হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ এখনো শতভাগ শেষ না হওয়ায় চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষক। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং বৃষ্টি-শিলাবৃষ্টিতে অনেক বাঁধের ক্ষতি হওয়ায় ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাউবো অবশ্য দাবি করছে, ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এ বছর সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১৮টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হয়। গেল ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। অনেক জায়গায় মাটির কাজই শেষ হয়নি, কোথাও কোথাও ঘাস লাগানোর নামে বরাদ্দ লোপাটের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ।
২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাঁধ ভেঙে শতভাগ ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেননি হাওরবাসী। খরচার হাওরপাড়ের কৃষক আবুল কাসেম (৬৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, '২০১৭ সালে বাঁধের দুর্নীতি আর অবহেলার কারণে আমরা না খেয়ে মরেছিলাম। গরু-ছাগলও মরেছে ঘাসের অভাবে। ২০২৬ সালেও যদি সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে আমরা প্রশাসনের দুয়ারে গিয়ে হাহাকার করা ছাড়া আর পথ পাব না।'
গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত ও শিলাবৃষ্টিতে অনেক বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাউবো দাবি করছে, এগুলোর পুনঃসংস্কার করা হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলোতে কাজ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, 'গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনিয়ম ও গাফিলতি চরমে। পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনের শুরু থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতির রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বৃষ্টিপাত ও শিলাবৃষ্টিতে আরও বেশি বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যে কোনো সময় পাহাড়ি ঢল নামতে পারে।'
হাওর ও নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন অভিযোগ করেন, 'গত বছরের অক্ষত বাঁধগুলোতে নতুন বরাদ্দ দেখিয়ে হরিলুট চলছে। প্রথম দফার আগাম বন্যাতেই এই নড়বড়ে বাঁধ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'
কাজের ধীরগতির কারণ হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার নির্বাচনের অজুহাত তুলে ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি করেছিলেন। সেই সময়ও অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি। তিনি দাবি করেন, ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪২ শতাংশ অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে পিআইসি সদস্যদের অভিযোগ, কাজের অগ্রগতি ভালো হলেও বিল না পাওয়ায় তাদের ধার-দেনা করে কাজ চালাতে হচ্ছে। তারা অনতিবিলম্বে শতভাগ বিল প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশকর্মী সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, সময়মতো অর্থ ছাড় না করা এবং অন্যান্য কারণেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'পিআইসিদের সময়মতো অর্থ না দেওয়া আর এ কারণে হাওরের ফসল নষ্ট হলে আমরা যারা মনিটরিং কমিটির সদস্য আছি, আমরা দায় নেব না। প্রয়োজনে পদত্যাগ করব।'
হাওর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন শুরু করেছে। দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা। ব্যর্থ হলে রাজপথে নেমে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন নেতারা।

শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মার্চ ২০২৬
হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ এখনো শতভাগ শেষ না হওয়ায় চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষক। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং বৃষ্টি-শিলাবৃষ্টিতে অনেক বাঁধের ক্ষতি হওয়ায় ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাউবো অবশ্য দাবি করছে, ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এ বছর সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১৮টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হয়। গেল ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। অনেক জায়গায় মাটির কাজই শেষ হয়নি, কোথাও কোথাও ঘাস লাগানোর নামে বরাদ্দ লোপাটের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ।
২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাঁধ ভেঙে শতভাগ ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেননি হাওরবাসী। খরচার হাওরপাড়ের কৃষক আবুল কাসেম (৬৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, '২০১৭ সালে বাঁধের দুর্নীতি আর অবহেলার কারণে আমরা না খেয়ে মরেছিলাম। গরু-ছাগলও মরেছে ঘাসের অভাবে। ২০২৬ সালেও যদি সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে আমরা প্রশাসনের দুয়ারে গিয়ে হাহাকার করা ছাড়া আর পথ পাব না।'
গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত ও শিলাবৃষ্টিতে অনেক বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাউবো দাবি করছে, এগুলোর পুনঃসংস্কার করা হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলোতে কাজ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, 'গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনিয়ম ও গাফিলতি চরমে। পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনের শুরু থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতির রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বৃষ্টিপাত ও শিলাবৃষ্টিতে আরও বেশি বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যে কোনো সময় পাহাড়ি ঢল নামতে পারে।'
হাওর ও নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন অভিযোগ করেন, 'গত বছরের অক্ষত বাঁধগুলোতে নতুন বরাদ্দ দেখিয়ে হরিলুট চলছে। প্রথম দফার আগাম বন্যাতেই এই নড়বড়ে বাঁধ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'
কাজের ধীরগতির কারণ হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার নির্বাচনের অজুহাত তুলে ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি করেছিলেন। সেই সময়ও অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি। তিনি দাবি করেন, ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪২ শতাংশ অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে পিআইসি সদস্যদের অভিযোগ, কাজের অগ্রগতি ভালো হলেও বিল না পাওয়ায় তাদের ধার-দেনা করে কাজ চালাতে হচ্ছে। তারা অনতিবিলম্বে শতভাগ বিল প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশকর্মী সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, সময়মতো অর্থ ছাড় না করা এবং অন্যান্য কারণেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'পিআইসিদের সময়মতো অর্থ না দেওয়া আর এ কারণে হাওরের ফসল নষ্ট হলে আমরা যারা মনিটরিং কমিটির সদস্য আছি, আমরা দায় নেব না। প্রয়োজনে পদত্যাগ করব।'
হাওর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন শুরু করেছে। দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা। ব্যর্থ হলে রাজপথে নেমে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন নেতারা।

আপনার মতামত লিখুন