সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

আয় বাড়লেও স্বস্তি নেই, হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ


রেজাউল করিম
রেজাউল করিম
প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪১ এএম

আয় বাড়লেও স্বস্তি নেই, হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ

মূল্যস্ফীতি ও আয়ের ভারসাম্যহীনতায় চাপে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানুষের আয় বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির গতি সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না আয় বাড়ার হার। তাই প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমসিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে ব্যয় কাটছাঁট করতে হচ্ছে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে। 

বিশ্বব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ে করা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই চাপের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাবারের দাম বেড়ে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া, আর সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদি করে তুলেছে। আর বাংলাদেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে খাবারের দাম। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, মুদ্রানীতির কড়াকড়ি কিছুটা প্রভাব ফেললেও সরবরাহভিত্তিক সমস্যাগুলো সমাধান না হলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানো কঠিন হবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা (পারচেইজিং পাওয়ার ইনডেক্স বা পিপিআই) বাড়ার সম্ভাবনাও সীমিত থেকে যাচ্ছে। 

রবিউল ইসলাম একজন ব্যাংকার। একটি বেসরকারি ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় তিনি চাকরি করেন। অফিসের কাছাকাছি হওয়ায় গত ৫ বছর ধরে তিনি মতিঝিলে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনের একটি ভবনে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। বাড়ি ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। এই বছর নতুন করে বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন বাড়িওয়ালা। জীবন নির্বাহের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবং সে অনুযায়ি বেতন না বাড়ায় তিনি আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। তাই তিনি সেই বাসাটা ছেড়ে দেন। 

তিনি সংবাদকে বলেন, ‘গত বছর আমি আগের বাসাটা ছেড়ে যাত্রাবাড়ির শনির আখড়ায় একটি নতুন বাসা নিয়েছি। চাকরিতে নতুন জয়েন করেছি। বেতনও বেশি নয়, ২৫ হাজার টাকা। আমি আর আমার স্ত্রী দু’জনের সংসার। আমাদের সংসারের খরচ মিটিয়ে গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে কিছু টাকা পাঠাতাম। কিন্তু বাসা ভাড়াসহ অন্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় আর পারছিলাম না। তাই আগের বাসাটা ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে কম খরচে নতুন বাসা নিয়েছি। সেখানে বাসা ভাড়া ১২ হাজার টাকা। তবে দূরে বাসা নেয়াতে যাতায়াত খরচ বেড়ে গেছে। এতে আরেক সমস্যায় পড়েছি। এছাড়া সবকিছুরই দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে জীবনটা বিষিয়ে উঠেছে।’

বাজার খরচেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে প্রতি মাসের শুরুতে মাছ-মাংস কিনে ফ্রিজে রেখে দিতাম। সারা মাস আর চিন্তা করতে হতো না। এখন জিনিসপত্রের যে দাম তাতে ডিপ ফ্রিজে মাছ-মাংসের জায়গাটা খালিই পড়ে থাকে। কারণ এক সঙ্গে বেশি করে কিনতে পারি না। সপ্তাহে ১-২ দিন মাছ-মাংস খাই, বাকি দিন ডাল-সবজি। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে সেই হারে আয়-ইনকাম না বাড়লে আসলে চলাটা মুশকিল।’

রাজধানির পুরানা পল্টনে সজিব হোসেনের চা-বিস্কুটের ছোট্ট একটি দোকান আছে। প্রায় ৮ বছর ধরে তিনি এই দোকানটি চালান। আগে ২০১৮ সালের দিকে এই দোকানের ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা। তখন মাসিক আয় হতো প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা। এখন সেই দোকানের ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার টাকায় এবং এখন আয় হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। পাঁচ বছর আগে ২০ হাজার টাকা আয় দিয়ে যেভাবে চলতে পারতেন এখন ২৫ হাজার টাকা আয় দিয়ে সেভাবে চলতে পারছেন না। কারণ, তার আয় বাড়ার তুলনায় মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে গেছে। 

জানতে চাইলে গতকাল তিনি সংবাদকে বলেন, ‘আগে পাঁচ-ছয়শো টাকা দিয়ে বাজারে যে পরিমান মালামাল কিনতে পারতাম, এখন তা কিনতে প্রায় এক হাজার টাকার বেশি লাগে। অন্যান্য খরচও একইভাবে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে একটার খরচ বাড়লে অন্যটি অটোমেটিক বেড়ে যায়।’

খরচ চালাতে না পেরে পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ে। দুইজনই স্কুলে পড়ে। ঢাকায় তাদের স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু খরচ চালাতে না পেরে পরিবারসহ গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছি। বিশেষ করে, দুই ছেলে-মেয়ের খরচটা অনেক কমে গেছে গ্রামের সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে। এভাবে যদি আমি খরচ না কমাতাম তাহলে ঢাকায় টিকতে পারতাম না।’

শুধু রবিউল বা সজিবই নয়, ঢাকা শহরে এমন অনেক পরিবার আছে যারা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে খরচে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অনেক পরিবারের দিন পার হচ্ছে ঠিকই কিন্তু পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। সস্তা প্রটিনের উৎস ব্রয়লার ও ডিমের উপর যখন এসব পরিবার নির্ভর করতে যাচ্ছে তখন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এসব পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। 

এই প্রসঙ্গে কথা হয় অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘অর্থনীতির এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আমি এক বছর সময় পেয়েছিলাম। এই সময়ের মধ্যে আমি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতেও শুরু করেছিল। ’

মানুষের আয় বাড়িয়ে করে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো যায় কিনা এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ি আয় বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। কারণ, এমনিতেই মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি আছে, আর আয় যদি আরও বাড়িয়ে দেয়া হয় তখন মূল্যস্ফীতি আর সেই জায়গায় থাকবে না, আরও বেড়ে যাবে। আয় আর কতটুকুই বা বাড়ানো যায়। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো ধরনের সূত্র কাজ করবে না।’

বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বিবিএস এর মূল্যস্ফীতি ও আয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ও আয়ের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ২০১৬ সালে গড় সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৫.৪ শতাংশ এবং আয় বৃদ্ধি ছিল ৬.৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৫.৭ শতাংশে দাঁড়ায়, আর আয় বৃদ্ধি হয় ৬.৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে মূল্যস্ফীতি আবার কিছুটা কমে ৫.৬ শতাংশে আসে, কিন্তু আয় প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭.০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০১৯ সালে মূল্যস্ফীতি আরও সামান্য কমে ৫.৫ শতাংশে নেমে আসে, আর আয় বৃদ্ধি হয় প্রায় ৭.২ শতাংশ। এই সময়টায় দেখা যায়, যেখানে মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আয় বৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেশি ছিল যা অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। 

২০২০ সালে এসে এই স্থিতিশীলতায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। মূল্যস্ফীতি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৫.৬ শতাংশে থাকলেও আয় বৃদ্ধি কমে ৫.৫ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ এই বছর আয় বৃদ্ধির গতি প্রথমবারের মতো মূল্যস্ফীতির নিচে চলে যায়। ২০২১ সালে মূল্যস্ফীতি একইভাবে ৫.৬ শতাংশে থাকলেও আয় বৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৫.৮ শতাংশে ওঠে। তবে এই বৃদ্ধি খুবই কম ছিল। এত বোঝা যায়, অর্থনীতি তখন একটি সংবেদনশীল অবস্থায় ছিল এবং বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। 

২০২২ সাল থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এই বছরে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৭.৭ শতাংশে পৌঁছায়, কিন্তু আয় বৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪.৫ শতাংশে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়। ২০২৩ সালে এই ব্যবধান আরও বেড়ে যায়। এ সময় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯.৯ শতাংশে উঠে যায়, কিন্তু আয় বৃদ্ধি নেমে আসে ৩.৮ শতাংশে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি প্রায় তিনগুণ গতিতে বাড়লেও আয় তার অর্ধেকেরও কম গতিতে বাড়ে যা একটি স্পষ্ট ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়। 

২০২৪ সালে এই চাপ আরও তীব্র হয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১০.২ শতাংশে পৌঁছায় যা পুরো সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে আয় বৃদ্ধি আরও কমে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এই সময় মূল্যস্ফীতি ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৬.৭ শতাংশে পৌঁছে যায় যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত চাপের পরিস্থিতি নির্দেশ করে। 

২০২৫ সালে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৮ শতাংশে নেমে আসে এবং আয় বৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪.০ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে এই উন্নতি সত্ত্বেও আয় এখনও মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম রয়েছে। ব্যবধান প্রায় ৪.৮ শতাংশ যা দেখায় যে ভারসাম্য এখনও পুরোপুরি ফিরেনি। 

সব মিলিয়ে এই দশ বছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম চার বছরে মূল্যস্ফীতি ও আয়ের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক ছিল। এই সময়ে আয় ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে এই সম্পর্ক ভেঙে পড়ে এবং মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে থাকে, অথচ আয় প্রবৃদ্ধি কমে যায়। অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের অসমতা তৈরি হয়। এই সময়ে পণ্যের দাম বাড়ার গতি মানুষের আয়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়। 

মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উত্থান-পতন

২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়টি বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার জন্য একটি তুলনামূলকভাবে স্বস্তির সময় হিসেবে দেখা যায়। ২০১৬ সালে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ছিল প্রায় ১.১ শতাংশ যা নির্দেশ করে যে আয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য বেশি ছিল। ২০১৭ সালেও একই প্রবণতা বজায় থাকে, যেখানে ক্রয়ক্ষমতা আবারও প্রায় ১.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০১৮ সালে এই বৃদ্ধি কিছুটা বাড়ে এবং তা দাঁড়ায় প্রায় ১.৪ শতাংশে। ২০১৯ সালে এসে এটি আরও উন্নত হয়ে প্রায় ১.৭ শতাংশে পৌঁছায়। এই চার বছরে ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করে যে, মানুষের বাস্তব আয় ধীরে ধীরে বাড়ছিল এবং বাজারে তাদের ক্রয়ক্ষমতা শক্তিশালী হচ্ছিল। 

২০২০ সালে এসে এই ইতিবাচক প্রবণতায় একটি বিরতি দেখা যায়। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা সামান্য কমে গিয়ে প্রায় মাইনাস ০.১ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ আয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় সমান হয়ে যাওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে পরিস্থিতি সামান্য উন্নতি হলেও তা খুবই সীমিত ছিল। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা মাত্র ০.২ শতাংশ বৃদ্ধি পায় যা বাস্তবে খুব বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন নির্দেশ করে না। বরং এটি বোঝায় যে অর্থনীতি তখন এক ধরনের নাজুক ভারসাম্যের মধ্যে ছিল। 

২০২২ সাল থেকে চিত্রটি নেতিবাচক হয়ে ওঠে। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা কমে দাঁড়ায় প্রায় মাইনাস ৩.২ শতাংশে যা বড় ধরনের পতনের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হলো, মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম ছিল, ফলে তারা আগের চেয়ে কম পণ্য ও সেবা কিনতে পেরেছেন। ২০২৩ সালে এই পতন আরও তীব্র হয় এবং ক্রয়ক্ষমতা নেমে যায় প্রায় মাইনাস ৬.১ শতাংশে। এটি অর্থনীতির জন্য আরও একটি বড় ধাক্কা। কারণ এত বড় নেতিবাচক পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

২০২৪ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায় এবং ক্রয়ক্ষমতা প্রায় নেতিবাচক ৬.৭ শতাংশে নেমে আসে যা পুরো দশকের সর্বনিম্ন। 

এই সময় মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও আয় বৃদ্ধি খুব সীমিত থাকায় মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ব্যয় বাড়ে। কিন্তু সেই ব্যয় সামাল দেয়ার মতো আয় বাড়েনি। 

২০২৫ সালে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দেখা যায়, তবে তা তখনও নেতিবাচক অবস্থাতেই থাকে। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা নেতিবাচক ৪.৮ শতাংশে অবস্থান করে যা আগের দুই বছরের তুলনায় কিছুটা কম পতনের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হলো, পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও মানুষের প্রকৃত আয় তখনও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। 

সব মিলিয়ে এই দশ বছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে বেড়ে একটি ইতিবাচক ধারায় ছিল, কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে তা ভেঙে পড়ে এবং ২০২২ সালের পর থেকে দ্রুত নেতিবাচক হয়ে যায়। বিশেষ করে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বড় ধরনের পতন প্রমাণ করে যে মূল্যস্ফীতির চাপ আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে জীবনযাত্রার মান সমন্বয় করতে হচ্ছে, ব্যয় কমাতে হচ্ছে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালাতে হচ্ছে। 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঠিক তেমনি আয় বাড়িয়ে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। অন্যথায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬


আয় বাড়লেও স্বস্তি নেই, হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মূল্যস্ফীতি ও আয়ের ভারসাম্যহীনতায় চাপে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানুষের আয় বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির গতি সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না আয় বাড়ার হার। তাই প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমসিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে ব্যয় কাটছাঁট করতে হচ্ছে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে। 

বিশ্বব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ে করা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই চাপের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাবারের দাম বেড়ে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া, আর সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদি করে তুলেছে। আর বাংলাদেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে খাবারের দাম। 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, মুদ্রানীতির কড়াকড়ি কিছুটা প্রভাব ফেললেও সরবরাহভিত্তিক সমস্যাগুলো সমাধান না হলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানো কঠিন হবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা (পারচেইজিং পাওয়ার ইনডেক্স বা পিপিআই) বাড়ার সম্ভাবনাও সীমিত থেকে যাচ্ছে। 

রবিউল ইসলাম একজন ব্যাংকার। একটি বেসরকারি ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় তিনি চাকরি করেন। অফিসের কাছাকাছি হওয়ায় গত ৫ বছর ধরে তিনি মতিঝিলে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনের একটি ভবনে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। বাড়ি ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। এই বছর নতুন করে বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন বাড়িওয়ালা। জীবন নির্বাহের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবং সে অনুযায়ি বেতন না বাড়ায় তিনি আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। তাই তিনি সেই বাসাটা ছেড়ে দেন। 

তিনি সংবাদকে বলেন, ‘গত বছর আমি আগের বাসাটা ছেড়ে যাত্রাবাড়ির শনির আখড়ায় একটি নতুন বাসা নিয়েছি। চাকরিতে নতুন জয়েন করেছি। বেতনও বেশি নয়, ২৫ হাজার টাকা। আমি আর আমার স্ত্রী দু’জনের সংসার। আমাদের সংসারের খরচ মিটিয়ে গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে কিছু টাকা পাঠাতাম। কিন্তু বাসা ভাড়াসহ অন্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় আর পারছিলাম না। তাই আগের বাসাটা ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে কম খরচে নতুন বাসা নিয়েছি। সেখানে বাসা ভাড়া ১২ হাজার টাকা। তবে দূরে বাসা নেয়াতে যাতায়াত খরচ বেড়ে গেছে। এতে আরেক সমস্যায় পড়েছি। এছাড়া সবকিছুরই দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে জীবনটা বিষিয়ে উঠেছে।’

বাজার খরচেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে প্রতি মাসের শুরুতে মাছ-মাংস কিনে ফ্রিজে রেখে দিতাম। সারা মাস আর চিন্তা করতে হতো না। এখন জিনিসপত্রের যে দাম তাতে ডিপ ফ্রিজে মাছ-মাংসের জায়গাটা খালিই পড়ে থাকে। কারণ এক সঙ্গে বেশি করে কিনতে পারি না। সপ্তাহে ১-২ দিন মাছ-মাংস খাই, বাকি দিন ডাল-সবজি। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে সেই হারে আয়-ইনকাম না বাড়লে আসলে চলাটা মুশকিল।’

রাজধানির পুরানা পল্টনে সজিব হোসেনের চা-বিস্কুটের ছোট্ট একটি দোকান আছে। প্রায় ৮ বছর ধরে তিনি এই দোকানটি চালান। আগে ২০১৮ সালের দিকে এই দোকানের ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা। তখন মাসিক আয় হতো প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা। এখন সেই দোকানের ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার টাকায় এবং এখন আয় হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। পাঁচ বছর আগে ২০ হাজার টাকা আয় দিয়ে যেভাবে চলতে পারতেন এখন ২৫ হাজার টাকা আয় দিয়ে সেভাবে চলতে পারছেন না। কারণ, তার আয় বাড়ার তুলনায় মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে গেছে। 

জানতে চাইলে গতকাল তিনি সংবাদকে বলেন, ‘আগে পাঁচ-ছয়শো টাকা দিয়ে বাজারে যে পরিমান মালামাল কিনতে পারতাম, এখন তা কিনতে প্রায় এক হাজার টাকার বেশি লাগে। অন্যান্য খরচও একইভাবে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে একটার খরচ বাড়লে অন্যটি অটোমেটিক বেড়ে যায়।’

খরচ চালাতে না পেরে পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ে। দুইজনই স্কুলে পড়ে। ঢাকায় তাদের স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু খরচ চালাতে না পেরে পরিবারসহ গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছি। বিশেষ করে, দুই ছেলে-মেয়ের খরচটা অনেক কমে গেছে গ্রামের সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে। এভাবে যদি আমি খরচ না কমাতাম তাহলে ঢাকায় টিকতে পারতাম না।’

শুধু রবিউল বা সজিবই নয়, ঢাকা শহরে এমন অনেক পরিবার আছে যারা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে খরচে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অনেক পরিবারের দিন পার হচ্ছে ঠিকই কিন্তু পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। সস্তা প্রটিনের উৎস ব্রয়লার ও ডিমের উপর যখন এসব পরিবার নির্ভর করতে যাচ্ছে তখন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এসব পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। 

এই প্রসঙ্গে কথা হয় অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘অর্থনীতির এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আমি এক বছর সময় পেয়েছিলাম। এই সময়ের মধ্যে আমি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতেও শুরু করেছিল। ’

মানুষের আয় বাড়িয়ে করে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো যায় কিনা এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ি আয় বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। কারণ, এমনিতেই মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি আছে, আর আয় যদি আরও বাড়িয়ে দেয়া হয় তখন মূল্যস্ফীতি আর সেই জায়গায় থাকবে না, আরও বেড়ে যাবে। আয় আর কতটুকুই বা বাড়ানো যায়। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো ধরনের সূত্র কাজ করবে না।’

বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বিবিএস এর মূল্যস্ফীতি ও আয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ও আয়ের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ২০১৬ সালে গড় সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৫.৪ শতাংশ এবং আয় বৃদ্ধি ছিল ৬.৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৫.৭ শতাংশে দাঁড়ায়, আর আয় বৃদ্ধি হয় ৬.৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে মূল্যস্ফীতি আবার কিছুটা কমে ৫.৬ শতাংশে আসে, কিন্তু আয় প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭.০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০১৯ সালে মূল্যস্ফীতি আরও সামান্য কমে ৫.৫ শতাংশে নেমে আসে, আর আয় বৃদ্ধি হয় প্রায় ৭.২ শতাংশ। এই সময়টায় দেখা যায়, যেখানে মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আয় বৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেশি ছিল যা অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। 

২০২০ সালে এসে এই স্থিতিশীলতায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। মূল্যস্ফীতি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৫.৬ শতাংশে থাকলেও আয় বৃদ্ধি কমে ৫.৫ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ এই বছর আয় বৃদ্ধির গতি প্রথমবারের মতো মূল্যস্ফীতির নিচে চলে যায়। ২০২১ সালে মূল্যস্ফীতি একইভাবে ৫.৬ শতাংশে থাকলেও আয় বৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৫.৮ শতাংশে ওঠে। তবে এই বৃদ্ধি খুবই কম ছিল। এত বোঝা যায়, অর্থনীতি তখন একটি সংবেদনশীল অবস্থায় ছিল এবং বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। 

২০২২ সাল থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এই বছরে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৭.৭ শতাংশে পৌঁছায়, কিন্তু আয় বৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪.৫ শতাংশে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়। ২০২৩ সালে এই ব্যবধান আরও বেড়ে যায়। এ সময় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯.৯ শতাংশে উঠে যায়, কিন্তু আয় বৃদ্ধি নেমে আসে ৩.৮ শতাংশে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি প্রায় তিনগুণ গতিতে বাড়লেও আয় তার অর্ধেকেরও কম গতিতে বাড়ে যা একটি স্পষ্ট ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়। 

২০২৪ সালে এই চাপ আরও তীব্র হয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১০.২ শতাংশে পৌঁছায় যা পুরো সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে আয় বৃদ্ধি আরও কমে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এই সময় মূল্যস্ফীতি ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৬.৭ শতাংশে পৌঁছে যায় যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত চাপের পরিস্থিতি নির্দেশ করে। 

২০২৫ সালে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৮ শতাংশে নেমে আসে এবং আয় বৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪.০ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে এই উন্নতি সত্ত্বেও আয় এখনও মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম রয়েছে। ব্যবধান প্রায় ৪.৮ শতাংশ যা দেখায় যে ভারসাম্য এখনও পুরোপুরি ফিরেনি। 

সব মিলিয়ে এই দশ বছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম চার বছরে মূল্যস্ফীতি ও আয়ের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক ছিল। এই সময়ে আয় ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে এই সম্পর্ক ভেঙে পড়ে এবং মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে থাকে, অথচ আয় প্রবৃদ্ধি কমে যায়। অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের অসমতা তৈরি হয়। এই সময়ে পণ্যের দাম বাড়ার গতি মানুষের আয়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়। 

মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উত্থান-পতন

২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়টি বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার জন্য একটি তুলনামূলকভাবে স্বস্তির সময় হিসেবে দেখা যায়। ২০১৬ সালে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ছিল প্রায় ১.১ শতাংশ যা নির্দেশ করে যে আয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য বেশি ছিল। ২০১৭ সালেও একই প্রবণতা বজায় থাকে, যেখানে ক্রয়ক্ষমতা আবারও প্রায় ১.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০১৮ সালে এই বৃদ্ধি কিছুটা বাড়ে এবং তা দাঁড়ায় প্রায় ১.৪ শতাংশে। ২০১৯ সালে এসে এটি আরও উন্নত হয়ে প্রায় ১.৭ শতাংশে পৌঁছায়। এই চার বছরে ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করে যে, মানুষের বাস্তব আয় ধীরে ধীরে বাড়ছিল এবং বাজারে তাদের ক্রয়ক্ষমতা শক্তিশালী হচ্ছিল। 

২০২০ সালে এসে এই ইতিবাচক প্রবণতায় একটি বিরতি দেখা যায়। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা সামান্য কমে গিয়ে প্রায় মাইনাস ০.১ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ আয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় সমান হয়ে যাওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে পরিস্থিতি সামান্য উন্নতি হলেও তা খুবই সীমিত ছিল। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা মাত্র ০.২ শতাংশ বৃদ্ধি পায় যা বাস্তবে খুব বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন নির্দেশ করে না। বরং এটি বোঝায় যে অর্থনীতি তখন এক ধরনের নাজুক ভারসাম্যের মধ্যে ছিল। 

২০২২ সাল থেকে চিত্রটি নেতিবাচক হয়ে ওঠে। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা কমে দাঁড়ায় প্রায় মাইনাস ৩.২ শতাংশে যা বড় ধরনের পতনের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হলো, মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম ছিল, ফলে তারা আগের চেয়ে কম পণ্য ও সেবা কিনতে পেরেছেন। ২০২৩ সালে এই পতন আরও তীব্র হয় এবং ক্রয়ক্ষমতা নেমে যায় প্রায় মাইনাস ৬.১ শতাংশে। এটি অর্থনীতির জন্য আরও একটি বড় ধাক্কা। কারণ এত বড় নেতিবাচক পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

২০২৪ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায় এবং ক্রয়ক্ষমতা প্রায় নেতিবাচক ৬.৭ শতাংশে নেমে আসে যা পুরো দশকের সর্বনিম্ন। 

এই সময় মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও আয় বৃদ্ধি খুব সীমিত থাকায় মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ব্যয় বাড়ে। কিন্তু সেই ব্যয় সামাল দেয়ার মতো আয় বাড়েনি। 

২০২৫ সালে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দেখা যায়, তবে তা তখনও নেতিবাচক অবস্থাতেই থাকে। ওই বছরে ক্রয়ক্ষমতা নেতিবাচক ৪.৮ শতাংশে অবস্থান করে যা আগের দুই বছরের তুলনায় কিছুটা কম পতনের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হলো, পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও মানুষের প্রকৃত আয় তখনও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। 

সব মিলিয়ে এই দশ বছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে বেড়ে একটি ইতিবাচক ধারায় ছিল, কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে তা ভেঙে পড়ে এবং ২০২২ সালের পর থেকে দ্রুত নেতিবাচক হয়ে যায়। বিশেষ করে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বড় ধরনের পতন প্রমাণ করে যে মূল্যস্ফীতির চাপ আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে জীবনযাত্রার মান সমন্বয় করতে হচ্ছে, ব্যয় কমাতে হচ্ছে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালাতে হচ্ছে। 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঠিক তেমনি আয় বাড়িয়ে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। অন্যথায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না।



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত