সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ঈদের সেই চেনা স্পর্শ কি হারিয়ে ফেলছি?


সৈয়দা বদরুন নেসা
সৈয়দা বদরুন নেসা
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৬

ঈদের সেই চেনা স্পর্শ কি হারিয়ে ফেলছি?
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…

রমজানের শেষ বিকেলগুলোতে এক ধরনের মায়াবী নীরবতা নেমে আসে। আকাশে সোনালি আলো ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ে। বাতাসে ভেসে থাকে বিদায়ের এক কোমল সুর। সেই সুরের ভেতর দিয়েই আসে ঈদ—আনন্দের, মিলনের, নিজেকে ফিরে পাওয়ার উৎসব। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই উৎসবের রূপ ও অনুভূতি কতটা বদলে গেছে, এই প্রশ্ন আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

সেকালের ঈদ ছিল দীর্ঘ, ধীরস্থির এক প্রস্তুতির। নতুন জামার সেই ঘ্রাণই যেন ছিল ঈদের আগমনী বার্তা। চাঁদ দেখা ছিল সম্মিলিত সামাজিক অভিজ্ঞতা। ছাদে ছাদে, উঠোনে উঠোনে মানুষ একসঙ্গে তাকিয়ে থাকতো আকাশের দিকে। 'চাঁদ উঠেছে' এই ঘোষণাটি শুধু একটি খবর ছিল না, ছিল একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠার সূচনা।

একসময় ঈদ মানেই ছিল সাদা-কালো টিভির সামনে বসে থাকা। চাঁদ দেখার খবরের অপেক্ষা। আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যখন বেজে উঠত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…’ তখন যেন শুধু একটি গান নয়, পুরো সমাজটাই একসঙ্গে আনন্দে ভরে উঠতো।

ঈদের আরেকটি বড় অনুষঙ্গ ছিল ঈদ কার্ড। হাতে লেখা কয়েকটি বাক্য, ছোট্ট একটি কাগজ। তবুও তার ভেতরে থাকতো গভীর আন্তরিকতা। নব্বইয়ের দশকেও ডাক বিভাগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঈদ শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান হতো। আজ ডিজিটাল যুগে এসে সেই সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত। এখন সেকেন্ডের ব্যবধানে বার্তা পৌঁছে যায়। কিন্তু সেই বার্তায় হৃদয়ের স্পর্শ কতটা থাকে—প্রশ্ন থেকেই যায়।

ঈদের আগের রাতগুলোতেও ছিল অন্যরকম এক আবহ। মেহেদি পাতার আয়োজন, রেশমি চুড়ির টুংটাং শব্দ, পরিবারের সবাই মিলে ঘর সাজানো ছিল এক ধরনের সম্মিলিত আনন্দের অংশ। এখন টিউবের মেহেদি সেই জায়গা দখল করেছে। সহজ, দ্রুত, কিন্তু অনেকটাই একাকি। সময় বাঁচে, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা কোথাও যেন কমে যায়।

আজকের ঈদে আয়োজন বেড়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রাণের ছোঁয়া কি আগের মতোই আছে? একসময় একটি বা দুটি নতুন পোশাকেই যে আনন্দ পূর্ণতা পেত, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে ব্র্যান্ড, ফ্যাশন, সামাজিক প্রদর্শন।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য বলছে, ঈদের সময় মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আমরা এখন ভার্চুয়ালি অনেক বেশি সংযুক্ত। কিন্তু বাস্তবের সেই আন্তরিকতা কি আগের মতোই রয়ে গেছে?

আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, বড়দের সালাম করা, একসঙ্গে বসে খাওয়া—এসব চর্চাও ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে। নগরায়ণ, ব্যস্ততা আর জীবনযাপনের পরিবর্তন আমাদের কাছাকাছি থেকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

তবুও সবকিছু হারিয়ে যায়নি। আজও মায়েদের রান্নাঘরের ব্যস্ততা আছে, সন্তানদের জন্য নতুন জামা কেনার আনন্দ আছে, ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলির উষ্ণতা আছে। অর্থাৎ ঈদের মূল চেতনা এখনো আমাদের ভেতরে বেঁচে আছে। শুধু তার প্রকাশভঙ্গি বদলে গেছে।

তাই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরে আসে—ঈদের আনন্দ কি সত্যিই কমে গেছে? নাকি আমরা নিজেরাই সেই অনুভূতি থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গেছি?

এখনও সময় আছে। আমরা চাইলে আমাদের সন্তানদের হাতে শুধু নতুন পোশাকই তুলে দেব না, তুলে দিতে পারি গল্প— মেহেদি পাতার গল্প, একসঙ্গে বসে খাওয়ার গল্প, ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার গল্প। আমরা তাদের শেখাতে পারি, ঈদ মানে শুধু কেনাকাটা নয়; ঈদ মানে মানুষ হওয়া, ক্ষমা করা, কাছে আসা, ভালোবাসা দেওয়া।

ঈদের সেই পুরোনো গন্ধটা হয়তো পুরোপুরি ফিরে আসবে না। কিন্তু আমরা যদি সচেতন হই, যদি একটু সময় দিই, যদি সম্পর্কগুলোকে আবার ছুঁয়ে দেখি, তাহলে সেই স্পর্শের কিছুটা হলেও আবার ফিরে আসবে। কারণ উৎসব কখনো হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যায় মানুষের ভেতরের অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


ঈদের সেই চেনা স্পর্শ কি হারিয়ে ফেলছি?

প্রকাশের তারিখ : ২১ মার্চ ২০২৬

featured Image

রমজানের শেষ বিকেলগুলোতে এক ধরনের মায়াবী নীরবতা নেমে আসে। আকাশে সোনালি আলো ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ে। বাতাসে ভেসে থাকে বিদায়ের এক কোমল সুর। সেই সুরের ভেতর দিয়েই আসে ঈদ—আনন্দের, মিলনের, নিজেকে ফিরে পাওয়ার উৎসব। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই উৎসবের রূপ ও অনুভূতি কতটা বদলে গেছে, এই প্রশ্ন আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

সেকালের ঈদ ছিল দীর্ঘ, ধীরস্থির এক প্রস্তুতির। নতুন জামার সেই ঘ্রাণই যেন ছিল ঈদের আগমনী বার্তা। চাঁদ দেখা ছিল সম্মিলিত সামাজিক অভিজ্ঞতা। ছাদে ছাদে, উঠোনে উঠোনে মানুষ একসঙ্গে তাকিয়ে থাকতো আকাশের দিকে। 'চাঁদ উঠেছে' এই ঘোষণাটি শুধু একটি খবর ছিল না, ছিল একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠার সূচনা।

একসময় ঈদ মানেই ছিল সাদা-কালো টিভির সামনে বসে থাকা। চাঁদ দেখার খবরের অপেক্ষা। আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যখন বেজে উঠত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…’ তখন যেন শুধু একটি গান নয়, পুরো সমাজটাই একসঙ্গে আনন্দে ভরে উঠতো।

ঈদের আরেকটি বড় অনুষঙ্গ ছিল ঈদ কার্ড। হাতে লেখা কয়েকটি বাক্য, ছোট্ট একটি কাগজ। তবুও তার ভেতরে থাকতো গভীর আন্তরিকতা। নব্বইয়ের দশকেও ডাক বিভাগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঈদ শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান হতো। আজ ডিজিটাল যুগে এসে সেই সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত। এখন সেকেন্ডের ব্যবধানে বার্তা পৌঁছে যায়। কিন্তু সেই বার্তায় হৃদয়ের স্পর্শ কতটা থাকে—প্রশ্ন থেকেই যায়।

ঈদের আগের রাতগুলোতেও ছিল অন্যরকম এক আবহ। মেহেদি পাতার আয়োজন, রেশমি চুড়ির টুংটাং শব্দ, পরিবারের সবাই মিলে ঘর সাজানো ছিল এক ধরনের সম্মিলিত আনন্দের অংশ। এখন টিউবের মেহেদি সেই জায়গা দখল করেছে। সহজ, দ্রুত, কিন্তু অনেকটাই একাকি। সময় বাঁচে, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা কোথাও যেন কমে যায়।

আজকের ঈদে আয়োজন বেড়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রাণের ছোঁয়া কি আগের মতোই আছে? একসময় একটি বা দুটি নতুন পোশাকেই যে আনন্দ পূর্ণতা পেত, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে ব্র্যান্ড, ফ্যাশন, সামাজিক প্রদর্শন।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য বলছে, ঈদের সময় মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আমরা এখন ভার্চুয়ালি অনেক বেশি সংযুক্ত। কিন্তু বাস্তবের সেই আন্তরিকতা কি আগের মতোই রয়ে গেছে?

আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, বড়দের সালাম করা, একসঙ্গে বসে খাওয়া—এসব চর্চাও ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে। নগরায়ণ, ব্যস্ততা আর জীবনযাপনের পরিবর্তন আমাদের কাছাকাছি থেকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

তবুও সবকিছু হারিয়ে যায়নি। আজও মায়েদের রান্নাঘরের ব্যস্ততা আছে, সন্তানদের জন্য নতুন জামা কেনার আনন্দ আছে, ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলির উষ্ণতা আছে। অর্থাৎ ঈদের মূল চেতনা এখনো আমাদের ভেতরে বেঁচে আছে। শুধু তার প্রকাশভঙ্গি বদলে গেছে।

তাই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরে আসে—ঈদের আনন্দ কি সত্যিই কমে গেছে? নাকি আমরা নিজেরাই সেই অনুভূতি থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গেছি?

এখনও সময় আছে। আমরা চাইলে আমাদের সন্তানদের হাতে শুধু নতুন পোশাকই তুলে দেব না, তুলে দিতে পারি গল্প— মেহেদি পাতার গল্প, একসঙ্গে বসে খাওয়ার গল্প, ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার গল্প। আমরা তাদের শেখাতে পারি, ঈদ মানে শুধু কেনাকাটা নয়; ঈদ মানে মানুষ হওয়া, ক্ষমা করা, কাছে আসা, ভালোবাসা দেওয়া।

ঈদের সেই পুরোনো গন্ধটা হয়তো পুরোপুরি ফিরে আসবে না। কিন্তু আমরা যদি সচেতন হই, যদি একটু সময় দিই, যদি সম্পর্কগুলোকে আবার ছুঁয়ে দেখি, তাহলে সেই স্পর্শের কিছুটা হলেও আবার ফিরে আসবে। কারণ উৎসব কখনো হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যায় মানুষের ভেতরের অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত