মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দুবাইভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’- এর কাছ থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল ও ২৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন (অকটেন) কেনার প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এই জ্বালানি তেল আমদানিতে মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৬ হাজার ৮৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৪৬ কোটি ৭১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে প্রস্তুত করা একটি সারসংক্ষেপে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম আইন অনুযায়ী দেশে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি, রপ্তানি, মজুদ, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণন ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)’-এর ওপর ন্যস্ত রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক সভার সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৬ সাল থেকে বিপিসি আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ৫০ শতাংশ সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করে আসছে।
বর্তমানে বিপিসি বিভিন্ন গ্রেডের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পাশাপাশি জি-টু-জি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের ‘সৌদি আরামকো’ থেকে ‘আরবিয়ান লাইট ক্রুড’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক)’ থেকে ‘মুরবান ক্রুড অয়েল’ আমদানি করে। এসব অপরিশোধিত তেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-এ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বড় অংশই আমদানিনির্ভর।
সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ১ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং দামের অস্থিরতা বাড়ে।
পরিস্থিতির প্রভাবে অনেক জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ তাদের রপ্তানি সীমিত বা স্থগিত করার উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে কাতার ও ওমান থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিও ব্যাহত হতে শুরু করে। এতে ইউরোপীয় বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যায় এবং বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বিপিসির অপরিশোধিত তেল আমদানিও। অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বিলম্ব হলে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তখন সেই ঘাটতি পূরণ করতে অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, গত ৯ মার্চ দেশে ডিজেলের প্রারম্ভিক মজুদ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন, যা দিয়ে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মার্চ ও এপ্রিল মাসের পার্সেল সরবরাহে প্রাথমিকভাবে সম্মত হলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। মার্চ মাসে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ১৭টি এলসি খোলা হয়। এর মধ্যে চারটি পার্সেলের মাধ্যমে দেশে তেল সরবরাহ হয়েছে এবং ছয়টি পার্সেল সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকি সাতটি পার্সেলের বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে এপ্রিল মাসের জন্য ১৫টি এলসি খোলা হলেও এর মধ্যে ১৩টি পার্সেল সরবরাহে প্রাথমিক সম্মতি মিলেছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি পার্সেলের সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।
এ অবস্থায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে বিপিসি। এর ধারাবাহিকতায় গত ৬ মার্চ পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
দুবাইভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি সৌদি রাজপরিবারের মালিকানাধীন জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশ ও ইউরোপ অঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আসছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে বা কোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনস্বার্থে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পণ্য সংগ্রহ করা যায়। সেই বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছে মূল্যসংবলিত প্রস্তাব আহ্বান করা হলে তারা গত ৯ মার্চ আনুষ্ঠানিক দরপ্রস্তাব জমা দেয়। প্রস্তাবটির বৈধতা ছিল তিন কার্যদিবস, অর্থাৎ ১২ মার্চ পর্যন্ত।
প্রস্তাব অনুযায়ী পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে পণ্য লোডিংয়ের তারিখে প্রকাশিত প্ল্যাটস (আরব উপসাগর) সূচক মূল্যের সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে ৩ মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম যোগ করে।
প্রস্তাব পাওয়ার পর বিপিসি একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে। কমিটি প্রস্তাবিত জ্বালানি তেলের মান ও স্পেসিফিকেশন পর্যালোচনা করে দেখতে পায় যে তা বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে বিপিসি ৫০ পিপিএম সালফার সীমার মধ্যে ডিজেল আমদানি করে থাকে।
পরে ৯ মার্চ প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোসিয়েশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পণ্যের মূল্য, পরিশোধ পদ্ধতি, পার্সেল সাইজ, ডেলিভারি সূচি এবং ডেমারেজ দাবিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়।
সর্বশেষ ৯ মার্চ প্ল্যাটসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ডিজেলের মূল্য ছিল প্রতি মেট্রিক টন ১৭৯ দশমিক ০৬ মার্কিন ডলার এবং গ্যাসোলিনের মূল্য ১৪১ দশমিক ১৪ মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে ৩ ডলার প্রিমিয়াম যোগ করলে ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৩ কোটি ৫৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৬৬৬ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টাকা।
একইভাবে ২৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন আমদানিতে ব্যয় হবে প্রায় ৩ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ১শ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৮০ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।সব মিলিয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানিতে মোট সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৬ হাজার ৮৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৪৬ কোটি ৭১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
তবে প্ল্যাটসে প্রকাশিত মূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে এই ব্যয় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক দরপত্রে এর আগে ডিজেলের জন্য প্রাপ্ত প্রিমিয়াম ছিল প্রতি ব্যারেলে ৪.৭২ থেকে ৪.৭৮ মার্কিন ডলার এবং জি-টু-জি আলোচনায় সর্বনিম্ন প্রিমিয়াম পাওয়া গিয়েছিল ৫.৩৩ ডলার। অকটেনের ক্ষেত্রে সেই প্রিমিয়াম ছিল প্রায় ৬.৮০ ডলার পর্যন্ত। সে তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ ডলার প্রিমিয়ামে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাবকে প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
যদিও পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন বিপিসির তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী নয়, তবুও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির আওতায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিপিসির পরিচালনা পর্ষদের ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ১০১৯তম সভায় এই ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল অক্ষুণ্ণ রাখা এবং পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপটি ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছে এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দুবাইভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’- এর কাছ থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল ও ২৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন (অকটেন) কেনার প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এই জ্বালানি তেল আমদানিতে মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৬ হাজার ৮৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৪৬ কোটি ৭১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে প্রস্তুত করা একটি সারসংক্ষেপে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম আইন অনুযায়ী দেশে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি, রপ্তানি, মজুদ, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণন ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)’-এর ওপর ন্যস্ত রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির এক সভার সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৬ সাল থেকে বিপিসি আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ৫০ শতাংশ সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করে আসছে।
বর্তমানে বিপিসি বিভিন্ন গ্রেডের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পাশাপাশি জি-টু-জি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের ‘সৌদি আরামকো’ থেকে ‘আরবিয়ান লাইট ক্রুড’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক)’ থেকে ‘মুরবান ক্রুড অয়েল’ আমদানি করে। এসব অপরিশোধিত তেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-এ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বড় অংশই আমদানিনির্ভর।
সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ১ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং দামের অস্থিরতা বাড়ে।
পরিস্থিতির প্রভাবে অনেক জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ তাদের রপ্তানি সীমিত বা স্থগিত করার উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে কাতার ও ওমান থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিও ব্যাহত হতে শুরু করে। এতে ইউরোপীয় বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যায় এবং বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বিপিসির অপরিশোধিত তেল আমদানিও। অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বিলম্ব হলে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তখন সেই ঘাটতি পূরণ করতে অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, গত ৯ মার্চ দেশে ডিজেলের প্রারম্ভিক মজুদ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন, যা দিয়ে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মার্চ ও এপ্রিল মাসের পার্সেল সরবরাহে প্রাথমিকভাবে সম্মত হলেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। মার্চ মাসে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ১৭টি এলসি খোলা হয়। এর মধ্যে চারটি পার্সেলের মাধ্যমে দেশে তেল সরবরাহ হয়েছে এবং ছয়টি পার্সেল সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকি সাতটি পার্সেলের বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে এপ্রিল মাসের জন্য ১৫টি এলসি খোলা হলেও এর মধ্যে ১৩টি পার্সেল সরবরাহে প্রাথমিক সম্মতি মিলেছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি পার্সেলের সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে।
এ অবস্থায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে বিপিসি। এর ধারাবাহিকতায় গত ৬ মার্চ পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
দুবাইভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি সৌদি রাজপরিবারের মালিকানাধীন জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশ ও ইউরোপ অঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে আসছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে বা কোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনস্বার্থে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে পণ্য সংগ্রহ করা যায়। সেই বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছে মূল্যসংবলিত প্রস্তাব আহ্বান করা হলে তারা গত ৯ মার্চ আনুষ্ঠানিক দরপ্রস্তাব জমা দেয়। প্রস্তাবটির বৈধতা ছিল তিন কার্যদিবস, অর্থাৎ ১২ মার্চ পর্যন্ত।
প্রস্তাব অনুযায়ী পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে পণ্য লোডিংয়ের তারিখে প্রকাশিত প্ল্যাটস (আরব উপসাগর) সূচক মূল্যের সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে ৩ মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম যোগ করে।
প্রস্তাব পাওয়ার পর বিপিসি একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে। কমিটি প্রস্তাবিত জ্বালানি তেলের মান ও স্পেসিফিকেশন পর্যালোচনা করে দেখতে পায় যে তা বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে বিপিসি ৫০ পিপিএম সালফার সীমার মধ্যে ডিজেল আমদানি করে থাকে।
পরে ৯ মার্চ প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোসিয়েশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পণ্যের মূল্য, পরিশোধ পদ্ধতি, পার্সেল সাইজ, ডেলিভারি সূচি এবং ডেমারেজ দাবিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়।
সর্বশেষ ৯ মার্চ প্ল্যাটসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ডিজেলের মূল্য ছিল প্রতি মেট্রিক টন ১৭৯ দশমিক ০৬ মার্কিন ডলার এবং গ্যাসোলিনের মূল্য ১৪১ দশমিক ১৪ মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে ৩ ডলার প্রিমিয়াম যোগ করলে ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৩ কোটি ৫৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৬৬৬ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টাকা।
একইভাবে ২৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন আমদানিতে ব্যয় হবে প্রায় ৩ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ১শ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৮০ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।সব মিলিয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানিতে মোট সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১৬ কোটি ৬৮ লাখ ৬ হাজার ৮৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৪৬ কোটি ৭১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
তবে প্ল্যাটসে প্রকাশিত মূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে এই ব্যয় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক দরপত্রে এর আগে ডিজেলের জন্য প্রাপ্ত প্রিমিয়াম ছিল প্রতি ব্যারেলে ৪.৭২ থেকে ৪.৭৮ মার্কিন ডলার এবং জি-টু-জি আলোচনায় সর্বনিম্ন প্রিমিয়াম পাওয়া গিয়েছিল ৫.৩৩ ডলার। অকটেনের ক্ষেত্রে সেই প্রিমিয়াম ছিল প্রায় ৬.৮০ ডলার পর্যন্ত। সে তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ ডলার প্রিমিয়ামে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাবকে প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
যদিও পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন বিপিসির তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী নয়, তবুও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির আওতায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিপিসির পরিচালনা পর্ষদের ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ১০১৯তম সভায় এই ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল অক্ষুণ্ণ রাখা এবং পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপটি ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছে এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন