের শিশু ও বয়স্করা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সামনে গরমের দিনে এই সমস্যা আরও বাড়বে।’
বেতুয়া প্রশান্তি পার্কে ঘুরতে আসা পর্যটক হাসনাইন বলেন, ‘একটি পর্যটন এলাকার প্রবেশপথই হলো তার প্রথম পরিচয়। সেখানে যদি দূষণ ও বিশৃঙ্খলা থাকে, তাহলে পুরো এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবেশমুখে ইটভাটার কারণে মাটি আনা ও ইট বহনের ট্রাক চলাচলে প্রচুর ধুলাবালি উড়ে, যা পর্যটন এলাকার পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।’
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, ইটভাটার জন্য নির্ধারিত আইন অনুযায়ী জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমির কাছাকাছি ভাটা স্থাপন করা নিষিদ্ধ। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তে পুরোনো পদ্ধতিতে ইট পোড়ানোর কারণে বায়ুদূষণ আরও বাড়ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ুর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অবৈধ ইটভাটা মালিকদের দাবি, তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন এবং খুব শিগগিরই বৈধ ইটভাটার তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে।
অবৈধ ইটভাটার তালিকায় থাকা তেঁতুলিয়া ব্রিকসের মালিক মো. মোশারেফ বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন করেছি। এখনো অনুমোদন পাইনি।’ অনুমোদন ছাড়া কীভাবে ইটভাটা পরিচালনা করছেন- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই আমার ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়।’
চরফ্যাশন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, ‘জনবসতি এলাকায় গড়ে ওঠা ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালুর কারণে শিশু ও বয়স্করা বেশি শ্বাসকষ্ট ও কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।’
ভোলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তোতা মিয়া জানান, অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এমদাদুল হোসেন বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। যেসব ভাটা পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মার্চ ২০২৬
ভোলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশন উপজেলার চরফ্যাশন সদর, দুলারহাট, শশীভূষণ ও দক্ষিণ আইচা এলাকায় গড়ে ওঠা ৩৩টি ইটভাটার মধ্যে মাত্র ১৬টির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। বাকি ১৭টি ভাটা অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। প্রশাসন প্রতিবছর অভিযান চালালেও কিছুদিন পরই প্রভাব খাটিয়ে ভাটাগুলো পুনরায় চালু করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ৩৩টি ইটভাটার বেশির ভাগই জনবসতি এলাকায় গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রাত্রী, নাভা, আকন, সোনালী, তেঁতুলিয়া, আব্দুল্লাহ ও মিজান ব্রিকসসহ অন্তত ১৭টি ভাটায় অবৈধ ড্রাম চিমনি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি এসব ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
এদিকে আসলামপুর ইউনিয়নে মেঘনা নদীর তীরবর্তী আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্র বেতুয়া প্রশান্তি পার্কের প্রবেশমুখেই গড়ে উঠেছে অন্তত ছয়টি ইটভাটা। নদী, সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শান্ত নিরিবিলি আবহের কারণে পার্কটি স্থানীয় ও দূরদূরান্তের পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে ইটভাটার ধোঁয়া, ধুলাবালি এবং ভারী যানবাহনের চলাচলে পর্যটন এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এতে একদিকে পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইটভাটার ধোঁয়া ও ছাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কৃষিজমিতে জমে ফসলের ক্ষতি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ধান, শাকসবজি ও ফলগাছ ঠিকমতো বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এছাড়া ভাটায় জ্বালানি হিসেবে গাছ কাটার প্রবণতা থাকায় আশপাশের বনজ সম্পদও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
দক্ষিণ আইচা এলাকার কৃষক বাবুল বলেন, ‘আমি প্রায় দেড় একর জমিতে রবি শস্য করেছি। পাশেই ইটভাটা থাকায় গাছ ঠিকমতো বাড়ে না, অনেক সময় গাছ খিঁচুনি দেয়। ফলে ফসলও ভালো হয় না। আমরা এসব ইটভাটা বন্ধের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই।’
দুলারহাট এলাকার বাসিন্দা হারুন বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে ‘ঢাকা ব্রিকস’ নামে একটি ভাটা রয়েছে। এই ভাটায় কাঠ পোড়ানো হয়। এর ধোঁয়া ও ধুলাবালুর কারণে আমাদের পরিবারের শিশু ও বয়স্করা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সামনে গরমের দিনে এই সমস্যা আরও বাড়বে।’
বেতুয়া প্রশান্তি পার্কে ঘুরতে আসা পর্যটক হাসনাইন বলেন, ‘একটি পর্যটন এলাকার প্রবেশপথই হলো তার প্রথম পরিচয়। সেখানে যদি দূষণ ও বিশৃঙ্খলা থাকে, তাহলে পুরো এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবেশমুখে ইটভাটার কারণে মাটি আনা ও ইট বহনের ট্রাক চলাচলে প্রচুর ধুলাবালি উড়ে, যা পর্যটন এলাকার পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।’
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, ইটভাটার জন্য নির্ধারিত আইন অনুযায়ী জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমির কাছাকাছি ভাটা স্থাপন করা নিষিদ্ধ। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তে পুরোনো পদ্ধতিতে ইট পোড়ানোর কারণে বায়ুদূষণ আরও বাড়ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ুর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অবৈধ ইটভাটা মালিকদের দাবি, তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন এবং খুব শিগগিরই বৈধ ইটভাটার তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে।
অবৈধ ইটভাটার তালিকায় থাকা তেঁতুলিয়া ব্রিকসের মালিক মো. মোশারেফ বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন করেছি। এখনো অনুমোদন পাইনি।’ অনুমোদন ছাড়া কীভাবে ইটভাটা পরিচালনা করছেন- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছরই আমার ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়।’
চরফ্যাশন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, ‘জনবসতি এলাকায় গড়ে ওঠা ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালুর কারণে শিশু ও বয়স্করা বেশি শ্বাসকষ্ট ও কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।’
ভোলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তোতা মিয়া জানান, অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এমদাদুল হোসেন বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। যেসব ভাটা পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’

আপনার মতামত লিখুন