মুসলিমদের যে কয়টি ধর্মীয় উৎসব রয়েছে তার মধ্যে ঈদুল ফিতর অন্যতম। এটি ইসলামী বর্ষপুঞ্জির খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা মুসলিমদের জন্য আনন্দের ও ধর্মীয় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিশেষ দিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে যেখানে ঈদ উৎসবের আনন্দে পরিবার, বন্ধু এবং স্বজনরা একত্রিত হয়, সেখানে প্রবাসীদের জন্য ঈদ অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। প্রবাসে ঈদ পালন করার সময় প্রবাসীদের মাঝে এমন কিছু মিশ্র অনুভূতি পরিলক্ষিত হয়, যা তাদের এক ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জর মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করায়, আবার কখনও কখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা বিশেষ উষ্ণতা এবং নতুন কিছু সৃষ্টি বা আয়োজনের উপলক্ষ হিসেবেও কাজ করে।
প্রবাস জীবনে ঈদ উদযাপন সত্যিকারার্থে খুব বেশি একটা সুখকর নয়। দেশে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ পালন করার যে আনন্দ— তা মোটেও প্রবাসে পাওয়া যায় না। এ না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও হৃদয়ে দাগ কাটে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আজকাল প্রবাসীরা ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার মাধ্যমে কিছুটা কষ্টের লাঘব ঘটাতে পারলেও একাকীত্বের অনুভূতি কিন্তু থেকেই যায়। প্রবাসীরা যখন তাদের মাতৃভূমি, পরিবারের মধ্যে ঈদ উৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ দেখে, তখন তাদের ভেতরে যে আবেগ-অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা প্রকাশ করা সত্যি কঠিন। কারও কারও মাঝে আবার নস্টালজিয়া এসে ভিড় করে; যা কি না নিয়ে যায় তাদের শৈশবের মধুর স্মৃতিবিজড়িত ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তের মাঝে।
প্রবাসে ঈদ উৎসবের প্রস্তুতিতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। যেহেতু পরিবারের সব সদস্যরা কিংবা আত্মীয়-স্বজন কাছাকাছি থাকে না, তাই তাদের একাকী অথবা ছোট একটি প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে ঈদ উদযাপন করতে হয়। সেখানেও থাকে বিশেষ কিছু আয়োজন। সর্বপ্রথম সবাই ঘুম থেকে উঠেই ঈদের নামাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। একেকটি এলাকায় সাধারণত একেকটি মসজিদে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হয়, সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। আজকাল আবহাওয়া সদয় হলে অধিক সংখ্যক লোকের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে কোনো কোনো এলাকায় খোলা মাঠেও ঈদের নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে।
নামাজ শেষে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর যে একটি রেওয়াজ ছিল, তা এখন নেই বললেই চলে। এর প্রথম কারণ, ঘুরে ঘুরে একদিনে সবার বাসায় যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায় না। দ্বিতীয়ত, কখনও কখনও দেখা যায় লোকজন ঘুরে-ফিরে কেবল নির্দিষ্ট কিছু বাড়িতে যায় শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য। এতে ওইসব বাড়ির লোকজন আর সেজেগুজে বাইরে বেরুনোর সুযোগ পান না। ফলে উৎসবমুখর দিনটি তাদের কাছে মাটি হয়ে যায়। তাই ঈদের দিনের আনন্দ থেকে যাতে কাউকে বঞ্চিত হতে না হয়, সেই চিন্তা-ভাবনা থেকে কমিউনিটির সদস্যরা একে অন্যকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে ইদানীং একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হন। একই সঙ্গে সেখানে থাকে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার নিজেদের জন্য যা রান্নাবান্না করেন তাই তারা সঙ্গে করে নিয়ে যান। ফলে অনুষ্ঠানস্থল বিশাল খাদ্যের সমাহারে পরিণত হয়। সেমাই, মিষ্টি, পায়েস, চটপটি, হালিম, কোর্মা-পোলাও, বিরিয়ানিসহ এমন কোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার নেই যা সেখানে পাওয়া যায় না। সত্যিকারার্থে খাবারের দিক থেকে প্রবাসের অনুষ্ঠানগুলো এখন আর দেশীয় অনুষ্ঠানের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসে ঈদ উদযাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের দেশে ঈদ করতে না পারার দুঃখ ভুলে থাকা ও নতুন প্রজন্মের মাঝে ঈদের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও ঐতিহ্যগত দিক তুলে ধরার জন্য ঈদের অনুষ্ঠান আয়োজন করা বেশ জরুরি। তাছাড়া ঈদ যে উৎসব বা ঐতিহ্যের বাইরে আমাদের ‘একাত্মতার প্রতীক’ এ জিনিসটি ফোটিয়ে তোলার জন্যও এসব অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।
তবে একটি সত্য কথা না বললেই নয়। প্রবাসে যতই জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠান পালন করা হোক না কেন, তবু প্রবাসীদের মন ভরে না।
পারিবারিক স্মৃতির অনুপস্থিতি তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এই দিনগুলোতে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হতে না পারায় হৃদয়ের ভেতরে এক অজানা শূন্যতা অনুভব করেন। দেশের গ্রামের বাড়ি কিংবা শহরের দিকে মন ফিরে যায়, যেখানে তাদের প্রিয়জনরা ঈদ উদযাপন করে থাকে। এই সময় তাদের মধ্যে একটি প্রবল আবেগানুভূতি তৈরি হয়। বস্তুত একদিকে পরিবার ও স্বজনবিহীন নিঃসঙ্গতা এবং অন্যদিকে বন্ধু ও কমিউনিটির মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রবাসীদের মাঝে একটি দ্বৈত অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটায়।
[লেখক : আয়ারল্যান্ড প্রবাসী]

বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মার্চ ২০২৬
মুসলিমদের যে কয়টি ধর্মীয় উৎসব রয়েছে তার মধ্যে ঈদুল ফিতর অন্যতম। এটি ইসলামী বর্ষপুঞ্জির খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা মুসলিমদের জন্য আনন্দের ও ধর্মীয় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিশেষ দিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে যেখানে ঈদ উৎসবের আনন্দে পরিবার, বন্ধু এবং স্বজনরা একত্রিত হয়, সেখানে প্রবাসীদের জন্য ঈদ অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। প্রবাসে ঈদ পালন করার সময় প্রবাসীদের মাঝে এমন কিছু মিশ্র অনুভূতি পরিলক্ষিত হয়, যা তাদের এক ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জর মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করায়, আবার কখনও কখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা বিশেষ উষ্ণতা এবং নতুন কিছু সৃষ্টি বা আয়োজনের উপলক্ষ হিসেবেও কাজ করে।
প্রবাস জীবনে ঈদ উদযাপন সত্যিকারার্থে খুব বেশি একটা সুখকর নয়। দেশে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ পালন করার যে আনন্দ— তা মোটেও প্রবাসে পাওয়া যায় না। এ না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও হৃদয়ে দাগ কাটে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আজকাল প্রবাসীরা ভিডিও কল, সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার মাধ্যমে কিছুটা কষ্টের লাঘব ঘটাতে পারলেও একাকীত্বের অনুভূতি কিন্তু থেকেই যায়। প্রবাসীরা যখন তাদের মাতৃভূমি, পরিবারের মধ্যে ঈদ উৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ দেখে, তখন তাদের ভেতরে যে আবেগ-অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা প্রকাশ করা সত্যি কঠিন। কারও কারও মাঝে আবার নস্টালজিয়া এসে ভিড় করে; যা কি না নিয়ে যায় তাদের শৈশবের মধুর স্মৃতিবিজড়িত ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তের মাঝে।
প্রবাসে ঈদ উৎসবের প্রস্তুতিতে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। যেহেতু পরিবারের সব সদস্যরা কিংবা আত্মীয়-স্বজন কাছাকাছি থাকে না, তাই তাদের একাকী অথবা ছোট একটি প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে ঈদ উদযাপন করতে হয়। সেখানেও থাকে বিশেষ কিছু আয়োজন। সর্বপ্রথম সবাই ঘুম থেকে উঠেই ঈদের নামাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। একেকটি এলাকায় সাধারণত একেকটি মসজিদে ঈদের নামাজের আয়োজন করা হয়, সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। আজকাল আবহাওয়া সদয় হলে অধিক সংখ্যক লোকের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে কোনো কোনো এলাকায় খোলা মাঠেও ঈদের নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে।
নামাজ শেষে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর যে একটি রেওয়াজ ছিল, তা এখন নেই বললেই চলে। এর প্রথম কারণ, ঘুরে ঘুরে একদিনে সবার বাসায় যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায় না। দ্বিতীয়ত, কখনও কখনও দেখা যায় লোকজন ঘুরে-ফিরে কেবল নির্দিষ্ট কিছু বাড়িতে যায় শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য। এতে ওইসব বাড়ির লোকজন আর সেজেগুজে বাইরে বেরুনোর সুযোগ পান না। ফলে উৎসবমুখর দিনটি তাদের কাছে মাটি হয়ে যায়। তাই ঈদের দিনের আনন্দ থেকে যাতে কাউকে বঞ্চিত হতে না হয়, সেই চিন্তা-ভাবনা থেকে কমিউনিটির সদস্যরা একে অন্যকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে ইদানীং একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হন। একই সঙ্গে সেখানে থাকে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার নিজেদের জন্য যা রান্নাবান্না করেন তাই তারা সঙ্গে করে নিয়ে যান। ফলে অনুষ্ঠানস্থল বিশাল খাদ্যের সমাহারে পরিণত হয়। সেমাই, মিষ্টি, পায়েস, চটপটি, হালিম, কোর্মা-পোলাও, বিরিয়ানিসহ এমন কোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার নেই যা সেখানে পাওয়া যায় না। সত্যিকারার্থে খাবারের দিক থেকে প্রবাসের অনুষ্ঠানগুলো এখন আর দেশীয় অনুষ্ঠানের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসে ঈদ উদযাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের দেশে ঈদ করতে না পারার দুঃখ ভুলে থাকা ও নতুন প্রজন্মের মাঝে ঈদের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও ঐতিহ্যগত দিক তুলে ধরার জন্য ঈদের অনুষ্ঠান আয়োজন করা বেশ জরুরি। তাছাড়া ঈদ যে উৎসব বা ঐতিহ্যের বাইরে আমাদের ‘একাত্মতার প্রতীক’ এ জিনিসটি ফোটিয়ে তোলার জন্যও এসব অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।
তবে একটি সত্য কথা না বললেই নয়। প্রবাসে যতই জাঁকজমকভাবে অনুষ্ঠান পালন করা হোক না কেন, তবু প্রবাসীদের মন ভরে না।
পারিবারিক স্মৃতির অনুপস্থিতি তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এই দিনগুলোতে প্রবাসীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে একত্রিত হতে না পারায় হৃদয়ের ভেতরে এক অজানা শূন্যতা অনুভব করেন। দেশের গ্রামের বাড়ি কিংবা শহরের দিকে মন ফিরে যায়, যেখানে তাদের প্রিয়জনরা ঈদ উদযাপন করে থাকে। এই সময় তাদের মধ্যে একটি প্রবল আবেগানুভূতি তৈরি হয়। বস্তুত একদিকে পরিবার ও স্বজনবিহীন নিঃসঙ্গতা এবং অন্যদিকে বন্ধু ও কমিউনিটির মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা প্রবাসীদের মাঝে একটি দ্বৈত অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটায়।
[লেখক : আয়ারল্যান্ড প্রবাসী]

আপনার মতামত লিখুন