যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক সংকট মধ্যপ্রাচ্যে এবারের ঈদের আনন্দকে ফিকে করে দিয়েছে। লেবানন থেকে ফিলিস্তিন, ইরান থেকে সিরিয়া- হাজার হাজার মানুষের জন্য এই ঈদ হয়ে উঠেছে বিষণ্ণতা আর অনিশ্চয়তার।
বৈরুতের দাউদি এলাকায় সিরীয় শরণার্থী আলা এখন ঠাঁই খুঁজছেন। ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া দক্ষিণী উপকণ্ঠ দাহিয়েতে থাকতেন তিনি। এখন খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। ঈদের কোনো পরিকল্পনা জানতে চাইলে তার সরাসরি উত্তর, ‘না। এখন শুধু একটা তাঁবু চাই।’
লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে আরও ১০ লাখের বেশি মানুষ। বৈরুতের ব্যস্ততম ওয়াটারফ্রন্ট এখন তাঁবু শহরে পরিণত হয়েছে।
গাজা সিটির রেমাল বাজারেও নেই ঈদের আমেজ। ৬২ বছর বয়সী খালেদ দীব বলছিলেন, ‘বাইরে থেকে বাজারটাকে প্রাণবন্ত দেখালেও ভেতরে আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। সবাই ঘরছাড়া। তাঁবুতে থাকা মানুষদের কাছে আর কীসের ঈদ?’
যুদ্ধের আগে খালেদের একটি মুদিদোকান ছিল। তিনি জানান, আগে ঈদে মেয়ে-বোনদের উপহার দিতেন, বাড়ি সাজাতেন, বাচ্চাদের নতুন জামা কিনে দিতেন। এখন তা আর সম্ভব নয়।
তিন সন্তানের মা শিরিন শেরিম বলেন, ‘আমাদের ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ। যুদ্ধের পর টিকে আছি, কিন্তু জীবন এত দুর্বিষহ যে মৌলিক চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না।’
গাজার বাড়ির দেয়াল ফাঁকা। সেখানে প্লাস্টিকের চাদর আর কাঠের টুকরো দিয়ে ঘর বানিয়েছেন শিরিন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার বাড়ি ফিরে মন খারাপ হয়ে যায়। মানুষ রাস্তায় প্লাস্টিকের তাঁবুতে থাকছে। এই মানুষগুলো কীভাবে ঈদ করবে?’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যেই পড়েছে ঈদ। তৃতীয় সপ্তাহে চলা এই হামলায় অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কেনাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ইরানে পবিত্র মাস রমজানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসেছে পারস্য নববর্ষ ‘নওরোজ’। ফলে সরকারবিরোধী অনেকের কাছে নওরোজের গুরুত্বই এখন বেশি।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তার চিত্র বদলে গেছে। ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে খোলা ময়দানে ঈদের জামাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নামাজ হবে মসজিদের ভেতরে।
কুয়েতে বড় জমায়েত এড়াতে নাটক, কনসার্ট ও বিয়ের অনুষ্ঠানে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কুয়েত প্রবাসী আলী ইব্রাহিম জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কেনাকাটা অনেক কম। কাতারও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সব জনসমাবেশ স্থগিত রেখেছে।
বৈরুতের রাজনৈতিক গবেষক করিম সাফিয়ুদ্দিন বলেন, ‘যুদ্ধের মধ্যেও আমি পরিবারের সঙ্গে ঈদ করব। পরিবারের বন্ধন আর সমাজের সংহতি টিকে থাকার প্রধান শর্ত।’
দুবাইয়ে বসবাসরত সমাজকর্মী জুহি ইয়াসমিন খান বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ উদযাপন মানায় না। আমরা অনেকেই শুধু ঘনিষ্ঠদের নিয়ে ঘরোয়াভাবেই ঈদ করছি।’
ঈদের আগের দিন বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ছোট্ট সারার হাতে মেহেদি পরছিলেন তার মা মারিয়ম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের থামাতে পারবে না। এই সময়টুকু ঠিকই কেটে যাবে।’
তবে অধিকৃত জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের কাছে এই সময় আরও বেদনাদায়ক। ইসরায়েল আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে। শহরের সরু গলিতে নেই ঈদের আলোকসজ্জা। ইহাব নামের এক যুবকের ভাষায়, ‘আল-আকসায় যেতে না পারার কষ্টে আমরা ভেঙে পড়ছি।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননে বিচ্ছিন্ন কিছু আনন্দের আভাসও আছে। বৈরুতের এক নারী বলছেন, ‘আমাদের ঈদের কেনাকাটা অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম। তবুও ঈদ তো ঈদ।’সূত্র: আল জাজিরা।

শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মার্চ ২০২৬
যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক সংকট মধ্যপ্রাচ্যে এবারের ঈদের আনন্দকে ফিকে করে দিয়েছে। লেবানন থেকে ফিলিস্তিন, ইরান থেকে সিরিয়া- হাজার হাজার মানুষের জন্য এই ঈদ হয়ে উঠেছে বিষণ্ণতা আর অনিশ্চয়তার।
বৈরুতের দাউদি এলাকায় সিরীয় শরণার্থী আলা এখন ঠাঁই খুঁজছেন। ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া দক্ষিণী উপকণ্ঠ দাহিয়েতে থাকতেন তিনি। এখন খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। ঈদের কোনো পরিকল্পনা জানতে চাইলে তার সরাসরি উত্তর, ‘না। এখন শুধু একটা তাঁবু চাই।’
লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে আরও ১০ লাখের বেশি মানুষ। বৈরুতের ব্যস্ততম ওয়াটারফ্রন্ট এখন তাঁবু শহরে পরিণত হয়েছে।
গাজা সিটির রেমাল বাজারেও নেই ঈদের আমেজ। ৬২ বছর বয়সী খালেদ দীব বলছিলেন, ‘বাইরে থেকে বাজারটাকে প্রাণবন্ত দেখালেও ভেতরে আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। সবাই ঘরছাড়া। তাঁবুতে থাকা মানুষদের কাছে আর কীসের ঈদ?’
যুদ্ধের আগে খালেদের একটি মুদিদোকান ছিল। তিনি জানান, আগে ঈদে মেয়ে-বোনদের উপহার দিতেন, বাড়ি সাজাতেন, বাচ্চাদের নতুন জামা কিনে দিতেন। এখন তা আর সম্ভব নয়।
তিন সন্তানের মা শিরিন শেরিম বলেন, ‘আমাদের ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ। যুদ্ধের পর টিকে আছি, কিন্তু জীবন এত দুর্বিষহ যে মৌলিক চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না।’
গাজার বাড়ির দেয়াল ফাঁকা। সেখানে প্লাস্টিকের চাদর আর কাঠের টুকরো দিয়ে ঘর বানিয়েছেন শিরিন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার বাড়ি ফিরে মন খারাপ হয়ে যায়। মানুষ রাস্তায় প্লাস্টিকের তাঁবুতে থাকছে। এই মানুষগুলো কীভাবে ঈদ করবে?’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যেই পড়েছে ঈদ। তৃতীয় সপ্তাহে চলা এই হামলায় অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কেনাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ইরানে পবিত্র মাস রমজানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসেছে পারস্য নববর্ষ ‘নওরোজ’। ফলে সরকারবিরোধী অনেকের কাছে নওরোজের গুরুত্বই এখন বেশি।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তার চিত্র বদলে গেছে। ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে খোলা ময়দানে ঈদের জামাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নামাজ হবে মসজিদের ভেতরে।
কুয়েতে বড় জমায়েত এড়াতে নাটক, কনসার্ট ও বিয়ের অনুষ্ঠানে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কুয়েত প্রবাসী আলী ইব্রাহিম জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কেনাকাটা অনেক কম। কাতারও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সব জনসমাবেশ স্থগিত রেখেছে।
বৈরুতের রাজনৈতিক গবেষক করিম সাফিয়ুদ্দিন বলেন, ‘যুদ্ধের মধ্যেও আমি পরিবারের সঙ্গে ঈদ করব। পরিবারের বন্ধন আর সমাজের সংহতি টিকে থাকার প্রধান শর্ত।’
দুবাইয়ে বসবাসরত সমাজকর্মী জুহি ইয়াসমিন খান বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ উদযাপন মানায় না। আমরা অনেকেই শুধু ঘনিষ্ঠদের নিয়ে ঘরোয়াভাবেই ঈদ করছি।’
ঈদের আগের দিন বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ছোট্ট সারার হাতে মেহেদি পরছিলেন তার মা মারিয়ম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের থামাতে পারবে না। এই সময়টুকু ঠিকই কেটে যাবে।’
তবে অধিকৃত জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের কাছে এই সময় আরও বেদনাদায়ক। ইসরায়েল আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে। শহরের সরু গলিতে নেই ঈদের আলোকসজ্জা। ইহাব নামের এক যুবকের ভাষায়, ‘আল-আকসায় যেতে না পারার কষ্টে আমরা ভেঙে পড়ছি।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননে বিচ্ছিন্ন কিছু আনন্দের আভাসও আছে। বৈরুতের এক নারী বলছেন, ‘আমাদের ঈদের কেনাকাটা অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম। তবুও ঈদ তো ঈদ।’সূত্র: আল জাজিরা।

আপনার মতামত লিখুন