সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যাদুকাটা নদীর তীরে


প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ
প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬

ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যাদুকাটা নদীর তীরে
ছবি : সংবাদ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর তীরে এখন যেন ধর্ম-বর্ণের ব্যবধান ঘুচে গেছে। একই প্রান্তরে, একই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের পণাতীর্থ স্নান উৎসব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের শাহ আরেফিন (রহ.)-এর ওরস—দুই আয়োজন মিলেমিশে তৈরি করেছে সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন।

প্রায় ৭২০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পণাতীর্থ স্নানযাত্রা ও ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর ওরসকে ঘিরে প্রতি বছরের মতো এবারও দুই সম্প্রদায়ের মানুষ এক কাতারে মিলিত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার নর-নারী এখন যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থান করছেন।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাপ্রভু শ্রী অদ্বৈত্য আচার্যের জন্মধাম রাজারগাঁও (নবগ্রাম) আখড়াবাড়ী সংলগ্ন যাদুকাটা নদীতে পণাতীর্থ স্নানযাত্রা আগামীকাল ১৭ মার্চ ভোর ৫টা ৫৩ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড থেকে সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে এ স্নান সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

অপরদিকে একই সময়ে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর মহাপবিত্র ওরস উদযাপনের কথা থাকলেও পবিত্র শবে কদর উপলক্ষে তা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি। ১৬ মার্চ দিবাগত রাত পবিত্র শবে কদর হওয়ায় তিন দিনব্যাপী এ ওরস উদযাপন এবার স্থগিত করা হয়েছে। তবে ভক্ত-অনুরাগীদের অনেকেই মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়েছেন।

হিন্দু শাস্ত্রের মহাপুরুষ শ্রী অদ্বৈত্য মহাপ্রভুর আখড়াবাড়ী ও জন্মধাম সংরক্ষণ ও সংস্কার কার্যনিবাহী কমিটির সভাপতি বাবু করুনাসিন্ধু চৌধুরী বলেন, ‘দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ স্নানযাত্রার মুখ্য সময় আগামীকাল। এরই মধ্যে সকল প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম ভাইদের সঙ্গেও আমাদের আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। ওরস না হলেও অনেক মুসলমান ভাই আমাদের এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।’

এদিকে গঙ্গাস্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন)-এর উদ্যোগে সপ্তাহব্যাপী মঙ্গল আরতি, ভজন, লীলা কীর্তন, বৈদিক নাটক, গঙ্গাপূজা এবং দেশের বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চশিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর ওরস উদযাপন কমিটির সহসভাপতি ও বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘পবিত্র শবে কদর ও ঈদুল ফিতরের কারণে বিগত দুই বছরের মতো এ বছরেও ওরস বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু এতে আমাদের হিন্দু ভাইদের উৎসবে অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। তারাও আমাদের উৎসবে অংশ নেন, আমরাও তাদের উৎসবে অংশ নেই—এটাই এ এলাকার ঐতিহ্য।’

স্থানীয় সাংবাদিক ও শাহ আরেফিন মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলম সাব্বির বলেন, ‘পবিত্র শবে কদর ও মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ওরস বন্ধ ঘোষণা করা হলেও অনেক ভক্ত-আশেকান এসেছেন মাজার প্রাঙ্গণে। আর হিন্দু ভাইদের স্নানযাত্রায় অনেক মুসলমান স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন। এটাই আমাদের সুনামগঞ্জের চিরায়ত সম্প্রীতির চিত্র।’

গঙ্গাস্নানযাত্রা উপলক্ষে এবছর দেশ-বিদেশের অন্তত চার লাখ পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটবে বলে জানিয়েছে আয়োজক কমিটি। এ আয়োজনকে ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। পুরো এলাকায় ৪৫০ জন পুলিশ মোতায়েন করেছে জেলা প্রশাসন। তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, পণাতীর্থ স্নানযাত্রাকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে গোটা এলাকা।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ‘প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্নানযাত্রাকে সফল করতে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের এ মিলনমেলা যেন নির্বিঘ্নে উদযাপিত হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। যাদুকাটা নদীর তীরে প্রতিবছরই ফিরে আসে সম্প্রীতির এ বার্তা নিয়ে পণাতীর্থ স্নান ও শাহ আরেফিনের ওরসের মিলনমেলা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬


ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যাদুকাটা নদীর তীরে

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মার্চ ২০২৬

featured Image

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর তীরে এখন যেন ধর্ম-বর্ণের ব্যবধান ঘুচে গেছে। একই প্রান্তরে, একই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের পণাতীর্থ স্নান উৎসব ও মুসলিম সম্প্রদায়ের শাহ আরেফিন (রহ.)-এর ওরস—দুই আয়োজন মিলেমিশে তৈরি করেছে সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন।

প্রায় ৭২০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পণাতীর্থ স্নানযাত্রা ও ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর ওরসকে ঘিরে প্রতি বছরের মতো এবারও দুই সম্প্রদায়ের মানুষ এক কাতারে মিলিত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার নর-নারী এখন যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থান করছেন।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাপ্রভু শ্রী অদ্বৈত্য আচার্যের জন্মধাম রাজারগাঁও (নবগ্রাম) আখড়াবাড়ী সংলগ্ন যাদুকাটা নদীতে পণাতীর্থ স্নানযাত্রা আগামীকাল ১৭ মার্চ ভোর ৫টা ৫৩ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড থেকে সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে এ স্নান সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

অপরদিকে একই সময়ে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর মহাপবিত্র ওরস উদযাপনের কথা থাকলেও পবিত্র শবে কদর উপলক্ষে তা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি। ১৬ মার্চ দিবাগত রাত পবিত্র শবে কদর হওয়ায় তিন দিনব্যাপী এ ওরস উদযাপন এবার স্থগিত করা হয়েছে। তবে ভক্ত-অনুরাগীদের অনেকেই মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়েছেন।

হিন্দু শাস্ত্রের মহাপুরুষ শ্রী অদ্বৈত্য মহাপ্রভুর আখড়াবাড়ী ও জন্মধাম সংরক্ষণ ও সংস্কার কার্যনিবাহী কমিটির সভাপতি বাবু করুনাসিন্ধু চৌধুরী বলেন, ‘দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ স্নানযাত্রার মুখ্য সময় আগামীকাল। এরই মধ্যে সকল প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম ভাইদের সঙ্গেও আমাদের আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। ওরস না হলেও অনেক মুসলমান ভাই আমাদের এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।’

এদিকে গঙ্গাস্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন)-এর উদ্যোগে সপ্তাহব্যাপী মঙ্গল আরতি, ভজন, লীলা কীর্তন, বৈদিক নাটক, গঙ্গাপূজা এবং দেশের বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চশিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর ওরস উদযাপন কমিটির সহসভাপতি ও বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘পবিত্র শবে কদর ও ঈদুল ফিতরের কারণে বিগত দুই বছরের মতো এ বছরেও ওরস বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু এতে আমাদের হিন্দু ভাইদের উৎসবে অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। তারাও আমাদের উৎসবে অংশ নেন, আমরাও তাদের উৎসবে অংশ নেই—এটাই এ এলাকার ঐতিহ্য।’

স্থানীয় সাংবাদিক ও শাহ আরেফিন মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলম সাব্বির বলেন, ‘পবিত্র শবে কদর ও মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার জন্য ওরস বন্ধ ঘোষণা করা হলেও অনেক ভক্ত-আশেকান এসেছেন মাজার প্রাঙ্গণে। আর হিন্দু ভাইদের স্নানযাত্রায় অনেক মুসলমান স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন। এটাই আমাদের সুনামগঞ্জের চিরায়ত সম্প্রীতির চিত্র।’

গঙ্গাস্নানযাত্রা উপলক্ষে এবছর দেশ-বিদেশের অন্তত চার লাখ পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটবে বলে জানিয়েছে আয়োজক কমিটি। এ আয়োজনকে ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। পুরো এলাকায় ৪৫০ জন পুলিশ মোতায়েন করেছে জেলা প্রশাসন। তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, পণাতীর্থ স্নানযাত্রাকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে গোটা এলাকা।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ‘প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্নানযাত্রাকে সফল করতে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের এ মিলনমেলা যেন নির্বিঘ্নে উদযাপিত হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। যাদুকাটা নদীর তীরে প্রতিবছরই ফিরে আসে সম্প্রীতির এ বার্তা নিয়ে পণাতীর্থ স্নান ও শাহ আরেফিনের ওরসের মিলনমেলা।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত