সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

একটা শোক সংবাদ


শাশ্বত নিপ্পন
শাশ্বত নিপ্পন
প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

একটা শোক সংবাদ
ছবি: ইন্টারনেট

সমস্যা হলো আমার বাসার ঠিক সামনেই জেলখানা। জেলা কারাগার। বাসা থেকে বেরুলেই জেলখানার মূল ফটক। যার গায়ে মোটা করে লেখা “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ।” কিন্তু সাধারণত আমার ঘুম ভাঙ্গে জেলখানার ভিতরের রক্ষীদের অশ্রাব্য চিৎকারে। কাছেই কোর্ট। এ অঞ্চলটাকে কোর্ট পাড়া বা জেল পাড়া বলে এলাকাবাসী। সে কারণে পুলিশ, চোর-ডাকাত, হাজতি, উকিল, মহুরী, উকিলের দালাল, বাটপার, নেশাখোর, আর বিপর্যস্থ পরিজন এবং তাদের আহাজারীতে এলাকাটা গমগমে থাকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। সব কিছুতেই যেন অশুভের হাতছানি; মঙ্গলবার্তা নেই কোথাও। রোজকার এই দৃশ্য আমাকে বিব্রত ও বিষণ্ন করে তোলে। আমার মনে হয়, ঐ মৌচা বিশাল প্রাচীরের ও’পাশে শুধুই কি খারাপ মানুষেরা? মানুষই তো চোর-ডাকাত, খুনী; আর মানুষ থাকলে থাকবে জীবন যন্ত্রণা, দুঃখ বোধ, না বলা কষ্ট, চোখের জল, পাপ বোধ— আমার মনটা কেঁদে ওঠে। আর প্রতিদিনই ভাবি এ বাসা ছেড়ে দেব। তবে এই পয়সায় এই মানের বাসা পাওয়া ভাগ্যের।

আমার বাসার পজিটিভ দিকগুলো কিন্তু হিংসে করার মতো। প্রথমত, বাড়ির মালিক দেশে থাকেন না; সৌদি প্রবাসী। তার এক আত্মীয় বাড়ির দেখভাল করেন। আমার ঘরের দক্ষিণ দিক খোলা। ভীষণভাবে ফাঁকা। ফসল কাটা মাঠের বুক কাঁপিয়ে হু হু করে বাতাস এসে আছড়ে পড়ে আমার তিন তলার ঘরে। পর্দার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটায় প্রতিক্ষণ। ফ্যান অথবা এসি লাগে না। আর মাঠে যখন ফসল থাকে— বিশেষত ধান; তখন বাতাস শুধু উপভোগের বিষয় থাকে না— হয়ে ওঠে দেখার ব্যাপার। অবারিত বাতাসে কচি ধানের লুটোপুটি— সে এক অসম্ভব দৃশ্য। আর ধান পুষ্ট হলে, বাতাসে বাজে অভিনব এক মর্মর ধ্বনি।

বর্ষার সময় এই দৃশ্যপট একেবারেই পাল্টে যায় কোনো অজানা হুকুমে। তখন যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু ধূসর বৃষ্টি আর বৃষ্টি। গাছ, মাঠ, বাঁশ, বাগান, অন্ধকার সব কিছুই বৃষ্টিতে একাকার হয়ে যায়। একবার এই অবিশ্রান্ত বৃষ্টির দিকে তাকালে দৃষ্টি হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় সময়ও। আমি ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি। দেখি অন্ধকারকে ভিজতে। হাত-পা ছড়িয়ে গ্রাম্য কিশোরীর মতো, অন্ধকার ভিজছে। অন্ধকারের এই বৃষ্টি প্রেম আমার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। 

আমার অফিস কাছেই। লাঞ্চের সময় বাসায় এসে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে ঢুল ঢুল চোখে আবার অফিসে যাই। কিন্তু, বাসা থেকে বের হলেই রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ। বিভিন্ন ধরনের মানুষ; সর্বশ্রান্ত হওয়া মানুষের আহাজারি দেখতেই হয়। আমার মনটা আবার তিক্ত হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যায় স্থানীয় দৈনিক ‘সুখবর’-এর অফিসে গিয়ে বসি। কাগজ দেখি; চা খাই সাথে সিগারেট। নির্বাহী সম্পাদক সাহেব কেন জানি না আমাকে খাতির করেন। চা খাওয়ান গল্প করেন। আমিও গল্পগুজব সেরে, প্রতিদিনের ‘সুখবর’ পড়ে টেবিল ছাড়ি। বাসায় ফেরার পথে কয়েল, ব্রাশ, পেস্ট, নাপা, সিগারেট, এক ডজন ডিম এই সব টুকিটাকি জিনিস, যেদিন যেমন প্রয়োজন, কেনাকাটা করে উদাস মনে বাসায় ফিরি। তখন জেলগেটের মাথায় তীব্র সার্চ লাইটটা দপদপ করে জ্বলে। চারদিকে সোনালি আলো ছড়ায়। শুধু ফটকের নিচের দিকটা অন্ধকার হয়ে থাকে। আমার মনে হয় কোনো ভয়ংকর এক চোখওয়ালা দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে। আমার ভয় হয়। পুরু পাঁচিলের ওপাশে চাপা পড়া মানুষগুলোর অস্ফুট যন্ত্রণাগুলো আবার আমাকে স্পর্শ করে। আমি দ্রুত পায়ে জেল গেট পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখনই কারারক্ষীরা ঢং ঢং করে দশটা বাড়ি দেয় তাদের ঝোলানো ঘণ্টায়। যেন ঘোষণা করছে— “পালিয়ে যাও, পালিয়ে যাও এখান থেকে”— আমি তখন আবারও সিদ্ধান্ত নিই, কালই নতুন বাসার খোঁজ করব। এসব ভাবতে ভাবতে আমি দ্রুত পা চালাই। আমার হার্ট বিট বেড়ে যায়। হাঁপিয়ে উঠি। আমার বাসার সামান্য দূরের পান সিগারেটের দোকানটার ঝাঁপ পড়ে শব্দ করে। দূরে কোথাও কারা যেন হল্লা করে। রাত দশটার বাতাস সেই হল্লাকে ফেরি করে যেন। আমি সিগারেটে শেষ টানটা দিতে দিতেই ছায়ামূর্তিটা নড়ে উঠল। একদম আমার বাসার মেইন গেটের পাশ ঘেঁষে। আমি চমকে উঠি। এখন দিনকাল ভাল না; ছিঁচকে চুরি বাড়ছে। আমি ভয় পাই ভিতরে ভিতরে। তারপরও বলি, কে? উত্তর নেই। কে? —আমি আবার বলি; এবারও উত্তর আসে না। অর্থাৎ অন্য পক্ষ দুর্বল। এবার আমি সাহসী হয়ে উঠি। গলা ঝেড়ে এক দু’পা এগিয়ে বলি, ঐ মিয়া, কে তুমি? এখানে কী? এত রাতে?

সামান্য কেশে লোকটা ঘুরে দাঁড়ায়। অপরাধীর মতো, মাথা নিচু করে দাঁড়ায় আলো আঁধারে ঢাঁকা আকাশটাকে মাথায় নিয়ে। জীর্ণ পাজামা-পাঞ্জাবী পরা শীর্ণ এক লোক; গায়ে চাদর। ময়লা একটা চাদর। যদিও এখন চাদরের সময় না— তবুও লোকটা গায়ে চাদর। আমার সন্দেহ আরো বাড়ে। বেটা চোর। অজ্ঞাত লোকটা আবারো কাশে; তারপর বলে, জ্বী আমি; আপনার আগুনটা... আমার সহ্য ক্ষমতা শেষ সীমার কাছাকাছি চলে যায়। চোরে আমার কাছে আগুন চাইছে! বিড়ি খাবে— এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হয়! আমি ভারি গলায় বলি, তুমি কে?

জ্বী আমি মোশারফ আলি; এত রাতে এখানে কী? আমি আবার জানতে চাই। ইতোমধ্যে আমি বুঝেছি যে আগন্তুক ভয় পেয়েছে। তার ভয়েই আমার সাহস। না মানে, এখানেই... লোকটা উত্তর দেয় মিন মিন করে। স্যার কি এখানেই থাকেন? লোকটা বিনয়ের সাথে জানতে চায়। বুঝতে পারি সে আমাকে পুলিশ মনে করছে; এটিও আমার জন্যে অস্বস্তিকর। আমি এবার ধমক দিয়ে উঠি, যাও এখান থেকে; যাও— যত্তসব! লোকটা পরাজিতের মতো ধীর পায়ে আলো অন্ধকারের সীমানার দিকে এগিয়ে যায়। অপমানিত পরাজতিদের দেখে মানুষ তৃপ্তি পায়। আমিও পেলাম। তারপর একবুক বিজয়ের উল্লাস নিয়ে আমি বাসায় ফিরলাম। মনে হলো, মানুষকে নিষ্প্রভ করার আনন্দই আলাদা।

বাসায় আমার কোনো কাজ থাকে না। মাঝে মাঝে অফিসের কিছু কাজ বাসায় শেষ করি; কিন্তু এখন হাত একেবারেই খালি। আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। আমার প্রিয় বারান্দা। যেখানে দিগন্ত প্রসারিত অন্ধকার প্রতিদিন আমার প্রতীক্ষা করে থাকে। আমি আবার সিগারেট জ্বালাই; তারপর অন্ধকারগুলোকে গাঁথতে থাকি। জোনাক পোকাগুলোকে কাউন্ট করার চেষ্টা করি। অসংখ্য জোনাকি একসময় এক হয়ে যায়। আবার প্রথম থেকে আমি আমার গননা শুরু করি। ঠিক তখনই কারাগারের ভীতিকর ঘণ্টাটা বেজে ওঠে। অকারণেই আমি চমকে উঠি। 

(২)

আর পাঁচটি সকালের মতোই আজও সরগরম হয়ে উঠে জেল পাড়া, কোর্ট চত্বর। সমস্ত চিৎকার আর হাহাকারকে কোনো মতে পাশ কাটিয়ে আমিও অফিসে পৌঁছে যাই যথারীতি। রাতের কোনো কথাই আমার মনে থাকে না। স্বভাবসুলভভাবে আমি অফিসের চেয়ারে বসে কাজ কাজ খেলা করি; আর ব্যবস্ততার কথা বলে ফেসবুক স্ক্রল করতে থাকি। গত তিন দিনের বাসি “বাংলাদেশ প্রতিদিনের” পাতা উল্টাই; স্থানীয় “দৈনিক সুখবর”-এর লিড নিউজ দেখি— নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতা গ্রেফতার; পাশের গ্রামের রাসেল ভাইপার সদৃশ সাপ; প্রবাসীর বাড়িতে বড় ধরনের চুরি; পূর্বশত্রুতার জেরে কৃষকের চাষের কলাগাছ তছরুপের মাঝেই বড় বাবু এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন, “আসসালামু আলাইকুম” স্যার; আমি চোখ না সরিয়েই উত্তর করি। স্যার, আপনার ট্রেনিং-এর চিঠি...

আমার ইনসার্ভিস ট্রেনিং সিলেটে। এক মাস। আমার মাথা গরম হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার আড্ডায় নির্বাহী সম্পাদক সাহেবের কাছে ছুটি নিলাম এক মাসের জন্য। কিছু প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই সেরে ঘরে ফিরে এলাম তাড়াতাড়ি। কাল আমার লম্বা জার্নি করতে হবে।

বাসায় আসতে পথে দেখি এক কারারক্ষী মধ্যবয়সী এক মহিলাকে ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করছে, কী কেস? জ্বে ডাকাতি; নাম কী? জুলফিককার, উত্তর করে সন্ত্রস্ত নারী। রক্ষী জানতে চান, তোমার কে হয়? কোনো রকমের লজ্জা না করেই নারী বলে, আমার সোয়ামী। পুলিশ সামান্য চুপ থেকে বলে, এতে কী আছে? এবার নারী বলে, পুলাও ভাত ছার; লোকটা খ্যেতি চেয়িলো; হাতে টাকা ন্যাই, কুন মতে এঁদিচি ছার— নারীর গলা ধরে আসে। ফুঁপাতে ফুঁপাতে নারী বলে, ভিতরে মানুষডা কিচু খেতি পারচি না; ইকটু ফুটা এঁদিচি, দিয়েন ছার... আল্লাহ আপনার ভাল করবি, মানুষটা ক্ষিদি সহ্য করতি পারে না, নারী কাঁদে; দিয়ি দিয়েন ছার; নারী কাঁদতে থাকে...

আমি সিগারেট জ্বালাই। তারপর পরিচিত অন্ধকারের গায়ে ধোঁয়া ছাড়তে থাকি। আমার মাথার ওপর ঝুলে থাকে আকাশ; সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চাঁদ। নীল আকাশের গায়ে তখনো লেগে আছে ছোপ ছোপ অন্ধকার; বাতাসে ভেসে আসে ঢাকাগামী পরিবহনের হর্ন। কাছে দূরে একদল কুকুর চিৎকার করে। আমি ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে থাকি।

সিগারেটের শেষ অংশ মাটিতে ফেলতেই সেই জীর্ণ-শীর্ণ ছায়ামূর্তি নড়ে ওঠে। আজ আমার ভয় লাগছে না। মনটা বিষণ্ন বা বিক্ষিপ্ত থাকলে, ভয় লাগে না। আমি খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞাসা করি, আবার আপনি? জ্বী স্যার, আমি মোশারফ আলি— লোকটা জবাব দেন। আপনি প্রতি রাতে এখানে... আমার প্রশ্ন শেষ না হতেই মোশারফ আলি বলে ওঠে, স্যার আমি চোর নই... আপনি কী করেন, আমি প্রশ্ন করি তীব্রভাবে।

এখন কিছু করি না স্যার;

কী করতেন? সামান্য নিশ্চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নিয়ে মোশারফ আলি জবাব দেন, শিক্ষকতা; প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলাম। গেল বছর তিনেক অবসরে গেছি।

এবার আমার নীরব থাকার পালা। আমি লজ্জিত হয়ে চুপ থাকি কিছু মুহূর্ত; দ্বিধা কাটিয়ে আবার প্রশ্ন করি, কিন্তু এখানে...

আমি এখানে থাকি স্যার; আমার বাড়ি হোসেননগর। শহর থেকে সাত-আট কিলো; ঐ গ্রামের স্কুলেই আমি শিক্ষকতা করতাম।

আমার মধ্যে গল্প করার তাগিদ নড়াচড়া করে। বুঝতে পারি আজ আমার আড্ডা সম্পন্ন হয়নি; সে কারণেই হয়তো ভিতরের কেউ গল্প করতে চাচ্ছে। এরই নাম অভ্যাস। আমি আগ্রহ নিয়ে বলি, কিন্তু মোশারফ সাহেব আপনি এই অবস্থায় এখানে কেন? সময় চলে যায়; আমি উত্তরের অপেক্ষা থাকি। এক সময় মোশারফ আলি নীরবতা ভেঙ্গে বলে— স্যার আপনার কাছে আগুন হবে? নেন হবে; নেন সিগারেটটাই নেন— আমি বেনসন এগিয়ে দিই। আমিও জ্বালাই। মোশারফ আলি সিগারেটটা জ্বালান বড় যত্ন করে। হাতের তালুতে দিয়ে ঢেঁকে লাইট জ্বালান। গ্যাস লাইটের সামান্য আলো, আঁধারে মশাল হয়ে জ্বলে। সেই আলোতে তার মুখের বলি রেখাগুলোসহ কুতকুতে চোখ, ভ্রুর পাকা চুল আর রুগ্ন চেহারার বিষণ্নতা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক বুক ধোঁয়া ছেড়ে, কাশতে থাকেন মোশারফ সাহেব। তারপর কথা বলেন।

আজ বাতাস কম। গুমোট হয়ে আছে চারপাশ। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। আকাশের কোথাও কোথাও জমে আছে কালো মেঘ; ঝড় বৃষ্টি আসতেও পারে। মোশারফ আলি বলেন চলেন। আমার মনে হয় বহু দূর থেকে ভেসে আসা কথা শুনছি। তিনি বলেন, “স্যার আমি এখানেই, আপনার বাসার আশেপাশের থাকি কিছু দিন ধরে। এখানেই ঘুমাই আবার ঘুমাই না; সারাদিন যায় নানা ব্যস্ততায়। রাত হলেই—

কিন্তু এখানে কেন? আমি বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করি।

কী করব স্যার, ছেলেটা ভিতরে, গভীর দরদ নিয়ে বলে মোশারফ আলি। গত দু’মাস ওরা নিয়ে এসেছে; মিথ্যা মামলা; আর কেউ জানুক বা না জানুক, প্রমাণ হোক বা না হোক, আমি জানি এ মামলা মিথ্যা। মা মরা ছেলে আমার— একমাত্র ছেলে আমার, সে ভিতরে আছে কষ্টে; আছে নির্ঘুম— আমি কি বাড়িতে ফ্যান চালিয়ে ঘুমাতে পারি স্যার?

আমি পাথর হয়ে শুনে যাই। মোশারফ আলির এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। আমি পাথর চোখে দেখি গভীর অন্ধকার ভেদ করে জোনাকি উড়ছে একটা দুটো; গম্ভীর শব্দে ভেসে আসছে বাতাসে; মেঘ ডাকছে।

মোশারফ আলি চোখ মোছেন তারপর বলতে থাকেন, সারাদিন কোর্ট বারান্দায় থাকি; উকিল সাহেবদের পিছনে ঘুরি; মুহুরিকে ঘুষ দিই; পুলিশের হাতে টাকা দিয়ে ছেলেটার সাথে দেখা করি— জামিনের মিথ্যা আশ্বাস দিই; আর সন্ধ্যা নামলে এই জেলের সামনেই ঘুমাই অথবা জেগে থাকি। সান্ত্বনা পাই, ছেলেটা খুব দূরে নেই। মা মরা ছেলে... আমার! বাড়ির বাইরে তো একা থাকেনি, কখনো। 

এবার জোরে মেঘ ডেকে উঠে। আমি রাস্তার লাইট পোস্টের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। মোশারফ আলি আকাশের দিকে তাকান তারপর বলেন, স্যার আপনি যান, বৃষ্টি আসতে পারে...

আমার কী করা উচিৎ? আমি ভাবতে থাকি। মোশারফ আলি তার জীর্ণ শীর্ণ শরীর আর ময়লা চাদর নিয়ে জমাট অন্ধকারের দিকে এগুতে থাকেন। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে এগুতে থাকে হোসেননগর প্রাইমারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোশারফ আলি। উনি রাস্তায় থাকবেন আজও। কারণ উনি তার মা মরা ছেলের কাছাকাছিই থাকবেন—

(৩)

আমার সিলেট জীবনের বয়স প্রায় পঁচিশ দিন। এর মধ্যে দারুণ কেটেছে দিনগুলো। রাত নয়টা দশটা পর্যন্ত সিলেট শহর বেড়াই। রাতে সবাই মিলে গান-বাজনা শেষে ডিনার করি। কাগজ পড়ি কখনো আই.পি.এল. ক্রিকেট দেখি। আনন্দে কেটেছে এই পঁচিশ দিন। প্রতিদিন দৈনিক সুখবর পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক সাহেবের সাথে ত্রিশ মিনিট কথা বলি। 

আজ সম্পাদক সাহেবকে ফোন দিতে দেরি হয়ে গেল। বেশ কয়েকবার রিং বাজার পর উনি ধরলেন; ভাই কেমন আছেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম আন্তরিকভাবে। হ্যালো ভাই, ভাল আছি, তবে একটা শোক সংবাদ আছে— আমি ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠি। আবার আগ্রহ বোধও জন্মায়। সম্পাদক সাহেব বলতে থাকেন— গত রাতের দিকে আপনার বাসার সামনে একটা এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একজন মারাও গেছে; আরে যত্তসব নেশা খোর! লোকটা রাস্তাতেই না কি শুয়েছিল— ট্রাকেও পিষে দিয়েছে। হ্যালো, নাইট গার্ড বলছেন... হ্যালো...

আমার ফোন কান থেকে সরে গেছে ইতোমধ্যেই। নির্বাহী সম্পাদক সাহেব চিৎকার করেই চলেছেন, হ্যালো... হ্যালো...

বাইরে তখন ফুটফুটে জোসনা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬


একটা শোক সংবাদ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সমস্যা হলো আমার বাসার ঠিক সামনেই জেলখানা। জেলা কারাগার। বাসা থেকে বেরুলেই জেলখানার মূল ফটক। যার গায়ে মোটা করে লেখা “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ।” কিন্তু সাধারণত আমার ঘুম ভাঙ্গে জেলখানার ভিতরের রক্ষীদের অশ্রাব্য চিৎকারে। কাছেই কোর্ট। এ অঞ্চলটাকে কোর্ট পাড়া বা জেল পাড়া বলে এলাকাবাসী। সে কারণে পুলিশ, চোর-ডাকাত, হাজতি, উকিল, মহুরী, উকিলের দালাল, বাটপার, নেশাখোর, আর বিপর্যস্থ পরিজন এবং তাদের আহাজারীতে এলাকাটা গমগমে থাকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। সব কিছুতেই যেন অশুভের হাতছানি; মঙ্গলবার্তা নেই কোথাও। রোজকার এই দৃশ্য আমাকে বিব্রত ও বিষণ্ন করে তোলে। আমার মনে হয়, ঐ মৌচা বিশাল প্রাচীরের ও’পাশে শুধুই কি খারাপ মানুষেরা? মানুষই তো চোর-ডাকাত, খুনী; আর মানুষ থাকলে থাকবে জীবন যন্ত্রণা, দুঃখ বোধ, না বলা কষ্ট, চোখের জল, পাপ বোধ— আমার মনটা কেঁদে ওঠে। আর প্রতিদিনই ভাবি এ বাসা ছেড়ে দেব। তবে এই পয়সায় এই মানের বাসা পাওয়া ভাগ্যের।

আমার বাসার পজিটিভ দিকগুলো কিন্তু হিংসে করার মতো। প্রথমত, বাড়ির মালিক দেশে থাকেন না; সৌদি প্রবাসী। তার এক আত্মীয় বাড়ির দেখভাল করেন। আমার ঘরের দক্ষিণ দিক খোলা। ভীষণভাবে ফাঁকা। ফসল কাটা মাঠের বুক কাঁপিয়ে হু হু করে বাতাস এসে আছড়ে পড়ে আমার তিন তলার ঘরে। পর্দার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটায় প্রতিক্ষণ। ফ্যান অথবা এসি লাগে না। আর মাঠে যখন ফসল থাকে— বিশেষত ধান; তখন বাতাস শুধু উপভোগের বিষয় থাকে না— হয়ে ওঠে দেখার ব্যাপার। অবারিত বাতাসে কচি ধানের লুটোপুটি— সে এক অসম্ভব দৃশ্য। আর ধান পুষ্ট হলে, বাতাসে বাজে অভিনব এক মর্মর ধ্বনি।

বর্ষার সময় এই দৃশ্যপট একেবারেই পাল্টে যায় কোনো অজানা হুকুমে। তখন যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু ধূসর বৃষ্টি আর বৃষ্টি। গাছ, মাঠ, বাঁশ, বাগান, অন্ধকার সব কিছুই বৃষ্টিতে একাকার হয়ে যায়। একবার এই অবিশ্রান্ত বৃষ্টির দিকে তাকালে দৃষ্টি হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় সময়ও। আমি ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি। দেখি অন্ধকারকে ভিজতে। হাত-পা ছড়িয়ে গ্রাম্য কিশোরীর মতো, অন্ধকার ভিজছে। অন্ধকারের এই বৃষ্টি প্রেম আমার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। 

আমার অফিস কাছেই। লাঞ্চের সময় বাসায় এসে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে ঢুল ঢুল চোখে আবার অফিসে যাই। কিন্তু, বাসা থেকে বের হলেই রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ। বিভিন্ন ধরনের মানুষ; সর্বশ্রান্ত হওয়া মানুষের আহাজারি দেখতেই হয়। আমার মনটা আবার তিক্ত হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যায় স্থানীয় দৈনিক ‘সুখবর’-এর অফিসে গিয়ে বসি। কাগজ দেখি; চা খাই সাথে সিগারেট। নির্বাহী সম্পাদক সাহেব কেন জানি না আমাকে খাতির করেন। চা খাওয়ান গল্প করেন। আমিও গল্পগুজব সেরে, প্রতিদিনের ‘সুখবর’ পড়ে টেবিল ছাড়ি। বাসায় ফেরার পথে কয়েল, ব্রাশ, পেস্ট, নাপা, সিগারেট, এক ডজন ডিম এই সব টুকিটাকি জিনিস, যেদিন যেমন প্রয়োজন, কেনাকাটা করে উদাস মনে বাসায় ফিরি। তখন জেলগেটের মাথায় তীব্র সার্চ লাইটটা দপদপ করে জ্বলে। চারদিকে সোনালি আলো ছড়ায়। শুধু ফটকের নিচের দিকটা অন্ধকার হয়ে থাকে। আমার মনে হয় কোনো ভয়ংকর এক চোখওয়ালা দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে। আমার ভয় হয়। পুরু পাঁচিলের ওপাশে চাপা পড়া মানুষগুলোর অস্ফুট যন্ত্রণাগুলো আবার আমাকে স্পর্শ করে। আমি দ্রুত পায়ে জেল গেট পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখনই কারারক্ষীরা ঢং ঢং করে দশটা বাড়ি দেয় তাদের ঝোলানো ঘণ্টায়। যেন ঘোষণা করছে— “পালিয়ে যাও, পালিয়ে যাও এখান থেকে”— আমি তখন আবারও সিদ্ধান্ত নিই, কালই নতুন বাসার খোঁজ করব। এসব ভাবতে ভাবতে আমি দ্রুত পা চালাই। আমার হার্ট বিট বেড়ে যায়। হাঁপিয়ে উঠি। আমার বাসার সামান্য দূরের পান সিগারেটের দোকানটার ঝাঁপ পড়ে শব্দ করে। দূরে কোথাও কারা যেন হল্লা করে। রাত দশটার বাতাস সেই হল্লাকে ফেরি করে যেন। আমি সিগারেটে শেষ টানটা দিতে দিতেই ছায়ামূর্তিটা নড়ে উঠল। একদম আমার বাসার মেইন গেটের পাশ ঘেঁষে। আমি চমকে উঠি। এখন দিনকাল ভাল না; ছিঁচকে চুরি বাড়ছে। আমি ভয় পাই ভিতরে ভিতরে। তারপরও বলি, কে? উত্তর নেই। কে? —আমি আবার বলি; এবারও উত্তর আসে না। অর্থাৎ অন্য পক্ষ দুর্বল। এবার আমি সাহসী হয়ে উঠি। গলা ঝেড়ে এক দু’পা এগিয়ে বলি, ঐ মিয়া, কে তুমি? এখানে কী? এত রাতে?

সামান্য কেশে লোকটা ঘুরে দাঁড়ায়। অপরাধীর মতো, মাথা নিচু করে দাঁড়ায় আলো আঁধারে ঢাঁকা আকাশটাকে মাথায় নিয়ে। জীর্ণ পাজামা-পাঞ্জাবী পরা শীর্ণ এক লোক; গায়ে চাদর। ময়লা একটা চাদর। যদিও এখন চাদরের সময় না— তবুও লোকটা গায়ে চাদর। আমার সন্দেহ আরো বাড়ে। বেটা চোর। অজ্ঞাত লোকটা আবারো কাশে; তারপর বলে, জ্বী আমি; আপনার আগুনটা... আমার সহ্য ক্ষমতা শেষ সীমার কাছাকাছি চলে যায়। চোরে আমার কাছে আগুন চাইছে! বিড়ি খাবে— এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হয়! আমি ভারি গলায় বলি, তুমি কে?

জ্বী আমি মোশারফ আলি; এত রাতে এখানে কী? আমি আবার জানতে চাই। ইতোমধ্যে আমি বুঝেছি যে আগন্তুক ভয় পেয়েছে। তার ভয়েই আমার সাহস। না মানে, এখানেই... লোকটা উত্তর দেয় মিন মিন করে। স্যার কি এখানেই থাকেন? লোকটা বিনয়ের সাথে জানতে চায়। বুঝতে পারি সে আমাকে পুলিশ মনে করছে; এটিও আমার জন্যে অস্বস্তিকর। আমি এবার ধমক দিয়ে উঠি, যাও এখান থেকে; যাও— যত্তসব! লোকটা পরাজিতের মতো ধীর পায়ে আলো অন্ধকারের সীমানার দিকে এগিয়ে যায়। অপমানিত পরাজতিদের দেখে মানুষ তৃপ্তি পায়। আমিও পেলাম। তারপর একবুক বিজয়ের উল্লাস নিয়ে আমি বাসায় ফিরলাম। মনে হলো, মানুষকে নিষ্প্রভ করার আনন্দই আলাদা।

বাসায় আমার কোনো কাজ থাকে না। মাঝে মাঝে অফিসের কিছু কাজ বাসায় শেষ করি; কিন্তু এখন হাত একেবারেই খালি। আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। আমার প্রিয় বারান্দা। যেখানে দিগন্ত প্রসারিত অন্ধকার প্রতিদিন আমার প্রতীক্ষা করে থাকে। আমি আবার সিগারেট জ্বালাই; তারপর অন্ধকারগুলোকে গাঁথতে থাকি। জোনাক পোকাগুলোকে কাউন্ট করার চেষ্টা করি। অসংখ্য জোনাকি একসময় এক হয়ে যায়। আবার প্রথম থেকে আমি আমার গননা শুরু করি। ঠিক তখনই কারাগারের ভীতিকর ঘণ্টাটা বেজে ওঠে। অকারণেই আমি চমকে উঠি। 

(২)

আর পাঁচটি সকালের মতোই আজও সরগরম হয়ে উঠে জেল পাড়া, কোর্ট চত্বর। সমস্ত চিৎকার আর হাহাকারকে কোনো মতে পাশ কাটিয়ে আমিও অফিসে পৌঁছে যাই যথারীতি। রাতের কোনো কথাই আমার মনে থাকে না। স্বভাবসুলভভাবে আমি অফিসের চেয়ারে বসে কাজ কাজ খেলা করি; আর ব্যবস্ততার কথা বলে ফেসবুক স্ক্রল করতে থাকি। গত তিন দিনের বাসি “বাংলাদেশ প্রতিদিনের” পাতা উল্টাই; স্থানীয় “দৈনিক সুখবর”-এর লিড নিউজ দেখি— নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতা গ্রেফতার; পাশের গ্রামের রাসেল ভাইপার সদৃশ সাপ; প্রবাসীর বাড়িতে বড় ধরনের চুরি; পূর্বশত্রুতার জেরে কৃষকের চাষের কলাগাছ তছরুপের মাঝেই বড় বাবু এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন, “আসসালামু আলাইকুম” স্যার; আমি চোখ না সরিয়েই উত্তর করি। স্যার, আপনার ট্রেনিং-এর চিঠি...

আমার ইনসার্ভিস ট্রেনিং সিলেটে। এক মাস। আমার মাথা গরম হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার আড্ডায় নির্বাহী সম্পাদক সাহেবের কাছে ছুটি নিলাম এক মাসের জন্য। কিছু প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই সেরে ঘরে ফিরে এলাম তাড়াতাড়ি। কাল আমার লম্বা জার্নি করতে হবে।

বাসায় আসতে পথে দেখি এক কারারক্ষী মধ্যবয়সী এক মহিলাকে ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করছে, কী কেস? জ্বে ডাকাতি; নাম কী? জুলফিককার, উত্তর করে সন্ত্রস্ত নারী। রক্ষী জানতে চান, তোমার কে হয়? কোনো রকমের লজ্জা না করেই নারী বলে, আমার সোয়ামী। পুলিশ সামান্য চুপ থেকে বলে, এতে কী আছে? এবার নারী বলে, পুলাও ভাত ছার; লোকটা খ্যেতি চেয়িলো; হাতে টাকা ন্যাই, কুন মতে এঁদিচি ছার— নারীর গলা ধরে আসে। ফুঁপাতে ফুঁপাতে নারী বলে, ভিতরে মানুষডা কিচু খেতি পারচি না; ইকটু ফুটা এঁদিচি, দিয়েন ছার... আল্লাহ আপনার ভাল করবি, মানুষটা ক্ষিদি সহ্য করতি পারে না, নারী কাঁদে; দিয়ি দিয়েন ছার; নারী কাঁদতে থাকে...

আমি সিগারেট জ্বালাই। তারপর পরিচিত অন্ধকারের গায়ে ধোঁয়া ছাড়তে থাকি। আমার মাথার ওপর ঝুলে থাকে আকাশ; সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চাঁদ। নীল আকাশের গায়ে তখনো লেগে আছে ছোপ ছোপ অন্ধকার; বাতাসে ভেসে আসে ঢাকাগামী পরিবহনের হর্ন। কাছে দূরে একদল কুকুর চিৎকার করে। আমি ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে থাকি।

সিগারেটের শেষ অংশ মাটিতে ফেলতেই সেই জীর্ণ-শীর্ণ ছায়ামূর্তি নড়ে ওঠে। আজ আমার ভয় লাগছে না। মনটা বিষণ্ন বা বিক্ষিপ্ত থাকলে, ভয় লাগে না। আমি খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞাসা করি, আবার আপনি? জ্বী স্যার, আমি মোশারফ আলি— লোকটা জবাব দেন। আপনি প্রতি রাতে এখানে... আমার প্রশ্ন শেষ না হতেই মোশারফ আলি বলে ওঠে, স্যার আমি চোর নই... আপনি কী করেন, আমি প্রশ্ন করি তীব্রভাবে।

এখন কিছু করি না স্যার;

কী করতেন? সামান্য নিশ্চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নিয়ে মোশারফ আলি জবাব দেন, শিক্ষকতা; প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলাম। গেল বছর তিনেক অবসরে গেছি।

এবার আমার নীরব থাকার পালা। আমি লজ্জিত হয়ে চুপ থাকি কিছু মুহূর্ত; দ্বিধা কাটিয়ে আবার প্রশ্ন করি, কিন্তু এখানে...

আমি এখানে থাকি স্যার; আমার বাড়ি হোসেননগর। শহর থেকে সাত-আট কিলো; ঐ গ্রামের স্কুলেই আমি শিক্ষকতা করতাম।

আমার মধ্যে গল্প করার তাগিদ নড়াচড়া করে। বুঝতে পারি আজ আমার আড্ডা সম্পন্ন হয়নি; সে কারণেই হয়তো ভিতরের কেউ গল্প করতে চাচ্ছে। এরই নাম অভ্যাস। আমি আগ্রহ নিয়ে বলি, কিন্তু মোশারফ সাহেব আপনি এই অবস্থায় এখানে কেন? সময় চলে যায়; আমি উত্তরের অপেক্ষা থাকি। এক সময় মোশারফ আলি নীরবতা ভেঙ্গে বলে— স্যার আপনার কাছে আগুন হবে? নেন হবে; নেন সিগারেটটাই নেন— আমি বেনসন এগিয়ে দিই। আমিও জ্বালাই। মোশারফ আলি সিগারেটটা জ্বালান বড় যত্ন করে। হাতের তালুতে দিয়ে ঢেঁকে লাইট জ্বালান। গ্যাস লাইটের সামান্য আলো, আঁধারে মশাল হয়ে জ্বলে। সেই আলোতে তার মুখের বলি রেখাগুলোসহ কুতকুতে চোখ, ভ্রুর পাকা চুল আর রুগ্ন চেহারার বিষণ্নতা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক বুক ধোঁয়া ছেড়ে, কাশতে থাকেন মোশারফ সাহেব। তারপর কথা বলেন।

আজ বাতাস কম। গুমোট হয়ে আছে চারপাশ। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। আকাশের কোথাও কোথাও জমে আছে কালো মেঘ; ঝড় বৃষ্টি আসতেও পারে। মোশারফ আলি বলেন চলেন। আমার মনে হয় বহু দূর থেকে ভেসে আসা কথা শুনছি। তিনি বলেন, “স্যার আমি এখানেই, আপনার বাসার আশেপাশের থাকি কিছু দিন ধরে। এখানেই ঘুমাই আবার ঘুমাই না; সারাদিন যায় নানা ব্যস্ততায়। রাত হলেই—

কিন্তু এখানে কেন? আমি বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করি।

কী করব স্যার, ছেলেটা ভিতরে, গভীর দরদ নিয়ে বলে মোশারফ আলি। গত দু’মাস ওরা নিয়ে এসেছে; মিথ্যা মামলা; আর কেউ জানুক বা না জানুক, প্রমাণ হোক বা না হোক, আমি জানি এ মামলা মিথ্যা। মা মরা ছেলে আমার— একমাত্র ছেলে আমার, সে ভিতরে আছে কষ্টে; আছে নির্ঘুম— আমি কি বাড়িতে ফ্যান চালিয়ে ঘুমাতে পারি স্যার?

আমি পাথর হয়ে শুনে যাই। মোশারফ আলির এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। আমি পাথর চোখে দেখি গভীর অন্ধকার ভেদ করে জোনাকি উড়ছে একটা দুটো; গম্ভীর শব্দে ভেসে আসছে বাতাসে; মেঘ ডাকছে।

মোশারফ আলি চোখ মোছেন তারপর বলতে থাকেন, সারাদিন কোর্ট বারান্দায় থাকি; উকিল সাহেবদের পিছনে ঘুরি; মুহুরিকে ঘুষ দিই; পুলিশের হাতে টাকা দিয়ে ছেলেটার সাথে দেখা করি— জামিনের মিথ্যা আশ্বাস দিই; আর সন্ধ্যা নামলে এই জেলের সামনেই ঘুমাই অথবা জেগে থাকি। সান্ত্বনা পাই, ছেলেটা খুব দূরে নেই। মা মরা ছেলে... আমার! বাড়ির বাইরে তো একা থাকেনি, কখনো। 

এবার জোরে মেঘ ডেকে উঠে। আমি রাস্তার লাইট পোস্টের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। মোশারফ আলি আকাশের দিকে তাকান তারপর বলেন, স্যার আপনি যান, বৃষ্টি আসতে পারে...

আমার কী করা উচিৎ? আমি ভাবতে থাকি। মোশারফ আলি তার জীর্ণ শীর্ণ শরীর আর ময়লা চাদর নিয়ে জমাট অন্ধকারের দিকে এগুতে থাকেন। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে এগুতে থাকে হোসেননগর প্রাইমারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোশারফ আলি। উনি রাস্তায় থাকবেন আজও। কারণ উনি তার মা মরা ছেলের কাছাকাছিই থাকবেন—

(৩)

আমার সিলেট জীবনের বয়স প্রায় পঁচিশ দিন। এর মধ্যে দারুণ কেটেছে দিনগুলো। রাত নয়টা দশটা পর্যন্ত সিলেট শহর বেড়াই। রাতে সবাই মিলে গান-বাজনা শেষে ডিনার করি। কাগজ পড়ি কখনো আই.পি.এল. ক্রিকেট দেখি। আনন্দে কেটেছে এই পঁচিশ দিন। প্রতিদিন দৈনিক সুখবর পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক সাহেবের সাথে ত্রিশ মিনিট কথা বলি। 

আজ সম্পাদক সাহেবকে ফোন দিতে দেরি হয়ে গেল। বেশ কয়েকবার রিং বাজার পর উনি ধরলেন; ভাই কেমন আছেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম আন্তরিকভাবে। হ্যালো ভাই, ভাল আছি, তবে একটা শোক সংবাদ আছে— আমি ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠি। আবার আগ্রহ বোধও জন্মায়। সম্পাদক সাহেব বলতে থাকেন— গত রাতের দিকে আপনার বাসার সামনে একটা এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একজন মারাও গেছে; আরে যত্তসব নেশা খোর! লোকটা রাস্তাতেই না কি শুয়েছিল— ট্রাকেও পিষে দিয়েছে। হ্যালো, নাইট গার্ড বলছেন... হ্যালো...

আমার ফোন কান থেকে সরে গেছে ইতোমধ্যেই। নির্বাহী সম্পাদক সাহেব চিৎকার করেই চলেছেন, হ্যালো... হ্যালো...

বাইরে তখন ফুটফুটে জোসনা।



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত