পদ্মাপাড়ের দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিডুবির মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় চোখের সামনে স্ত্রী ও সাত মাসের শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন চিকিৎসক নুরুজ্জামান। অথচ দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগেই বড় মেয়ের আবদার মেটাতে চিপস কিনতে বাস থেকে নেমেছিলেন তিনি। সেই চিপস কেনা তাঁর ও চার বছরের মেয়ের জীবনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ফিরে এলেও বাসডুবিতে কেড়ে নিয়েছে পরিবারের বাকি সদস্যদের।
জানা গেছে, ঈদের তিন দিন আগে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাঁচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকারবাড়িয়া গ্রামের বাড়িতে আসেন মো. নুরুজ্জামান, তাঁর স্ত্রী আয়েশা আক্তার ও দুই সন্তান। ছয় বছর আগে সাভারের সিআরপি (সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্য প্যারালাইজড) থেকে ফিজিওথেরাপিস্ট বিষয়ে (এমবিবিএস সমমনা) পড়ালেখা শেষ করে নুরুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রী সাভার ও মিরপুরের সিআরপি হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দেন।
নুরুজ্জামান শৈলকুপার খন্দকারবাড়িয়া গ্রামের মো. কামরুজ্জামানের ছেলে। চার বছর আগে তিনি আয়েশার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে আসে ফুটফুটে দুই সন্তান—চার বছরের কন্যা নওয়ারা ও সাত মাসের পুত্র আরশান।
ঈদ আনন্দ শেষে কুমারখালী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাসে ঢাকায় কর্মস্থলে ফেরার সময় বুধবার বিকেলে রাজবাড়ির গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সাজানো স্বপ্নের সলিলসমাধি হয় পদ্মার ঘোলা জলে। চোখের সামনে পদ্মায় বাসসহ তলিয়ে যেতে দেখেন স্ত্রী আয়েশা ও পুত্র আরশানকে। তবে বাস থেকে নেমে শিশুকন্যার জন্য চিপস কিনতে এসে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান নুরুজ্জামান ও তাঁর মেয়ে নওয়ারা।
বৃহস্পতিবার সকালে নুরুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে গেলে শুনশান নীরবতা। নুরুজ্জামানের মা বেঁচে না থাকায় নেই কান্নার রোল। বাবা কামরুজ্জামান রওনা হচ্ছেন পুত্রবধূ আয়েশা ও নাতি আরশানের দাফনের জন্য ঢাকার সাভারের নয়ারহাটে।
কামরুজ্জামান জানান, ঈদের চার দিন আগে স্বপরিবারে বাড়িতে আসেন নুরুজ্জামান। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। তাঁর এক ভাই কানাডায় প্রবাসী, আরেক ভাই আদমজী এস্টেটের প্রকৌশলী। ঢাকার সিআরপি থেকে এমবিবিএস সমমনা ফিজিওথেরাপিস্ট বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করে ছেলে ও পুত্রবধূ একই প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। চার বছর আগে সাভারের নয়ারহাটে আয়েশার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর তাদের ঘরে আসে দুই সন্তান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা কুমারখালী থেকে বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। বিকেলে হঠাৎ নুরুজ্জামান ফোন করে তাঁকে বলেন, ‘আব্বা, আমার সব শেষ। আপনার বৌমা ও আরশান বাসসহ ফেরিঘাটে পদ্মায় তলিয়ে গেছে।’ সন্তানের চিপস কিনতে বাস থেকে নেমে বেঁচে যান নুরুজ্জামান ও তাঁর কন্যা নওয়ারা। রাত তিনটার দিকে বাসের ভেতর থেকে মরদেহ দুটি পাওয়া যায় বলে জানান তিনি। পুত্রবধূ আয়েশার বাবার ইচ্ছায় সাভারের নয়ারহাটে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হবে বলে তিনি সেখানে রওনা হচ্ছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে নুরুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প বসতো। এবার বাড়ি এসে শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় তাঁরা মেডিকেল ক্যাম্প করতে পারেননি। শুধু গল্প হয়েছে মানুষের মৃত্যু নিয়ে।
নুরুজ্জামানের মামা কুমারখালীর পান্টি গ্রামের বুলবুল আহমেদের সঙ্গে বাড়িতে কথা হয়। তিনি জানান, বুধবার রাত নটা পর্যন্ত তাঁর ও তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে পান্টি বাজারে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। এরপর ভাগ্নে বলে, ‘আগামীকাল চলে যাচ্ছি, আর দেখা হবে না।’ পরে বুধবার বিকেলে শুনলাম হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা।
নুরুজ্জামানের ভাতিজা মোবাশ্বির আহমেদ জায়েদ বলেন, তাঁর চাচা-চাচী দুজন অভিজ্ঞ ডাক্তার। প্রতিবছর ঈদে বাড়িতে এসে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করেন। গ্রামের সবাই প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসে তাঁদের দেখাতেন—ভুল চিকিৎসা হচ্ছে কিনা। কিন্তু এবার শারীরিকভাবে একটু অসুস্থ থাকায় মেডিকেল ক্যাম্প করতে পারেননি। তাঁরা দুজন খুব মানবিক ছিলেন।
প্রতিবেশী সাফুরা খাতুন বলেন, ‘বাস দুর্ঘটনার খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর নিহতের শ্বশুরবাড়ি শৈলকুপায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সে আমাদের গ্রামের বৌমা। কোলে সাত মাসের সন্তান, সেই সন্তানসহ মারা গেছে। গ্রামের সবাই এই ঘটনায় মর্মাহত।’
ফোনে নুরুজ্জামান বলেন, ‘বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় কুমারখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা যাওয়া-আসা করি। ছুটি শেষে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে ঢাকা যাচ্ছিলাম। পথে ফেরিতে ওঠার সময় গাড়ি সিরিয়ালে ছিল। তখন আমি আর বড় মেয়ে নওয়ারা বাস থেকে নেমে যাই। আর স্ত্রী আয়েশা ও ছোট সন্তান আরশান বাসেই ছিল। পরে বাসটি নদীতে পড়ে যায়।’
শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। জানতে পেরেছি, নিহত মা ও শিশু সন্তানের মরদেহ সাভারে গৃহবধূর নিজ গ্রামে দাফন করা হবে। তবুও পরিবার থেকে কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে।’
উল্লেখ্য, গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটের তিন নম্বর পন্টুন থেকে কুষ্টিয়াগামী (ঢাকাগামী) সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান। নিহতদের পরিবারকে দাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬
পদ্মাপাড়ের দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিডুবির মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় চোখের সামনে স্ত্রী ও সাত মাসের শিশুপুত্রকে হারিয়েছেন চিকিৎসক নুরুজ্জামান। অথচ দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগেই বড় মেয়ের আবদার মেটাতে চিপস কিনতে বাস থেকে নেমেছিলেন তিনি। সেই চিপস কেনা তাঁর ও চার বছরের মেয়ের জীবনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ফিরে এলেও বাসডুবিতে কেড়ে নিয়েছে পরিবারের বাকি সদস্যদের।
জানা গেছে, ঈদের তিন দিন আগে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাঁচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকারবাড়িয়া গ্রামের বাড়িতে আসেন মো. নুরুজ্জামান, তাঁর স্ত্রী আয়েশা আক্তার ও দুই সন্তান। ছয় বছর আগে সাভারের সিআরপি (সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্য প্যারালাইজড) থেকে ফিজিওথেরাপিস্ট বিষয়ে (এমবিবিএস সমমনা) পড়ালেখা শেষ করে নুরুজ্জামান ও তাঁর স্ত্রী সাভার ও মিরপুরের সিআরপি হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দেন।
নুরুজ্জামান শৈলকুপার খন্দকারবাড়িয়া গ্রামের মো. কামরুজ্জামানের ছেলে। চার বছর আগে তিনি আয়েশার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে আসে ফুটফুটে দুই সন্তান—চার বছরের কন্যা নওয়ারা ও সাত মাসের পুত্র আরশান।
ঈদ আনন্দ শেষে কুমারখালী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাসে ঢাকায় কর্মস্থলে ফেরার সময় বুধবার বিকেলে রাজবাড়ির গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সাজানো স্বপ্নের সলিলসমাধি হয় পদ্মার ঘোলা জলে। চোখের সামনে পদ্মায় বাসসহ তলিয়ে যেতে দেখেন স্ত্রী আয়েশা ও পুত্র আরশানকে। তবে বাস থেকে নেমে শিশুকন্যার জন্য চিপস কিনতে এসে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান নুরুজ্জামান ও তাঁর মেয়ে নওয়ারা।
বৃহস্পতিবার সকালে নুরুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে গেলে শুনশান নীরবতা। নুরুজ্জামানের মা বেঁচে না থাকায় নেই কান্নার রোল। বাবা কামরুজ্জামান রওনা হচ্ছেন পুত্রবধূ আয়েশা ও নাতি আরশানের দাফনের জন্য ঢাকার সাভারের নয়ারহাটে।
কামরুজ্জামান জানান, ঈদের চার দিন আগে স্বপরিবারে বাড়িতে আসেন নুরুজ্জামান। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। তাঁর এক ভাই কানাডায় প্রবাসী, আরেক ভাই আদমজী এস্টেটের প্রকৌশলী। ঢাকার সিআরপি থেকে এমবিবিএস সমমনা ফিজিওথেরাপিস্ট বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করে ছেলে ও পুত্রবধূ একই প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। চার বছর আগে সাভারের নয়ারহাটে আয়েশার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর তাদের ঘরে আসে দুই সন্তান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা কুমারখালী থেকে বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। বিকেলে হঠাৎ নুরুজ্জামান ফোন করে তাঁকে বলেন, ‘আব্বা, আমার সব শেষ। আপনার বৌমা ও আরশান বাসসহ ফেরিঘাটে পদ্মায় তলিয়ে গেছে।’ সন্তানের চিপস কিনতে বাস থেকে নেমে বেঁচে যান নুরুজ্জামান ও তাঁর কন্যা নওয়ারা। রাত তিনটার দিকে বাসের ভেতর থেকে মরদেহ দুটি পাওয়া যায় বলে জানান তিনি। পুত্রবধূ আয়েশার বাবার ইচ্ছায় সাভারের নয়ারহাটে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হবে বলে তিনি সেখানে রওনা হচ্ছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে নুরুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প বসতো। এবার বাড়ি এসে শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় তাঁরা মেডিকেল ক্যাম্প করতে পারেননি। শুধু গল্প হয়েছে মানুষের মৃত্যু নিয়ে।
নুরুজ্জামানের মামা কুমারখালীর পান্টি গ্রামের বুলবুল আহমেদের সঙ্গে বাড়িতে কথা হয়। তিনি জানান, বুধবার রাত নটা পর্যন্ত তাঁর ও তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে পান্টি বাজারে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। এরপর ভাগ্নে বলে, ‘আগামীকাল চলে যাচ্ছি, আর দেখা হবে না।’ পরে বুধবার বিকেলে শুনলাম হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা।
নুরুজ্জামানের ভাতিজা মোবাশ্বির আহমেদ জায়েদ বলেন, তাঁর চাচা-চাচী দুজন অভিজ্ঞ ডাক্তার। প্রতিবছর ঈদে বাড়িতে এসে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করেন। গ্রামের সবাই প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসে তাঁদের দেখাতেন—ভুল চিকিৎসা হচ্ছে কিনা। কিন্তু এবার শারীরিকভাবে একটু অসুস্থ থাকায় মেডিকেল ক্যাম্প করতে পারেননি। তাঁরা দুজন খুব মানবিক ছিলেন।
প্রতিবেশী সাফুরা খাতুন বলেন, ‘বাস দুর্ঘটনার খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর নিহতের শ্বশুরবাড়ি শৈলকুপায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সে আমাদের গ্রামের বৌমা। কোলে সাত মাসের সন্তান, সেই সন্তানসহ মারা গেছে। গ্রামের সবাই এই ঘটনায় মর্মাহত।’
ফোনে নুরুজ্জামান বলেন, ‘বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় কুমারখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা যাওয়া-আসা করি। ছুটি শেষে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে ঢাকা যাচ্ছিলাম। পথে ফেরিতে ওঠার সময় গাড়ি সিরিয়ালে ছিল। তখন আমি আর বড় মেয়ে নওয়ারা বাস থেকে নেমে যাই। আর স্ত্রী আয়েশা ও ছোট সন্তান আরশান বাসেই ছিল। পরে বাসটি নদীতে পড়ে যায়।’
শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। জানতে পেরেছি, নিহত মা ও শিশু সন্তানের মরদেহ সাভারে গৃহবধূর নিজ গ্রামে দাফন করা হবে। তবুও পরিবার থেকে কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে।’
উল্লেখ্য, গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটের তিন নম্বর পন্টুন থেকে কুষ্টিয়াগামী (ঢাকাগামী) সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান। নিহতদের পরিবারকে দাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন