শখ করে পোষা ষাঁড় গরুটি বিক্রি করে তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন প্রান্তিক কৃষক আবু জাফর। স্বপ্ন ছিল অধিক লাভের। ফলন ভালো হলেও শেষ পর্যন্ত তার সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
বাজারে হাইব্রিড পেঁয়াজের দাম কম হওয়ায় লাভের বদলে এখন বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি। জাফরের আক্ষেপ, নিজের জমির সব পেঁয়াজ বিক্রি করেও এখন আর একটা বাছুর গরু কেনার টাকা উঠবে না।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের মুকশিদপুর গ্রামের শাহাদত বিশ্বাসের ছেলে আবু জাফর। অধিক লাভের আশায় সোনাপাতিল বিলে বাবার তিন বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের শীতকালীন পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন তিনি। আবাদের খরচ জোগাতে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় নিজের পালিত বড় ষাঁড়টি বিক্রি করেন। সেই টাকার পুরোটাই খরচ করেন পেঁয়াজ চাষে। বিঘা প্রতি প্রায় ৭০ মণ করে মোট ২১০ মণ ফলন পেলেও বর্তমান বাজারদরে তিনি দিশেহারা।
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ হাইব্রিড পেঁয়াজ ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ কৃষকদের দাবি, প্রতি মণ পেঁয়াজ আবাদে খরচ হয়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।
একই বিলের ১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন বেতবাড়িয়া গ্রামের ইকবাল হোসেন। তিনি নিজের জমির পাশাপাশি অন্যের জমি ইজারা নিয়েও চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমির জন্য মালিককে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ইজারা দিতে হয়েছে।
তিনি জানান, জমির ইজারা বাদেও তার ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। ফলন ভালো হলেও বর্তমান বাজারদরে শুধু পুঁজি ফেরত আসা নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি।
একই বিলে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড জাতের ক্রস-৮০, মেটাল, কিং, সুপার কিং ও সুখসাগর জাতের পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন নজরুল ইসলাম, মাসুদসহ কয়েক’শ কৃষক। তাদের প্রত্যেকেরই ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু দাম নিয়ে তারা চরম হতাশ। কৃষকদের দাবি, এসব পেঁয়াজের চাহিদা কম থাকায় বাজারে দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষক আবু জাফর বলেন, ‘আমি মূলত তাঁতি সম্প্রদায়ের মানুষ। কাপড়ের ব্যবসা খারাপ হওয়ায় লাভের আশায় গরু বিক্রি করে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম। ফলন যা পেয়েছি তাতে খুশি ছিলাম, কিন্তু বাজারে এই পেঁয়াজ চলে না। ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এখন সব পেঁয়াজ বিক্রি করলেও একটা বাছুর কেনা সম্ভব নয়।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল নোমান জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জমির পেঁয়াজ তোলা শেষ। জাতভেদে বিঘা প্রতি গড় ফলন হয়েছে ১০০ মণের মতো।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, হাইব্রিড পেঁয়াজে রসের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি সংরক্ষণ করা কিছুটা কঠিন। তবে সংরক্ষণের জন্য বাজারে কিছু আধুনিক মেশিন এসেছে, যা পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ফলন বেশি হওয়ায় বাজারে বর্তমানে দাম কিছুটা কম বলে তিনি স্বীকার করেন।
আপনার মতামত লিখুন