সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

জাকাত: দান নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা


ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ
ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬

জাকাত: দান নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। এটি ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলভিত্তি। জাকাতের উদ্দেশ্য হলো, সহায়তার মনোভাব পোষণ ও অথনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়ন। দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ কমিয়ে আনা। মাহে রমজানের সঙ্গে জাকাতের রয়েছে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক। যেহেতু জাকাত চন্দ্রবর্ষ দ্বারা হিসাব করা হয়; সেহেতু আমাদের দেশে অধিকতর কল্যাণের আশায় সাধারণত রমজান মাসেই জাকাত আদায় করা হয়। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক কল্যাণ সাধনে জাকাত আদায় ও বণ্টনের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ইসলামের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কারা জাকাত আদায় করবেন, কোন কোন জিনিসের জাকাত আদায় করবেন, জাকাতের সঠিক হিসাব কীভাবে করবেন, কোন কোন খাতে কীভাবে জাকাত আদায় করবেন এবং জাকাতের হকদাররা কীভাবে জাকাত গ্রহণ করবেন— এ সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা জাকাত দাতা ও জাকাতগৃহীতা তথা সব মুসলিম নর-নারীর জন্যই ফরজ বা একান্ত অপরিহার্য। সঙ্গে সঙ্গে জাকাত আদায় না করা বা লোক দেখানো আদায় করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও সবাইকে অবহিত, সচেতন ও সতর্ক করাও ইমাম, মুয়াল্লিম, মুবাল্লিগ ও উলামায়ে দ্বীনগণের পবিত্র জিম্মাদারি দায়িত্ব। 

জাকাত ব্যবস্থাই হলো বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সমাজের অসহায়, দরিদ্র, নিপীড়িত ও পিছিয়ে পড়া জনগণকে অভাব ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তি দিয়ে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করার জন্য ইসলামে জাকাতের বিধান করা হয়েছে। তাই জাকাত হলো গরিবের সামাজিক নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি ও তাদের অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ। সামাজিক সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ও একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথই হচ্ছে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এ পৃথিবীর সব কিছুর মালিক মহান আল্লাহ। মানুষ তার প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর সব ধন-সম্পদ ভোগ করে মাত্র। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জানো না, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্য কেবল আল্লাহরই, আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক কিংবা সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা বাকারা, ১০৭) এই ভূমণ্ডল সৃষ্টির পরে তিনি মানুষকে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু, সাদা কালো ইত্যাদি  তে ভাগ করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এটিও তার সৃষ্টি রহস্যের একটি। এর মাধ্যমে তিনি তার বান্দাকে পরীক্ষা করেন। কাউকে তিনি ধন-সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন আবার কাউকে দারিদ্র্য দিয়ে। ধনীদের পরীক্ষা করার জন্য জাকাত আল্লাহর একটি উপলক্ষ মাত্র। এর মাধ্যমে সম্পদশালী ব্যক্তির আত্মার যেমন পরিশুদ্ধি আসে, তেমনই তার ধন-সম্পদ পবিত্র ও হালাল হয়। আর সমাজের অসহায়, ফকির, মিসকিন, দরিদ্ররা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। 

জাকাতের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ইসলামে সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। এভাবে জাকাত ফান্ডের অর্থ দিয়ে যদি অভাবীদের একটি তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশটি পরিবারকে বাছাই করে প্রত্যেক পরিবারকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে উপার্জনযোগ্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয় এবং যে পরিবারের কর্তা একজন শক্তিমান পুরুষ তাকে একটি ভ্যান বা মাঝারি নৌকা কিনে দেয়া হয়, যে পরিবারের কর্তা একজন বয়োবৃদ্ধ পুরুষ তাকে একটি ছোট পান-চায়ের দোকান করে দেয়া হয়, আর যে পরিবারের প্রধান একজন বিধবা নারী তাকে একটা ভালো সেলাই মেশিন কিনে দেয়া হয়— তাহলে এর সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহার করে তারা দৈনন্দিন রোজগার করে সংসার চালাতে পারবে। এভাবে প্রতি বছর যদি বিশটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা যায় তাহলে মদিনায় যেমন খেলাফতে রাশেদিনের শেষ দিকে জাকাত নেয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি— তেমনই ২০ বছর পর হয়তো ওই মহল্লায়ও জাকাত নেয়ার মতো কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। আমরা বলতে পারি যে, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। 

ইদানীং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলো সমাজে বিদ্যমান অসহনীয় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনকল্পে জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করে তহবিল গঠন এবং সেই তহবিল থেকেই দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলো নিজেদের তহবিলের জাকাত ছাড়াও তাদের গ্রাহকদের দেয়া জাকাত নিয়ে গড়ে তুলেছে জাকাত ফাউন্ডেশন। মূলত নগদ সাহায্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন এই তিনটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। অনুরূপভাবে কোনো এলাকার বিত্তবান লোকজন যদি জাকাতের তহবিল গঠন করে গরিব মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়, তাহলেও গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহজতর হবে। নতুবা জাকাত সরকারি জাকাত ফান্ডে জমা দিতে হবে এবং সেখান থেকে জনকল্যাণের প্রয়োজনীয় কার্যকর ভূমিকা নিলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। সরকারের বাস্তবমুখী উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং কার্যকর ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার পাশাপাশি ১৮ কোটি জনতা অধ্যুষিত এ দেশে যারা সাহেবে নিসাব; তারা সবাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিয়মিত জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে ব্যয়ের জন্য উদ্যোগী হলে দেশে গরিব জনগণের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। সরকারের রাজস্ব ফান্ডও হবে সমৃদ্ধ আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি হবে আরও বিস্তৃত। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছার ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার। তাই রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বাড়ানো আর জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার সব স্তরে জাকাত বিষয়ক ইসলামী অর্থনীতির শিক্ষা চালু করা; সর্বস্তরের মানুষের কাছে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা; সব মুসলিম দেশে সরকারিভাবে জাকাত আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

ইসলামে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। জাকাত আক্ষরিক অর্থেই সম্পদকে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি করে। জাকাত দাতার মন থেকে লোভ-লালসা, অহংকার ও কৃপণতা দূর করে তাকে আত্মশুদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে। এটি ধনীদের সঙ্গে দরিদ্রদের সুসম্পর্ক স্থাপন করে এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও সামাজিক সংহতি রক্ষা করে। জাকাতের মাধ্যমে অভাবী, ঋণগ্রস্ত এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করে তাদের স্বাবলম্বী করা হয়। এটি একটি অবশ্য পালনীয় আর্থিক ইবাদত, যা ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর অন্যতম। 

জাকাত কেবল দরিদ্রকে অর্থ দেয়া নয়, বরং এটি সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক মহান মাধ্যম। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। পরিশেষে আমরা বলতে পারি, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। মোট কথা ইসলামী সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জাকাত একদিকে যেমন গরিব অসহায়তা অবসানের গ্যারান্টি রাখে তেমনি অর্থনৈতিক চাকাকে গতিশীলও রাখে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও সুদৃঢ় ও সমুন্নত করে। এ সব কারণে জাকাতের আর্থসামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। 

[লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬


জাকাত: দান নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

প্রকাশের তারিখ : ১৮ মার্চ ২০২৬

featured Image

জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। এটি ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলভিত্তি। জাকাতের উদ্দেশ্য হলো, সহায়তার মনোভাব পোষণ ও অথনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়ন। দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ কমিয়ে আনা। মাহে রমজানের সঙ্গে জাকাতের রয়েছে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক। যেহেতু জাকাত চন্দ্রবর্ষ দ্বারা হিসাব করা হয়; সেহেতু আমাদের দেশে অধিকতর কল্যাণের আশায় সাধারণত রমজান মাসেই জাকাত আদায় করা হয়। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক কল্যাণ সাধনে জাকাত আদায় ও বণ্টনের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ইসলামের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কারা জাকাত আদায় করবেন, কোন কোন জিনিসের জাকাত আদায় করবেন, জাকাতের সঠিক হিসাব কীভাবে করবেন, কোন কোন খাতে কীভাবে জাকাত আদায় করবেন এবং জাকাতের হকদাররা কীভাবে জাকাত গ্রহণ করবেন— এ সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা জাকাত দাতা ও জাকাতগৃহীতা তথা সব মুসলিম নর-নারীর জন্যই ফরজ বা একান্ত অপরিহার্য। সঙ্গে সঙ্গে জাকাত আদায় না করা বা লোক দেখানো আদায় করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও সবাইকে অবহিত, সচেতন ও সতর্ক করাও ইমাম, মুয়াল্লিম, মুবাল্লিগ ও উলামায়ে দ্বীনগণের পবিত্র জিম্মাদারি দায়িত্ব। 

জাকাত ব্যবস্থাই হলো বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সমাজের অসহায়, দরিদ্র, নিপীড়িত ও পিছিয়ে পড়া জনগণকে অভাব ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে মুক্তি দিয়ে সচ্ছল ও স্বাবলম্বী করার জন্য ইসলামে জাকাতের বিধান করা হয়েছে। তাই জাকাত হলো গরিবের সামাজিক নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি ও তাদের অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ। সামাজিক সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ও একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথই হচ্ছে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এ পৃথিবীর সব কিছুর মালিক মহান আল্লাহ। মানুষ তার প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর সব ধন-সম্পদ ভোগ করে মাত্র। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জানো না, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্য কেবল আল্লাহরই, আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক কিংবা সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা বাকারা, ১০৭) এই ভূমণ্ডল সৃষ্টির পরে তিনি মানুষকে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু, সাদা কালো ইত্যাদি  তে ভাগ করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এটিও তার সৃষ্টি রহস্যের একটি। এর মাধ্যমে তিনি তার বান্দাকে পরীক্ষা করেন। কাউকে তিনি ধন-সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন আবার কাউকে দারিদ্র্য দিয়ে। ধনীদের পরীক্ষা করার জন্য জাকাত আল্লাহর একটি উপলক্ষ মাত্র। এর মাধ্যমে সম্পদশালী ব্যক্তির আত্মার যেমন পরিশুদ্ধি আসে, তেমনই তার ধন-সম্পদ পবিত্র ও হালাল হয়। আর সমাজের অসহায়, ফকির, মিসকিন, দরিদ্ররা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। 

জাকাতের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ইসলামে সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। এভাবে জাকাত ফান্ডের অর্থ দিয়ে যদি অভাবীদের একটি তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশটি পরিবারকে বাছাই করে প্রত্যেক পরিবারকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে উপার্জনযোগ্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয় এবং যে পরিবারের কর্তা একজন শক্তিমান পুরুষ তাকে একটি ভ্যান বা মাঝারি নৌকা কিনে দেয়া হয়, যে পরিবারের কর্তা একজন বয়োবৃদ্ধ পুরুষ তাকে একটি ছোট পান-চায়ের দোকান করে দেয়া হয়, আর যে পরিবারের প্রধান একজন বিধবা নারী তাকে একটা ভালো সেলাই মেশিন কিনে দেয়া হয়— তাহলে এর সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহার করে তারা দৈনন্দিন রোজগার করে সংসার চালাতে পারবে। এভাবে প্রতি বছর যদি বিশটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা যায় তাহলে মদিনায় যেমন খেলাফতে রাশেদিনের শেষ দিকে জাকাত নেয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি— তেমনই ২০ বছর পর হয়তো ওই মহল্লায়ও জাকাত নেয়ার মতো কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। আমরা বলতে পারি যে, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। 

ইদানীং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামী ব্যাংকগুলো সমাজে বিদ্যমান অসহনীয় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনকল্পে জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করে তহবিল গঠন এবং সেই তহবিল থেকেই দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলো নিজেদের তহবিলের জাকাত ছাড়াও তাদের গ্রাহকদের দেয়া জাকাত নিয়ে গড়ে তুলেছে জাকাত ফাউন্ডেশন। মূলত নগদ সাহায্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন এই তিনটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। অনুরূপভাবে কোনো এলাকার বিত্তবান লোকজন যদি জাকাতের তহবিল গঠন করে গরিব মানুষের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়, তাহলেও গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহজতর হবে। নতুবা জাকাত সরকারি জাকাত ফান্ডে জমা দিতে হবে এবং সেখান থেকে জনকল্যাণের প্রয়োজনীয় কার্যকর ভূমিকা নিলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। সরকারের বাস্তবমুখী উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং কার্যকর ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার পাশাপাশি ১৮ কোটি জনতা অধ্যুষিত এ দেশে যারা সাহেবে নিসাব; তারা সবাই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিয়মিত জাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে ব্যয়ের জন্য উদ্যোগী হলে দেশে গরিব জনগণের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। সরকারের রাজস্ব ফান্ডও হবে সমৃদ্ধ আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি হবে আরও বিস্তৃত। এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছার ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার। তাই রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বাড়ানো আর জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার সব স্তরে জাকাত বিষয়ক ইসলামী অর্থনীতির শিক্ষা চালু করা; সর্বস্তরের মানুষের কাছে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা; সব মুসলিম দেশে সরকারিভাবে জাকাত আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

ইসলামে সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। জাকাত আক্ষরিক অর্থেই সম্পদকে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করে এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি করে। জাকাত দাতার মন থেকে লোভ-লালসা, অহংকার ও কৃপণতা দূর করে তাকে আত্মশুদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে। এটি ধনীদের সঙ্গে দরিদ্রদের সুসম্পর্ক স্থাপন করে এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও সামাজিক সংহতি রক্ষা করে। জাকাতের মাধ্যমে অভাবী, ঋণগ্রস্ত এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করে তাদের স্বাবলম্বী করা হয়। এটি একটি অবশ্য পালনীয় আর্থিক ইবাদত, যা ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর অন্যতম। 

জাকাত কেবল দরিদ্রকে অর্থ দেয়া নয়, বরং এটি সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এক মহান মাধ্যম। এজন্য প্রয়োজন হবে সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার। পরিশেষে আমরা বলতে পারি, আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাত ব্যবস্থায় সমাজের অথনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসনে এটি এক উত্তম ব্যবস্থা। সাম্য ও সমতার বিধান ছাড়া সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সুরক্ষা হয় না। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ হলেই সমাজ স্থিতিশীল হয়। অপরাধ কমে আসে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, জাকাত সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করে থাকে। মোট কথা ইসলামী সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় জাকাত একদিকে যেমন গরিব অসহায়তা অবসানের গ্যারান্টি রাখে তেমনি অর্থনৈতিক চাকাকে গতিশীলও রাখে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও সুদৃঢ় ও সমুন্নত করে। এ সব কারণে জাকাতের আর্থসামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। 

[লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত