সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ফোরকান আপা


হোসেন আবদুল মান্নান
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬

ফোরকান আপা
ফোরকান বেগম

এখন মার্চ মাস। তাকে স্মরণ করছি। মার্চ মুক্তিযুদ্ধের মাস, স্বাধীনতার মাস, বাঙালির আত্মত্যাগে মহিমান্বিত মাস। তিনি একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরনারী সংগঠক ছিলেন। তিনি ছিলেন ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের এক অকুতোভয় সাহসী ছাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক প্রায় সব আন্দোলন সংগ্রামের নারী নেতৃত্বে যিনি ছিলেন এক অগ্রগামী সৈনিক। রূপগঞ্জে নিজের গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন মুক্তি বাহিনী। একপর্যায়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে সংগঠিত মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ছিল অনন্য ও অপরিসীম।

তাকে আমরা ফোরকান আপা বলে ডাকতাম। প্রথম দিকে বুঝতে পারতাম না তাকে। আজিমপুর সরকারি কলোনির অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে লেডিস ক্লাবের কাছের কোয়ার্টারে বাস করতেন। তার ঘরসংসার ছিল না বা হয়ে ওঠেনি। আজীবন সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত ছিলেন। কেউ কেউ বলতেন তিনি বীরাঙ্গনা বা অন্যকিছু ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে। তবে প্রায় সারাজীবনই সচিবালয়ে কাটিয়ে গেছেন। ১৯৭৩ সালের মুক্তিযোদ্ধা ব্যাচের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। আমার মতো অনেকেই জানতেন না তার চাকরি কী এবং কোথায়? কিন্তু প্রতিদিন অফিস সময়ে তিনি সবার সঙ্গে বের হয়ে সচিবালয়ে যেতেন।

মুখের ওপর হাসি লেগেই থাকত। শ্যামলা চেহারার বিদুষী নারী বলতে যা বোঝায়। তিনি তা-ই ছিলেন। তাকে কখনও মন খারাপ অবস্থায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আজিমপুরে তিনি আমার স্ত্রীকেও চিনতেন। আজও দিব্যি চোখে ভাসছে আমি বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি ফোরকান আপা দাঁড়িয়ে, ‘এই মান্নান, আমাকে নিয়ে যান।’ বলতাম, ‘উঠুন আপা’। তিনি সচিবালয়ে নেমে যাচ্ছেন কিন্তু কোন মন্ত্রণালয়ে তার চাকরি— তা কখনও জিজ্ঞেস করিনি। এটুকুই জানতাম তিনি নন-ক্যাডার কোনো পদে কাজ করেন। কিন্তু তাকে সবাই সমীহ করে কথা বলতেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অবদানের কথা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনেকেই জানতেন। সচিবালয়ে কর্মচারীদের যেকোনো দাবিদাওয়া বিষয়ক সভা সমিতিতে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়েই অংশ নিতেন।

এক অসাধারণ অদ্ভুত চরিত্রের নারী ছিলেন ফোরকান আপা। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে জাসদের প্রবীণ নেতা ও ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আ স ম আবদুর রবের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার প্রস্তুতি পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়েকজন ছাত্রী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ফোরকান বেগম তাদের অন্যতম। যিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক তার বিষয়ে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হলে ফোরকান বেগম ভারতে আশ্রয় নিয়ে লেম্বুছড়া ক্যাম্পে থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। দেশে প্রবেশ করে যুদ্ধের পাশাপাশি তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেয়ারও ব্যবস্থা করেন।

বলাবাহুল্য, ১৯৬৯ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের আন্দোলন, মিছিল, মিটিং ইত্যাদির যেকোনো সাদা-কালো ফুটেজে মনোযোগ দিয়ে তাকালেই পাওয়া যায় সেই দুঃসাহসিক নারী রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফোরকান বেগম সেখানে আছেন। সে সময়ের ধূসর বিবর্ণ হয়ে আসা ছবিতে ফোরকান আপাকে দেখলে গর্বে মনটা ভরে যায়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের যাদের কোনো চিহ্ন নেই, অস্তিত্ব নেই, তারাও বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা বিষয়ে পরাক্রমশালী ভূমিকা পালন করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে না গিয়েও সব সুযোগ-সুবিধার নেতৃত্ব তারাই দিয়ে গেছেন। আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করে অনেকেই সমালোচিত হয়েছেন।

আ স ম আবদুর রবের কথা থেকে আরও জানা গেল, ৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মাহেন্দ্র সময়েও সেই মঞ্চের সামনের সারিতে বসা ছাত্রী নেত্রীদের মধ্যে মমতাজ বেগম ও ফোরকান বেগম প্রমুখের উপস্থিতি ছিল। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। সেদিন তার নেতৃত্বে ছাত্রীরা রেসকোর্সের সেই সভায় যোগদান করেছিল। তখনকার সমাজ বাস্তবতায় একজন নারীর এমন ভূমিকা পালন একেবারেই স্বাভাবিক ছিল না। আজকাল আমার নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে ফোরকান আপারা এদেশ থেকে কী পেয়েছিলেন? তিনি কি সরকারের বড় কোনো পদস্থ, জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন? তার কি বাড়ি, গাড়ি, ধনদৌলত, ক্ষমতা কিছু ছিল? তার কী কোনো খেতাব ছিল? তিনি কি কিছু পাওয়ার জন্যে স্বাধিকারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মহতি ছাত্র জীবনকে বাজি রেখে ছিলেন? তার মধ্যে কি বৈষয়িক লোভ লালসার কোনো ভাবনা ছিল? নিশ্চয়ই এসব কিছু তাকে কখনও প্রভাবিত করতে পারেনি।

বছর তিনেক আগে ২০২৩ সালের শেষের দিকে ফোরকান আপার জীবনাবসান হয়। বলা যায়, নীরবে নিভৃতে, সাধারণের অজান্তেই তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটা বেড থেকে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

জয়তু ফোরকান আপা।

[লেখক : গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬


ফোরকান আপা

প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬

featured Image

এখন মার্চ মাস। তাকে স্মরণ করছি। মার্চ মুক্তিযুদ্ধের মাস, স্বাধীনতার মাস, বাঙালির আত্মত্যাগে মহিমান্বিত মাস। তিনি একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরনারী সংগঠক ছিলেন। তিনি ছিলেন ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের এক অকুতোভয় সাহসী ছাত্রী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক প্রায় সব আন্দোলন সংগ্রামের নারী নেতৃত্বে যিনি ছিলেন এক অগ্রগামী সৈনিক। রূপগঞ্জে নিজের গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন মুক্তি বাহিনী। একপর্যায়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে সংগঠিত মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ছিল অনন্য ও অপরিসীম।

তাকে আমরা ফোরকান আপা বলে ডাকতাম। প্রথম দিকে বুঝতে পারতাম না তাকে। আজিমপুর সরকারি কলোনির অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে লেডিস ক্লাবের কাছের কোয়ার্টারে বাস করতেন। তার ঘরসংসার ছিল না বা হয়ে ওঠেনি। আজীবন সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত ছিলেন। কেউ কেউ বলতেন তিনি বীরাঙ্গনা বা অন্যকিছু ছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে। তবে প্রায় সারাজীবনই সচিবালয়ে কাটিয়ে গেছেন। ১৯৭৩ সালের মুক্তিযোদ্ধা ব্যাচের সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিল সুসম্পর্ক। আমার মতো অনেকেই জানতেন না তার চাকরি কী এবং কোথায়? কিন্তু প্রতিদিন অফিস সময়ে তিনি সবার সঙ্গে বের হয়ে সচিবালয়ে যেতেন।

মুখের ওপর হাসি লেগেই থাকত। শ্যামলা চেহারার বিদুষী নারী বলতে যা বোঝায়। তিনি তা-ই ছিলেন। তাকে কখনও মন খারাপ অবস্থায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আজিমপুরে তিনি আমার স্ত্রীকেও চিনতেন। আজও দিব্যি চোখে ভাসছে আমি বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি ফোরকান আপা দাঁড়িয়ে, ‘এই মান্নান, আমাকে নিয়ে যান।’ বলতাম, ‘উঠুন আপা’। তিনি সচিবালয়ে নেমে যাচ্ছেন কিন্তু কোন মন্ত্রণালয়ে তার চাকরি— তা কখনও জিজ্ঞেস করিনি। এটুকুই জানতাম তিনি নন-ক্যাডার কোনো পদে কাজ করেন। কিন্তু তাকে সবাই সমীহ করে কথা বলতেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অবদানের কথা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনেকেই জানতেন। সচিবালয়ে কর্মচারীদের যেকোনো দাবিদাওয়া বিষয়ক সভা সমিতিতে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত হয়েই অংশ নিতেন।

এক অসাধারণ অদ্ভুত চরিত্রের নারী ছিলেন ফোরকান আপা। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে জাসদের প্রবীণ নেতা ও ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আ স ম আবদুর রবের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার প্রস্তুতি পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়েকজন ছাত্রী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ফোরকান বেগম তাদের অন্যতম। যিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক তার বিষয়ে ব্যাপক তল্লাশি শুরু হলে ফোরকান বেগম ভারতে আশ্রয় নিয়ে লেম্বুছড়া ক্যাম্পে থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। দেশে প্রবেশ করে যুদ্ধের পাশাপাশি তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেয়ারও ব্যবস্থা করেন।

বলাবাহুল্য, ১৯৬৯ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের আন্দোলন, মিছিল, মিটিং ইত্যাদির যেকোনো সাদা-কালো ফুটেজে মনোযোগ দিয়ে তাকালেই পাওয়া যায় সেই দুঃসাহসিক নারী রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফোরকান বেগম সেখানে আছেন। সে সময়ের ধূসর বিবর্ণ হয়ে আসা ছবিতে ফোরকান আপাকে দেখলে গর্বে মনটা ভরে যায়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের যাদের কোনো চিহ্ন নেই, অস্তিত্ব নেই, তারাও বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা বিষয়ে পরাক্রমশালী ভূমিকা পালন করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে না গিয়েও সব সুযোগ-সুবিধার নেতৃত্ব তারাই দিয়ে গেছেন। আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করে অনেকেই সমালোচিত হয়েছেন।

আ স ম আবদুর রবের কথা থেকে আরও জানা গেল, ৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মাহেন্দ্র সময়েও সেই মঞ্চের সামনের সারিতে বসা ছাত্রী নেত্রীদের মধ্যে মমতাজ বেগম ও ফোরকান বেগম প্রমুখের উপস্থিতি ছিল। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। সেদিন তার নেতৃত্বে ছাত্রীরা রেসকোর্সের সেই সভায় যোগদান করেছিল। তখনকার সমাজ বাস্তবতায় একজন নারীর এমন ভূমিকা পালন একেবারেই স্বাভাবিক ছিল না। আজকাল আমার নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে ফোরকান আপারা এদেশ থেকে কী পেয়েছিলেন? তিনি কি সরকারের বড় কোনো পদস্থ, জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন? তার কি বাড়ি, গাড়ি, ধনদৌলত, ক্ষমতা কিছু ছিল? তার কী কোনো খেতাব ছিল? তিনি কি কিছু পাওয়ার জন্যে স্বাধিকারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মহতি ছাত্র জীবনকে বাজি রেখে ছিলেন? তার মধ্যে কি বৈষয়িক লোভ লালসার কোনো ভাবনা ছিল? নিশ্চয়ই এসব কিছু তাকে কখনও প্রভাবিত করতে পারেনি।

বছর তিনেক আগে ২০২৩ সালের শেষের দিকে ফোরকান আপার জীবনাবসান হয়। বলা যায়, নীরবে নিভৃতে, সাধারণের অজান্তেই তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটা বেড থেকে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

জয়তু ফোরকান আপা।

[লেখক : গল্পকার]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত