সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

একটি শিশুর জন্ম থেকে একটি রাষ্ট্রের গল্প


ফকর উদ্দিন মানিক
ফকর উদ্দিন মানিক
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬

একটি শিশুর জন্ম থেকে একটি রাষ্ট্রের গল্প
একটি শিশুর জন্ম দিয়ে শুরু হওয়া সেই গল্প ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল একটি জাতির ইতিহাস।আর সেই গল্পের কেন্দ্রের মানুষটির নাম—শেখ মুজিবুর রহমান

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু গল্প আছে, যেগুলো কেবল একটি মানুষের জীবনের গল্প নয়সেগুলো হয়ে ওঠে একটি সময়ের, একটি সংগ্রামের এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের গল্প। এই গল্পগুলো কখনো শুরু হয় খুব সাধারণ কোনো প্রান্তিক জনপদে, আবার ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে একটি পুরো জাতির জীবনে।

মার্চ মাস এলেই বাংলার প্রকৃতিতে এক ধরনের অদ্ভুত আবেগ জেগে ওঠে। বসন্তের আলো, বাতাসের উষ্ণতা আর ইতিহাসের স্মৃতি যেন মিলেমিশে এক বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয়। এই সময়টায় মানুষ শুধু ঋতুর সৌন্দর্যই অনুভব করে না; তারা ফিরে তাকায় অতীতের দিকেসেই সময়ের দিকে, যখন বাঙালি জাতি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল।

গল্পটা শুরু হয়েছিল দক্ষিণ বাংলার এক শান্ত গ্রামের ভোরে। নদীর ধারে সবুজে ঘেরা একটি জনপদ, যেখানে দিনের শুরু হয় পাখির ডাক আর মানুষের ব্যস্ততায়। সেই গ্রামেই একদিন জন্ম নিয়েছিল একটি শিশু। তখন কেউ ভাবেনি, এই শিশুটির জীবনের পথ একদিন একটি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।

শৈশব থেকেই ছেলেটির মধ্যে ছিল এক অদ্ভূত স্বভাবঅন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস। স্কুলের মাঠে কিংবা পাড়ার আড্ডায়, কোথাও যদি কোনো অন্যায় ঘটত, সে চুপ করে থাকতে পারত না। বন্ধুরা তাকে বিশ্বাস করত, কারণ সে কথা বলত সোজাসাপটা, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয়ও পেত না।

সময় এগিয়ে গেল। সেই ছেলেটি বড় হতে লাগল, আর তার চোখের সামনে খুলে যেতে লাগল এক কঠিন বাস্তবতার পর্দা। সে দেখতে পেল, তার চারপাশের মানুষ কত ধরনের বঞ্চনা আর বৈষম্যের মধ্যে বাস করছে। ভাষা, অর্থনীতি, শিক্ষাসব ক্ষেত্রেই যেন এক অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে।

এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। সে বুঝতে শুরু করল, শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি, প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব।

ছাত্রজীবনে সে সেই পথেই হাঁটতে শুরু করল। রাজনীতি তখন তার কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি ছিল না; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি উপায় ছিল। সভা-সমাবেশে সে কথা বলত সহজ ভাষায়, কিন্তু সেই কথার মধ্যে ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর বিশ্বাস।

ক্রমে ক্রমে তার কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়তে লাগল শহর থেকে গ্রামে। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসবাই তার কথার মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। সেই সময় পূর্ব বাংলার মানুষ নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছিল, আর এই তরুণ নেতা তাদের মনে নতুন আশা জাগিয়ে তুলেছিলেন।

একসময় সেই আশা একটি সুস্পষ্ট দাবিতে রূপ নিল। মানুষের অধিকার, স্বায়ত্তশাসন এবং সম্মানের প্রশ্ন সামনে চলে এল। সেই দাবিগুলো দ্রুত মানুষের আন্দোলনে পরিণত হলো। রাস্তায়, মিছিলে, জনসমুদ্রে একটি নতুন আত্মবিশ্বাস জন্ম নিতে লাগল।

তারপর এল উত্তাল সময়। মানুষের প্রতিবাদ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠল। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সেই তরুণ নেতা হয়ে উঠলেন মানুষের ভরসার প্রতীক। মানুষ তাকে শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখল না; তারা দেখল একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে।

সময়ের স্রোত তখন আরও দ্রুত বয়ে চলেছে। একটি জাতি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে একটি ভাষণ, একটি আহ্বান পুরো জাতির মনকে নাড়িয়ে দিল। সেই আহ্বানে ছিল সাহস, ছিল সংগ্রামের ডাক, আবার ছিল মানুষের শক্তির প্রতি গভীর আস্থা।

এরপর শুরু হলো এক দীর্ঘ সংগ্রাম। নয় মাস ধরে মানুষ লড়ল স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে। অনেক ত্যাগ, অনেক বেদনা আর অসংখ্য আত্মদানের মধ্য দিয়ে সেই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত বিজয়ের পথে পৌঁছাল। স্বাধীনতার সেই সকাল শুধু একটি রাজনৈতিক অর্জন ছিল না; এটি ছিল মানুষের আত্মমর্যাদার পুনর্জন্ম। একটি জাতি তখন নতুন করে নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেল।

কিন্তু স্বাধীনতার পরও কাজ শেষ হয়ে যায়নি। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সামনে এসে দাঁড়াল। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতাসব মিলিয়ে বাস্তবতা ছিল কঠিন। তবু মানুষের মনে তখনও ছিল সেই স্বপ্ন, যে স্বপ্ন তাদের সংগ্রামের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

সময়ের প্রবাহে অনেক ঘটনা বদলে যায়। ইতিহাসে বিতর্কও জন্ম নেয়। কিন্তু কিছু সত্য আছে, যেগুলো সময়ের পরীক্ষায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একটি জাতির জাগরণ, তাদের সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কিছু মানুষের নাম।

দক্ষিণ বাংলার সেই শান্ত গ্রাম থেকে শুরু হওয়া গল্পটিও ঠিক তেমনই। একটি শিশুর জন্ম দিয়ে শুরু হওয়া সেই গল্প ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল একটি জাতির ইতিহাস।আর সেই গল্পের কেন্দ্রের মানুষটির নামশেখ মুজিবুর রহমান

[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬


একটি শিশুর জন্ম থেকে একটি রাষ্ট্রের গল্প

প্রকাশের তারিখ : ১৭ মার্চ ২০২৬

featured Image

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু গল্প আছে, যেগুলো কেবল একটি মানুষের জীবনের গল্প নয়সেগুলো হয়ে ওঠে একটি সময়ের, একটি সংগ্রামের এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের গল্প। এই গল্পগুলো কখনো শুরু হয় খুব সাধারণ কোনো প্রান্তিক জনপদে, আবার ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে একটি পুরো জাতির জীবনে।

মার্চ মাস এলেই বাংলার প্রকৃতিতে এক ধরনের অদ্ভুত আবেগ জেগে ওঠে। বসন্তের আলো, বাতাসের উষ্ণতা আর ইতিহাসের স্মৃতি যেন মিলেমিশে এক বিশেষ অনুভূতির জন্ম দেয়। এই সময়টায় মানুষ শুধু ঋতুর সৌন্দর্যই অনুভব করে না; তারা ফিরে তাকায় অতীতের দিকেসেই সময়ের দিকে, যখন বাঙালি জাতি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল।

গল্পটা শুরু হয়েছিল দক্ষিণ বাংলার এক শান্ত গ্রামের ভোরে। নদীর ধারে সবুজে ঘেরা একটি জনপদ, যেখানে দিনের শুরু হয় পাখির ডাক আর মানুষের ব্যস্ততায়। সেই গ্রামেই একদিন জন্ম নিয়েছিল একটি শিশু। তখন কেউ ভাবেনি, এই শিশুটির জীবনের পথ একদিন একটি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে।

শৈশব থেকেই ছেলেটির মধ্যে ছিল এক অদ্ভূত স্বভাবঅন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস। স্কুলের মাঠে কিংবা পাড়ার আড্ডায়, কোথাও যদি কোনো অন্যায় ঘটত, সে চুপ করে থাকতে পারত না। বন্ধুরা তাকে বিশ্বাস করত, কারণ সে কথা বলত সোজাসাপটা, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয়ও পেত না।

সময় এগিয়ে গেল। সেই ছেলেটি বড় হতে লাগল, আর তার চোখের সামনে খুলে যেতে লাগল এক কঠিন বাস্তবতার পর্দা। সে দেখতে পেল, তার চারপাশের মানুষ কত ধরনের বঞ্চনা আর বৈষম্যের মধ্যে বাস করছে। ভাষা, অর্থনীতি, শিক্ষাসব ক্ষেত্রেই যেন এক অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে।

এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। সে বুঝতে শুরু করল, শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি, প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব।

ছাত্রজীবনে সে সেই পথেই হাঁটতে শুরু করল। রাজনীতি তখন তার কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি ছিল না; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি উপায় ছিল। সভা-সমাবেশে সে কথা বলত সহজ ভাষায়, কিন্তু সেই কথার মধ্যে ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর বিশ্বাস।

ক্রমে ক্রমে তার কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়তে লাগল শহর থেকে গ্রামে। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসবাই তার কথার মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। সেই সময় পূর্ব বাংলার মানুষ নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছিল, আর এই তরুণ নেতা তাদের মনে নতুন আশা জাগিয়ে তুলেছিলেন।

একসময় সেই আশা একটি সুস্পষ্ট দাবিতে রূপ নিল। মানুষের অধিকার, স্বায়ত্তশাসন এবং সম্মানের প্রশ্ন সামনে চলে এল। সেই দাবিগুলো দ্রুত মানুষের আন্দোলনে পরিণত হলো। রাস্তায়, মিছিলে, জনসমুদ্রে একটি নতুন আত্মবিশ্বাস জন্ম নিতে লাগল।

তারপর এল উত্তাল সময়। মানুষের প্রতিবাদ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠল। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সেই তরুণ নেতা হয়ে উঠলেন মানুষের ভরসার প্রতীক। মানুষ তাকে শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেখল না; তারা দেখল একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে।

সময়ের স্রোত তখন আরও দ্রুত বয়ে চলেছে। একটি জাতি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে একটি ভাষণ, একটি আহ্বান পুরো জাতির মনকে নাড়িয়ে দিল। সেই আহ্বানে ছিল সাহস, ছিল সংগ্রামের ডাক, আবার ছিল মানুষের শক্তির প্রতি গভীর আস্থা।

এরপর শুরু হলো এক দীর্ঘ সংগ্রাম। নয় মাস ধরে মানুষ লড়ল স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে। অনেক ত্যাগ, অনেক বেদনা আর অসংখ্য আত্মদানের মধ্য দিয়ে সেই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত বিজয়ের পথে পৌঁছাল। স্বাধীনতার সেই সকাল শুধু একটি রাজনৈতিক অর্জন ছিল না; এটি ছিল মানুষের আত্মমর্যাদার পুনর্জন্ম। একটি জাতি তখন নতুন করে নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেল।

কিন্তু স্বাধীনতার পরও কাজ শেষ হয়ে যায়নি। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সামনে এসে দাঁড়াল। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতাসব মিলিয়ে বাস্তবতা ছিল কঠিন। তবু মানুষের মনে তখনও ছিল সেই স্বপ্ন, যে স্বপ্ন তাদের সংগ্রামের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

সময়ের প্রবাহে অনেক ঘটনা বদলে যায়। ইতিহাসে বিতর্কও জন্ম নেয়। কিন্তু কিছু সত্য আছে, যেগুলো সময়ের পরীক্ষায় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। একটি জাতির জাগরণ, তাদের সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কিছু মানুষের নাম।

দক্ষিণ বাংলার সেই শান্ত গ্রাম থেকে শুরু হওয়া গল্পটিও ঠিক তেমনই। একটি শিশুর জন্ম দিয়ে শুরু হওয়া সেই গল্প ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল একটি জাতির ইতিহাস।আর সেই গল্পের কেন্দ্রের মানুষটির নামশেখ মুজিবুর রহমান

[লেখক : সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত