একটি বিড়ালের মৃত্যু, কিছু প্রশ্ন
গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ আমি আমার বিড়ালদের কৃমি ও উকুনের সমস্যা নিয়ে গাজীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যাই। প্রথমে একজন নারী কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি আমাকে পাশের কক্ষে যেতে বলেন। সেখানে একজন কর্মকর্তা বসে ছিলেন। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও তিনি আমাকে বসতে বললেন না বা কোনো মনোযোগ দিলেন না। পরে নিজেই চেয়ার টেনে বসি। আমি একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বা কারও স্ত্রী হিসেবে বিশেষ সুবিধা চাইনি; একজন সাধারণ সেবাপ্রার্থী হিসেবে সামান্য সৌজন্যই আশা করেছিলাম। আমি যখন বিড়ালদের সমস্যার কথা জানাই, তিনি আমার নাম জানতে চান। আমি বলি, ‘সন্ধ্যা রানী সাহা।’ নাম শুনে তিনি অবজ্ঞার সুরে বলেন, ‘সকাল রানী কিংবা বিকাল রানী কেন নয়?’ এমন মন্তব্যে আমি মর্মাহত হই। পরে তিনি বেনাজল ভেট ও নিভাপিম ভেট নামে দুটি ওষুধ লিখে দেন। পরে আমি পরিচয় দিলে তিনি আলমারি থেকে ওষুধ দুটি বের করে দেন। এরপর আমি আমার এক বছর বয়সী একটি মা বিড়ালের স্পে (পোষা প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সার্জারি) করানোর বিষয়ে জানতে চাই। বিড়ালটির তখন এক মাস বয়সী তিনটি বাচ্চা ছিল। তিনি জানান, ব্যবস্থা আছে এবং আমাকে পরদিন সকাল ৮টায় আসতে বলেন। পরদিন সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে আমি বিড়াল নিয়ে তার অফিসে যাই। তিনি আরও প্রায় এক ঘণ্টা পরে আসেন। পরে জানতে পারি, তিনি ভেটেরিনারি সার্জন। তিনি প্রথমে তিন হাজার টাকা চান। আমি টাকা দিলে তিনি বিড়াল আনতে বলেন। পরে বলেন, জলাতঙ্কেরইনজেকশনের জন্য আরও এক হাজার টাকা লাগবে। আমি সেটিও দিই। কিন্তু মোট চার হাজার টাকা নেয়ার পরও কোনো রশিদ দেয়া হয়নি। আমার প্রশ্ন হলো, হাসপাতালের যদি কোনো নির্ধারিত চার্জ থাকে, তাহলে রশিদ দেয়া হবে না কেন? প্রবেশপথে লেখা ছিল—‘কাউকে কোনো টাকা-পয়সা দেবেন না।’ অথচ বাস্তবে কোনো প্রমাণপত্র ছাড়াই টাকা নেয়া হলো। বিড়ালকে ইনজেকশন দেয়ার আগে ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘বিড়াল চিকিৎসা করে আপনার কী লাভ?’ একজন প্রাণী চিকিৎসকের মুখে এ ধরনের কথা শুনে আমি বিস্মিত ও ব্যথিত হই। প্রাণী কল্যাণ, এবং মানবিক চিকিৎসা নিয়ে যখন বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে, তখন এমন মনোভাব সত্যিই হতাশাজনক। ইনজেকশন দেয়ার পর তিনি কিছুক্ষণ দ্বিধা করেন—সেদিনই অপারেশন করা ঠিক হবে কি না। পরে বলেন, এক ঘণ্টা পরে অপারেশন করলে অসুবিধা হবে না। বিড়ালকে অজ্ঞান করার পর তাকে অপারেশন রুমে রাখা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছিল না। আমি গিয়ে জানালে তিনি বলেন, তিনি একাই সব করবেন। পরে আরেকজন লোক অপারেশনের জায়গা শেভ করার জন্য ব্লেড কিনতে বলেন। আমি বলি, ইতোমধ্যে চার হাজার টাকা দিয়েছি; তারপরও কি ব্লেডের টাকা দিতে হবে? কিন্তু তখন বিড়ালটি অজ্ঞান অবস্থায় ছিল, তাই কথা বাড়ানোর সুযোগ ছিল না। বাইরে থেকে ব্লেড কিনে আনা হয়। অপারেশন শেষে ডাক্তার সাত দিন অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেয়ার কথা বলেন। ফেরার সময় তিনি আবারজানতে চান, আমার আর কয়টি বিড়াল আছে এবং সেগুলোও আনতে বলেন। একই সঙ্গে বলেন, এ বিষয়ে যেন অন্য কারও সঙ্গে আলোচনা না করি। পরে জানতে পারি, অপারেশনের বেশির ভাগ কাজ অন্য একজন করেছেন। তাকে আবার ১০০ টাকা দিতে হয় এবং বের হওয়ার আগে একজনকে ২০ টাকা বকশিশ দিতে হয়। বাসায় ফিরে আমরা নিয়মিত ইনজেকশন দেয়াই। কিন্তু বিড়ালটির অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। গত ৬ এপ্রিল অপারেশন হয়, আর গত ৯ এপ্রিল সে মারা যায়। তার তিনটি ছোট বাচ্চা মাকে খুঁজে অস্থির হয়ে পড়ে। তারা তখনও মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মা না থাকায় বাচ্চাগুলো ঠিকমতো খেতে পারছিল না। বিড়ালটি মারা যাওয়ার পর ডাক্তার বলেন, পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার ঠিকমতো হয়নি। আমাদের কাছে এটি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আমি সেখানে কোনো বিশেষ পরিচয়ে যাইনি; একজন সাধারণ সেবাপ্রার্থী হিসেবেই গিয়েছিলাম। পরে প্রয়োজনে নিজের ও পরিবারের পরিচয় দিতে হয়েছে। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। আমি ভাবি, পরিচয় দেয়ার পরও যদি এমন আচরণ হয়, তাহলে একজন সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে কী ধরনের সেবা পান? এই ঘটনা আমাদের পরিবারকে গভীর মানসিক কষ্ট দিয়েছে। বিষয়টি শুধু একটি বিড়ালের মৃত্যু নয়; এটি সেবা ব্যবস্থার মানবিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। আমি কোনো বিশেষ সুবিধা চাইনি। একজন সাধারণ সেবাপ্রার্থী হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ, পরিষ্কার পরামর্শ, নির্ধারিত ফি-এর রশিদ এবং মানবিক ভাষা প্রত্যাশা করেছিলাম। অসুস্থ প্রাণী নিয়ে কেউ হাসপাতালে গেলে তিনি এমনিতেই উদ্বিগ্ন থাকেন। সেখানে অবহেলা নয়, প্রয়োজন মমতা, সততা ও দায়িত্ববোধ। যারা কথা বলতে পারে না, তাদের সেবার ক্ষেত্রে দায়িত্ব আরও বেশি। তাই প্রাণী চিকিৎসা সেবায় মানবিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সন্ধ্যা রানী সাহাচৌরাস্তা, গাজীপুর সিটি, গাজীপুর।