প্রত্যাবর্তন না প্রত্যর্পণ! রাজনীতির নতুন ধন্ধ
বাংলাদেশের আইসিটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত বিষয়। সরকার এবং সরকারের বর্তমান সহযোগী কাম বিরোধী পক্ষ উভয়েই প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ কোনোটাই চায় বলে মনে হয় না। কেননা শেখ হাসিনার দেশে উপস্থিতি, কারাগারেই হোক বা ফাঁসির মঞ্চে তা কার্যকলাপ নিষিদ্ধ দলকে অনেকটাই রাজনীতির উন্মুক্ত মঞ্চে নিয়ে আসবে — যা তরুণ তুর্কি দলের জন্য বিব্রতকর। এবং সে পরিস্থিতিতে জামায়াতও বিরোধী দল হিসেবে শুধু কাগজে-কলমে বা অনেকটা আওয়ামী লীগ আমলের জাতীয় পার্টির মতো অবস্থানে যেতে হতে পারে। ইউনূস ঘোষিত ‘দানবী’র ফিরে আসাটা ইউনূসের জন্যও বিব্রতকর হতে পারে।শাসকদলের জন্যও এটা একটা বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই মুহূর্তে তারা জামায়াত-এনসিপি এবং ইউনূস সমর্থক স্টাবলিশমেন্টকে সরাসরি প্রতিপক্ষ বানাতে চায় না। তাই জামায়াত-এনসিপির সুরে তারাও বলছেন কিসের প্রত্যাবর্তন, বন্দী বিনিময় চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে হবে। কারণ তারা জানেন প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নানা আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পার হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত হয়। আর এ ভাবেই সময় পার হবে। তারা যদি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে আইনের আওতায়ই আনতে চান তবে প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ বা তিনি বিমানে আসবেন না স্থলপথে আসবেন কোনোটাতেই আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু মুখে যে যাই বলুক, ফাঁসির রায় প্রতীকী ব্যবস্থা হিসেবে রেখে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি ও দেশের বাইরে রাখাতেই বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের সহযোগী বিরোধী দল অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। শেখ হাসিনা শুধুমাত্র প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ত হলে বা মিডিয়াতে বক্তব্য দিলে কিছুদিন বাদ-প্রতিবাদ চলে। এবং আপাতত লংমার্চের নামে লংড্রাইভ মার্কা কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে চাপে রাখা যাতে এ বিষয়ে দিল্লির সাথে ঢাকার কোনো সমঝোতা না হয়। এবারের লংড্রাইভে সে দিক থেকে কিছু কাজও হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুতে ছাড় পেতে পেতে জামায়াতের যে বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে তাও বিএনপির জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।জুলাই আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তৃতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। অন্যদিকে কার্যকলাপ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ উক্ত ট্রাইব্যুনালকে একটি “ক্যাংগারু আদালত” বলে নিন্দা জানায় এবং এই বিচারকে “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী” শক্তির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য পরিকল্পিত একটি “প্রহসন” বলে অভিহিত করে।শেখ হাসিনা কি আসলেই ফিরছেন — এ প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নানা মত। একাংশের ধারণা শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে নিজের গুরুত্ব বজায় রাখা, সমর্থকদের ধরে রাখা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে আবার সক্রিয় করার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে শুধু এমনটা বলছেন। আবার কেউ বলছেন তিনি দেশি-বিদেশি আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করে আটঘাট বেঁধেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেক সময় আন্তর্জাতিক প্রভাব বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। সেই আন্তর্জাতিক মহলের চাপ, তাপ এবং প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ফেরার পরিকল্পনা করছেন। তবে শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি জনগণের উপর ভরসা করেই দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে এবং আইনি লড়াই করতে প্রস্তুত।তিনি আরও বলছেন, ‘যদি মৃত্যু আসে, আমি আমার নিজের মাটিতেই মরতে চাই’।তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে জুলাই আন্দোলন পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে তার ব্যর্থতা, আন্দোলন দমনে চরম নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, অসংখ্য মৃত্যু এবং তার কর্তৃত্ববাদী দীর্ঘ শাসন আমলে গণতন্ত্রকে সংকুচিত করা, ভোটের অধিকারকে খর্ব করা ইত্যাদি বিষয়ে ন্যূনতম কোনো আত্মপর্যালোচনা নাই। গত ৫ আগস্ট তিনি দিল্লিতে যে অনলাইন সংবাদ সম্মেলন করলেন সেখানেও তিনি জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর নিজে না দিয়ে উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সজীব ওয়াজেদ জয়ের দিকে ঠেলে দিলেন। উত্তরে জয় যা বললেন তার সারকথা হলো ‘৫ আগস্টের আগে পরে অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী ও পুলিশ হত্যা সংঘটিত হয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী শাসকরা যদি এক পক্ষকে সম্পূর্ণ ছাড় দিতে পারেন, তবে অপর পক্ষকে এককভাবে অপরাধী বা দোষী সাব্যস্ত করার নৈতিক অধিকার তাদের থাকে না।’ প্রশ্ন হলো, একটা অন্যায়ের উদাহরণ দিয়ে আরেকটি অন্যায় ঢাকার প্রচেষ্টা কি মানুষের কাছে গ্রহণীয় হবে? মানুষ তো কথার মারপ্যাঁচ নয়, সরাসরি উত্তর চায়। শুধুমাত্র ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করে আওয়ামী লীগ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে বলে মনে হয় না।নেতৃত্ব আত্মপর্যালোচনা না করায় কর্মী সমর্থকরাও পুরনো পথেই হাঁটছেন। তাই তো আমাদেরকে দেখতে হলো দেশের বাইরে চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের ও দেশের চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করতে যেয়ে সুদূর ইতালিতে হামলা ও হেনস্তার শিকার হলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। জুলাইয়ের আগে আওয়ামী লীগের সাথে থাকলেও এবং বিতর্কিত নির্বাচনসমূহে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালালেও জুলাই আন্দোলনের অসংখ্য মৃত্যু তাকে টেনে এনেছিলো রাজপথের প্রতিবাদে। সে কারণে তখন আওয়ামী লীগ সরকারের কট্টরপন্থী সমর্থকরা তার এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। আবার ৫ আগস্টের পরে তিনি যখন মব উল্লম্ফনের বিরুদ্ধে, নারী স্বাধীনতাকে সংকুচিত করার প্রয়াসের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেন তখন ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ ধর্মীয় উগ্রবাদী অংশ ও উগ্রপন্থী সাইবার গ্রুপগুলো তার স্বাধীনচেতা জীবনযাপন, পছন্দের পোশাক, অভিনয় এবং খোলামেলা রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্যের বিরুদ্ধে লাগামহীন নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে। আবার এখন জুলাই’২৪-পূর্বের তার একসময়ের মিত্ররা সোশ্যাল মিডিয়ায় অশোভন ভাষায় তাকে আক্রমণ করে চলেছেন।বাঁধনের কাছাকাছি অবস্থানে শাওনও। অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের যৌক্তিকতার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। ১৯৭১ সালের রাজাকারদের নৃশংসতার কথা মনে করিয়ে ও বিষয়টির ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা তুলে ধরে, তিনি বলেন শিক্ষার্থীরা কি পরিস্থিতিতে নিজেদের ক্ষোভ থেকে এই স্লোগান দিয়েছে, তা আমাদের বুঝতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর আন্দোলনের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি ও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থান দেখে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে আন্দোলনটি পূর্ব-পরিকল্পিত ছিল। আর এ কথা বলার সাথে সাথেই তিনি তীব্র সামাজিক মব ট্রায়াল ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হন। নাটকের টিয়া পাখির মুখে বলা সেই দেশ আলোড়ন সৃষ্টিকারী সংলাপ ‘তুই রাজাকার’ - এর প্রতিশোধ আজ রাজাকারের দোসররা হুমায়ুন আহমেদের অনুপস্থিতিতে শাওনের উপর নিচ্ছেন। তা হলে কি কেউ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে না?প্রকৃতপক্ষেই আমাদের সমাজে স্বাধীন চিন্তার পরিসর ও সহিষ্ণুতা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। যার কারণে জাতীয় সংসদে ভিন্নমত প্রকাশ করায় রুমিন ফারহানাকে তার একসময়ের সতীর্থদের কাছ থেকেই অকথ্য ভাষায় গালাগালির শিকার হতে হচ্ছে কিংবা সরকার দলীয় আইনজীবী নেতার আচরণে বিচারপতিকে এজলাস ত্যাগ করতে হচ্ছে।ইতালির ঘটনায় আমাদের তথ্য উপদেষ্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে গোটা আওয়ামী লীগ দলকে মাফিয়া গ্যাং হিসেবে আখ্যায়িত করে পরিস্থিতি আরো উসকে দিলেন। এ ধরনের উক্তি করার আগে আয়নার দিকে তাকানো উচিত। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের দলের কর্মীদের বড় একটা অংশের কি ভূমিকা ছিল? দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও হামলার যে উন্মত্ত চেহারা সে সময় দেশবাসী দেখেছে তাকে তথ্য উপদেষ্টা কি উপাধি দিবেন? অভিনয়শিল্পী সিদ্দিকুর রহমান (যিনি নাটক ও টিভি পর্দায় সিদ্দিক নামে বহুল পরিচিত) এর উপর যখন তার দলের তরুণরা মব হামলা করলো, প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে পিটিয়ে তার পরিধানের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে থানায় নিয়ে, ২টি খুনের মামলায় নাম ঢুকিয়ে ১১ মাস যাবত তাকে আটক রাখার ব্যবস্থা করলো তখন তার এই কণ্ঠস্বর কোথায় ছিলো? জুলাই অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলো, তখন কিন্তু তার বিবেকের ডাক শোনা যায় নাই। ইতালির ঘটনায় সরকারের দায়িত্ব - দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দূতাবাসকে সক্রিয় করা, উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করা নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকে এগোনোর পরিবর্তে রাজনীতি আরও অসহিষ্ণু ও সহিংস হয়ে উঠে — এমন মন্তব্য থেকে সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের বিরত থাকা উচিত।আলোচনা চলছিলো প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যর্পণ নিয়ে। সেখানেই ফেরা যাক। শেখ হাসিনা ফিরলে তাকে আপিলের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্ন উঠবে এবং বিলম্ব মার্জনা চেয়ে আপিল আবেদন করার ক্ষেত্রে তার শক্তিশালী যুক্তিও আছে যা আদালতকে বিবেচনায় নিতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল রাজনীতির ভাষায় যাই বলুন না কেন আইন অনুযায়ী আপিল করা আসামির অধিকার, যা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। শেখ হাসিনাকে ভারতবর্ষে পাঠিয়েছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিমানে উড়িয়ে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ভারত আসামি হিসেবে নয়, অতিথি হিসাবে তাকে আশ্রয় দিয়েছে। তাই তার ফেরার বিষয়টি শুধুমাত্র তার ইচ্ছাধীন বলে মনে হয় না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় সরকারকেই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।তিনি ফিরলে আপিল আদালতে নানা প্রশ্ন ও যুক্তিতর্ক উঠবে। যেমন ১৯৭১ সালে দেশের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর দোসরদের নয় মাসব্যাপী যে হত্যাযজ্ঞ, নারী ধর্ষণ, সংখ্যালঘু হত্যা ও নিপীড়ন — ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। ২০২৪ - এর জুলাই আন্দোলন দমনে ও আইনশৃঙ্খলা জনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বাড়াবাড়ি ও নির্বিচার গুলির কারণে যে অসংখ্য মৃত্যু সংঘটিত হয়েছিলো তার বিচার আয়োজন সেই একই ট্রাইব্যুনাল ও আইনে যথাযথ কিনা? ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর নিযুক্ত হওয়ায় প্রতিশোধের বিচার আয়োজন হয়েছে কিনা - ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উঠবে।মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার সাথে সাথেই এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানিয়ে উল্লেখ করেছিলো ‘দুজনার অনুপস্থিতিতে হওয়া এ বিচার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’। অপরদিকে অ্যামনেস্টি তাদের প্রতিবেদনে বলেছিলো ‘এই বিচার ও সাজা কোনোটিই সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত হয়নি’। অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা নিয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়েছিলো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছিলো।যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক ডেভিড বার্গম্যান যিনি ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ে আলোচনার পাদপীঠে ছিলেন, তিনিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্যদের বিচার প্রক্রিয়া এবং এর স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট কিছু আইনি ও পদ্ধতিগত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ডেভিড বার্গম্যান বিচারিক কাঠামোর ত্রুটি, আইনি সহায়তার দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, যা নিয়ে দেশ-বিদেশে আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বার্গম্যান এমনও সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, বিচারকরা স্বাধীনভাবে রায় প্রস্তুতের সময় পেয়েছিলেন কি না, নাকি রাজনৈতিক বা বাহ্যিক কোনো চাপের কারণে তাড়াহুড়ো করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়েছে।অনুপস্থিতির বিচারে এবং আসামি নিজে আইনজীবী নিযুক্ত করতে না পারলে অনেক কিছুই আদালতের নজরে আসার সুযোগ থাকে না। শেখ হাসিনা কর্তৃক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরাসরি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার টেলিফোন কলরেকর্ড প্রমাণ হিসাবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা বলে থাকেন, ‘আরও মৃত্যু ও রক্তপাত ঘটিয়ে তিনি ক্ষমতায় থাকতে চান না, রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান কে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে বলেছেন’ — শেখ হাসিনার এ ধরনের কলরেকর্ডও রয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেলে হয়তো তার পক্ষ থেকে যে সব যুক্তি দেয়া হবে যা ইতিপূর্বে ট্রাইব্যুনালে দেয়া হয় নি। সে সব বিষয় আপিল আদালতকে বিবেচনায় নিতে হবে।তবে প্রত্যাবর্তন হোক আর প্রত্যর্পণই হোক সরকারকে সমগ্র বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে রাজনৈতিকভাবেও বিবেচনা করতে হবে। অতি সম্প্রতি ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ বাংলাদেশে তার সাম্প্রতিক সফরকালে বলেছেন, সমাজে স্থায়ী শান্তি ও অগ্রগতির জন্য ন্যায়বিচারের পাশাপাশি রাজনৈতিক পুনর্মিলন অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা অপরিহার্য। পূর্বাপর বিবেচনা না করে প্রতিহিংসার আগুন জ্বালালে, সে আগুনে একদিন নিজেকে জ্বলতে হতে পারে।প্রসঙ্গত ২০২৬-এর ২১ জানুয়ারি দেয়া ট্রাইব্যুনালের একটি আদেশের কথা মনে পড়ছে। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর রুকন আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সেই রায় দিয়েছিলো। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান থেকে আকাশপথে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে আসলেও তখন তাকে আইনের আওতায় আনা হয় নি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্তির ঠিক তেরো বছর পর ইউনূস আমলের একেবারে শেষ সময়ে ২০২৬-এর ২১ জানুয়ারি আত্মসমর্পণ করলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ‘তিনি এখন যেভাবে আছেন সেভাবে থাকবেন’ এমন একটি আদেশ দিয়েছিলো। শেখ হাসিনা আত্মসমর্পণ করে আপিল ও জামিনের আবেদন জানালে ক্ষমতাসীন ও সহযোগী বিরোধী দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে ট্রাইব্যুনাল ‘আপিল ও জামিন শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ না করা পর্যন্ত তিনি এতদিন যেখানে ছিলেন সেখানেই থাকবেন, বিমান প্রস্তুত!’ — এমন আদেশ না দিয়ে দেয়।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]