১৯৭১ সালে ২৫ মার্চে এই বাংলাদেশে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী৷ “অপারেশন সার্চলাইট” নামের অভিযানের মাধ্যমে শুরু করেছিল গণহত্যা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে হামলা করে যাকে যেখানে পেয়েছে হত্যা করেছে পাকিস্থানী সেনরা। সেই রাতে পাকিস্তানি সেনারা পুরনো ঢাকাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও রোকেয়া হলেও গণহত্যা চালায়। সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছিলেন মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন। ২৫ মার্চে রাতের হত্যাকান্ডের কথা জালিয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, “২৫ মার্চ সকাল থেকেই হল ছাড়তে থাকেন ছাত্ররা। শেষে ছিলাম মাত্র ৪১ জনের মতো। ডাইনিং বন্ধ। রাতের খাবারের জন্য চলে যাই সচিবালয়ের পেছনে, চিটাগাং রেস্টুরেন্টে। হঠাৎ সাঁজোয়া যানের শব্দ। দেখলাম আর্মির কনভয় যাচ্ছে। ওদের চোখেমুখে হিংস্রতার ছাপ। দ্রুত হলের উত্তর গেটে আসতেই শুরু হয় কামানের গর্জন। গোলাগুলিরও শব্দ পাই অবিরত।”
“আমরা চার বন্ধু হলের ছাদে অবস্থান নেই। নানা শঙ্কায় কাটে গোটা রাত। ওরা আগে আলোর মতো একটা গুলি ছোঁড়ে। এরপরই ফায়ার করতে থাকে। রাত দুইটার পর দেখি পুরান ঢাকার দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারপাশে শুধু গুলি, চিৎকার আর মানুষের কান্নার শব্দ। ফজরের আজান পড়েছে তখন। কিন্তু আজানের সময়ও পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল। কেন জানি ওরা ফজলুল হক হলে আসেনি। ফলে দৈবক্রমে বেঁচে যাই আমরা।”
“২৬ মার্চ ভোরবেলায়, শহিদুল্লাহ হলে অ্যাটাক হয়। ছয়জনের লাশও পড়ে ছিল। আর্মিরা আমাদের হলে আসে। আমরা যে যার মতো লুকিয়ে থাকি। আমি চলে যাই তিনতলায়, ৩৫২ নম্বর রুমের বারান্দায়।”
“ওরা এলে দারোয়ান বলে, ‘এই হলে ভাল ছাত্ররা থাকে। ছুটির কারণে সবাই বাড়ি চলে গেছে। এখন কেউ নাই, স্যার’। কিন্তু বাংলাদেশের একটি পতাকা তখনও হলের সামনে পতপত করে উড়ছিল। তা দেখে আর্মিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, অশ্লীল একটা গালি দিয়ে দারোয়ানের ওপরই চড়াও হয়। এরপর পতাকাটি নামিয়ে বুটের তলায় কিছুক্ষণ মাড়িয়ে তাতে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। রাগে চারদিকে কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোঁড়ে। একটি গুলি এসে পড়ে আমার ঠিক সামনেই। কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে আর্মিরা তখন অন্যত্র চলে যায়। ফলে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি থেকেই ফিরে আসি।”
একাত্তরে তৌফিকুর রহমানরা থাকতেন সরকারি কোয়ার্টারে, চাঙ্খারপুলের রশিদ বিল্ডিংয়ে। ২৫ মার্চের রাতের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সারা রাত গোলাগুলির শব্দ। ওরা যে গণহত্যা চালিয়েছে এটা ক্লিয়ার হই ভোরের দিকে। গেটের বাইরে গিয়েই থ বনে যাই। রাস্তা সুনসান। হঠাৎ কার্জন হলের দিক থেকে একটা আর্মিদের জিপ আসে। জিপে এলএমজি ফিট করা। ওরা ফায়ার করতে করতে আসছে। স্যান্ডেল ফেলে দৌড়ে দেয়াল টপকে কোনোরকমে বাসায় চলে আসি। বাসার সামনে টং দোকানে একটা ছেলে সিগারেট বিক্রি করতো, বরিশাল বাড়ি তার। দোকানের ভেতর থেকে সে বের হতে গেলে তাকেও গুলি করে হত্যা করে ওরা।”
“পরে ভয়ে ভয়ে জগন্নাথ হলের দিকে যাই আমি। রাতে ওদিকেই গুলির শব্দ হচ্ছিল। দূর থেকে দেখলাম অনেক মানুষের গুলিবিদ্ধ ডেডবডি পড়ে আছে। কারো মাথায়, কারো বুকে, কারো পেটে গুলি লেগেছে। কয়েকজনকে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়েও মারা হয়েছে। রক্তের গন্ধ তখনো ছড়াচ্ছিল। এক রাতে ওরা ফুলবাড়িয়া রেললাইনের দুই পাশের বস্তিগুলোও পুড়িয়ে দেয়। মানুষের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে ঢাকার বাতাস।”
বজলুল মাহমুদ বাবলুর বাড়ি ঢাকার সেন্ট্রালরোডে। তিনি বলেন, “সারা রাত শুনেছি মানুষের আর্তচিৎকার ও গুলির শব্দ। পরেরদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ ওঠে। মানুষ তখন ঢাকা থেকে পালাতে থাকে। মোড়ে মোড়ে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি আর্মি। নিউ মার্কেটের দিকে এগোতেই দেখি লাশের স্তূপ। পলাশী হয়ে ইকবাল হলের দিকে যেতেই চোখে পড়ে শত শত লাশ। ওইদিন ঢাকার রাজপথে ছিল পচা লাশের গন্ধ।”

বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মার্চ ২০২৬
১৯৭১ সালে ২৫ মার্চে এই বাংলাদেশে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী৷ “অপারেশন সার্চলাইট” নামের অভিযানের মাধ্যমে শুরু করেছিল গণহত্যা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে হামলা করে যাকে যেখানে পেয়েছে হত্যা করেছে পাকিস্থানী সেনরা। সেই রাতে পাকিস্তানি সেনারা পুরনো ঢাকাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও রোকেয়া হলেও গণহত্যা চালায়। সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ছিলেন মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন। ২৫ মার্চে রাতের হত্যাকান্ডের কথা জালিয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, “২৫ মার্চ সকাল থেকেই হল ছাড়তে থাকেন ছাত্ররা। শেষে ছিলাম মাত্র ৪১ জনের মতো। ডাইনিং বন্ধ। রাতের খাবারের জন্য চলে যাই সচিবালয়ের পেছনে, চিটাগাং রেস্টুরেন্টে। হঠাৎ সাঁজোয়া যানের শব্দ। দেখলাম আর্মির কনভয় যাচ্ছে। ওদের চোখেমুখে হিংস্রতার ছাপ। দ্রুত হলের উত্তর গেটে আসতেই শুরু হয় কামানের গর্জন। গোলাগুলিরও শব্দ পাই অবিরত।”
“আমরা চার বন্ধু হলের ছাদে অবস্থান নেই। নানা শঙ্কায় কাটে গোটা রাত। ওরা আগে আলোর মতো একটা গুলি ছোঁড়ে। এরপরই ফায়ার করতে থাকে। রাত দুইটার পর দেখি পুরান ঢাকার দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারপাশে শুধু গুলি, চিৎকার আর মানুষের কান্নার শব্দ। ফজরের আজান পড়েছে তখন। কিন্তু আজানের সময়ও পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল। কেন জানি ওরা ফজলুল হক হলে আসেনি। ফলে দৈবক্রমে বেঁচে যাই আমরা।”
“২৬ মার্চ ভোরবেলায়, শহিদুল্লাহ হলে অ্যাটাক হয়। ছয়জনের লাশও পড়ে ছিল। আর্মিরা আমাদের হলে আসে। আমরা যে যার মতো লুকিয়ে থাকি। আমি চলে যাই তিনতলায়, ৩৫২ নম্বর রুমের বারান্দায়।”
“ওরা এলে দারোয়ান বলে, ‘এই হলে ভাল ছাত্ররা থাকে। ছুটির কারণে সবাই বাড়ি চলে গেছে। এখন কেউ নাই, স্যার’। কিন্তু বাংলাদেশের একটি পতাকা তখনও হলের সামনে পতপত করে উড়ছিল। তা দেখে আর্মিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, অশ্লীল একটা গালি দিয়ে দারোয়ানের ওপরই চড়াও হয়। এরপর পতাকাটি নামিয়ে বুটের তলায় কিছুক্ষণ মাড়িয়ে তাতে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। রাগে চারদিকে কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোঁড়ে। একটি গুলি এসে পড়ে আমার ঠিক সামনেই। কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে আর্মিরা তখন অন্যত্র চলে যায়। ফলে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি থেকেই ফিরে আসি।”
একাত্তরে তৌফিকুর রহমানরা থাকতেন সরকারি কোয়ার্টারে, চাঙ্খারপুলের রশিদ বিল্ডিংয়ে। ২৫ মার্চের রাতের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “সারা রাত গোলাগুলির শব্দ। ওরা যে গণহত্যা চালিয়েছে এটা ক্লিয়ার হই ভোরের দিকে। গেটের বাইরে গিয়েই থ বনে যাই। রাস্তা সুনসান। হঠাৎ কার্জন হলের দিক থেকে একটা আর্মিদের জিপ আসে। জিপে এলএমজি ফিট করা। ওরা ফায়ার করতে করতে আসছে। স্যান্ডেল ফেলে দৌড়ে দেয়াল টপকে কোনোরকমে বাসায় চলে আসি। বাসার সামনে টং দোকানে একটা ছেলে সিগারেট বিক্রি করতো, বরিশাল বাড়ি তার। দোকানের ভেতর থেকে সে বের হতে গেলে তাকেও গুলি করে হত্যা করে ওরা।”
“পরে ভয়ে ভয়ে জগন্নাথ হলের দিকে যাই আমি। রাতে ওদিকেই গুলির শব্দ হচ্ছিল। দূর থেকে দেখলাম অনেক মানুষের গুলিবিদ্ধ ডেডবডি পড়ে আছে। কারো মাথায়, কারো বুকে, কারো পেটে গুলি লেগেছে। কয়েকজনকে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়েও মারা হয়েছে। রক্তের গন্ধ তখনো ছড়াচ্ছিল। এক রাতে ওরা ফুলবাড়িয়া রেললাইনের দুই পাশের বস্তিগুলোও পুড়িয়ে দেয়। মানুষের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে ঢাকার বাতাস।”
বজলুল মাহমুদ বাবলুর বাড়ি ঢাকার সেন্ট্রালরোডে। তিনি বলেন, “সারা রাত শুনেছি মানুষের আর্তচিৎকার ও গুলির শব্দ। পরেরদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ ওঠে। মানুষ তখন ঢাকা থেকে পালাতে থাকে। মোড়ে মোড়ে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি আর্মি। নিউ মার্কেটের দিকে এগোতেই দেখি লাশের স্তূপ। পলাশী হয়ে ইকবাল হলের দিকে যেতেই চোখে পড়ে শত শত লাশ। ওইদিন ঢাকার রাজপথে ছিল পচা লাশের গন্ধ।”

আপনার মতামত লিখুন