রাতের অর্ধেকটা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ঘুম না আসায় নাইকির মনে হয় যে আরো একটা নির্ঘুম রাত অনন্তকালের জন্য চাপা পড়ে যেতে চলেছে উত্তরের মেরুতুষারের হিমেল ঢালের নিচে, যদি না কোনো এক দিন এ অস্থির পৃথিবীর দ্রুত পরিবর্তনশীল জলহাওয়ার সমতা ভেঙ্গে শীতল জলমহল ছেড়ে ওখানের হিমজমাট গ্ল্যাসিয়ারের সঙ্গে ভেসে এসে দক্ষিণের কোনো উষ্ণ সমুদ্রের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে অবশেষে থিতু হয় কিছুকালের জন্য। তারপর সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে এসে আবার বৃষ্টি হয়ে দক্ষিণমেরুর বরফঢাকা পর্বতমালা হতে গড়িয়ে আসে আরো দক্ষিণে বয়ে চলা কোনো এক নদীর স্রোতে মিশে ওর কোনো এক উত্তরপুরুষের কমণ্ডলুতে পুজোর জল হিসেবে ওদের সুপ্রাচীন গুরুদেবতাদের পায়ে অর্ঘ্য ছিটাতে।
এটা হয়তো নিছক এক কষ্টকল্পনা। আর যদি এটা কল্পনাই হয়ে থাকে তবে খানিকটা কষ্টছোঁয়া হলেই বা ক্ষতি কী, বিশেষ করে এমন এক অলক্ষুণে নির্ঘুম কোনো রাতের বিক্ষিপ্ত মনোজগৎ ও ক্লান্তিদগ্ধ শরীরে!
তাহলে শরীরটা যখন ওর নিজেরই মনে হলো তখন এটাকে আর নিজের কাছে নিরাপদ মনে না হওয়ায় ভোর রাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে সে একজন স্ত্রীর সন্ধানে যে প্রকৃত অর্থেই এটার যত্ন নেবে কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও। মনে মনে ভাবে সে, দেখা যাক ভোরের আকাশে একটা ভালো দিনের নীলাভ এক কামনা মেলে দিয়ে।
কিন্তু বড্ড অসময় তখন। রাস্তার রাজারা নেমে পড়েছে রাস্তায়। কাকডাকা এই ভোররাতে কোনো বাহন প্রত্যাশা করা অবান্তর। তারপর শেষরাতের ঘরমুখী খেকো বাবাজীরা তো আছেনই। মানুষের নিঃশ্বাসের ভার তখন কিছুটা কম থাকায় বাতাস একটু হালকা মনে হয় ওর কাছে। নিঃশ্বাস নিতে থাকে সে অন্য সময় থেকে অনেক বেশি করে, অথবা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। এভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার পর একটু হলেও উজ্জীবিত মনে হয় নিজেকে। মনে মনে নিজেকে বলে সে, দিনের কিছুটা সময় হলেও যদি এভাবে নিঃশ্বাস না নাও তাহলে তুমি কখনোই মনে করতে পারবে না যে তোমার বেঁচে থাকা মানে এই নিঃশ্বাস নেয়া। জীবনে প্রথমবারের মতো কেঁদেছিলে তুমি এই নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য, আর এখনো কেঁদেই চলেছ, যদিও এই কান্না তুমি লুকিয়ে রাখো তোমার ব্যক্তিত্বকে খাটো না করার প্রচেষ্টায়!
কোনো কোনো মধ্য রাতে জেগে থেকেও নাইকির মনে হয় যে সে জেগে আছে স্বপ্নের ভেতর ডুবে থাকা মানুষের এলোমেলো চেতনার বিক্ষিপ্ত বহমানতায়। অবসাদ নাকি অবচেতন মনের কোনো ইচ্ছে, কে জানে কী, কালো কফির তৃষ্ণা জাগিয়ে হেঁসেলের কিনারায় প্রিয় নারীমুখ ভেসে উঠতে না উঠতেই ভদকার তীব্র টানে এক ঝলক তরল আগুন ঠোঁটের আল পেরিয়ে গলনালী চিরে নেমে আসে নিচের দিকে। অতঃপর ওর নোনা রক্তে মিশে নিঃসঙ্গ সত্তার গহীনে ঝড় তুলে তছনছ করে দেয় যাবতীয় চিন্তার জটাজাল। তখন জেগে থাকে কেবল অসীম শূন্যতার আর্তনাদ, নৈঃশব্দ্যের গুঞ্জন। হাতের মাঝখানে তখন কাচের গ্লাসটাও আর নেই। অবশ আঙ্গুলগুলো মুঠো করতে চাইলে ভাঁজা পাপড়ের মতো বোতলের গোলাকার কাচ গুঁড়িয়ে রক্তস্রোত নামে ওর আঙ্গুল বেয়ে। ভদকায় ধুয়ে ফেলে সে ওসব। মনের সঙ্গে ওর শরীরটা কখনো মিলেমিশে চলে না। এই যা ঝামেলা। হাড়েমাংসে হাড্ডাহাড্ডি ঝগড়ায় মেতে থাকে সারাক্ষণ। রক্ত দ্রুত টগবগিয়ে উঠে ওর হৃৎপিণ্ডের চাপ বাড়িয়ে দেয়। পেশির ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীরটা তখন চায় উষ্ণ জলাধারের তরল পরশ। জলপিপের নিবিড় আলিঙ্গন।
আঙ্গুলের কাটাচিহ্নটার দিকে একবার তাকায় নাইকি। তারপর হাঁটতে হাঁটতে লোকালয়টা অতিক্রম করে যায়। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বাড়ি যার প্রতিটা ভিন্ন গড়নের। ওগুলোর ভেতরের মানুষগুলোর বৈশিষ্ট্যের মতো অনেকটা। দু-একটা বাড়ির সদর দরজায় এখনো পুরোনো আদলে লেখা ‘কুকুর হইতে সাবধান’। কিন্তু সে জানে যে ওগুলোর ভেতরে কোনো কুকুর নেই। নিতান্তই কৌতূহল মেটাতে ওরকম একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে নাইকি। একটা নেড়ি কুকুর শুয়ে আছে ওটার গেটের বাইরে। ওতে ওর আরো ভালোভাবে মনে হয় যে ভেতরে কোনো কুকুর নেই। মনে মনে ভাবে সে যে বাইরের কুকুরটাকে একটা ছোট্ট আঘাত করে ওকে দিয়ে একটা ‘ঘেউ’ শব্দ করানো যেতে পারে। পরক্ষণেই মনে হয় ওটার কোনো প্রয়োজন নেই। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে এমন কিছু শব্দ করতে থাকে সে যা শুনে একটা কুকুর নিশ্চিতভাবেই ছুটে আসবে যদি আদৌ ওটা থাকে সেখানে। কিছুক্ষণ পর নিজের মাথাটাই পাঁচিলের ওপর উঠিয়ে দেয় সে। কুকুর কেন, মনে হয় কোনো মানুষই নেই এখন এই বাড়িটাতে।
হাঁটতে হাঁটতে অভিজাত এলাকাটার শেষ প্রান্তে এসে পড়ে সে। একটা রেললাইন আবাসিক ঘরবাড়িগুলোকে দুভাগে ভাগ করে রেখেছে। রেললাইনের দুদিকে নদীর দু’তীরের মতো গড়ে উঠেছে বস্তি। হয়তো ওখানেই থাকে আবাসিক এলাকাটা থেকেও অনেক বেশি মানুষ, যদি আমরা ওদেরকেও মানুষ বলে মনে করে থাকি। আর আবাসিক এলাকাটাও-বা কতটুকু আবাসিক! ওখানের অর্ধেকের চেয়েও বেশি ঘরবাড়ি ব্যবসার কাজে লাগিয়েছে ওগুলোর মালিকেরা, যার অধিকাংশ জার্মান শব্দ কিন্ডারগার্টেন নামের শিশুদের পাঠশালা, যেখানে ওরা বলে, ‘বাচ্চাদের পড়াশোনা শেখানো হয়’, হাসপাতাল বা ক্লিনিক-জাতীয় কিছু, খাবারের দোকান, কিছু পার্লার, যদিও সবাই জানে যে ওখানে গোপন অন্য কিছু আদান-প্রদান করা হয়, এই এমন সব আশ্চর্য নামের আড়ালে গড়ে উঠেছে তথাকথিত ‘আবাসিক এলাকা’। ওসব প্রতিষ্ঠানের নামগুলোও আবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বা ওইসব দেশের রাজধানীর নামে। বাংলা কোনো নাম খোঁজা কারো উচিত হবে না। যেমন, যদি কারো সন্তানের নাম বাংলায় রাখে কেউ তাহলে সারা জীবন ওই সন্তানটিকে উৎসাহীদের কাছে ওর নামের অর্থ বলে যাওয়ার বিড়ম্বনা পোহাতে হবে।
ওই বস্তিগুলো নদীর দু’তীরের মতো ভাঙ্গে ও গড়ে। ওখানে যারা বাস করে তাদের উচ্ছেদের কথা কখনো ভাবে না ভবনের অধিবাসীরা। অথচ কোনো না কোনো দলের লোকেরা বছরে দু-একবার উচ্ছেদ করবে ওদের। তা না হলে ওদের পিতাপ্রভুদের করে-খাওয়া চলে না। ওইসব প্রভুদের অনেকে হয়তো ওই এলাকাতেই থাকে। ওদের বাসার আয়া-বুয়া, দারোয়ান, বাবুর্চি, গাড়ি চালক, এরা সব ওখান থেকে আসে। ওদের সব দিক সামলাতে পারে বস্তির এসব মানুষেরা। রেললাইনের দু’পাশের দুটো অভিজাত আবাসিক এলাকার মধ্যখানের বস্তিটা যেন একটা বাফার জোন। রেললাইনটা সীমান্ত। যদিও দু’পক্ষে কখনো সংঘর্ষ হয় না। পারস্পরিক শান্তি রক্ষা করে চলতে হয় বস্তিবাসীদের। পাশাপাশি বসবাসের এই সংস্কৃতিটি হয়তো ভালোই। করে খেতে পারছে সবাই।
শুক্রবারের সকালগুলো এদিকে অনেকটা জনমানবহীনভাবে শুয়ে থাকে বা গড়িয়ে যায়। অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন না থাকায় সাহেবরা অনেকটা বেলা পর্যন্ত ঘুমোয়। বেগমরাও সপ্তাহের অন্য রাতগুলোর প্রাপ্তি সুদে-আসলে তুলে নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকে ওদের সমর্থনে। ফলে অনেক চর্বিঝোলা বস্তু দেখতে হয় না এসব সকালে। বস্তিগুলোয় অবশ্য গত রাতের উনুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আগুন জ্বালাতে হয়। ওদের ব্যস্ততা অথবা প্রয়োজন সপ্তাহের অন্য রাতগুলো থেকে বরং ছুটির দিনগুলোয় আরো অনেক বেশি থাকে।
আশপাশে কোথাও একটা মোরগ ডেকে ওঠায় কান খাড়া করে নাইকি। অবাক ঘটনা! মনে করতে পারে না সে যে কতদিন এ শহরে মোরগের ডাক শোনেনি। মনে মনে ভাবে সে, কী যেন বলে মোরগের ডাক দেয়াকে? তাও কি ভুলে গেছে সে! বাগ দেয়া?
নিয়ন-জ্বলা ধূসর একটা শহরে ভোরের আলো যতটা স্বচ্ছ হতে পারে তা হয়ে গেছে। এ মোরগটা হয়তো ঘুমকাতুরে অথবা কোনো সায়েবসুবো। গ্রামের মোরগেরা অন্ধকার থাকতেই বাগ দেয়া শুরু করে। হাঁটার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দেয়ায় হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে গলার কাছে চলে আসে ওর। তারপর সেখানেই আটকে থাকে কিছুক্ষণ আর মস্তিষ্কে আরো বেশি করে রক্ত পাঠাতে থাকে যেন ওই মুহূর্তে আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারে ওটা। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ দৌড়াতে হয় ওকে। অবাক চোখে সে দেখে যে মাটি ফুঁড়ে এসে আরো অনেকে দৌড়াতে শুরু করেছে। মনে মনে ভাবে নাইকি, এই একটু আগেও এসব মানুষগুলো ছিল কোথায়? ওরাও কি জানে না যে কেন ওরা দৌড়াচ্ছে? নাকি সেই শুধু জানে না। মানুষগুলোর চোখেমুখে আতঙ্কের তেমন কোনো চিহ্ন নেই। ক্লান্তিকর দৌড়ে বস্তিগুলোর প্রায় শেষদিকটায় এসে পড়ে নাইকি। ওখানে পৌঁছে সে দেখে যে বেশ বড় দুটো ছেলেমেয়ে নিঃসংকোচে প্রাতঃকৃত্য সারছে। ওকে দেখেও ওরা পুরোপুরি ভাবলেশহীন। যেন ওদের দৌড়ানোর কোনো প্রয়োজনই নেই। নাইকির পক্ষে আর সামনে এগোনো মুশকিল। বাতাস ওখানে সিসার চেয়েও ভারী। বস্তির যত নর্দমা, আবর্জনা, সব এসে জমা হয়েছে নিচু ওই জলাভূমিতে। পানি বলতে যা বোঝায় তার একবিন্দুও নেই ওখানে। কালো থিকথিকে একটা তরল পদার্থ জমে রয়েছে ঘন কচুরিপানার নিচে।
নিঃশ্বাস— এবার এটা নেয়া বন্ধ করতে হবে তোমাকে— ভাবতে না ভাবতেই, বস্তিতে অনেকটা বেমানান এমন এক মহিলার হেঁচকা টানে চটের দরজা অথবা পর্দা ভেদ করে অন্ধকার এক কুঠরিতে ঢুকে পড়ে সে। ‘বাঁচতে চাইলে হুইত্তা পড়েন’ বলেই একটা চাটাইয়ের ওপর ওকে ফেলে একটা দুর্গন্ধ কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেয়। তখন সত্যি সত্যি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ওর। ‘ওই দিক ঘুইরা শুন’ বলে ওই মহিলাও ঢুকে পড়ে কাঁথার ভেতর। কিন্তু ঘুরে শোয় না নাইকি। মহিলার ভারী নিতম্ব ওর শরীর স্পর্শ করায় সে ভাবতে শুরু করে যে কোথাও জড়িয়ে যাচ্ছে কিনা। ওর ঘুরে না শোয়াতে ওই মহিলাই ওর দিকে ফিরে শোয়। ফিসফিসিয়ে বলে ‘ডর লাগে? ডরাইয়েন না। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কিলিয়ার অইয়া যাইব।’ ওর ওই কথায় সত্যি সত্যি ভয় পায় নাইকি। উটকো এমন একটা অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় ভাবতে শুরু করে। অনেকটা কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকে কান ফাটানো গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। তখন ওই মহিলাকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে নাইকি। তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে সে বলে ‘আরে আমার পুরুষ মানুষরে, কইলাম না ডরাইয়েন না।’
পাঁচ নয়, দু’মিনিটের মধ্যেই সব নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়। আরো এক দু’মিনিট পর মানুষজনের সাড়া পাওয়া যেতে থাকে। যন্ত্রচালিতের মতো ওখান থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে নাইকি। আশপাশের মানুষগুলো ইতোমধ্যে একজন দু’জন করে এগিয়ে এসে জলা জায়গাটার দিকে একটা জটলা গড়ে তোলে। সেও এগিয়ে যায় ওদিকে।
কালো ওই তরল পদার্থের ভেতর একটা মানুষের সাড়ে তিন লিটার রক্ত আর কতটুকুইবা! মানুষগুলো ঝুঁকে মৃতের মুখটা দেখার চেষ্টা করে। স্মৃতি হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করে যে মানুষটা ওদের পরিচিত কেউ কিনা। অপরিচিত হলে বুকটা হালকা করে নেয় দুর্গন্ধ বাতাসে বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে দিয়ে।
এখন ওর মুখটা দেখতে চায় না নাইকি। ওর কাছে একজন মৃত, তা সে পরিচিত হোক আর অপরিচিত হোক, একই রকম। একটা জড় পদার্থ ভিন্ন অন্য কিছু নয় এখন ওটা। সে বরং ওই মহিলাকে খোঁজার চেষ্টা করে। ওর পালিয়ে থাকা জায়গাটার কাছে এসে সবগুলো ঝুপড়িকে একই রকম মনে হয়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে ওইরকম কোনো মহিলা কোনো ঘর থেকে বেরিয়ে আসে কিনা। সে হয়তো কোনো অভিজাত ঘরের বুয়া। বেশভূষায় ওরকমই মনে হয়েছে নাইকির। বেশ কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পরও কোনো কিছু উদ্ধার করতে পারে না সে। ওকে দেখে কিছুটা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় এক প্রায়-বৃদ্ধা মহিলা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘কারে খোঁজেন?’
কার নাম বলবে সে? মানুষ তো মানুষকে নামেই চেনে। নাম দূরে থাক ওর চেহারাটাই হয়তো এখন আর মনে নেই নাইকির। বাফার জোন ছেড়ে উল্টোপথে ফিরে আসে সে। নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করে আবার। আহা নিঃশ্বাস! এভাবে নিঃশ্বাস নিতে নিতে চেষ্টা করে সে ভুলে থাকতে ওর নিকট অতীত, দূর অতীত, এমনকি সকল অতীত...
ফিরে আসে সে আবার ওর নিজের জগতে। আলো, বাতাস, অন্ধকার, উষ্ণতা প্রকৃতির এসব নিজস্ব বিষয়গুলো যখন অবারিত তখনই প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করার উপযোগী বাইরের লিকলিকে হাওয়া মুহূর্তের ভেতর ওর হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলিকে পাইয়ে দেয় আবার। যেসব নেই বলে বিভ্রম ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিল সে ওর অবচেতন বোধের যন্ত্রণা থেকে সেসব খুঁজে দেখে ওগুলো সব এক অর্থহীনতা হাতড়িয়ে বেড়ানোর যন্ত্রণা বই অন্য কিছু নয়। নিশ্চিতভাবে যখন বুঝতে পারে সে যে ওগুলো ওর নয়, কখনোই পাবে না সে ওই সব অধরা বিষয়গুলো তখন ঘরে ফিরে যেতে প্রলুব্ধ করে সে নিজেকে।

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
রাতের অর্ধেকটা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ঘুম না আসায় নাইকির মনে হয় যে আরো একটা নির্ঘুম রাত অনন্তকালের জন্য চাপা পড়ে যেতে চলেছে উত্তরের মেরুতুষারের হিমেল ঢালের নিচে, যদি না কোনো এক দিন এ অস্থির পৃথিবীর দ্রুত পরিবর্তনশীল জলহাওয়ার সমতা ভেঙ্গে শীতল জলমহল ছেড়ে ওখানের হিমজমাট গ্ল্যাসিয়ারের সঙ্গে ভেসে এসে দক্ষিণের কোনো উষ্ণ সমুদ্রের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে অবশেষে থিতু হয় কিছুকালের জন্য। তারপর সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে এসে আবার বৃষ্টি হয়ে দক্ষিণমেরুর বরফঢাকা পর্বতমালা হতে গড়িয়ে আসে আরো দক্ষিণে বয়ে চলা কোনো এক নদীর স্রোতে মিশে ওর কোনো এক উত্তরপুরুষের কমণ্ডলুতে পুজোর জল হিসেবে ওদের সুপ্রাচীন গুরুদেবতাদের পায়ে অর্ঘ্য ছিটাতে।
এটা হয়তো নিছক এক কষ্টকল্পনা। আর যদি এটা কল্পনাই হয়ে থাকে তবে খানিকটা কষ্টছোঁয়া হলেই বা ক্ষতি কী, বিশেষ করে এমন এক অলক্ষুণে নির্ঘুম কোনো রাতের বিক্ষিপ্ত মনোজগৎ ও ক্লান্তিদগ্ধ শরীরে!
তাহলে শরীরটা যখন ওর নিজেরই মনে হলো তখন এটাকে আর নিজের কাছে নিরাপদ মনে না হওয়ায় ভোর রাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে সে একজন স্ত্রীর সন্ধানে যে প্রকৃত অর্থেই এটার যত্ন নেবে কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও। মনে মনে ভাবে সে, দেখা যাক ভোরের আকাশে একটা ভালো দিনের নীলাভ এক কামনা মেলে দিয়ে।
কিন্তু বড্ড অসময় তখন। রাস্তার রাজারা নেমে পড়েছে রাস্তায়। কাকডাকা এই ভোররাতে কোনো বাহন প্রত্যাশা করা অবান্তর। তারপর শেষরাতের ঘরমুখী খেকো বাবাজীরা তো আছেনই। মানুষের নিঃশ্বাসের ভার তখন কিছুটা কম থাকায় বাতাস একটু হালকা মনে হয় ওর কাছে। নিঃশ্বাস নিতে থাকে সে অন্য সময় থেকে অনেক বেশি করে, অথবা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। এভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার পর একটু হলেও উজ্জীবিত মনে হয় নিজেকে। মনে মনে নিজেকে বলে সে, দিনের কিছুটা সময় হলেও যদি এভাবে নিঃশ্বাস না নাও তাহলে তুমি কখনোই মনে করতে পারবে না যে তোমার বেঁচে থাকা মানে এই নিঃশ্বাস নেয়া। জীবনে প্রথমবারের মতো কেঁদেছিলে তুমি এই নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য, আর এখনো কেঁদেই চলেছ, যদিও এই কান্না তুমি লুকিয়ে রাখো তোমার ব্যক্তিত্বকে খাটো না করার প্রচেষ্টায়!
কোনো কোনো মধ্য রাতে জেগে থেকেও নাইকির মনে হয় যে সে জেগে আছে স্বপ্নের ভেতর ডুবে থাকা মানুষের এলোমেলো চেতনার বিক্ষিপ্ত বহমানতায়। অবসাদ নাকি অবচেতন মনের কোনো ইচ্ছে, কে জানে কী, কালো কফির তৃষ্ণা জাগিয়ে হেঁসেলের কিনারায় প্রিয় নারীমুখ ভেসে উঠতে না উঠতেই ভদকার তীব্র টানে এক ঝলক তরল আগুন ঠোঁটের আল পেরিয়ে গলনালী চিরে নেমে আসে নিচের দিকে। অতঃপর ওর নোনা রক্তে মিশে নিঃসঙ্গ সত্তার গহীনে ঝড় তুলে তছনছ করে দেয় যাবতীয় চিন্তার জটাজাল। তখন জেগে থাকে কেবল অসীম শূন্যতার আর্তনাদ, নৈঃশব্দ্যের গুঞ্জন। হাতের মাঝখানে তখন কাচের গ্লাসটাও আর নেই। অবশ আঙ্গুলগুলো মুঠো করতে চাইলে ভাঁজা পাপড়ের মতো বোতলের গোলাকার কাচ গুঁড়িয়ে রক্তস্রোত নামে ওর আঙ্গুল বেয়ে। ভদকায় ধুয়ে ফেলে সে ওসব। মনের সঙ্গে ওর শরীরটা কখনো মিলেমিশে চলে না। এই যা ঝামেলা। হাড়েমাংসে হাড্ডাহাড্ডি ঝগড়ায় মেতে থাকে সারাক্ষণ। রক্ত দ্রুত টগবগিয়ে উঠে ওর হৃৎপিণ্ডের চাপ বাড়িয়ে দেয়। পেশির ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীরটা তখন চায় উষ্ণ জলাধারের তরল পরশ। জলপিপের নিবিড় আলিঙ্গন।
আঙ্গুলের কাটাচিহ্নটার দিকে একবার তাকায় নাইকি। তারপর হাঁটতে হাঁটতে লোকালয়টা অতিক্রম করে যায়। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বাড়ি যার প্রতিটা ভিন্ন গড়নের। ওগুলোর ভেতরের মানুষগুলোর বৈশিষ্ট্যের মতো অনেকটা। দু-একটা বাড়ির সদর দরজায় এখনো পুরোনো আদলে লেখা ‘কুকুর হইতে সাবধান’। কিন্তু সে জানে যে ওগুলোর ভেতরে কোনো কুকুর নেই। নিতান্তই কৌতূহল মেটাতে ওরকম একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে নাইকি। একটা নেড়ি কুকুর শুয়ে আছে ওটার গেটের বাইরে। ওতে ওর আরো ভালোভাবে মনে হয় যে ভেতরে কোনো কুকুর নেই। মনে মনে ভাবে সে যে বাইরের কুকুরটাকে একটা ছোট্ট আঘাত করে ওকে দিয়ে একটা ‘ঘেউ’ শব্দ করানো যেতে পারে। পরক্ষণেই মনে হয় ওটার কোনো প্রয়োজন নেই। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে এমন কিছু শব্দ করতে থাকে সে যা শুনে একটা কুকুর নিশ্চিতভাবেই ছুটে আসবে যদি আদৌ ওটা থাকে সেখানে। কিছুক্ষণ পর নিজের মাথাটাই পাঁচিলের ওপর উঠিয়ে দেয় সে। কুকুর কেন, মনে হয় কোনো মানুষই নেই এখন এই বাড়িটাতে।
হাঁটতে হাঁটতে অভিজাত এলাকাটার শেষ প্রান্তে এসে পড়ে সে। একটা রেললাইন আবাসিক ঘরবাড়িগুলোকে দুভাগে ভাগ করে রেখেছে। রেললাইনের দুদিকে নদীর দু’তীরের মতো গড়ে উঠেছে বস্তি। হয়তো ওখানেই থাকে আবাসিক এলাকাটা থেকেও অনেক বেশি মানুষ, যদি আমরা ওদেরকেও মানুষ বলে মনে করে থাকি। আর আবাসিক এলাকাটাও-বা কতটুকু আবাসিক! ওখানের অর্ধেকের চেয়েও বেশি ঘরবাড়ি ব্যবসার কাজে লাগিয়েছে ওগুলোর মালিকেরা, যার অধিকাংশ জার্মান শব্দ কিন্ডারগার্টেন নামের শিশুদের পাঠশালা, যেখানে ওরা বলে, ‘বাচ্চাদের পড়াশোনা শেখানো হয়’, হাসপাতাল বা ক্লিনিক-জাতীয় কিছু, খাবারের দোকান, কিছু পার্লার, যদিও সবাই জানে যে ওখানে গোপন অন্য কিছু আদান-প্রদান করা হয়, এই এমন সব আশ্চর্য নামের আড়ালে গড়ে উঠেছে তথাকথিত ‘আবাসিক এলাকা’। ওসব প্রতিষ্ঠানের নামগুলোও আবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বা ওইসব দেশের রাজধানীর নামে। বাংলা কোনো নাম খোঁজা কারো উচিত হবে না। যেমন, যদি কারো সন্তানের নাম বাংলায় রাখে কেউ তাহলে সারা জীবন ওই সন্তানটিকে উৎসাহীদের কাছে ওর নামের অর্থ বলে যাওয়ার বিড়ম্বনা পোহাতে হবে।
ওই বস্তিগুলো নদীর দু’তীরের মতো ভাঙ্গে ও গড়ে। ওখানে যারা বাস করে তাদের উচ্ছেদের কথা কখনো ভাবে না ভবনের অধিবাসীরা। অথচ কোনো না কোনো দলের লোকেরা বছরে দু-একবার উচ্ছেদ করবে ওদের। তা না হলে ওদের পিতাপ্রভুদের করে-খাওয়া চলে না। ওইসব প্রভুদের অনেকে হয়তো ওই এলাকাতেই থাকে। ওদের বাসার আয়া-বুয়া, দারোয়ান, বাবুর্চি, গাড়ি চালক, এরা সব ওখান থেকে আসে। ওদের সব দিক সামলাতে পারে বস্তির এসব মানুষেরা। রেললাইনের দু’পাশের দুটো অভিজাত আবাসিক এলাকার মধ্যখানের বস্তিটা যেন একটা বাফার জোন। রেললাইনটা সীমান্ত। যদিও দু’পক্ষে কখনো সংঘর্ষ হয় না। পারস্পরিক শান্তি রক্ষা করে চলতে হয় বস্তিবাসীদের। পাশাপাশি বসবাসের এই সংস্কৃতিটি হয়তো ভালোই। করে খেতে পারছে সবাই।
শুক্রবারের সকালগুলো এদিকে অনেকটা জনমানবহীনভাবে শুয়ে থাকে বা গড়িয়ে যায়। অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন না থাকায় সাহেবরা অনেকটা বেলা পর্যন্ত ঘুমোয়। বেগমরাও সপ্তাহের অন্য রাতগুলোর প্রাপ্তি সুদে-আসলে তুলে নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকে ওদের সমর্থনে। ফলে অনেক চর্বিঝোলা বস্তু দেখতে হয় না এসব সকালে। বস্তিগুলোয় অবশ্য গত রাতের উনুনের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আগুন জ্বালাতে হয়। ওদের ব্যস্ততা অথবা প্রয়োজন সপ্তাহের অন্য রাতগুলো থেকে বরং ছুটির দিনগুলোয় আরো অনেক বেশি থাকে।
আশপাশে কোথাও একটা মোরগ ডেকে ওঠায় কান খাড়া করে নাইকি। অবাক ঘটনা! মনে করতে পারে না সে যে কতদিন এ শহরে মোরগের ডাক শোনেনি। মনে মনে ভাবে সে, কী যেন বলে মোরগের ডাক দেয়াকে? তাও কি ভুলে গেছে সে! বাগ দেয়া?
নিয়ন-জ্বলা ধূসর একটা শহরে ভোরের আলো যতটা স্বচ্ছ হতে পারে তা হয়ে গেছে। এ মোরগটা হয়তো ঘুমকাতুরে অথবা কোনো সায়েবসুবো। গ্রামের মোরগেরা অন্ধকার থাকতেই বাগ দেয়া শুরু করে। হাঁটার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দেয়ায় হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে গলার কাছে চলে আসে ওর। তারপর সেখানেই আটকে থাকে কিছুক্ষণ আর মস্তিষ্কে আরো বেশি করে রক্ত পাঠাতে থাকে যেন ওই মুহূর্তে আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারে ওটা। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ দৌড়াতে হয় ওকে। অবাক চোখে সে দেখে যে মাটি ফুঁড়ে এসে আরো অনেকে দৌড়াতে শুরু করেছে। মনে মনে ভাবে নাইকি, এই একটু আগেও এসব মানুষগুলো ছিল কোথায়? ওরাও কি জানে না যে কেন ওরা দৌড়াচ্ছে? নাকি সেই শুধু জানে না। মানুষগুলোর চোখেমুখে আতঙ্কের তেমন কোনো চিহ্ন নেই। ক্লান্তিকর দৌড়ে বস্তিগুলোর প্রায় শেষদিকটায় এসে পড়ে নাইকি। ওখানে পৌঁছে সে দেখে যে বেশ বড় দুটো ছেলেমেয়ে নিঃসংকোচে প্রাতঃকৃত্য সারছে। ওকে দেখেও ওরা পুরোপুরি ভাবলেশহীন। যেন ওদের দৌড়ানোর কোনো প্রয়োজনই নেই। নাইকির পক্ষে আর সামনে এগোনো মুশকিল। বাতাস ওখানে সিসার চেয়েও ভারী। বস্তির যত নর্দমা, আবর্জনা, সব এসে জমা হয়েছে নিচু ওই জলাভূমিতে। পানি বলতে যা বোঝায় তার একবিন্দুও নেই ওখানে। কালো থিকথিকে একটা তরল পদার্থ জমে রয়েছে ঘন কচুরিপানার নিচে।
নিঃশ্বাস— এবার এটা নেয়া বন্ধ করতে হবে তোমাকে— ভাবতে না ভাবতেই, বস্তিতে অনেকটা বেমানান এমন এক মহিলার হেঁচকা টানে চটের দরজা অথবা পর্দা ভেদ করে অন্ধকার এক কুঠরিতে ঢুকে পড়ে সে। ‘বাঁচতে চাইলে হুইত্তা পড়েন’ বলেই একটা চাটাইয়ের ওপর ওকে ফেলে একটা দুর্গন্ধ কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেয়। তখন সত্যি সত্যি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ওর। ‘ওই দিক ঘুইরা শুন’ বলে ওই মহিলাও ঢুকে পড়ে কাঁথার ভেতর। কিন্তু ঘুরে শোয় না নাইকি। মহিলার ভারী নিতম্ব ওর শরীর স্পর্শ করায় সে ভাবতে শুরু করে যে কোথাও জড়িয়ে যাচ্ছে কিনা। ওর ঘুরে না শোয়াতে ওই মহিলাই ওর দিকে ফিরে শোয়। ফিসফিসিয়ে বলে ‘ডর লাগে? ডরাইয়েন না। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কিলিয়ার অইয়া যাইব।’ ওর ওই কথায় সত্যি সত্যি ভয় পায় নাইকি। উটকো এমন একটা অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় ভাবতে শুরু করে। অনেকটা কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকে কান ফাটানো গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। তখন ওই মহিলাকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে নাইকি। তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে সে বলে ‘আরে আমার পুরুষ মানুষরে, কইলাম না ডরাইয়েন না।’
পাঁচ নয়, দু’মিনিটের মধ্যেই সব নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়। আরো এক দু’মিনিট পর মানুষজনের সাড়া পাওয়া যেতে থাকে। যন্ত্রচালিতের মতো ওখান থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে নাইকি। আশপাশের মানুষগুলো ইতোমধ্যে একজন দু’জন করে এগিয়ে এসে জলা জায়গাটার দিকে একটা জটলা গড়ে তোলে। সেও এগিয়ে যায় ওদিকে।
কালো ওই তরল পদার্থের ভেতর একটা মানুষের সাড়ে তিন লিটার রক্ত আর কতটুকুইবা! মানুষগুলো ঝুঁকে মৃতের মুখটা দেখার চেষ্টা করে। স্মৃতি হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করে যে মানুষটা ওদের পরিচিত কেউ কিনা। অপরিচিত হলে বুকটা হালকা করে নেয় দুর্গন্ধ বাতাসে বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে দিয়ে।
এখন ওর মুখটা দেখতে চায় না নাইকি। ওর কাছে একজন মৃত, তা সে পরিচিত হোক আর অপরিচিত হোক, একই রকম। একটা জড় পদার্থ ভিন্ন অন্য কিছু নয় এখন ওটা। সে বরং ওই মহিলাকে খোঁজার চেষ্টা করে। ওর পালিয়ে থাকা জায়গাটার কাছে এসে সবগুলো ঝুপড়িকে একই রকম মনে হয়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে ওইরকম কোনো মহিলা কোনো ঘর থেকে বেরিয়ে আসে কিনা। সে হয়তো কোনো অভিজাত ঘরের বুয়া। বেশভূষায় ওরকমই মনে হয়েছে নাইকির। বেশ কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পরও কোনো কিছু উদ্ধার করতে পারে না সে। ওকে দেখে কিছুটা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় এক প্রায়-বৃদ্ধা মহিলা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘কারে খোঁজেন?’
কার নাম বলবে সে? মানুষ তো মানুষকে নামেই চেনে। নাম দূরে থাক ওর চেহারাটাই হয়তো এখন আর মনে নেই নাইকির। বাফার জোন ছেড়ে উল্টোপথে ফিরে আসে সে। নিঃশ্বাস নিতে চেষ্টা করে আবার। আহা নিঃশ্বাস! এভাবে নিঃশ্বাস নিতে নিতে চেষ্টা করে সে ভুলে থাকতে ওর নিকট অতীত, দূর অতীত, এমনকি সকল অতীত...
ফিরে আসে সে আবার ওর নিজের জগতে। আলো, বাতাস, অন্ধকার, উষ্ণতা প্রকৃতির এসব নিজস্ব বিষয়গুলো যখন অবারিত তখনই প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করার উপযোগী বাইরের লিকলিকে হাওয়া মুহূর্তের ভেতর ওর হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলিকে পাইয়ে দেয় আবার। যেসব নেই বলে বিভ্রম ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিল সে ওর অবচেতন বোধের যন্ত্রণা থেকে সেসব খুঁজে দেখে ওগুলো সব এক অর্থহীনতা হাতড়িয়ে বেড়ানোর যন্ত্রণা বই অন্য কিছু নয়। নিশ্চিতভাবে যখন বুঝতে পারে সে যে ওগুলো ওর নয়, কখনোই পাবে না সে ওই সব অধরা বিষয়গুলো তখন ঘরে ফিরে যেতে প্রলুব্ধ করে সে নিজেকে।

আপনার মতামত লিখুন