স্বাধীনতা যেকোনো জাতির জীবনে শ্রেষ্ঠ অর্জন। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতা লাভ করতে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে। সব জাতির স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ প্রয়োজন হয়নি। বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেছে— নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, যেখানে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে। দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছে। তারপর এই স্বাধীনতা লাভ করেছে।
সুতরাং, বাঙালির এই স্বাধীনতা বিষয়টি অন্য দেশের স্বাধীনতা লাভের চাইতে অবশ্যই একটু আলাদা। পৃথিবীর অনেক জাতি সংগ্রাম করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। আবার অনেক দেশ শুধু অধ্যাদেশের বা ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। কোনো কোনো দেশ ঔপনিবেশিক বা অন্যান্য রাজকীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে— রাজতান্ত্রিক বা শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে।
ভারত বিভাগ, অর্থাৎ ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে ভারত বিভাজিত হয়, সেটিও ঠিক আক্ষরিক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি। বাঙালি জাতিকে ৪৭-এর বিভাজনের পরে খুব সঙ্গতভাবেই এদেশের মানুষ উপলব্ধি করেছে যে তারা প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেনি। এই স্বাধীনতা লাভ না করার পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তো ছিলই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাতিগত সংকট বা জাতীয়তাবাদের চেতনার সংকট।
বাঙালি জাতির এই ভূমি থেকে উৎসারিত যে চেতনা, যে মনন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনাচার দিয়ে তৈরি হয়েছে— সেটি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজিত পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে মানুষ অনুশীলন করতে পারেনি, চর্চা করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী পরিচয়, সেই পরিচয় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেনি পাকিস্তানে।
এই অনানুষ্ঠানিক বাঙালিয়ানার শক্তিকে পাকিস্তানিরা ভয় পেত এবং হিংসা করত। তারা বাঙালিকে শুধু চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার করেনি, শুধু অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার করেনি, শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করেছে। তার সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে— তার গান, নৃত্য বা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে শত শত বছর ধরে চলে আসা বাঙালির উৎসব ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড— সেগুলোকেও তারা অপছন্দ করত। এমনকি তারা এর চর্চাকে ভয় পেত।
কারণ তারা মনে করত, বাঙালি যদি তার নিজস্ব পরিচয়ে সমৃদ্ধ হয়, তাহলে একদিন তারা যে বৈষম্যমূলক শাসন, শোষণ ও নিপীড়ন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানবাসীর ওপর পরিচালনা করছিল, সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সবসময় ভয় করত, হিংসা করত এবং এ ধরনের সামাজিক ও জাতীয় কর্মকাণ্ডকে শুধু নিরুৎসাহিতই নয়, কখনও কখনও বাধাগ্রস্তও করত।
রবীন্দ্রসংগীত চর্চার ক্ষেত্রে তারা অনেক বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল। ঠিক তেমনই নাট্যকলা চর্চার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ছিল। নজরুলের অনেক কবিতা, প্রবন্ধ ভজন, কীর্তনসহ অনেক কালজয়ী সংগীতকেও এদেশে অলিখিতভাবে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো। বাংলা ভাষাকেও তারা ভয় পেত। সে কারণেই ভাষার দাবিতে বাঙালিকে আন্দোলন করতে হয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের কথা এই জাতি সবসময় শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ রাখে।
তাই বাঙালি যে মুক্তিযুদ্ধ করেছে— সেটি শুধু মানচিত্র পরিবর্তন বা শুধু একটি পতাকা পরিবর্তনের জন্য নয়। শুধু কোনো বিশেষ উর্দুভাষী ব্যক্তির পরিবর্তে বাঙালি নামের কোনো মানুষের দ্বারা শাসিত হওয়ার জন্যও নয়। আসলে আকাঙ্ক্ষা ছিল আমাদের নিজস্ব মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, নিজস্ব সংস্কৃতির চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙালির সম্ভাবনাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করা।
বাঙালির অনেক সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য ছিল এবং তার বিচ্ছিন্ন অবয়ব এখনও বিরজমান। সেগুলোকে ধারণ করে, চর্চা করে এবং আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানবসম্পদ ব্যবহার করে এবং দীর্ঘদিন বিজাতীয়দের দ্বারা শাসিত ও শোষিত বাঙালির ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়ানোর যে আকাঙ্ক্ষা, যা কোনো একক ব্যক্তির ছিল না, কোনো একক দলেরও ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলার ভূখণ্ডের সব মানুষের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সেই চেতনার সমৃদ্ধ জাতি নির্মাণের।
এখানে বাংলা ভাষাভাষী তো বটেই, যারা অন্য ভাষাভাষী নৃগোষ্ঠী , তারাও একটি উদার রাষ্ট্রনীতি চাইতেন— যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান সুযোগ ভোগ করে রাষ্ট্রীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করবে। সেটি ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
এটি কোনো লিখিত দলিলের প্রয়োজন ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডের মানুষের একটি অলিখিত ঐকমত্য (কনসেনসাস)— সমস্ত বাঙালির একটি স্বাভাবিক জনমত। সেই আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে বাঙালি নয় মাসের মরণপণ যে যুদ্ধ করেছিল, সেটিই হলো মুক্তিযুদ্ধ।
সেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা লাভ করা— এটি আসলে শুধু কোনো অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনো নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীন পরিচয় লাভ করা নয়। এটি বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের হৃদয়ে লালিত স্বপ্নে ভরা এক বিশাল শক্তিমত্তায় ঋদ্ধ আকাঙ্ক্ষা।
সে আকাঙ্ক্ষা হলো— বাঙালি পৃথিবীর কোনো জাতির চাইতে ছোট নয়। সুতরাং আমাদের স্বাধীনতা শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনের স্বাধীনতা নয়। এ স্বাধীনতা বাঙালির হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা, এটি বাঙালির চিরায়ত জাতীয়তাবাদী চেতনার আকাঙ্ক্ষা, মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে পরিচিত লাভের আকাঙ্ক্ষা।
এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা, কোনো গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা বা কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সংকীর্ণতা এই আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে পারে না, খণ্ডিত করতে পারে না। বরং এটি হলো তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আজকের দিনের আঠারো কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা।
কাজেই আজকে যে স্বাধীনতা দিবস— এই স্বাধীনতা দিবস বাঙালির ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা, সে আকাঙ্ক্ষার ফসল। প্রকৃত স্বাধীন, মুক্ত, উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা— সে আকাঙ্ক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আজকের স্বাধীনতা দিবস।
এই স্বাধীনতা দিবসকে কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এটি আঠারো কোটি বাঙালির সম্পদ। এই স্বাধীনতার আস্বাদন প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে— এটি হলো আজকের দিনের অঙ্গীকার।
বাঙালি অতীতে কখনই কোনো সংকীর্ণ স্বার্থের কাছে বা কোনো দাম্ভিক শক্তির কাছে হার মানেনি এবং ভবিষ্যতেও কখনও হার মানবে না। বাঙালি উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করবে— সেটিই আজকের দিনের স্বাধীনতা দিবসের আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক : সাবেক প্রোভাইস চ্যান্সেলর, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬
স্বাধীনতা যেকোনো জাতির জীবনে শ্রেষ্ঠ অর্জন। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই স্বাধীনতা লাভ করতে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে। সব জাতির স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ প্রয়োজন হয়নি। বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করেছে— নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, যেখানে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে। দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছে। তারপর এই স্বাধীনতা লাভ করেছে।
সুতরাং, বাঙালির এই স্বাধীনতা বিষয়টি অন্য দেশের স্বাধীনতা লাভের চাইতে অবশ্যই একটু আলাদা। পৃথিবীর অনেক জাতি সংগ্রাম করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। আবার অনেক দেশ শুধু অধ্যাদেশের বা ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। কোনো কোনো দেশ ঔপনিবেশিক বা অন্যান্য রাজকীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে— রাজতান্ত্রিক বা শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে।
ভারত বিভাগ, অর্থাৎ ব্রিটিশদের কাছ থেকে যে ভারত বিভাজিত হয়, সেটিও ঠিক আক্ষরিক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হয়নি। বাঙালি জাতিকে ৪৭-এর বিভাজনের পরে খুব সঙ্গতভাবেই এদেশের মানুষ উপলব্ধি করেছে যে তারা প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করেনি। এই স্বাধীনতা লাভ না করার পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তো ছিলই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাতিগত সংকট বা জাতীয়তাবাদের চেতনার সংকট।
বাঙালি জাতির এই ভূমি থেকে উৎসারিত যে চেতনা, যে মনন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জীবনাচার দিয়ে তৈরি হয়েছে— সেটি দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজিত পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিকভাবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে মানুষ অনুশীলন করতে পারেনি, চর্চা করতে পারেনি। স্বাভাবিকভাবে বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী পরিচয়, সেই পরিচয় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেনি পাকিস্তানে।
এই অনানুষ্ঠানিক বাঙালিয়ানার শক্তিকে পাকিস্তানিরা ভয় পেত এবং হিংসা করত। তারা বাঙালিকে শুধু চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার করেনি, শুধু অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার করেনি, শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য করেছে। তার সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে— তার গান, নৃত্য বা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে শত শত বছর ধরে চলে আসা বাঙালির উৎসব ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড— সেগুলোকেও তারা অপছন্দ করত। এমনকি তারা এর চর্চাকে ভয় পেত।
কারণ তারা মনে করত, বাঙালি যদি তার নিজস্ব পরিচয়ে সমৃদ্ধ হয়, তাহলে একদিন তারা যে বৈষম্যমূলক শাসন, শোষণ ও নিপীড়ন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানবাসীর ওপর পরিচালনা করছিল, সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সবসময় ভয় করত, হিংসা করত এবং এ ধরনের সামাজিক ও জাতীয় কর্মকাণ্ডকে শুধু নিরুৎসাহিতই নয়, কখনও কখনও বাধাগ্রস্তও করত।
রবীন্দ্রসংগীত চর্চার ক্ষেত্রে তারা অনেক বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল। ঠিক তেমনই নাট্যকলা চর্চার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ছিল। নজরুলের অনেক কবিতা, প্রবন্ধ ভজন, কীর্তনসহ অনেক কালজয়ী সংগীতকেও এদেশে অলিখিতভাবে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো। বাংলা ভাষাকেও তারা ভয় পেত। সে কারণেই ভাষার দাবিতে বাঙালিকে আন্দোলন করতে হয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের কথা এই জাতি সবসময় শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ রাখে।
তাই বাঙালি যে মুক্তিযুদ্ধ করেছে— সেটি শুধু মানচিত্র পরিবর্তন বা শুধু একটি পতাকা পরিবর্তনের জন্য নয়। শুধু কোনো বিশেষ উর্দুভাষী ব্যক্তির পরিবর্তে বাঙালি নামের কোনো মানুষের দ্বারা শাসিত হওয়ার জন্যও নয়। আসলে আকাঙ্ক্ষা ছিল আমাদের নিজস্ব মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, নিজস্ব সংস্কৃতির চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বাঙালির সম্ভাবনাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করা।
বাঙালির অনেক সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য ছিল এবং তার বিচ্ছিন্ন অবয়ব এখনও বিরজমান। সেগুলোকে ধারণ করে, চর্চা করে এবং আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানবসম্পদ ব্যবহার করে এবং দীর্ঘদিন বিজাতীয়দের দ্বারা শাসিত ও শোষিত বাঙালির ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়ানোর যে আকাঙ্ক্ষা, যা কোনো একক ব্যক্তির ছিল না, কোনো একক দলেরও ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলার ভূখণ্ডের সব মানুষের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সেই চেতনার সমৃদ্ধ জাতি নির্মাণের।
এখানে বাংলা ভাষাভাষী তো বটেই, যারা অন্য ভাষাভাষী নৃগোষ্ঠী , তারাও একটি উদার রাষ্ট্রনীতি চাইতেন— যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান সুযোগ ভোগ করে রাষ্ট্রীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করবে। সেটি ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
এটি কোনো লিখিত দলিলের প্রয়োজন ছিল না। এটি ছিল গোটা বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডের মানুষের একটি অলিখিত ঐকমত্য (কনসেনসাস)— সমস্ত বাঙালির একটি স্বাভাবিক জনমত। সেই আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে বাঙালি নয় মাসের মরণপণ যে যুদ্ধ করেছিল, সেটিই হলো মুক্তিযুদ্ধ।
সেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা লাভ করা— এটি আসলে শুধু কোনো অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনো নতুন রাষ্ট্রের স্বাধীন পরিচয় লাভ করা নয়। এটি বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের হৃদয়ে লালিত স্বপ্নে ভরা এক বিশাল শক্তিমত্তায় ঋদ্ধ আকাঙ্ক্ষা।
সে আকাঙ্ক্ষা হলো— বাঙালি পৃথিবীর কোনো জাতির চাইতে ছোট নয়। সুতরাং আমাদের স্বাধীনতা শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনের স্বাধীনতা নয়। এ স্বাধীনতা বাঙালির হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা, এটি বাঙালির চিরায়ত জাতীয়তাবাদী চেতনার আকাঙ্ক্ষা, মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে পরিচিত লাভের আকাঙ্ক্ষা।
এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা, কোনো গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা বা কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সংকীর্ণতা এই আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে পারে না, খণ্ডিত করতে পারে না। বরং এটি হলো তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডের মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আজকের দিনের আঠারো কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা।
কাজেই আজকে যে স্বাধীনতা দিবস— এই স্বাধীনতা দিবস বাঙালির ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা, সে আকাঙ্ক্ষার ফসল। প্রকৃত স্বাধীন, মুক্ত, উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা— সে আকাঙ্ক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আজকের স্বাধীনতা দিবস।
এই স্বাধীনতা দিবসকে কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এটি আঠারো কোটি বাঙালির সম্পদ। এই স্বাধীনতার আস্বাদন প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে— এটি হলো আজকের দিনের অঙ্গীকার।
বাঙালি অতীতে কখনই কোনো সংকীর্ণ স্বার্থের কাছে বা কোনো দাম্ভিক শক্তির কাছে হার মানেনি এবং ভবিষ্যতেও কখনও হার মানবে না। বাঙালি উদার বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করবে— সেটিই আজকের দিনের স্বাধীনতা দিবসের আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক : সাবেক প্রোভাইস চ্যান্সেলর, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন