সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বিশ্লেষণ

‘ডিপ স্টেট’ কী, শব্দটির প্রচলন কবে কোথায় কীভাবে


সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬

‘ডিপ স্টেট’ কী, শব্দটির প্রচলন কবে কোথায় কীভাবে
“ডিপ স্টেট” রাষ্ট্রের আড়ালের ক্ষমতা-রাজনীতিকে বোঝার ধারণা

সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার একটি প্রস্তাব এসেছিল “ডিপ স্টেট” থেকে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন- এটি কোনো একক পক্ষ নয়, বরং বৈদেশিকসহ একাধিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমষ্টি। এই বক্তব্য নতুন করে সামনে এনেছে বহুল আলোচিত কিন্তু প্রায়ই অস্পষ্ট একটি ধারণা-“ডিপ স্টেট”।

“ডিপ স্টেট” বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকা এমন প্রভাবশালী শক্তিগুলোকে, যারা নীতিনির্ধারণ, ক্ষমতার ভারসাম্য কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এটি কোনো সংবিধানস্বীকৃত বা দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান নয়; বরং একটি বিশ্লেষণী ধারণা, যা রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতার আড়ালের শক্তিগুলোকে ব্যাখ্যা করতে।

“ডিপ স্টেট” শব্দটির উৎপত্তি আধুনিক অর্থে ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কে।সেখানে “ডেরিন ডেভলেট” বা “গভীর রাষ্ট্র” ধারণাটি ব্যবহৃত হতো এমন এক গোপন নেটওয়ার্ক বোঝাতে, যেখানে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যুরোক্রেসি এলিট এবং কখনো কখনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের অংশ যুক্ত ছিল। অভিযোগ ছিল- নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও এই নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখত, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে।

পরবর্তীতে ধারণাটি বৈশ্বিক আলোচনায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এটি নতুন মাত্রা পায়। সেখানে “ডিপ স্টেট” বলতে কখনো বোঝানো হয় স্থায়ী ব্যুরোক্রেসি, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক-শিল্প জোট ও প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক গোষ্ঠী- যারা নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই শব্দটি অনেক সময় রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে “ডিপ স্টেট” ধারণাকে ব্যবহার করে।

সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “ডিপ স্টেট” আসলে একটি ব্যাখ্যামূলক কাঠামো। এটি বোঝাতে চায়- রাষ্ট্র কেবল দৃশ্যমান সরকার বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর ভেতরে থাকে ক্ষমতার স্তরবিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ও স্বার্থগোষ্ঠীর জটিল আন্তঃসম্পর্ক। 

অনেক ক্ষেত্রে এই শক্তিগুলো স্থিতিশীলতা রক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে কাজ করে। আবার অন্য প্রেক্ষাপটে এগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর অদৃশ্য চাপ বা প্রভাব হিসেবেও দেখা হয়।

বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে “ডিপ স্টেট” ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন আলোচ্য বিষয়। এখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে কারা ও কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে- তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ এই ধারণা নিজেই অস্পষ্ট ও অনেক সময় এটি প্রমাণনির্ভর বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা ধারণাগত কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

 পমার্কিন ডিপ স্টেট

আসিফ মাহমুদের বক্তব্যেও সেই অস্পষ্টতা বজায় রয়েছে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের নাম উল্লেখ করেননি। বরং একটি বহুমাত্রিক প্রভাববলয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ফলে “ডিপ স্টেট” নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা থাকে: এটি যেমন বাস্তব ক্ষমতার অদৃশ্য স্তর বোঝাতে সহায়ক হতে পারে, তেমনি অতিরঞ্জন বা রাজনৈতিক আখ্যান তৈরির হাতিয়ারও হতে পারে। কোথায় বাস্তব প্রভাব, আর কোথায় ব্যাখ্যার বিস্তার- এই সীমারেখা নির্ধারণ করাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, “ডিপ স্টেট” কোনো দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান নয় বরং রাষ্ট্রের আড়ালের ক্ষমতা-রাজনীতিকে বোঝার একটি ধারণা। এটি যতটা বাস্তবতার প্রশ্ন, ততটাই ব্যাখ্যার বিষয়- আর সেই কারণেই প্রতিবার এটি সামনে এলে কৌতূহলের পাশাপাশি তৈরি হয় নতুন প্রশ্নও।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬


‘ডিপ স্টেট’ কী, শব্দটির প্রচলন কবে কোথায় কীভাবে

প্রকাশের তারিখ : ২৭ মার্চ ২০২৬

featured Image

সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার একটি প্রস্তাব এসেছিল “ডিপ স্টেট” থেকে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন- এটি কোনো একক পক্ষ নয়, বরং বৈদেশিকসহ একাধিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমষ্টি। এই বক্তব্য নতুন করে সামনে এনেছে বহুল আলোচিত কিন্তু প্রায়ই অস্পষ্ট একটি ধারণা-“ডিপ স্টেট”।

“ডিপ স্টেট” বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকা এমন প্রভাবশালী শক্তিগুলোকে, যারা নীতিনির্ধারণ, ক্ষমতার ভারসাম্য কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এটি কোনো সংবিধানস্বীকৃত বা দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান নয়; বরং একটি বিশ্লেষণী ধারণা, যা রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যবহৃত হয় রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতার আড়ালের শক্তিগুলোকে ব্যাখ্যা করতে।

“ডিপ স্টেট” শব্দটির উৎপত্তি আধুনিক অর্থে ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কে।সেখানে “ডেরিন ডেভলেট” বা “গভীর রাষ্ট্র” ধারণাটি ব্যবহৃত হতো এমন এক গোপন নেটওয়ার্ক বোঝাতে, যেখানে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যুরোক্রেসি এলিট এবং কখনো কখনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের অংশ যুক্ত ছিল। অভিযোগ ছিল- নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও এই নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখত, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে।

পরবর্তীতে ধারণাটি বৈশ্বিক আলোচনায় ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এটি নতুন মাত্রা পায়। সেখানে “ডিপ স্টেট” বলতে কখনো বোঝানো হয় স্থায়ী ব্যুরোক্রেসি, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক-শিল্প জোট ও প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক গোষ্ঠী- যারা নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই শব্দটি অনেক সময় রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে “ডিপ স্টেট” ধারণাকে ব্যবহার করে।

সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “ডিপ স্টেট” আসলে একটি ব্যাখ্যামূলক কাঠামো। এটি বোঝাতে চায়- রাষ্ট্র কেবল দৃশ্যমান সরকার বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর ভেতরে থাকে ক্ষমতার স্তরবিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ও স্বার্থগোষ্ঠীর জটিল আন্তঃসম্পর্ক। 

অনেক ক্ষেত্রে এই শক্তিগুলো স্থিতিশীলতা রক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে কাজ করে। আবার অন্য প্রেক্ষাপটে এগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর অদৃশ্য চাপ বা প্রভাব হিসেবেও দেখা হয়।

বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে “ডিপ স্টেট” ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন আলোচ্য বিষয়। এখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে কারা ও কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে- তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ এই ধারণা নিজেই অস্পষ্ট ও অনেক সময় এটি প্রমাণনির্ভর বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা ধারণাগত কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

 পমার্কিন ডিপ স্টেট

আসিফ মাহমুদের বক্তব্যেও সেই অস্পষ্টতা বজায় রয়েছে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের নাম উল্লেখ করেননি। বরং একটি বহুমাত্রিক প্রভাববলয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ফলে “ডিপ স্টেট” নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা থাকে: এটি যেমন বাস্তব ক্ষমতার অদৃশ্য স্তর বোঝাতে সহায়ক হতে পারে, তেমনি অতিরঞ্জন বা রাজনৈতিক আখ্যান তৈরির হাতিয়ারও হতে পারে। কোথায় বাস্তব প্রভাব, আর কোথায় ব্যাখ্যার বিস্তার- এই সীমারেখা নির্ধারণ করাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, “ডিপ স্টেট” কোনো দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান নয় বরং রাষ্ট্রের আড়ালের ক্ষমতা-রাজনীতিকে বোঝার একটি ধারণা। এটি যতটা বাস্তবতার প্রশ্ন, ততটাই ব্যাখ্যার বিষয়- আর সেই কারণেই প্রতিবার এটি সামনে এলে কৌতূহলের পাশাপাশি তৈরি হয় নতুন প্রশ্নও।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত