সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

লটারি না ভর্তি পরীক্ষা?


মাছুম বিল্লাহ
মাছুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬

লটারি না ভর্তি পরীক্ষা?
প্রাথমিকে ফিরছে ভর্তি পরীক্ষা

কেজিতে তো নয়ই, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোন ভর্তি পরীক্ষা থাকা উচিত নয়! যে সমাজে সে জন্মগ্রহন করেছে সেই সমাজ তাকে কোনো ধরনের মানসিক চাপে না ফেলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ করে দিবে, এটি সমাজের কাছে তার বৈধ পাওনা। এখানে পরীক্ষা নামক বিষয় যোগ করার প্রশ্নই আসেনা। তবে, চতুর্থ শ্রেণী থেকে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া একেবারে অযৌক্তিক নয়, সেখানে প্রশ্ন হতে হবে শ্রেণী উপযোগী ও যৌক্তিক। ভর্তি পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা পড়াশোনা করে এবং অভিভাবকরাও পড়াশোনার বিষয়ে কিছুট সচেতন হন। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সকল অভিভাবকদের তাদের নিকটস্থ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য চিন্তা করতে হবে। তারা যদি তথাকথিত নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তির পেছনে ছোটেন তাহলে সরকার কিংবা অন্য কারুরই কিছু করার নেই। কোন সমস্যা হলেই আমরা সরকারকে দায়ী করি, সরকারের উপর সব চাপিয়ে দিই কিংবা সরকারকে মূহুর্তের মধ্যেই সব পরিবর্তন করতে বলি যা যুগ যুগ ধরে হয়নি। সবাই সুপারিশের ফিরিস্তি তুলে ধরি, সরকারকে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে কিন্তু কি দিয়ে , কিভাবে এবং এত অল্প সময়ে করা যে সম্ভব নয় সেগুলো আমরা কখনও চিন্তা করিনা। 

শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বড় বড় শহরগুলোতে কারণ নামকরা (?) দু’চারটি প্রতিষ্ঠানে সব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে চান। তারা ভর্তির জন্য সব ধরনের পদ্ধতিই অবলম্বন করেন (অর্থ, প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, কোচিং)। অথচ সরকারি ও বেসরকারি বহু বিদ্যালয় আছে সেগুলোতে শিক্ষার্থী পাওয়া য়ায়না। সরকারিগুলোতে সমস্যা নেই কিন্তু বেসরকারিগুলোতে শিক্ষার্থীর অভাবে কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন নিতে পারেন না। তাই, আওয়ামী সরকারের আমলে এই লটারি পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয় কারন নিজের পার্টির লোজকজনকেও ম্যানজে করা যেতনা সবাই তথাকথিত ভাল স্কুলে ভর্তি করাবেন। আমাদের ছোট-বড় প্রতিটি শহর জ্যামের শহর! সেই জ্যাম ঠেলে সকালবেলা সবাই ছোটেন বাচ্চাদের নিয়ে । এই বয়সে বাচ্চাদের বাসার কাছে ফুলবাগানের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, আমোদ ফুর্তি করা আর বয়স উপযোগী সহজ কিছু বিষয় শেখার কথা এবং এর মাধ্যমে সামাজিকতা ও বন্ধুত্ব ইত্যাদি শেখার প্রথম ধাপ। 

অথচ অভিভাবকগন তাদেরকে মহা প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে তাদের শারীরিক মানসিক কষ্টের বিনিময়ে, সমাজের উচুঁ শ্রেণী, নিচু শ্রেণী, অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য ব্যস্ত, মহাব্যস্ত, আর যখন সমস্যা হয় তখন সব সরকারের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতেই হবে। সরকার আইন করতে পারে কিন্তু সেটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিজস্ব গতিপথ রয়েছে, সরকার প্রয়োগ করতে গেলে সেটি অনেক সময়ই ব্যক্তি স্বাধীনতার বিপক্ষে এমনকি বলপ্রয়োগের পর্যায়ে চলে যায়।কাজেই সব সমস্যা সরকারকে দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে গেলে সমস্যা হবেই। অনেক অভিভাবক আছেন, তাদের শিশু সন্তানকে তথাকথিত ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য সাত-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শিশুদের সেখানে নিয়ে যান শুধুমাত্র ভালো পড়ালেখার জন্যই নয়, নিজেদের মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে, প্রেস্টিজের কথা চিন্তা করে। এখানে সরকারের কিছু করার নেই। সিদ্ধান্ত অভিভাবকদের নিতে হবে, সরকার শুধু কাজটি করতে উৎসাহ প্রদান করতে পারে। 

স্থানীয় স্কুলগুলো সবই হয়তো সেই মানের নেই, কিন্তু যখন অভিভাবকগন তাদের শিশু-সন্তানদের ভর্তি করবেন তখন নিকটস্থ বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকলেও তারা ভালো করার চেষ্টা করবে। বিদ্যালয়গুলো সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এগুলো ভালো করার দায়িত্ব অভিভাবকদের এবং সমাজেরও। এটি করা হলে লটারি আর ভর্তি পরীক্ষার কোন প্রশ্ন থাকবেনা, শিশুরা তাদের ওপর মানসিক অত্যাচার থেকে বেঁচে যাবে। আমাদের সরকারি বেসরকারি কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানই জনসংখ্যা অনুপাতে নেই, এগুলো সুষমভাবে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেনি। এটিও একটি বাস্তবতা। যেগুলো আছে সেগুলোকে মানে তোলার দায়িত্ব নাগরিকদেরও, কারণ সরকারের একার পক্ষে এতসব ম্যানেজ করা সম্ভব নয়। অভিভাবকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে, তথাকথিত নামী দামী স্কুলে দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হতে যেসব অবাক করা প্রশ্ন আসে সেগুলো অযৌক্তিক এবং কোন মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা হয়না। যেমন ঢাকার একটি বিখ্যাত স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল’ বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পথচলা কবে থেকে শুরু হয় এবং উপকারিতা কি? ’ এ প্রশ্ন বিসিএসকেও ছাড়িয়ে যায়। অভিভাবক যখন এসব স্কুলে সন্তান ভর্তির জন্য পাগলপ্রায় তখন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ ধরনের আজে বাজে প্রশ্ন ভর্তি পরীক্ষায় দিয়ে থাকে আর মাঝখানে শিশুদের কোচিং করানোর জন্য আরেকটি শ্রেণী গড়ে উঠে। এটিই স্বাভাবিক। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার কন্যা (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যায়ে মাস্টার্সে পড়ে) শিশু শ্রেণীতে ভর্তির সময় তার মা অন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে ভিকারুন্নেছা স্কুলে ভর্তি করানোর কয়েকটি কোচিংয়ের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলেন। আমি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলমা কোচিং-এ পড়ানো হচ্ছে আফ্রিকার কিছু দেশের মুদ্রার নাম, রাজধানীর নাম, ঐসব দেশের সরকার ব্যবস্থা, কঠিন ব্যাকরণ ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, ঐসব কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া আরেক কসরত। যেন বুয়েটে ভর্তির কোচিং! আর অর্থদণ্ড তো আছেই। আমি এসব বাদ দিতে বললাম। বাদ দিযে মেয়েকে একটি ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করলাম কারণ সেখানে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই, অতএব ভর্তির কোচিংও নেই। 

আমাদের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন ‘শিক্ষায় লটরি, এটা তো জুয়া খেলা, এটা কীভাবে সিস্টেম হতে পারে? কাজেই আমরা লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহার করলাম। দ্যাটস ইট। লটারি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে পারেনা। সেটি শিক্ষার কোনো মানদন্ড হতে পারেনা। লটারি ইস নট সলিউশন। ক্লাস ওয়ানে মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসেনা। খুবই সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো। ক্লাস ওয়ানে আমরা নিউরোসার্জন বানানোর চেষ্টা করবোনা। কেউ কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকার ইনহাউজ কোচিংযের ব্যবস্থা করবে।’ মন্ত্রী মহোদয়ের কথাগুলোর সঙ্গে আমি একমত তবে খুব সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো এবং কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবক্ষেত্র পর্যন্ত যেতে যেতে মূল মেসেজের সামান্য অবিকল অবস্থায় থাকে। এটি যারা বাস্তবায়ন করেন বা করবেন তারা দুর্নীতির আশ্রয় নেন যা সরকারের পক্ষে এত মাইক্রো লেভেলে পৌঁছে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। 

প্রাথমিকে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বয়স ৪-৬ বছরের মধ্যে যখন শিশুরা কেবল তাদের মতো করে কথাবার্তা ও যোগাযোগ করতে শেখে। শিশুরা তখন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি এমন পর্যায়ে থাকেনা যে, তাদের মেধা ও জানা-শোনা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই যোগ্য। সেটা করা মানে শিশুদের প্রতি অবিচার ও অভিভাবকদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা। লটারি পদ্ধতির সুবিধা ছিল এর স্বচছতা ও জবাবদিহিতা। লটারি পদ্ধতিতে সরকারের একজন প্রতিনিধি সশরীরে উপস্থিত থাকতেন। কেন্দ্রীয়ভাবে লটারি হওয়ার কারণে এখানো স্বজনপ্রীতি বা অর্থিক লেনদেনের সুযোগ ছিলনা বললেই চলে। ফলে অভিভাবকরা একটি আস্থার জায়গায় ছিলেন এবং মেধাবী ও সাধারণ-সব শিক্ষার্থীই ভর্তির সমান সুযোগ পেত। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাছাই করে সেরাদেরই ভর্তি করে তাহলে তাদের কৃতিত্ব কোথায় ? সব ধরনের মেধার শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে তাদের বিকশিত করার সুযোগ দেয়াই একটি প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ। শুধুমাত্র সেরাদের নিয়ে শ্রেণী তৈরি করলে সমাজের শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ ও বিভাজন তৈরি হয় যার কারণে বর্তমানে শিশু ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। 

এখানে আরেকটি বিষয় আমরা বেমালুম এড়িযে যাচ্ছি আর সেটি হচেছ, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সমস্যা হচেছ শহর এলাকায় আর শহর শুধু বাংলাদেশ নয়। শহর এলকার সব বিদ্যালয়েও ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা নেই। বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রাম, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোর করুণ অবস্থা, শিক্ষার মানের দিক দিয়ে, শিক্ষার্থী সংখ্যার দিকে দিয়ে এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়েও। শহরের মাত্র কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা যখন এত এত আলোচনা করি তখন মনে হয়, গ্রামের স্কুল স্কুল নয়, গ্রামের শিক্ষর্থীরা শিক্ষার্থী নয়! 

[লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬


লটারি না ভর্তি পরীক্ষা?

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬

featured Image

কেজিতে তো নয়ই, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোন ভর্তি পরীক্ষা থাকা উচিত নয়! যে সমাজে সে জন্মগ্রহন করেছে সেই সমাজ তাকে কোনো ধরনের মানসিক চাপে না ফেলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ করে দিবে, এটি সমাজের কাছে তার বৈধ পাওনা। এখানে পরীক্ষা নামক বিষয় যোগ করার প্রশ্নই আসেনা। তবে, চতুর্থ শ্রেণী থেকে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া একেবারে অযৌক্তিক নয়, সেখানে প্রশ্ন হতে হবে শ্রেণী উপযোগী ও যৌক্তিক। ভর্তি পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা পড়াশোনা করে এবং অভিভাবকরাও পড়াশোনার বিষয়ে কিছুট সচেতন হন। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সকল অভিভাবকদের তাদের নিকটস্থ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য চিন্তা করতে হবে। তারা যদি তথাকথিত নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তির পেছনে ছোটেন তাহলে সরকার কিংবা অন্য কারুরই কিছু করার নেই। কোন সমস্যা হলেই আমরা সরকারকে দায়ী করি, সরকারের উপর সব চাপিয়ে দিই কিংবা সরকারকে মূহুর্তের মধ্যেই সব পরিবর্তন করতে বলি যা যুগ যুগ ধরে হয়নি। সবাই সুপারিশের ফিরিস্তি তুলে ধরি, সরকারকে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে কিন্তু কি দিয়ে , কিভাবে এবং এত অল্প সময়ে করা যে সম্ভব নয় সেগুলো আমরা কখনও চিন্তা করিনা। 

শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বড় বড় শহরগুলোতে কারণ নামকরা (?) দু’চারটি প্রতিষ্ঠানে সব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে চান। তারা ভর্তির জন্য সব ধরনের পদ্ধতিই অবলম্বন করেন (অর্থ, প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, কোচিং)। অথচ সরকারি ও বেসরকারি বহু বিদ্যালয় আছে সেগুলোতে শিক্ষার্থী পাওয়া য়ায়না। সরকারিগুলোতে সমস্যা নেই কিন্তু বেসরকারিগুলোতে শিক্ষার্থীর অভাবে কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন নিতে পারেন না। তাই, আওয়ামী সরকারের আমলে এই লটারি পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয় কারন নিজের পার্টির লোজকজনকেও ম্যানজে করা যেতনা সবাই তথাকথিত ভাল স্কুলে ভর্তি করাবেন। আমাদের ছোট-বড় প্রতিটি শহর জ্যামের শহর! সেই জ্যাম ঠেলে সকালবেলা সবাই ছোটেন বাচ্চাদের নিয়ে । এই বয়সে বাচ্চাদের বাসার কাছে ফুলবাগানের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, আমোদ ফুর্তি করা আর বয়স উপযোগী সহজ কিছু বিষয় শেখার কথা এবং এর মাধ্যমে সামাজিকতা ও বন্ধুত্ব ইত্যাদি শেখার প্রথম ধাপ। 

অথচ অভিভাবকগন তাদেরকে মহা প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে তাদের শারীরিক মানসিক কষ্টের বিনিময়ে, সমাজের উচুঁ শ্রেণী, নিচু শ্রেণী, অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য ব্যস্ত, মহাব্যস্ত, আর যখন সমস্যা হয় তখন সব সরকারের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। নামকরা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতেই হবে। সরকার আইন করতে পারে কিন্তু সেটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকদের নিজস্ব গতিপথ রয়েছে, সরকার প্রয়োগ করতে গেলে সেটি অনেক সময়ই ব্যক্তি স্বাধীনতার বিপক্ষে এমনকি বলপ্রয়োগের পর্যায়ে চলে যায়।কাজেই সব সমস্যা সরকারকে দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে গেলে সমস্যা হবেই। অনেক অভিভাবক আছেন, তাদের শিশু সন্তানকে তথাকথিত ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য সাত-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শিশুদের সেখানে নিয়ে যান শুধুমাত্র ভালো পড়ালেখার জন্যই নয়, নিজেদের মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে, প্রেস্টিজের কথা চিন্তা করে। এখানে সরকারের কিছু করার নেই। সিদ্ধান্ত অভিভাবকদের নিতে হবে, সরকার শুধু কাজটি করতে উৎসাহ প্রদান করতে পারে। 

স্থানীয় স্কুলগুলো সবই হয়তো সেই মানের নেই, কিন্তু যখন অভিভাবকগন তাদের শিশু-সন্তানদের ভর্তি করবেন তখন নিকটস্থ বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকলেও তারা ভালো করার চেষ্টা করবে। বিদ্যালয়গুলো সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এগুলো ভালো করার দায়িত্ব অভিভাবকদের এবং সমাজেরও। এটি করা হলে লটারি আর ভর্তি পরীক্ষার কোন প্রশ্ন থাকবেনা, শিশুরা তাদের ওপর মানসিক অত্যাচার থেকে বেঁচে যাবে। আমাদের সরকারি বেসরকারি কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানই জনসংখ্যা অনুপাতে নেই, এগুলো সুষমভাবে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠেনি। এটিও একটি বাস্তবতা। যেগুলো আছে সেগুলোকে মানে তোলার দায়িত্ব নাগরিকদেরও, কারণ সরকারের একার পক্ষে এতসব ম্যানেজ করা সম্ভব নয়। অভিভাবকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে, তথাকথিত নামী দামী স্কুলে দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হতে যেসব অবাক করা প্রশ্ন আসে সেগুলো অযৌক্তিক এবং কোন মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা হয়না। যেমন ঢাকার একটি বিখ্যাত স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল’ বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পথচলা কবে থেকে শুরু হয় এবং উপকারিতা কি? ’ এ প্রশ্ন বিসিএসকেও ছাড়িয়ে যায়। অভিভাবক যখন এসব স্কুলে সন্তান ভর্তির জন্য পাগলপ্রায় তখন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ ধরনের আজে বাজে প্রশ্ন ভর্তি পরীক্ষায় দিয়ে থাকে আর মাঝখানে শিশুদের কোচিং করানোর জন্য আরেকটি শ্রেণী গড়ে উঠে। এটিই স্বাভাবিক। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার কন্যা (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যায়ে মাস্টার্সে পড়ে) শিশু শ্রেণীতে ভর্তির সময় তার মা অন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে ভিকারুন্নেছা স্কুলে ভর্তি করানোর কয়েকটি কোচিংয়ের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলেন। আমি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলমা কোচিং-এ পড়ানো হচ্ছে আফ্রিকার কিছু দেশের মুদ্রার নাম, রাজধানীর নাম, ঐসব দেশের সরকার ব্যবস্থা, কঠিন ব্যাকরণ ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, ঐসব কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া আরেক কসরত। যেন বুয়েটে ভর্তির কোচিং! আর অর্থদণ্ড তো আছেই। আমি এসব বাদ দিতে বললাম। বাদ দিযে মেয়েকে একটি ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করলাম কারণ সেখানে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই, অতএব ভর্তির কোচিংও নেই। 

আমাদের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন ‘শিক্ষায় লটরি, এটা তো জুয়া খেলা, এটা কীভাবে সিস্টেম হতে পারে? কাজেই আমরা লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহার করলাম। দ্যাটস ইট। লটারি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে পারেনা। সেটি শিক্ষার কোনো মানদন্ড হতে পারেনা। লটারি ইস নট সলিউশন। ক্লাস ওয়ানে মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসেনা। খুবই সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো। ক্লাস ওয়ানে আমরা নিউরোসার্জন বানানোর চেষ্টা করবোনা। কেউ কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকার ইনহাউজ কোচিংযের ব্যবস্থা করবে।’ মন্ত্রী মহোদয়ের কথাগুলোর সঙ্গে আমি একমত তবে খুব সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো এবং কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবেনা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবক্ষেত্র পর্যন্ত যেতে যেতে মূল মেসেজের সামান্য অবিকল অবস্থায় থাকে। এটি যারা বাস্তবায়ন করেন বা করবেন তারা দুর্নীতির আশ্রয় নেন যা সরকারের পক্ষে এত মাইক্রো লেভেলে পৌঁছে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। 

প্রাথমিকে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বয়স ৪-৬ বছরের মধ্যে যখন শিশুরা কেবল তাদের মতো করে কথাবার্তা ও যোগাযোগ করতে শেখে। শিশুরা তখন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি এমন পর্যায়ে থাকেনা যে, তাদের মেধা ও জানা-শোনা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই যোগ্য। সেটা করা মানে শিশুদের প্রতি অবিচার ও অভিভাবকদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা। লটারি পদ্ধতির সুবিধা ছিল এর স্বচছতা ও জবাবদিহিতা। লটারি পদ্ধতিতে সরকারের একজন প্রতিনিধি সশরীরে উপস্থিত থাকতেন। কেন্দ্রীয়ভাবে লটারি হওয়ার কারণে এখানো স্বজনপ্রীতি বা অর্থিক লেনদেনের সুযোগ ছিলনা বললেই চলে। ফলে অভিভাবকরা একটি আস্থার জায়গায় ছিলেন এবং মেধাবী ও সাধারণ-সব শিক্ষার্থীই ভর্তির সমান সুযোগ পেত। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বাছাই করে সেরাদেরই ভর্তি করে তাহলে তাদের কৃতিত্ব কোথায় ? সব ধরনের মেধার শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে তাদের বিকশিত করার সুযোগ দেয়াই একটি প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ। শুধুমাত্র সেরাদের নিয়ে শ্রেণী তৈরি করলে সমাজের শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ ও বিভাজন তৈরি হয় যার কারণে বর্তমানে শিশু ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। 

এখানে আরেকটি বিষয় আমরা বেমালুম এড়িযে যাচ্ছি আর সেটি হচেছ, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সমস্যা হচেছ শহর এলাকায় আর শহর শুধু বাংলাদেশ নয়। শহর এলকার সব বিদ্যালয়েও ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা নেই। বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রাম, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোর করুণ অবস্থা, শিক্ষার মানের দিক দিয়ে, শিক্ষার্থী সংখ্যার দিকে দিয়ে এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়েও। শহরের মাত্র কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা যখন এত এত আলোচনা করি তখন মনে হয়, গ্রামের স্কুল স্কুল নয়, গ্রামের শিক্ষর্থীরা শিক্ষার্থী নয়! 


[লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজ]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত