সংবাদ

আন্তর্জাতিক

চুক্তি ও ঋণপত্র বাতিল: ফেরত যাচ্ছে ‘এমটি মেমেই’

চট্টগ্রাম উপকূলে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্দেশ্যে আনা ‘মেমেই’ নামের একটি কেমিক্যাল ট্যাংকারকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নানা আলোচনা সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জাহাজটি ক্রয়ের জন্য চুক্তি সম্পাদন, আমদানি ঋণপত্র খোলা এবং বাংলাদেশে আগমনের পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগেই।পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসএন করপোরেশন জাহাজটির ডেলিভারি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ক্রয় সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বাতিল করে।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মেসার্স এসএন করপোরেশন গত ১৭ মে ২০২৬ তারিখে অফশোর রিসাইক্লিং ফান্ড এলএলসি নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘মেমেই’ জাহাজটি ক্রয়ের জন্য সমঝোতা চুক্তি সম্পাদন করে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক শনাক্তকরণ নম্বর ৯১৩৩০৮২ বহনকারী জাহাজটি অতীতে ‘মুল্যান্ড’, ‘ইকো’ এবং ‘হার্লে’ নামেও পরিচালিত হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ২১ মে ২০২৬ তারিখে আমদানি ঋণপত্র খোলা হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।এরপর জাহাজটি ২৬ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত তথ্যেও ওই সময়ে জাহাজটির চট্টগ্রামে অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জাহাজটি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আনা হলেও তখন পর্যন্ত জাহাজটি কিংবা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল না।কিন্তু জাহাজটি চট্টগ্রামে পৌঁছানোর দুই দিন পর, ২৮ মে ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় জাহাজটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, অতীতে ইরান-সংশ্লিষ্ট পেট্রোরসায়ন পণ্য পরিবহনের অভিযোগে জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। একইসঙ্গে জাহাজটির পূর্ববর্তী মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।নিষেধাজ্ঞার তথ্য প্রকাশের পরপরই এসএন করপোরেশন বিষয়টি পর্যালোচনা করে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতে জাহাজটি চট্টগ্রামে এলেও নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পর তারা জাহাজটির ডেলিভারি গ্রহণ করেনি। শুধু তাই নয়, আমদানি ঋণপত্রের বিপরীতে কোনো অর্থও পরিশোধ করা হয়নি। পরবর্তীতে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত ক্রয়চুক্তি বাতিল করা হয় এবং আমদানি ঋণপত্রও বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।প্রতিষ্ঠান সূত্রে আরও জানা গেছে, জাহাজটি এখনো কোনো শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে প্রবেশ করেনি এবং জাহাজ ভাঙার কোনো কার্যক্রমও শুরু হয়নি। জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকায় অবস্থান করছে এবং এর ওপর কোনো শিল্প কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। ফলে জাহাজটির পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রশ্নই ওঠেনি।নথিপত্র অনুযায়ী, ‘মেমেই’ একটি ৪৪ হাজার ৮০০ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন রাসায়নিক ও তেলবাহী ট্যাংকার। ১৯৯৭ সালে নির্মিত জাহাজটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮০ মিটার এবং প্রস্থ ৩২ দশমিক ২ মিটার। জাহাজটির পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ উপযোগী ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮৭৭ দশমিক ১ টন। আন্তর্জাতিক বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির সম্ভাব্য স্ক্র্যাপ মূল্য প্রায় ৪৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬১ কোটি টাকার সমপরিমাণ।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চুক্তি সম্পাদন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন গ্রহণ, আমদানি ঋণপত্র খোলা এবং জাহাজের চট্টগ্রামে আগমন— সবকিছুই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পূর্বে সম্পন্ন হয়েছিল। পরবর্তীতে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিধি-বিধান এবং ব্যাংকিং নীতিমালা অনুসরণ করে জাহাজটি গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।এসএন করপোরেশন জানিয়েছে, জাহাজটির বিপরীতে কোনো অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটির হস্তান্তর সম্পন্ন না হওয়ায় এর মালিকানা ও দায়দায়িত্ব বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছেই রয়েছে। এ কারণে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে জাহাজটি বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। বর্তমানে সেই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।তাছাড়া এসএন করপোরেশন বা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নিয়ম অনুসরণ করেই জাহাজটি ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল এবং নিষেধাজ্ঞার তথ্য পাওয়ার পর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।এসএন করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ১৭ মে অফশোর রিসাইক্লিং ফান্ড এলএলসি-এর সঙ্গে জাহাজ ক্রয় চুক্তি (এমওএ) সম্পাদন এবং ২১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে আমদানি ঋণপত্র (এল/সি) খোলা হয়। পরে ২৬ মে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানা যায়। পরবর্তীতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাহাজটির ডেলিভারি গ্রহণ না করা হয়, কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি এবং ক্রয় চুক্তি ও এল/সি বাতিল করা হয়; জাহাজটি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে নিয়ে যাবে বলেও আমাদের প্রতিষ্ঠানকে জানায়।নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে সম্পাদিত বৈধ বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় জাহাজটি বাংলাদেশে এলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করেনি এবং জাহাজটির ডেলিভারি গ্রহণ থেকেও বিরত থেকেছে। ফলে পুরো বিষয়টি এখন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

চুক্তি ও ঋণপত্র বাতিল: ফেরত যাচ্ছে ‘এমটি মেমেই’