ঈদ এলেই ঘরে ঘরে ভাসে সেমাইয়ের মিষ্টি গন্ধ। গরম দুধের সঙ্গে ভাজা সেমাই মিশে যায় আনন্দের রঙে। কিন্তু এই সেমাই আমাদের ঘরে এলো কীভাবে? ইতিহাস বলে, আরব বণিকদের হাত ধরেই।
খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, সেমাইয়ের মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য। আরবি ভাষায় পাতলা নুডলসকে বলা হতো ‘শারিয়ার’, পারস্যে ‘রেশতা’। নবম-দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খিলাফতের সময় দুধ বা মিষ্টি সিরাপ দিয়ে রান্না করা এই খাবারের জনপ্রিয়তা ছিল অনেক। ষোলো শতকের পর আরব বণিকদের মাধ্যমেই এটি আসে ভারত উপমহাদেশে।
পারস্য ও মধ্য এশিয়ার লোকজীবনে সেমাইয়ের লম্বা সুতাকে ধরা হতো দীর্ঘজীবনের প্রতীক। দক্ষিণ এশিয়ায় রোজার শেষে সেমাইয়ের মিষ্টি স্বাদ হয়ে উঠেছে জীবনের মাধুর্যের প্রতীক। ভারতীয় উপমহাদেশে সেমাই আসে মূলত মুঘল আমলে। পারস্য ও তুর্কি রান্নার প্রভাবে দুধ, ঘি, খেজুর, বাদাম ও সেমাই দিয়ে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ‘শির খুরমা’। ধীরে ধীরে এটি ঈদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
একসময় বাংলার ঘরেও ছিল হাতে কাটা সেমাই তৈরির প্রচলন। চালের গুঁড়া বা আটা দিয়ে হাতের তালুতে ঘষে তৈরি করা হতো সূক্ষ্ম সুতোর মতো সেমাই। রোদে শুকিয়ে নারিকেলের দুধ ও গুড় দিয়ে রান্না হতো। পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠে ছোট ছোট কারখানা। চট্টগ্রামের হাতে তৈরি ‘লাচ্ছা সেমাই’ একসময় ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখন শিল্প পর্যায়ে উৎপাদন হলেও সেই ঐতিহ্য কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে।
বাংলা সাহিত্যে সেমাই এসেছে বারবার। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘সেমাই ঈদ’ ও ‘সেমাই উৎসব’ কবিতা। উর্দু সাহিত্যে ঈদ ও সেমাই নিয়ে প্রেমঘন লেখার কমতি নেই। এক গল্পে বলা হয়েছে, “প্রেম সব জায়গায় সেমাই রান্না করে, ঈদের আনন্দ চারদিকে ছড়িয়ে দেয়।”
সেমাই শুধু খাবার নয়, এটি এখন ঐতিহ্য, সম্পর্কের বন্ধন আর ঈদের আনন্দের এক অপরিহার্য নাম। আরব বণিকের নৌকা থেকে শুরু করে আজকের রান্নাঘর- সেমাই পেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ পথ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতবদল হয়েছে এই আয়োজন, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসা আর উৎসবের আমেজ আজও অমলিন।

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মার্চ ২০২৬
ঈদ এলেই ঘরে ঘরে ভাসে সেমাইয়ের মিষ্টি গন্ধ। গরম দুধের সঙ্গে ভাজা সেমাই মিশে যায় আনন্দের রঙে। কিন্তু এই সেমাই আমাদের ঘরে এলো কীভাবে? ইতিহাস বলে, আরব বণিকদের হাত ধরেই।
খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, সেমাইয়ের মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য। আরবি ভাষায় পাতলা নুডলসকে বলা হতো ‘শারিয়ার’, পারস্যে ‘রেশতা’। নবম-দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খিলাফতের সময় দুধ বা মিষ্টি সিরাপ দিয়ে রান্না করা এই খাবারের জনপ্রিয়তা ছিল অনেক। ষোলো শতকের পর আরব বণিকদের মাধ্যমেই এটি আসে ভারত উপমহাদেশে।
পারস্য ও মধ্য এশিয়ার লোকজীবনে সেমাইয়ের লম্বা সুতাকে ধরা হতো দীর্ঘজীবনের প্রতীক। দক্ষিণ এশিয়ায় রোজার শেষে সেমাইয়ের মিষ্টি স্বাদ হয়ে উঠেছে জীবনের মাধুর্যের প্রতীক। ভারতীয় উপমহাদেশে সেমাই আসে মূলত মুঘল আমলে। পারস্য ও তুর্কি রান্নার প্রভাবে দুধ, ঘি, খেজুর, বাদাম ও সেমাই দিয়ে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ‘শির খুরমা’। ধীরে ধীরে এটি ঈদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
একসময় বাংলার ঘরেও ছিল হাতে কাটা সেমাই তৈরির প্রচলন। চালের গুঁড়া বা আটা দিয়ে হাতের তালুতে ঘষে তৈরি করা হতো সূক্ষ্ম সুতোর মতো সেমাই। রোদে শুকিয়ে নারিকেলের দুধ ও গুড় দিয়ে রান্না হতো। পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠে ছোট ছোট কারখানা। চট্টগ্রামের হাতে তৈরি ‘লাচ্ছা সেমাই’ একসময় ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখন শিল্প পর্যায়ে উৎপাদন হলেও সেই ঐতিহ্য কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে।
বাংলা সাহিত্যে সেমাই এসেছে বারবার। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘সেমাই ঈদ’ ও ‘সেমাই উৎসব’ কবিতা। উর্দু সাহিত্যে ঈদ ও সেমাই নিয়ে প্রেমঘন লেখার কমতি নেই। এক গল্পে বলা হয়েছে, “প্রেম সব জায়গায় সেমাই রান্না করে, ঈদের আনন্দ চারদিকে ছড়িয়ে দেয়।”
সেমাই শুধু খাবার নয়, এটি এখন ঐতিহ্য, সম্পর্কের বন্ধন আর ঈদের আনন্দের এক অপরিহার্য নাম। আরব বণিকের নৌকা থেকে শুরু করে আজকের রান্নাঘর- সেমাই পেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ পথ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতবদল হয়েছে এই আয়োজন, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসা আর উৎসবের আমেজ আজও অমলিন।

আপনার মতামত লিখুন