শপিং ব্যাগের মূল্য: পরিবেশ রক্ষা না কি বিপণন কৌশল
শপিংমলে বা সুপারশপে কেনাকাটা শেষে কাউন্টারে বিল দেয়ার সময় প্রায়ই আমাদের একটি পরিচিত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়— ‘স্যার/ম্যাডাম, আপনার কি ব্যাগ লাগবে’ হ্যাঁ বললেই মূল বিলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় শপিং ব্যাগের দাম। আকার ও ধরনভেদে এই মূল্য ৫ টাকা থেকে শুরু করে ২০ বা ২৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণ ভোক্তাদের মনে প্রায়ই একটি ক্ষোভ ও প্রশ্ন জাগে— যে দোকান থেকে হাজার টাকার বাজার করলাম, তারা কেন সামান্য একটি ব্যাগ বিনামূল্যে দিতে পারবে না ভোক্তাদের কাছ থেকে শপিং ব্যাগের এই মূল্য আদায় করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের।শপিং ব্যাগের দাম রাখার পক্ষে ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো পরিবেশ সংরক্ষণ। একসময় পলিথিন ব্যাগের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নদীর মারাত্মক ক্ষতি করেছে। পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ার পর পাট, মোটা কাগজ বা কাপড়ের তৈরি পরিবেশবান্ধব বা রিইউজেবল (পুনরায় ব্যবহারযোগ্য) ব্যাগের প্রচলন শুরু হয়। এই ব্যাগগুলোর উৎপাদন খরচ সাধারণ পলিথিনের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া পরিবেশবাদীদের মতে, ব্যাগের ওপর মূল্য নির্ধারণ করা হলে ভোক্তারা অকারণে একাধিক ব্যাগ নেয়া থেকে বিরত থাকেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাগের ওপর সামান্য মূল্য আরোপ করা হলে ‘সিঙ্গেল-ইউজ’ বা একবার ব্যবহারযোগ্য ব্যাগের ব্যবহার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাগের মূল্য রাখাকে একটি পরোক্ষ ‘গ্রিন ট্যাক্স’ হিসেবে দেখা যায়, যা ভোক্তাদের বাসা থেকে নিজস্ব ব্যাগ বহনে উৎসাহিত করে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে, যা ভোক্তাদের পক্ষের যুক্তি। সাধারণ ব্যবসায়িক নীতি অনুযায়ী, পণ্য বিক্রি করা এবং তা ক্রেতার হাতে নিরাপদে বহনযোগ্য অবস্থায় পৌঁছে দেয়া বিক্রেতার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। পণ্যের মোড়কীকরণ বা প্যাকেজিং খরচ সাধারণত পণ্যের দামের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। তাই আলাদা করে ব্যাগের দাম নেয়াটাকে অনেক ভোক্তা ‘দ্বৈত চার্জ’ বা ডাবল চার্জ হিসেবে মনে করেন।ভোক্তাদের সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গাটি হলো ‘ব্র্যান্ডিং’ বা বিজ্ঞাপন। সুপারশপ বা বড় ব্র্যান্ডগুলো তাদের বিক্রি করা ব্যাগের গায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বিশাল লোগো ও নাম ছাপিয়ে রাখে। ক্রেতা যখন নিজের টাকায় কেনা সেই ব্যাগ হাতে নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটেন, তখন তিনি মূলত ওই প্রতিষ্ঠানের একজন বিনা বেতনের বিজ্ঞাপনী প্রচারক বা বিলবোর্ড হিসেবে কাজ করেন। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে অন্য কোম্পানির বিজ্ঞাপন বহন করাটা ভোক্তাদের কাছে একেবারেই অযৌক্তিক ও অন্যায্য মনে হয়। ভারতে ইতোমধ্যে ভোক্তা অধিকার আদালত বেশ কয়েকটি রায়ে বলেছে যে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাগের দাম রাখে, তবে সেই ব্যাগে তাদের কোনো লোগো বা বিজ্ঞাপন থাকতে পারবে না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি ভেবে দেখার মতো। কোনো ক্রেতাকে পণ্য বহনের জন্য ব্র্যান্ডের ব্যাগ কিনতে বাধ্য করা অনুচিত।তাহলে যৌক্তিক সমাধান কী পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে শপিং ব্যাগের ব্যবহার কমানো এবং টেকসই ব্যাগের ওপর মূল্য আরোপ করাকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যাবে না। তবে এটিকে মুনাফা বা বিনা পয়সায় বিজ্ঞাপনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাও নৈতিক নয়। আদর্শ চর্চা হওয়া উচিত— বিক্রেতা বিনামূল্যে একটি সাধারণ (লোগোবিহীন) বা কাগজের প্যাকেট সরবরাহ করবেন। আর ক্রেতা যদি টেকসই, বড় বা ব্র্যান্ডের কোনো ব্যাগ চান, তবেই তার জন্য স্বেচ্ছায় মূল্য পরিশোধ করবেন। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। এই বিতর্কের সবচেয়ে সুন্দর এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হলো— বাড়ি থেকে নিজের কাপড়ের বা পাটের ব্যাগটি নিয়ে বাজারে যাওয়ার পুরনো ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসটি ফিরিয়ে আনা। এতে আপনার পকেটের টাকাও বাঁচবে, আর আমাদের পৃথিবীও প্লাস্টিক বা অতিরিক্ত বর্জ্যের হাত থেকে রক্ষা পাবে।আমানুর রহমানশাসনগাও, পঞ্চবটী, নারায়ণগঞ্জ সদর