রমজান মাসের এক মাসব্যাপী আত্মসংযম ও সিয়াম সাধনার সমাপ্তিতে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে সমাগত হয় ঈদুল ফিতর। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং আত্মিক শুদ্ধি, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক সহমর্মিতার এক গভীর ও ব্যঞ্জনাময় প্রতীক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন আমরা ঈদের আনন্দ নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, অস্থির এবং কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে ইরান, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিমুখী উত্তেজনা ও সংঘাতের ছায়া আজ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারে দাঁড় করিয়েছে। এই টালমাটাল বৈশ্বিক বাস্তবতায় ঈদুল ফিতরের অন্তর্নিহিত চেতনা-শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সাম্যের ডাকÑনতুন করে এবং আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ঈদুল ফিতরের ধর্মতাত্ত্বক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তিটি নিহিত রয়েছে পবিত্র রমজানের কৃচ্ছসাধনের মধ্যে। রোজা কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার বর্জন নয়, বরং এটি মানুষের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক কঠিন প্রশিক্ষণ। এই দীর্ঘ এক মাস মানুষ নিজের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের কষ্টকে অনুভব করতে শেখে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই আত্মিক পরিশুদ্ধিই মানুষকে প্রকৃত মানবিক গুণাবলিতে ভ‚ষিত করে। ঈদ হলো সেই অর্জিত নৈতিক বিজয়ের এক সামষ্টিক উদযাপন। ঈদের নামাজ, ফিতরা আদায় এবং পারস্পরিক আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়, তা মূলত বিভেদহীন এক সমাজ গঠনেরই মহড়া।
আজকের এই আনন্দ উৎসবকে যখন আমরা বৃহত্তর বৈশ্বিক ক্যানভাসে দেখি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিষণ্ন ছবি। মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থন ও হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়, লেবানন সীমান্তে অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। যে শিশুটির হাতে আজ নতুন রঙিন জামা থাকার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তার হাতে আজ একমুঠো ত্রাণের রুটি জোটে না। গাজা বা রাফাহর মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ধ্বংসস্তূপের ওপর যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আনন্দ নয়, বরং হারানো স্বজনদের জন্য দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে। সেখানে ‘ঈদ মোবারক’ ধ্বনি ছাপিয়ে বোমা হামলার ভয়ঙ্কর শব্দ আর ড্রোন হামলার আতঙ্ক মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈশ্বিক হাহাকার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার সংকল্প গ্রহণ করা।
ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা কেন্দ্রিক এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব অনুভ‚ত হচ্ছে সুদূর উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত। বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি তেল, যার বড় একটি অংশ উৎপাদিত ও পরিবাহিত হয় এই অঞ্চল দিয়ে। পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালী যদি যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়ে, তবে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্য এবং পরিবহন খরচের ওপর। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই অস্থিরতা থেকে মুক্ত নয়। জ্বালানি বাজারের ওঠানামা আমাদের মতো দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের ঈদ উদযাপনের বাজেটে টান পড়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের সেমাই বা নতুন পোশাক আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ঈদের সাম্যের বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবুও এই সংকটের মাঝেও মানুষ যে হাসিমুখে একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে ঈদুল ফিতরের আসল মহিমা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাড়ির টানে শহর থেকে গ্রামে ফেরার যে জনস্্রে আমরা প্রতি বছর দেখি, তা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিরল। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, আধুনিক যান্ত্রিকতা সত্তে¡ও আমাদের পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক শেকড়ের টান কতটা শক্তিশালী। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত নগরীগুলো যখন ফাঁকা হয়ে যায়, আর নিভৃত পল্লী যখন উৎসবে মুখর হয়, তখন তৈরি হয় এক অনন্য মেলবন্ধন। এই যাতায়াত কেবল শরীরের নয়, বরং এটি আত্মার এক পুনর্মিলন।
ইসলামী জীবনদর্শনে ‘যাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায়ের বাধ্যবাধকতা ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার। যখন সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দুস্থদের হাতে তুলে দেন, তখন সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। আজকের চরম পুঁজিবাদী বিশ্বে, যেখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী, সেখানে ঈদের এই দানশীলতার সংস্কৃতি একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে প্যালেস্টাইন বা ইয়েমেনের মতো ক্ষুধার্ত জনপদের জন্য বৈশ্বিক যাকাত ও ফিতরা তহবিল হতে পারে জীবনরক্ষাকারী এক মাধ্যম।
বিশ্বায়নের এই যুগে ঈদের রূপরেখাও পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। মরুভ‚মির তপ্ত বালুচর থেকে শুরু করে ইউরোপের তুষারপাত-সবখানেই প্রবাসী ভাই-বোনরা ঈদ পালন করেন। তাদের কাছে ঈদ মানে একরাশ নস্টালজিয়া। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কলে হয়তো পরিবারের সবার মুখ দেখা যায়, কিন্তু মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ বা ছোটবেলার সেই পাড়া-বেড়ানো আনন্দ কি ডিজিটাল পর্দায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব? প্রবাসীদের এই ত্যাগ এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈদের পরিধি ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বময়।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি হলো শরণার্থী সমস্যা। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আজ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ নিজেও এই মানবিক সংকটের সরাসরি সাক্ষী। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আমাদের মানবিকতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধের কারণে যারা নিজ ভ‚মি হারিয়েছে, তাদের জন্য ঈদ মানে কেবল একবেলা পেটভরে খাওয়ার স্বপ্ন। ঈদের শিক্ষা হলো মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো। যদি আমরা আমাদের উৎসবের সময় এই নিঃস্ব মানুষগুলোর কথা ভুলে যাই, তবে আমাদের রোজা ও ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।
বর্তমান সময়ে অতি-ভোক্তাবাদ বা ‘কনজিউমারিজম’ ঈদের আধ্যাত্মিকতাকে কিছুটা হলেও গ্রাস করছে। ঈদের বাজার করা বা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা অনেক সময় উৎসবের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। দামি পোশাক বা বিলাসিতা নয়, বরং আত্মসংযম এবং বিনয়ই হওয়া উচিত ঈদের ভূষণ। আধুনিকতার এই জোয়ারে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ঈদের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে অন্তরের পবিত্রতায়, বাইরের চাকচিক্যে নয়। যখন মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ জীবন বাঁচানোর লড়াই করছে, তখন আমাদের অতি-বিলাসিতা হওয়া উচিত পরিমিত ও সংবেদনশীল।
ঈদুল ফিতরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষমা। দীর্ঘ এক বছরের রেষারেষি, মান-অভিমান এবং তিক্ততা ভুলে যাওয়ার দিন হলো ঈদের দিন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার এই যুগে ক্ষমার সংস্কৃতি অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি ব্যক্তি পর্যায়ে একে অপরকে ক্ষমা করতে না শিখি, তবে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ইরান, ইসরায়েল বা আমেরিকা-রাষ্ট্রনায়করা যদি একে অপরের প্রতি প্রতিহিংসা ত্যাগ করে সমঝোতার পথে হাঁটতেন, তবে আজ হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণ বেঁচে যেত। ঈদ আমাদের অন্তরকে প্রশস্ত করার এবং ঘৃণা ত্যাগের দীক্ষা দেয়।
পরিবর্তনশীল ও অস্থির এই বিশ্বে ঈদুল ফিতর আমাদের জন্য একটি আশার প্রদীপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, ত্যাগের পর আনন্দের সূর্য উদিত হবেই। রমজানের কঠোর সাধনা যেমন আমাদের ধৈর্য শেখায়, ঈদ তেমনি আমাদের সেই ধৈর্যের মিষ্টি ফল উপহার দেয়। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে যেখানে সংঘাত ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে ঈদের সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা হতে পারে নিরাময়ের মহৌষধ। ঈদের সকালে যখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে সিজদাবনত হয়, তখন পৃথিবীর সব কৃত্রিম আভিজাত্য চূর্ণ হয়ে যায়। এই সাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য এবং এটাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমরা যদি ঈদের এই চেতনাকে কেবল একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরের পাথেয় করতে পারি, তবেই পৃথিবীটা হবে বাসযোগ্য ও শান্তিময়।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মার্চ ২০২৬
রমজান মাসের এক মাসব্যাপী আত্মসংযম ও সিয়াম সাধনার সমাপ্তিতে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে সমাগত হয় ঈদুল ফিতর। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং আত্মিক শুদ্ধি, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক সহমর্মিতার এক গভীর ও ব্যঞ্জনাময় প্রতীক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন আমরা ঈদের আনন্দ নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের চারপাশের পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, অস্থির এবং কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে ইরান, আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিমুখী উত্তেজনা ও সংঘাতের ছায়া আজ গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের কিনারে দাঁড় করিয়েছে। এই টালমাটাল বৈশ্বিক বাস্তবতায় ঈদুল ফিতরের অন্তর্নিহিত চেতনা-শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সাম্যের ডাকÑনতুন করে এবং আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ঈদুল ফিতরের ধর্মতাত্ত্বক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তিটি নিহিত রয়েছে পবিত্র রমজানের কৃচ্ছসাধনের মধ্যে। রোজা কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার বর্জন নয়, বরং এটি মানুষের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক কঠিন প্রশিক্ষণ। এই দীর্ঘ এক মাস মানুষ নিজের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের কষ্টকে অনুভব করতে শেখে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই আত্মিক পরিশুদ্ধিই মানুষকে প্রকৃত মানবিক গুণাবলিতে ভ‚ষিত করে। ঈদ হলো সেই অর্জিত নৈতিক বিজয়ের এক সামষ্টিক উদযাপন। ঈদের নামাজ, ফিতরা আদায় এবং পারস্পরিক আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়, তা মূলত বিভেদহীন এক সমাজ গঠনেরই মহড়া।
আজকের এই আনন্দ উৎসবকে যখন আমরা বৃহত্তর বৈশ্বিক ক্যানভাসে দেখি, তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বিষণ্ন ছবি। মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থন ও হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গাজা উপত্যকায় দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়, লেবানন সীমান্তে অস্থিরতা এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবন আজ বিপন্ন। যে শিশুটির হাতে আজ নতুন রঙিন জামা থাকার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তার হাতে আজ একমুঠো ত্রাণের রুটি জোটে না। গাজা বা রাফাহর মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ধ্বংসস্তূপের ওপর যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আনন্দ নয়, বরং হারানো স্বজনদের জন্য দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে। সেখানে ‘ঈদ মোবারক’ ধ্বনি ছাপিয়ে বোমা হামলার ভয়ঙ্কর শব্দ আর ড্রোন হামলার আতঙ্ক মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈশ্বিক হাহাকার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার সংকল্প গ্রহণ করা।
ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা কেন্দ্রিক এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব অনুভ‚ত হচ্ছে সুদূর উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত। বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি তেল, যার বড় একটি অংশ উৎপাদিত ও পরিবাহিত হয় এই অঞ্চল দিয়ে। পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালী যদি যুদ্ধের কারণে অচল হয়ে পড়ে, তবে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্য এবং পরিবহন খরচের ওপর। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই অস্থিরতা থেকে মুক্ত নয়। জ্বালানি বাজারের ওঠানামা আমাদের মতো দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের ঈদ উদযাপনের বাজেটে টান পড়ে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঈদের সেমাই বা নতুন পোশাক আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ঈদের সাম্যের বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবুও এই সংকটের মাঝেও মানুষ যে হাসিমুখে একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, সেখানেই লুকিয়ে আছে ঈদুল ফিতরের আসল মহিমা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাড়ির টানে শহর থেকে গ্রামে ফেরার যে জনস্্রে আমরা প্রতি বছর দেখি, তা পৃথিবীর অন্য কোথাও বিরল। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, আধুনিক যান্ত্রিকতা সত্তে¡ও আমাদের পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক শেকড়ের টান কতটা শক্তিশালী। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত নগরীগুলো যখন ফাঁকা হয়ে যায়, আর নিভৃত পল্লী যখন উৎসবে মুখর হয়, তখন তৈরি হয় এক অনন্য মেলবন্ধন। এই যাতায়াত কেবল শরীরের নয়, বরং এটি আত্মার এক পুনর্মিলন।
ইসলামী জীবনদর্শনে ‘যাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা আদায়ের বাধ্যবাধকতা ঈদের আনন্দকে সর্বজনীন করার একটি চমৎকার মাধ্যম। এটি কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য অধিকার। যখন সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দুস্থদের হাতে তুলে দেন, তখন সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। আজকের চরম পুঁজিবাদী বিশ্বে, যেখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী, সেখানে ঈদের এই দানশীলতার সংস্কৃতি একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে প্যালেস্টাইন বা ইয়েমেনের মতো ক্ষুধার্ত জনপদের জন্য বৈশ্বিক যাকাত ও ফিতরা তহবিল হতে পারে জীবনরক্ষাকারী এক মাধ্যম।
বিশ্বায়নের এই যুগে ঈদের রূপরেখাও পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। মরুভ‚মির তপ্ত বালুচর থেকে শুরু করে ইউরোপের তুষারপাত-সবখানেই প্রবাসী ভাই-বোনরা ঈদ পালন করেন। তাদের কাছে ঈদ মানে একরাশ নস্টালজিয়া। প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও কলে হয়তো পরিবারের সবার মুখ দেখা যায়, কিন্তু মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ বা ছোটবেলার সেই পাড়া-বেড়ানো আনন্দ কি ডিজিটাল পর্দায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব? প্রবাসীদের এই ত্যাগ এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈদের পরিধি ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বময়।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলোর একটি হলো শরণার্থী সমস্যা। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আজ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ নিজেও এই মানবিক সংকটের সরাসরি সাক্ষী। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন তা আমাদের মানবিকতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। যুদ্ধের কারণে যারা নিজ ভ‚মি হারিয়েছে, তাদের জন্য ঈদ মানে কেবল একবেলা পেটভরে খাওয়ার স্বপ্ন। ঈদের শিক্ষা হলো মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো। যদি আমরা আমাদের উৎসবের সময় এই নিঃস্ব মানুষগুলোর কথা ভুলে যাই, তবে আমাদের রোজা ও ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।
বর্তমান সময়ে অতি-ভোক্তাবাদ বা ‘কনজিউমারিজম’ ঈদের আধ্যাত্মিকতাকে কিছুটা হলেও গ্রাস করছে। ঈদের বাজার করা বা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা অনেক সময় উৎসবের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। দামি পোশাক বা বিলাসিতা নয়, বরং আত্মসংযম এবং বিনয়ই হওয়া উচিত ঈদের ভূষণ। আধুনিকতার এই জোয়ারে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ঈদের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে অন্তরের পবিত্রতায়, বাইরের চাকচিক্যে নয়। যখন মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ জীবন বাঁচানোর লড়াই করছে, তখন আমাদের অতি-বিলাসিতা হওয়া উচিত পরিমিত ও সংবেদনশীল।
ঈদুল ফিতরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষমা। দীর্ঘ এক বছরের রেষারেষি, মান-অভিমান এবং তিক্ততা ভুলে যাওয়ার দিন হলো ঈদের দিন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার এই যুগে ক্ষমার সংস্কৃতি অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি ব্যক্তি পর্যায়ে একে অপরকে ক্ষমা করতে না শিখি, তবে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ইরান, ইসরায়েল বা আমেরিকা-রাষ্ট্রনায়করা যদি একে অপরের প্রতি প্রতিহিংসা ত্যাগ করে সমঝোতার পথে হাঁটতেন, তবে আজ হাজার হাজার নিরপরাধ প্রাণ বেঁচে যেত। ঈদ আমাদের অন্তরকে প্রশস্ত করার এবং ঘৃণা ত্যাগের দীক্ষা দেয়।
পরিবর্তনশীল ও অস্থির এই বিশ্বে ঈদুল ফিতর আমাদের জন্য একটি আশার প্রদীপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, ত্যাগের পর আনন্দের সূর্য উদিত হবেই। রমজানের কঠোর সাধনা যেমন আমাদের ধৈর্য শেখায়, ঈদ তেমনি আমাদের সেই ধৈর্যের মিষ্টি ফল উপহার দেয়। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে যেখানে সংঘাত ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে ঈদের সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বার্তা হতে পারে নিরাময়ের মহৌষধ। ঈদের সকালে যখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে সিজদাবনত হয়, তখন পৃথিবীর সব কৃত্রিম আভিজাত্য চূর্ণ হয়ে যায়। এই সাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য এবং এটাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আমরা যদি ঈদের এই চেতনাকে কেবল একদিনের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছরের পাথেয় করতে পারি, তবেই পৃথিবীটা হবে বাসযোগ্য ও শান্তিময়।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন