একসময় দেশের গম উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল ছিল ঠাকুরগাঁও। জেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে গমের সোনালি শিষে ভরে উঠত কৃষিজমি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। উচ্চমূল্যের ফসল ভুট্টার সঙ্গে প্রতিযোগিতা, শ্রমিক সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ অঞ্চলের অনেক কৃষক এখন গম চাষ থেকে সরে আসছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। তবে বাস্তবে আবাদ হয়েছে মাত্র ২১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৪৫ টন। কিন্তু আবাদ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একসময় গম উৎপাদনের বিচারে ঠাকুরগাঁও জেলায় দেশের মোট গমের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আবাদ হতো। কৃষি বিভাগ বলছে, বর্তমানে গমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ধীরে ধীরে এই ফসল চাষে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
কৃষকেরা জানান, গম চাষে খরচ বেশি, অথবা লাভ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে ভুট্টা, ধান কিংবা সবজিতে লাভ বেশি হওয়ায় অনেকেই জমিতে গমের পরিবর্তে সেই সব ফসল চাষ করছেন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালান্দর ইউনিয়নের কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, "গম কাটার লোকজন কেউ করতে চায় না। বাজারে ভালো বীজও পাওয়া যায় না। ৪০ শতক জমিতে গম লাগিয়েছিলাম। শ্রমিক না পেয়ে এখন বাড়ির সবাই মিলে মাঠে নেমেছি গম কাটতে।"
সদর উপজেলার জামিরুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক একই সমস্যার কথা জানিয়ে বলেন, ‘গম চাষ বাদ না দিয়ে উপায় কী? এখন তো গমের ফলনও ভালো হয় না। কাটা-মাড়াইয়ের লোকও পাওয়া যায় না। এ জন্য গমের জমিতে ভুট্টা লাগিয়ে দিয়েছি।’
একই এলাকার কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে গম চাষ করতেই ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিক্রি করলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া যায় না। বিঘাপ্রতি প্রায় ৫ হাজার টাকা লোকসান হয়। এ জন্য ওই জমিতে এখন ধান লাগাচ্ছি।’
শুধু গম নয়, আগের জনপ্রিয় ফসল পাটের আবাদও কমে গেছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকেরা। কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে পাট কেটে ওই জমিতে গম করতাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পাটের দাম নেই, গমেরও দাম নেই। তাই এই দুই ফসল বাদ দিয়ে এখন ওই জমিতে মিষ্টিকুমড়া লাগাচ্ছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, গম চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে কয়েক বছর ধরে উঠান বৈঠক, ব্লক প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রণোদনা হিসেবে কৃষকদের মধ্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হচ্ছে। তবু গমের আবাদ বাড়ানো যাচ্ছে না।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক আলমগীর কবির বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা কৃষকদের সব সময় গম চাষে উৎসাহিত করছি। বীজ, সারসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মাড়াইয়ের সমস্যা, ইঁদুরের উপদ্রব, শ্রমিক সংকট এবং অন্যান্য ফসলে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক কৃষক গম চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ফলন কম এবং লাভ কম হওয়ায় কৃষকেরা তুলনামূলক উচ্চমূল্যের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

রোববার, ১৫ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মার্চ ২০২৬
একসময় দেশের গম উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল ছিল ঠাকুরগাঁও। জেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে গমের সোনালি শিষে ভরে উঠত কৃষিজমি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। উচ্চমূল্যের ফসল ভুট্টার সঙ্গে প্রতিযোগিতা, শ্রমিক সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ অঞ্চলের অনেক কৃষক এখন গম চাষ থেকে সরে আসছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। তবে বাস্তবে আবাদ হয়েছে মাত্র ২১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৪৫ টন। কিন্তু আবাদ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একসময় গম উৎপাদনের বিচারে ঠাকুরগাঁও জেলায় দেশের মোট গমের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আবাদ হতো। কৃষি বিভাগ বলছে, বর্তমানে গমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ধীরে ধীরে এই ফসল চাষে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
কৃষকেরা জানান, গম চাষে খরচ বেশি, অথবা লাভ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে ভুট্টা, ধান কিংবা সবজিতে লাভ বেশি হওয়ায় অনেকেই জমিতে গমের পরিবর্তে সেই সব ফসল চাষ করছেন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালান্দর ইউনিয়নের কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, "গম কাটার লোকজন কেউ করতে চায় না। বাজারে ভালো বীজও পাওয়া যায় না। ৪০ শতক জমিতে গম লাগিয়েছিলাম। শ্রমিক না পেয়ে এখন বাড়ির সবাই মিলে মাঠে নেমেছি গম কাটতে।"
সদর উপজেলার জামিরুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক একই সমস্যার কথা জানিয়ে বলেন, ‘গম চাষ বাদ না দিয়ে উপায় কী? এখন তো গমের ফলনও ভালো হয় না। কাটা-মাড়াইয়ের লোকও পাওয়া যায় না। এ জন্য গমের জমিতে ভুট্টা লাগিয়ে দিয়েছি।’
একই এলাকার কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে গম চাষ করতেই ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিক্রি করলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া যায় না। বিঘাপ্রতি প্রায় ৫ হাজার টাকা লোকসান হয়। এ জন্য ওই জমিতে এখন ধান লাগাচ্ছি।’
শুধু গম নয়, আগের জনপ্রিয় ফসল পাটের আবাদও কমে গেছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকেরা। কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে পাট কেটে ওই জমিতে গম করতাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পাটের দাম নেই, গমেরও দাম নেই। তাই এই দুই ফসল বাদ দিয়ে এখন ওই জমিতে মিষ্টিকুমড়া লাগাচ্ছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, গম চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে কয়েক বছর ধরে উঠান বৈঠক, ব্লক প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রণোদনা হিসেবে কৃষকদের মধ্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হচ্ছে। তবু গমের আবাদ বাড়ানো যাচ্ছে না।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক আলমগীর কবির বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা কৃষকদের সব সময় গম চাষে উৎসাহিত করছি। বীজ, সারসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মাড়াইয়ের সমস্যা, ইঁদুরের উপদ্রব, শ্রমিক সংকট এবং অন্যান্য ফসলে বেশি লাভ হওয়ায় অনেক কৃষক গম চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ফলন কম এবং লাভ কম হওয়ায় কৃষকেরা তুলনামূলক উচ্চমূল্যের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

আপনার মতামত লিখুন