বরেন্দ্র বিদ্রোহ বা কৈবর্ত বিদ্রোহ বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। কৈবর্ত বিদ্রোহ ছিল সামন্ত রাজা দিব্যের নেতৃত্বে পাল রাজাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি বিপ্লবী আন্দোলন। তৎকালীন পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের (১০৭০-১০৭৫) শাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়।
দশম-একাদশ শতকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ‘মাৎস্যন্যায়’ প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে সেখানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এই চরম অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন সামন্তশক্তি একত্রিত হয়। তাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই বাংলার উত্তরাংশে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে সামন্ত রাজা দিব্য বরেন্দ্রভ‚মিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
পাল আমলের সামন্ত রাজা দিব্য বিভিন্ন সামন্তরাজাদের একত্রিত হয়ে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানান। সামন্তরা তার ডাকে সাড়া দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বাংলার বরেন্দ্র অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রাজা দ্বিতীয় মহীপাল বিদ্রোহ দমন করতে এসে যুদ্ধে নিহত হন। ফলে পাল সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
দিব্য তার দক্ষ নেতৃত্বে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বরেন্দ্রে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। দিব্যের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তার ছোট ভাই রুদোক এবং পরে রুদোকের পুত্র ভীম (বরেন্দ্র রাজা)। ভীম নিজেকে একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রায় ৩০ বছর বরেন্দ্র শাসন করেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বরেন্দ্রকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
ভীম সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন এবং সেই অর্থ সাধারণ প্রজাদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। বর্তমান বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নে অবস্থিত দিবর দিঘি ও দিব্য বিজয়স্তম্ভ আজও এই রাজবংশের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতেও বীর দিব্য ও ভীমের কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিস্বরূপ একটি বিজয়স্তম্ভ ছিল, যা পরবর্তীকালে পাল রাজারা পুনরায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর ভেঙে ফেলে।
রাজা ভীমের নানা কীর্তির মধ্যে ‘ভীমের সাগর’, ‘ভীমের জাঙ্গাল’, ‘ভীমের ডাইং’ ও ‘ভীমের পান্টি’ উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব স্থাপনার নিদর্শন এখনও পাওয়া যায়।
রামপাল সিংহাসনে আরোহণ করার পর ভীমের জনপ্রিয়তা, দক্ষতা ও উদারতা দেখে ভীত হয়ে পড়েন। তখন পাল রাজাদের ক্ষমতা সম্ভবত ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী বদ্বীপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু শক্তিশালী রাজা ভীমের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার সাহস রামপালের ছিল না। ভূমি হারানোর আশঙ্কায় তিনি প্রতিবেশী ও সামন্তরাজাদের বিপুল অর্থ ও ভূমি দান করেন এবং তাদের সহায়তায় ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
ভীম বন্দী হওয়ার পর তার বিশ্বস্ত সহযোগী হরি পরাজিত সৈন্যদের একত্রিত করে রামপালের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন। হরির নেতৃত্বে যখন সেনারা প্রায় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন রামপাল বিপুল অর্থ বিতরণ করে তাদের একাংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিতে সক্ষম হন। এর ফলে বরেন্দ্রের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং অঞ্চলটি আবার পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
বিদ্রোহীরা যেন আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য পাল রাজারা ভীমের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে। তার পরিবারের সদস্যদের তার সামনেই হত্যা করা হয় এবং পরে ভীমকেও হত্যা করা হয়।
এই বিদ্রোহ সম্পর্কে দার্শনিক ও গবেষক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহের সঙ্গে সিদ্ধ আন্দোলনের সম্পর্ক ছিল এবং চুরাশি সিদ্ধের কাহিনি বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, কৈবর্তরা যদি পরাজিত না হতেন, তবে বাংলায় একটি শক্তিশালী দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারত।
ঐতিহাসিক রায়োসুকে ফুরুই উল্লেখ করেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহ বাংলার আদি মধ্যযুগের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিদ্রোহ সাময়িকভাবে পালদের তাদের পৈতৃক অঞ্চল বরেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং অধস্তন শাসকদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয়। এর ফলেই পরবর্তীকালে পাল শক্তির পতন এবং সেনাদের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়।
বরেন্দ্র অঞ্চলের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন। এই অঞ্চলে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প বাংলার ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা নকশাযুক্ত ফলক ও মূর্তিতে কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ, সামাজিক জীবন এবং দেব-দেবীর কাহিনি ফুটে ওঠে। দিনাজপুর ও নওগাঁ জেলা এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
একইভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের মৃৎশিল্প হাজার বছরের প্রাচীন লোকশিল্প। অতীতে মাটির কলস, হাঁড়ি, পুতুল ও পূজার সামগ্রী তৈরি হতো। কিন্তু আধুনিকতার আগ্রাসন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির মূল উৎস আদিবাসী সমাজ। সাঁওতাল, ওরাঁও ও মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর জীবনপ্রণালী প্রকৃতিনির্ভর ও কৃষিভিত্তিক। তাদের সমাজব্যবস্থা ‘মাঝি-পরগনা’ বা ‘পাঁচ মোড়ল’ দ্বারা পরিচালিত হয়। সোহরাই, বাহা ও কারাম তাদের প্রধান উৎসব। এসব উৎসবে নৃত্য-গীতি ও বাদ্যের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি প্রকাশ পায়।
এছাড়া বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে গম্ভীরা ও আলকাপ গানও জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতি।
কিন্তু আজ বৈচিত্র্যময় বরেন্দ্র সংস্কৃতি নানা ধর্মান্ধ রাজনৈতিক প্রবণতার চাপে সংকুচিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন সংস্কৃতিকে ‘বিধর্মীয়’ আচার হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। ফলে কৈবর্ত বিদ্রোহের সেই সংগ্রামী ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অথচ কয়েক দশক আগেও এই অঞ্চলের মানুষ সংস্কৃতিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করত না।
তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতি রক্ষায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনুশীলন আজ অত্যন্ত জরুরি।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মার্চ ২০২৬
বরেন্দ্র বিদ্রোহ বা কৈবর্ত বিদ্রোহ বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। কৈবর্ত বিদ্রোহ ছিল সামন্ত রাজা দিব্যের নেতৃত্বে পাল রাজাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি বিপ্লবী আন্দোলন। তৎকালীন পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের (১০৭০-১০৭৫) শাসনের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়।
দশম-একাদশ শতকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ‘মাৎস্যন্যায়’ প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে সেখানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এই চরম অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন সামন্তশক্তি একত্রিত হয়। তাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই বাংলার উত্তরাংশে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে সামন্ত রাজা দিব্য বরেন্দ্রভ‚মিতে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
পাল আমলের সামন্ত রাজা দিব্য বিভিন্ন সামন্তরাজাদের একত্রিত হয়ে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানান। সামন্তরা তার ডাকে সাড়া দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বাংলার বরেন্দ্র অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রাজা দ্বিতীয় মহীপাল বিদ্রোহ দমন করতে এসে যুদ্ধে নিহত হন। ফলে পাল সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
দিব্য তার দক্ষ নেতৃত্বে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বরেন্দ্রে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। দিব্যের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তার ছোট ভাই রুদোক এবং পরে রুদোকের পুত্র ভীম (বরেন্দ্র রাজা)। ভীম নিজেকে একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রায় ৩০ বছর বরেন্দ্র শাসন করেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বরেন্দ্রকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
ভীম সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন এবং সেই অর্থ সাধারণ প্রজাদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। বর্তমান বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নে অবস্থিত দিবর দিঘি ও দিব্য বিজয়স্তম্ভ আজও এই রাজবংশের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতেও বীর দিব্য ও ভীমের কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিস্বরূপ একটি বিজয়স্তম্ভ ছিল, যা পরবর্তীকালে পাল রাজারা পুনরায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর ভেঙে ফেলে।
রাজা ভীমের নানা কীর্তির মধ্যে ‘ভীমের সাগর’, ‘ভীমের জাঙ্গাল’, ‘ভীমের ডাইং’ ও ‘ভীমের পান্টি’ উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব স্থাপনার নিদর্শন এখনও পাওয়া যায়।
রামপাল সিংহাসনে আরোহণ করার পর ভীমের জনপ্রিয়তা, দক্ষতা ও উদারতা দেখে ভীত হয়ে পড়েন। তখন পাল রাজাদের ক্ষমতা সম্ভবত ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী বদ্বীপ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু শক্তিশালী রাজা ভীমের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার সাহস রামপালের ছিল না। ভূমি হারানোর আশঙ্কায় তিনি প্রতিবেশী ও সামন্তরাজাদের বিপুল অর্থ ও ভূমি দান করেন এবং তাদের সহায়তায় ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
ভীম বন্দী হওয়ার পর তার বিশ্বস্ত সহযোগী হরি পরাজিত সৈন্যদের একত্রিত করে রামপালের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন। হরির নেতৃত্বে যখন সেনারা প্রায় বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন রামপাল বিপুল অর্থ বিতরণ করে তাদের একাংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিতে সক্ষম হন। এর ফলে বরেন্দ্রের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং অঞ্চলটি আবার পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
বিদ্রোহীরা যেন আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য পাল রাজারা ভীমের প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে। তার পরিবারের সদস্যদের তার সামনেই হত্যা করা হয় এবং পরে ভীমকেও হত্যা করা হয়।
এই বিদ্রোহ সম্পর্কে দার্শনিক ও গবেষক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহের সঙ্গে সিদ্ধ আন্দোলনের সম্পর্ক ছিল এবং চুরাশি সিদ্ধের কাহিনি বিদ্রোহীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, কৈবর্তরা যদি পরাজিত না হতেন, তবে বাংলায় একটি শক্তিশালী দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারত।
ঐতিহাসিক রায়োসুকে ফুরুই উল্লেখ করেছেন, কৈবর্ত বিদ্রোহ বাংলার আদি মধ্যযুগের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিদ্রোহ সাময়িকভাবে পালদের তাদের পৈতৃক অঞ্চল বরেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং অধস্তন শাসকদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয়। এর ফলেই পরবর্তীকালে পাল শক্তির পতন এবং সেনাদের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়।
বরেন্দ্র অঞ্চলের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন। এই অঞ্চলে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প বাংলার ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা নকশাযুক্ত ফলক ও মূর্তিতে কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ, সামাজিক জীবন এবং দেব-দেবীর কাহিনি ফুটে ওঠে। দিনাজপুর ও নওগাঁ জেলা এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
একইভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের মৃৎশিল্প হাজার বছরের প্রাচীন লোকশিল্প। অতীতে মাটির কলস, হাঁড়ি, পুতুল ও পূজার সামগ্রী তৈরি হতো। কিন্তু আধুনিকতার আগ্রাসন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির মূল উৎস আদিবাসী সমাজ। সাঁওতাল, ওরাঁও ও মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর জীবনপ্রণালী প্রকৃতিনির্ভর ও কৃষিভিত্তিক। তাদের সমাজব্যবস্থা ‘মাঝি-পরগনা’ বা ‘পাঁচ মোড়ল’ দ্বারা পরিচালিত হয়। সোহরাই, বাহা ও কারাম তাদের প্রধান উৎসব। এসব উৎসবে নৃত্য-গীতি ও বাদ্যের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি প্রকাশ পায়।
এছাড়া বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে গম্ভীরা ও আলকাপ গানও জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতি।
কিন্তু আজ বৈচিত্র্যময় বরেন্দ্র সংস্কৃতি নানা ধর্মান্ধ রাজনৈতিক প্রবণতার চাপে সংকুচিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন সংস্কৃতিকে ‘বিধর্মীয়’ আচার হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। ফলে কৈবর্ত বিদ্রোহের সেই সংগ্রামী ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অথচ কয়েক দশক আগেও এই অঞ্চলের মানুষ সংস্কৃতিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করত না।
তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতি রক্ষায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনুশীলন আজ অত্যন্ত জরুরি।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন