মরুর তপ্ত বালুকারাশি আর অতল সমুদ্রের নীল জল—একপাশে তৃষ্ণার হাহাকার, অন্যপাশে লোনা জলের গ্রাস। এর মাঝেই লুকিয়ে আছে এক নৃশংস মৃত্যুফাঁদ। গত কয়েকদিনে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে বিলীন হওয়া ২২টি তাজা প্রাণ কেবল সংখ্যা নয়; বরং ২২টি স্বপ্ন, ২২টি পরিবার এবং ২২টি শোকাতুর দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
সবুজ শ্যামল এই বাংলার বুক চিরে দারিদ্র্যের কষাঘাত আর সোনালি ভবিষ্যতের মরিচিকা যখন কোনো তরুণকে গ্রাস করে, তখন শুরু হয় এক করুণ যাত্রার উপাখ্যান। মানব পাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং আধুনিক সভ্যতার গায়ে এক কলঙ্কিত ক্ষত, যা হাজারো মা-বাবার বুক খালি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধে যারা ঘর ছাড়ে, তাদের অজানাই থেকে যায় যে তারা আসলে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পা দিচ্ছে, যেখানে বালুকাধূসর মরুভূমি কিংবা উত্তাল সমুদ্রের লোনা জল হয়ে ওঠে তাদের শেষ শয্যা।
মানবসত্তা কেনাবেচার এই নিষ্ঠুর প্রথা বা মানব পাচার আধুনিক বিশ্বের এক ভয়াবহ অভিশাপ। আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এই বিষয়ের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো: মানব পাচারের শিকড় মূলত প্রাচীন দাসপ্রথার গভীরে প্রোথিত। প্রাচীনকালে যুদ্ধবন্দী বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষকে জোরপূর্বক শ্রম কিংবা যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হতো। ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ই আধুনিককালে ‘মানব পাচার’ হিসেবে নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে।
শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে যখন শ্রমের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়, তখন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষ সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্বায়নের ফলে সীমান্ত উন্মুক্ত হওয়া এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় পাচারকারীরা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানব পাচারের ইতিহাস মূলত দারিদ্র্য এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশান্তরী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িত। সত্তর ও আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর মাধ্যমে এ দেশে পাচারের বীজ বপন করা হয়।
মানব পাচার মূলত তিনটি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়: উৎস দেশ, ট্রানজিট দেশ এবং গন্তব্য দেশ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ফিলিপাইন মূলত ‘উৎস দেশ’ হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে মানুষ পাচার করা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া পাচারকারীদের জন্য ট্রানজিট ও গন্তব্য উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের জঙ্গলগুলোতে পাচারকৃতদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন— সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার মূলত শ্রম পাচারের প্রধান গন্তব্য। এখানে অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র বেতনে বা বিনা বেতনে শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
লিবিয়া বর্তমানে মানব পাচারের একটি ভয়াবহ ‘হাব’ বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা মানুষদের এখান থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
ইউরোপের উন্নত দেশগুলো যেমন— ইতালি, গ্রিস এবং স্পেন অনেক পাচারকৃত মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য। তবে সেখানে পৌঁছাতে পারলেও তারা প্রায়ই অবৈধ অভিবাসীর তকমা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতেও পাচারকৃত মানুষদের দেখা মেলে। এখানে মূলত কৃষি খাত এবং সেবা শিল্পে সস্তায় শ্রম শোষণের জন্য পাচার করা হয়।
প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের নারী ও শিশু পাচারের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিয়ে গিয়ে যৌন পল্লী বা গৃহস্থালির কাজে শ্রম দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পাচারকারী চক্রগুলোর জাল মাকড়সার মতো ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে বিশ্ব দরবার পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা বিভিন্ন দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বা যোগসাজশ করতে দক্ষ। সমুদ্রপথে ছোট নৌকায় গাদাগাদি করে মানুষ তোলা থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে বন্দীশালায় আটকে রেখে নির্যাতন—সবকিছুই এই চক্রগুলো অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চক্রগুলো সাধারণত গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে। তারা ‘দালাল’ নামে পরিচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ভুয়া ভিসার প্রলোভন দেখায়। এই স্থানীয় দালালরা আবার যুক্ত থাকে ঢাকাভিত্তিক বড় এজেন্সির সঙ্গে, যাদের আন্তর্জাতিক অপরাধী সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
মানব পাচার একটি জঘন্য অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। এটি প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নিচে করণীয় তুলে ধরা হলো: মানব পাচার রোধে সরকারের প্রধান কাজ হলো বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পাচারকারীদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পাচার প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সভা, সেমিনার এবং গণমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে পাচারের ভয়াবহতা এবং পাচারকারীদের কৌশলের ব্যাপারে জনগণকে সজাগ করে তুলতে হবে।
পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবকে পাচারপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা এবং বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পাচারচক্রের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে হবে।
সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু-বান্ধবের ব্যাপারে অভিভাবকদের বিশেষ নজর রাখতে হবে। অতিরিক্ত লোভ বা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে কেউ যেন সন্তানকে ভুল পথে নিতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
যারা পাচারের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন, তাদের সামাজিকভাবে হেয় না করে সহমর্মিতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। ভুক্তভোগীদের উচিত পাচারকারীদের তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা, যাতে অন্য কেউ এই ফাঁদে না পড়ে।
বিদেশে কর্মসংস্থান বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে অবশ্যই সরকারি অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের প্রলোভনে পড়ে পাসপোর্ট বা টাকা লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
দারিদ্র্য ও বেকারত্বই পাচারের মূল কারণ। তাই দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণ সমাজকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পাচারকারীরা তরুণদের ফাঁদে ফেলছে। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং অপরিচিত কারো প্রলোভনে সাড়া দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ‘মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটি’কে সক্রিয় করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পাচারবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
মানব পাচার একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পাচার হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধার ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজতর করতে হবে।
[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল]

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
মরুর তপ্ত বালুকারাশি আর অতল সমুদ্রের নীল জল—একপাশে তৃষ্ণার হাহাকার, অন্যপাশে লোনা জলের গ্রাস। এর মাঝেই লুকিয়ে আছে এক নৃশংস মৃত্যুফাঁদ। গত কয়েকদিনে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে বিলীন হওয়া ২২টি তাজা প্রাণ কেবল সংখ্যা নয়; বরং ২২টি স্বপ্ন, ২২টি পরিবার এবং ২২টি শোকাতুর দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
সবুজ শ্যামল এই বাংলার বুক চিরে দারিদ্র্যের কষাঘাত আর সোনালি ভবিষ্যতের মরিচিকা যখন কোনো তরুণকে গ্রাস করে, তখন শুরু হয় এক করুণ যাত্রার উপাখ্যান। মানব পাচার কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং আধুনিক সভ্যতার গায়ে এক কলঙ্কিত ক্ষত, যা হাজারো মা-বাবার বুক খালি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধে যারা ঘর ছাড়ে, তাদের অজানাই থেকে যায় যে তারা আসলে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পা দিচ্ছে, যেখানে বালুকাধূসর মরুভূমি কিংবা উত্তাল সমুদ্রের লোনা জল হয়ে ওঠে তাদের শেষ শয্যা।
মানবসত্তা কেনাবেচার এই নিষ্ঠুর প্রথা বা মানব পাচার আধুনিক বিশ্বের এক ভয়াবহ অভিশাপ। আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এই বিষয়ের একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো: মানব পাচারের শিকড় মূলত প্রাচীন দাসপ্রথার গভীরে প্রোথিত। প্রাচীনকালে যুদ্ধবন্দী বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষকে জোরপূর্বক শ্রম কিংবা যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হতো। ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ই আধুনিককালে ‘মানব পাচার’ হিসেবে নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে।
শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে যখন শ্রমের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়, তখন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষ সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্বায়নের ফলে সীমান্ত উন্মুক্ত হওয়া এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় পাচারকারীরা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানব পাচারের ইতিহাস মূলত দারিদ্র্য এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশান্তরী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িত। সত্তর ও আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর মাধ্যমে এ দেশে পাচারের বীজ বপন করা হয়।
মানব পাচার মূলত তিনটি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়: উৎস দেশ, ট্রানজিট দেশ এবং গন্তব্য দেশ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ফিলিপাইন মূলত ‘উৎস দেশ’ হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে মানুষ পাচার করা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া পাচারকারীদের জন্য ট্রানজিট ও গন্তব্য উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের জঙ্গলগুলোতে পাচারকৃতদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন— সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার মূলত শ্রম পাচারের প্রধান গন্তব্য। এখানে অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র বেতনে বা বিনা বেতনে শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
লিবিয়া বর্তমানে মানব পাচারের একটি ভয়াবহ ‘হাব’ বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা মানুষদের এখান থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
ইউরোপের উন্নত দেশগুলো যেমন— ইতালি, গ্রিস এবং স্পেন অনেক পাচারকৃত মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য। তবে সেখানে পৌঁছাতে পারলেও তারা প্রায়ই অবৈধ অভিবাসীর তকমা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতেও পাচারকৃত মানুষদের দেখা মেলে। এখানে মূলত কৃষি খাত এবং সেবা শিল্পে সস্তায় শ্রম শোষণের জন্য পাচার করা হয়।
প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের নারী ও শিশু পাচারের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিয়ে গিয়ে যৌন পল্লী বা গৃহস্থালির কাজে শ্রম দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পাচারকারী চক্রগুলোর জাল মাকড়সার মতো ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে বিশ্ব দরবার পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা বিভিন্ন দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বা যোগসাজশ করতে দক্ষ। সমুদ্রপথে ছোট নৌকায় গাদাগাদি করে মানুষ তোলা থেকে শুরু করে বিদেশের মাটিতে বন্দীশালায় আটকে রেখে নির্যাতন—সবকিছুই এই চক্রগুলো অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চক্রগুলো সাধারণত গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে। তারা ‘দালাল’ নামে পরিচিত স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ভুয়া ভিসার প্রলোভন দেখায়। এই স্থানীয় দালালরা আবার যুক্ত থাকে ঢাকাভিত্তিক বড় এজেন্সির সঙ্গে, যাদের আন্তর্জাতিক অপরাধী সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
মানব পাচার একটি জঘন্য অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। এটি প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নিচে করণীয় তুলে ধরা হলো: মানব পাচার রোধে সরকারের প্রধান কাজ হলো বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পাচারকারীদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পাচার প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সভা, সেমিনার এবং গণমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে পাচারের ভয়াবহতা এবং পাচারকারীদের কৌশলের ব্যাপারে জনগণকে সজাগ করে তুলতে হবে।
পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবকে পাচারপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা এবং বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পাচারচক্রের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে হবে।
সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু-বান্ধবের ব্যাপারে অভিভাবকদের বিশেষ নজর রাখতে হবে। অতিরিক্ত লোভ বা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে কেউ যেন সন্তানকে ভুল পথে নিতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
যারা পাচারের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন, তাদের সামাজিকভাবে হেয় না করে সহমর্মিতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। ভুক্তভোগীদের উচিত পাচারকারীদের তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা, যাতে অন্য কেউ এই ফাঁদে না পড়ে।
বিদেশে কর্মসংস্থান বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে অবশ্যই সরকারি অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের প্রলোভনে পড়ে পাসপোর্ট বা টাকা লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
দারিদ্র্য ও বেকারত্বই পাচারের মূল কারণ। তাই দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণ সমাজকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পাচারকারীরা তরুণদের ফাঁদে ফেলছে। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং অপরিচিত কারো প্রলোভনে সাড়া দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ‘মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটি’কে সক্রিয় করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পাচারবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
মানব পাচার একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পাচার হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধার ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজতর করতে হবে।
[লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল]

আপনার মতামত লিখুন