একাত্তরের ২৫ মার্চে ঢাকায় প্রথম গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে এ গণহত্যার প্রধান টার্গেট করা হয় পুলিশকে, আর পুলিশ বিভাগের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সকে। কিন্তু বাঙালি পুলিশ বাহিনী বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাপুরোচিত গণহত্যা প্রতিরোধ করতে জীবন দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
১৯৭১
সালের ২৫ মার্চ দুপুর
২টা। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নানা ধরনের
আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাঠানো হয়।
সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে শহরের
বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশের টহল টিম পাঠানো
হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজারবাগ
পুলিশ লাইন্সে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র থেকে খবর আসে
পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আক্রমণ করতে পারে। এই
খবরে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা বিক্ষিপ্তভাবে নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে
পাকিস্তান বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুতি নিতে
শুরু করে।
রাত
১০টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে
পুলিশের টহল টিম বেতার
মারফত জানায়, পাক বাহিনীর একটি
বড় কনভয় যুদ্ধসাজে শহরের
দিকে এগুচ্ছে। রাত সাড়ে ১০টার
দিকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে পুলিশের প্যাট্রিলং
টিম খবর পাঠায় যে,
রমনা পার্কের (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) উত্তর ও দক্ষিণ দিকে
সেনাবাহিনীর অন্তত ৭০/৮০টি সাঁজোয়া
যান পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে।
রাত
১১টার দিকে হোটেল ইন্টার
কন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থানরত পুলিশের প্যাট্রিলং টিমের সদস্যরা সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া বহর সে এলাকা
অতিক্রম করতে দেখে। পুলিশের
টহল টিম প্যাট্রলিং গাড়িটি
নিয়ে অন্যপথে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পৌঁছে এই খবর দেন।
রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা যে যার মতো
প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
রাত
সোয়া ১১টার দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর
সাঁজোয়া যানসমূহ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের চারদিকে অবস্থান নিতে থাকে। তখন
পাক বাহিনীর এই আক্রমণের খবর
তাৎক্ষণিকভাবে সারাদেশের জেলা ও সাব-ডিভিশন সমূহে পুলিশের ওয়্যারলেসে পাঠানো হয়। সংবাদটি ছিল
“Base for all station of East Pakistan Police, keep” এই সময়
রাজারবাগ ওয়্যারলেস রুমে উপস্থিত ছিলেন
এএসআই ইয়াছিন আলী তরফদার, কনস্টেবল
মুসলিম আলী শরীফ, মনির
হোসেন, মতিউর রহমান মতিন, আব্দুল লতিফ, সোহরাব হোসেনসহ আরও অনেকে।
রাত
১১টা ৩৫ মিনিটের সময়
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগারের ঘণ্টা পিটিয়ে সবাইকে সতর্ক ও একত্রিত করে।
এরপর অস্ত্রাগারে কর্তব্যরত সেন্ট্রির রাইফেল থেকে গুলি করে
অস্ত্রাগারের তালা ভাঙে এবং
আরআই মফিজ উদ্দিনের নিকট
থেকে জোরপূর্বক অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ে নিজেদের
মদ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিতরণ
করে।
প্রতিরোধ
যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পুলিশ সদস্যরা পুলিশ লাইন্সের চারদিকে, ব্যারাকের ছাদে, বিভিন্ন দালানের ছাদে এবং একটি
গ্রুপ বাংলামোটরে অবস্থান নেয়। রাত ১১টা
৪০ মিনিটের সময় পাকসেনাদের কনভয়
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের মেইন গেইটে এসে
পৌঁছে।
বাঙালি
পুলিশ সদস্যরাও রাজারবাগ ব্যারাকের ছাদে, বিভিন্ন বিল্ডিং-এ এবং পুলিশ
লাইন্সের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে রাজারবাগ, চামেলীবাগ, মালিবাগসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে পজিশন নেয়। রাত পৌনে
১২টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ
লাইন্সের দক্ষিণ-পূর্ব দিক (কেন্দ্রীয় পুলিশ
হাসপাতাল কোয়ার্টার সংলগ্ন) থেকে প্রথম গুলি
বর্ষণ হয়। এরপরই প্যারেড
গ্রাউন্ডের উত্তর-পূর্ব দিক (শাহজাহানপুর ক্রসিং)
থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়।
ব্যারাকের ছাদে অবস্থানরত বাঙালি
পুলিশ সদস্যরা পাকসেনাদের লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ
শুরু করে। এরপরই শুরু
হয় দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ’। ইতিহাসে সূচনা
হয় একটি নতুন অধ্যায়ের।
রাত ১২টার দিকে বাঙ্গালী পুলিশ
সদস্যদের মরণপণ প্রতিরোধে থমকে যায় ট্যাংক
ও কামান সজ্জিত পাকবাহিনী। একটু পরই মর্টার
ও হেভি মেশিনগান দিয়ে
গুলি বর্ষণ শুরু করে। রাজারবাগ
পুলিশ লাইন্সের ৪টি ব্যারাকে আগুন
লাগে।
রাজারবাগের
প্রধান তোড়ণ ভেঙে পাকবাহিনী
ট্যাংক বহরসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করে। এই আক্রমণে
পাকবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৮শ’। রাত সাড়ে
১২টার দিকে পাকবাহিনীর ভারী
অস্ত্রের মুখে বাঙালি পুলিশ
সদস্যরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে।
গেরিলা পদ্ধতিতে পাকবাহিনীর ওপরে হামলা চালায়
এবং এতে অনেকই হতাহত
হয়। অন্য একটি গ্রুপ
অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ মালিবাগ,
চামেলীবাগ প্রান্ত দিয়ে ঢাকা শহরে
বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সেদিনকার সেই অস্ত্র আর
গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে সারাদেশে, সীমান্তবর্তী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে এবং সম্মুখ যুদ্ধে।
রাত
পৌনে ১২টার দিকে শুরু হওয়া
যুদ্ধ থেমে থেমে চলতে
থাকে রাত ৩টা থেকে
সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত।
বাঙালি পুলিশের কিছু সূর্য সন্তান
বুকে অসীম সাহস নিয়ে
সমান তালে লড়ে চলে
ট্যাংক, কামান আর মর্টারের বিরুদ্ধে।
রাত সাড়ে ৩টার দিকে
কামান আর মর্টারের আক্রমণ
এক সময় থামে। বন্দী
হয় প্রায় দেড়শ’ বাঙালি পুলিশ। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স করায়ত্ত করে দখলদারবাহিনী। তার
আগেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কিছু পুলিশ অস্ত্র,
গোলাবারুদসহ রাজারবাগ ত্যাগ করে। রাজারবাগ পুলিশ
লাইন্সের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ৫৬ হাজার
বর্গমাইলে।
২৫ মার্র্চ ’৭১ রাতে রাজারবাগে
প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে ঢাকার রিজার্ভ ফোর্সের ৭৮ জন বীর
পুলিশ সদস্য প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন। এদের
অধিকাংশই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ও পার্শ্ববর্তী এলাকা
এবং মিল ব্যারাক, রমনা
থানা, পুরান ঢাকায় বিভিন্ন এলাকায় পাক হানাদার বাহিনী
এবং তাদের দোসরদের হাতে শহীদ হন।
যেভাবে
প্রতিরোধ প্রস্তুতি: ৭ মার্চে শেখ
মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর বাঙালি পুলিশ
সদস্যদের প্রতি বিভাগীয় চ্যানেলে কোনো সুনির্দিষ্ট দিক
নির্দেশনা ছিল না। এমনি
এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কোনো সুনির্দিষ্ট রণকৌশল
ছাড়াই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বীর পুলিশ সদস্যরা
অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে নিজেদের
সনাতন ‘থ্রি নট থ্রি’
আর ‘মার্ক- টু’ রাইফেল নিয়ে
ট্যাংক, কামান, মর্টার পরিবেষ্টিত শত্রু সেনার সুপরিকল্পিত হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে
সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তা
কোনো নৈমিত্তিক ঘটনা নয়। এভাবে
নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সিদ্ধান্তহীনতা,
সমন্বয় হীনতার মধ্যে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদের সংগঠিত করে মারণাস্ত্র সজ্জিত
একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে বুক ভরা সাহস
নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার ঘটনা অত্যন্ত
বিরল।
তাদের
মন্ত্র ছিল শুধুই মাতৃভূমির
শৃঙ্খল মোচন, লড়তে জানা, মরতে
আর মারতে জানা। যাদের রক্তে আজ স্বাধীন বাংলাদেশ
তাদের আত্মত্যাগে অনুপ্রেরণা পেয়ে লক্ষ্য মুক্তিযোদ্ধা
জনতা হাতে নিয়েছে হাতিয়ার,
যে উদাহরণ কলম পেশা কেরানী,
হাল বাওয়া মাঝি, লাঙল বাওয়া কৃষককে
গাইতে শিখিয়েছে ‘তোমার ভয় নেই মা,
আমরা প্রতিবাদ করতে জানি, শত্রু
এলে অস্ত্র হাতে লড়তে জানি’,
সেসব বীর বাঙালি পুলিশ
সদস্যদের বড় গর্বিত উত্তরাধিকার
আজকের বাংলাদেশ পুলিশ। চেতনার সেই উন্মুত্ত আবেগ
পেরিয়ে স্বাধীন আজ বাংলাদেশ।
একাত্তরে
মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের এই আত্মত্যাগ ও
গৌরবের ইতিহাস তুলে ধরে রাখার
জন্য ২০১৩ সালে ২৪
মার্চ যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ
পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ঐতিহাসিক রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স প্রাঙ্গণে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন
পুলিশের গৌরবময় স্মৃতিচিহ্ন ও স্মারক সম্ভার
সাজানো রয়েছে। আর জাদুঘরে প্রথম
প্রতিরোধযুদ্ধের সেই পাগলা ঘণ্টা।
যে পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে পুলিশ সদস্যদের একত্রিত করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি
নেয়া হয়েছিল। আরও রয়েছে প্রতিরোধ
যুদ্ধে ব্যবহৃত হ্যান্ড মাইক, বেতের তৈরি ঢাল, সেই
পুরনো রাইফেলসহ প্রতিরোধ যুদ্ধের নানা ইতিহাস।

বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মার্চ ২০২৬
একাত্তরের ২৫ মার্চে ঢাকায় প্রথম গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে এ গণহত্যার প্রধান টার্গেট করা হয় পুলিশকে, আর পুলিশ বিভাগের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সকে। কিন্তু বাঙালি পুলিশ বাহিনী বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাপুরোচিত গণহত্যা প্রতিরোধ করতে জীবন দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
১৯৭১
সালের ২৫ মার্চ দুপুর
২টা। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নানা ধরনের
আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাঠানো হয়।
সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে শহরের
বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশের টহল টিম পাঠানো
হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজারবাগ
পুলিশ লাইন্সে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র থেকে খবর আসে
পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আক্রমণ করতে পারে। এই
খবরে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা বিক্ষিপ্তভাবে নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে
পাকিস্তান বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুতি নিতে
শুরু করে।
রাত
১০টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে
পুলিশের টহল টিম বেতার
মারফত জানায়, পাক বাহিনীর একটি
বড় কনভয় যুদ্ধসাজে শহরের
দিকে এগুচ্ছে। রাত সাড়ে ১০টার
দিকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে পুলিশের প্যাট্রিলং
টিম খবর পাঠায় যে,
রমনা পার্কের (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) উত্তর ও দক্ষিণ দিকে
সেনাবাহিনীর অন্তত ৭০/৮০টি সাঁজোয়া
যান পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে।
রাত
১১টার দিকে হোটেল ইন্টার
কন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থানরত পুলিশের প্যাট্রিলং টিমের সদস্যরা সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া বহর সে এলাকা
অতিক্রম করতে দেখে। পুলিশের
টহল টিম প্যাট্রলিং গাড়িটি
নিয়ে অন্যপথে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পৌঁছে এই খবর দেন।
রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা যে যার মতো
প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
রাত
সোয়া ১১টার দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর
সাঁজোয়া যানসমূহ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের চারদিকে অবস্থান নিতে থাকে। তখন
পাক বাহিনীর এই আক্রমণের খবর
তাৎক্ষণিকভাবে সারাদেশের জেলা ও সাব-ডিভিশন সমূহে পুলিশের ওয়্যারলেসে পাঠানো হয়। সংবাদটি ছিল
“Base for all station of East Pakistan Police, keep” এই সময়
রাজারবাগ ওয়্যারলেস রুমে উপস্থিত ছিলেন
এএসআই ইয়াছিন আলী তরফদার, কনস্টেবল
মুসলিম আলী শরীফ, মনির
হোসেন, মতিউর রহমান মতিন, আব্দুল লতিফ, সোহরাব হোসেনসহ আরও অনেকে।
রাত
১১টা ৩৫ মিনিটের সময়
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগারের ঘণ্টা পিটিয়ে সবাইকে সতর্ক ও একত্রিত করে।
এরপর অস্ত্রাগারে কর্তব্যরত সেন্ট্রির রাইফেল থেকে গুলি করে
অস্ত্রাগারের তালা ভাঙে এবং
আরআই মফিজ উদ্দিনের নিকট
থেকে জোরপূর্বক অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ে নিজেদের
মদ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিতরণ
করে।
প্রতিরোধ
যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পুলিশ সদস্যরা পুলিশ লাইন্সের চারদিকে, ব্যারাকের ছাদে, বিভিন্ন দালানের ছাদে এবং একটি
গ্রুপ বাংলামোটরে অবস্থান নেয়। রাত ১১টা
৪০ মিনিটের সময় পাকসেনাদের কনভয়
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের মেইন গেইটে এসে
পৌঁছে।
বাঙালি
পুলিশ সদস্যরাও রাজারবাগ ব্যারাকের ছাদে, বিভিন্ন বিল্ডিং-এ এবং পুলিশ
লাইন্সের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে রাজারবাগ, চামেলীবাগ, মালিবাগসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে পজিশন নেয়। রাত পৌনে
১২টার দিকে রাজারবাগ পুলিশ
লাইন্সের দক্ষিণ-পূর্ব দিক (কেন্দ্রীয় পুলিশ
হাসপাতাল কোয়ার্টার সংলগ্ন) থেকে প্রথম গুলি
বর্ষণ হয়। এরপরই প্যারেড
গ্রাউন্ডের উত্তর-পূর্ব দিক (শাহজাহানপুর ক্রসিং)
থেকে গুলির শব্দ শোনা যায়।
ব্যারাকের ছাদে অবস্থানরত বাঙালি
পুলিশ সদস্যরা পাকসেনাদের লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ
শুরু করে। এরপরই শুরু
হয় দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ’। ইতিহাসে সূচনা
হয় একটি নতুন অধ্যায়ের।
রাত ১২টার দিকে বাঙ্গালী পুলিশ
সদস্যদের মরণপণ প্রতিরোধে থমকে যায় ট্যাংক
ও কামান সজ্জিত পাকবাহিনী। একটু পরই মর্টার
ও হেভি মেশিনগান দিয়ে
গুলি বর্ষণ শুরু করে। রাজারবাগ
পুলিশ লাইন্সের ৪টি ব্যারাকে আগুন
লাগে।
রাজারবাগের
প্রধান তোড়ণ ভেঙে পাকবাহিনী
ট্যাংক বহরসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করে। এই আক্রমণে
পাকবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৮শ’। রাত সাড়ে
১২টার দিকে পাকবাহিনীর ভারী
অস্ত্রের মুখে বাঙালি পুলিশ
সদস্যরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে।
গেরিলা পদ্ধতিতে পাকবাহিনীর ওপরে হামলা চালায়
এবং এতে অনেকই হতাহত
হয়। অন্য একটি গ্রুপ
অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ মালিবাগ,
চামেলীবাগ প্রান্ত দিয়ে ঢাকা শহরে
বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সেদিনকার সেই অস্ত্র আর
গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে সারাদেশে, সীমান্তবর্তী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে এবং সম্মুখ যুদ্ধে।
রাত
পৌনে ১২টার দিকে শুরু হওয়া
যুদ্ধ থেমে থেমে চলতে
থাকে রাত ৩টা থেকে
সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত।
বাঙালি পুলিশের কিছু সূর্য সন্তান
বুকে অসীম সাহস নিয়ে
সমান তালে লড়ে চলে
ট্যাংক, কামান আর মর্টারের বিরুদ্ধে।
রাত সাড়ে ৩টার দিকে
কামান আর মর্টারের আক্রমণ
এক সময় থামে। বন্দী
হয় প্রায় দেড়শ’ বাঙালি পুলিশ। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স করায়ত্ত করে দখলদারবাহিনী। তার
আগেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কিছু পুলিশ অস্ত্র,
গোলাবারুদসহ রাজারবাগ ত্যাগ করে। রাজারবাগ পুলিশ
লাইন্সের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ৫৬ হাজার
বর্গমাইলে।
২৫ মার্র্চ ’৭১ রাতে রাজারবাগে
প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে ঢাকার রিজার্ভ ফোর্সের ৭৮ জন বীর
পুলিশ সদস্য প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন। এদের
অধিকাংশই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ও পার্শ্ববর্তী এলাকা
এবং মিল ব্যারাক, রমনা
থানা, পুরান ঢাকায় বিভিন্ন এলাকায় পাক হানাদার বাহিনী
এবং তাদের দোসরদের হাতে শহীদ হন।
যেভাবে
প্রতিরোধ প্রস্তুতি: ৭ মার্চে শেখ
মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর বাঙালি পুলিশ
সদস্যদের প্রতি বিভাগীয় চ্যানেলে কোনো সুনির্দিষ্ট দিক
নির্দেশনা ছিল না। এমনি
এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কোনো সুনির্দিষ্ট রণকৌশল
ছাড়াই রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের বীর পুলিশ সদস্যরা
অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে নিজেদের
সনাতন ‘থ্রি নট থ্রি’
আর ‘মার্ক- টু’ রাইফেল নিয়ে
ট্যাংক, কামান, মর্টার পরিবেষ্টিত শত্রু সেনার সুপরিকল্পিত হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে
সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তা
কোনো নৈমিত্তিক ঘটনা নয়। এভাবে
নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সিদ্ধান্তহীনতা,
সমন্বয় হীনতার মধ্যে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদের সংগঠিত করে মারণাস্ত্র সজ্জিত
একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে বুক ভরা সাহস
নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার ঘটনা অত্যন্ত
বিরল।
তাদের
মন্ত্র ছিল শুধুই মাতৃভূমির
শৃঙ্খল মোচন, লড়তে জানা, মরতে
আর মারতে জানা। যাদের রক্তে আজ স্বাধীন বাংলাদেশ
তাদের আত্মত্যাগে অনুপ্রেরণা পেয়ে লক্ষ্য মুক্তিযোদ্ধা
জনতা হাতে নিয়েছে হাতিয়ার,
যে উদাহরণ কলম পেশা কেরানী,
হাল বাওয়া মাঝি, লাঙল বাওয়া কৃষককে
গাইতে শিখিয়েছে ‘তোমার ভয় নেই মা,
আমরা প্রতিবাদ করতে জানি, শত্রু
এলে অস্ত্র হাতে লড়তে জানি’,
সেসব বীর বাঙালি পুলিশ
সদস্যদের বড় গর্বিত উত্তরাধিকার
আজকের বাংলাদেশ পুলিশ। চেতনার সেই উন্মুত্ত আবেগ
পেরিয়ে স্বাধীন আজ বাংলাদেশ।
একাত্তরে
মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের এই আত্মত্যাগ ও
গৌরবের ইতিহাস তুলে ধরে রাখার
জন্য ২০১৩ সালে ২৪
মার্চ যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ
পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ঐতিহাসিক রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স প্রাঙ্গণে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন
পুলিশের গৌরবময় স্মৃতিচিহ্ন ও স্মারক সম্ভার
সাজানো রয়েছে। আর জাদুঘরে প্রথম
প্রতিরোধযুদ্ধের সেই পাগলা ঘণ্টা।
যে পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে পুলিশ সদস্যদের একত্রিত করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি
নেয়া হয়েছিল। আরও রয়েছে প্রতিরোধ
যুদ্ধে ব্যবহৃত হ্যান্ড মাইক, বেতের তৈরি ঢাল, সেই
পুরনো রাইফেলসহ প্রতিরোধ যুদ্ধের নানা ইতিহাস।

আপনার মতামত লিখুন