সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বাউল ও সাম্যবাদ


শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

বাউল ও সাম্যবাদ

বাংলাদেশে সাম্যবাদী সমাজ গড়ার আন্দোলন দীর্ঘদিনের। ইউরোপীয় ও রুশ নানা দর্শনের ভিত্তিতে বাংলা অঞ্চলে সাম্যবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত। তবে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার বহু আগে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্যবাদী প্রথা চালু ছিল। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকায়িত আছে সাম্যবাদের অনুশীলন। 

ইংরেজ শাসনের পূর্বে বাংলা জনপদের প্রতিটি গ্রাম ছিল স্বনির্ভর। এই অঞ্চলে ইংরেজ শাসনের আগে পণ্যবিনিময় প্রথা চালু ছিল। প্রতিটি গ্রাম ছিল বহুমাত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এখানকার গ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল বহুবিধ পেশার শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে। মানুষের চাহিদাভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা ছিল প্রতিটি গ্রামে। যেমন— কৃষকরা খাদ্যের চাহিদা মেটাতেন, তাঁতিরা কাপড়ের, জেলেরা মাছের, গোয়ালারা দুধের যোগান দিতেন। এছাড়া ধোপা, নাপিত, কামার, স্বর্ণকার, কুমোর, চিকিৎসার জন্য কবিরাজসহ নানা পেশার মানুষ একই গ্রামে বাস করত। গ্রামের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এসব পেশার মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদান করত। এই সময়টায় প্রাচীন বাংলার গ্রামগুলো এক ধরনের সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার আওতাধীন ছিল। 

ইংরেজ শাসনের পর থেকে মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন ঘটে এবং আদি সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। তবে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকারীরা প্রাচীন বাংলার এই সমাজব্যবস্থার ওপর অনুশীলন করে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেননি। তারা সাম্যবাদ অনুশীলনের প্রক্রিয়া চালিয়েছেন রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আদলে। তাই বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্যবাদী রাজনীতি অনেকটা তলানিতে পড়ে আছে। এর মূল কারণ হলো, সমাজতান্ত্রিক নেতারা এই দেশের সংস্কৃতির হাজার বছরের সাম্যবাদী ঐতিহ্যের কথা রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসেন না। 

সাম্যবাদী বিষয়গুলো অনুধাবন করা যায় বাউল সমাজের জীবনপ্রণালী পর্যবেক্ষণ করলে। বাউল হলো বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের এক অনন্য সাধন-ভজন গোষ্ঠী ও লোকজ সংগীতধারা। বাউলরা মূলত সুফিবাদ ও বৈষ্ণব সহজিয়া মতের মিশ্রণে মানবপ্রেম ও আত্মার সন্ধানের গান গেয়ে বেড়ায়। অনেকেই বলেন, ‘বাউল’ শব্দের অর্থ সাধারণত উন্মাদ বা পাগল— যারা সামাজিক বিধিনিষেধ মানে না। প্রকৃতপক্ষে তারা আদি সাম্যবাদের কথা বলে বলেই কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের পাগল বলে আখ্যা দেয়। 

বাউল গান মূলত মানুষের জীবন ও প্রকৃতির কথা বলে। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাউল গান কেন সাম্যবাদী ধারা বহন করে, তার কয়েকটি দিক উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, বাউল মতবাদ দেহের ভেতরেই ঈশ্বরের অবস্থান বা ‘আত্মা’র সন্ধানে বিশ্বাসী, যা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় বহন করে। দ্বিতীয়ত, বাউল গানে মানবতাবাদ প্রবল, যেখানে জাত-পাত বা ধর্মের কড়াকড়ি নেই। তৃতীয়ত, বাউলরা একতারা, দোতারা, ঢোল, খঞ্জনি, বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে গান পরিবেশন করেন, যেখানে পুঁজিবাদী তথাকথিত আধুনিকতার প্রভাব নেই। চতুর্থত, বাউলদের সাধনা সংগীতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়; এই সাধনায় জাত, কাল, পাত্র, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকে না। পঞ্চমত, বাউল গানে মাটি, মানুষ, সাম্য, মানবতাবাদ এবং আধ্যাত্মিক ভাবের গভীর প্রকাশ পাওয়া যায়। 

অন্যদিকে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম (ল্যাটিন শব্দ থেকে উদ্ভূত, অর্থ ‘সাধারণ’ বা ‘সর্বজনীন’) একটি সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং অর্থনৈতিক মতবাদ, যা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ। এর লক্ষ্য একটি কমিউনিস্ট সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে উৎপাদন, বিতরণ ও বিনিময়ের উপায়গুলো সাধারণ মালিকানাধীন হবে এবং পণ্য বণ্টন হবে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী। একটি কমিউনিস্ট সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সামাজিক শ্রেণী এবং পরবর্তীকালে অর্থ ও রাষ্ট্র (বা জাতিররাষ্ট্র) বিলুপ্ত হবে। 

‘দ্য অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব কার্ল মার্ক্স’-এর মতে, মার্ক্স পুঁজিবাদ-পরবর্তী সমাজ বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন— যেমন পজিটিভ হিউম্যানিজম, সোশালিজম, কমিউনিজম, মুক্ত ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্র, উৎপাদকদের মুক্ত সমিতি ইত্যাদি। তিনি এগুলোকে প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ‘সোশালিজম’ ও ‘কমিউনিজম’কে পৃথক ঐতিহাসিক ধাপ হিসেবে দেখার ধারণা তাঁর মূল লেখায় ছিল না; এটি পরবর্তীতে মার্ক্সবাদী পরিভাষায় যুক্ত হয়। 

অন্যদিকে বাউল দর্শন ধর্মীয় চিন্তা থেকে উদ্ভূত আত্ম-অন্বেষণের এক বিশেষ রূপ, যা মূলত আত্মার আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের লোকসাহিত্য ও লোকঐতিহ্য বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, আরব অঞ্চলের রাজনৈতিক শক্তির প্রতিক্রিয়ায় সুফিবাদের জন্ম, যা পরে পারস্যে বিকশিত হয় এবং ইরান ও মধ্য এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। ক্রমে এটি পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় এসে চর্যাগীতির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ লাভ করে। তুর্কি বিজয়ের পর সুফি দরবেশদের আগমনে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের মানবতাবাদ ও সুফিবাদ মিলিত হয়ে মরমি ভাবধারার জন্ম দেয়। 

গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল, ড. আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখের মতে, মধ্যযুগের শুরুতে বাংলায় অদ্বৈতবাদের প্রভাবে চৈতন্যবাদ বিকশিত হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে। ভাগবতধর্ম, আদি রামধর্ম ও কৃষ্ণধর্মের মিলনে বৈষ্ণবধর্ম আত্মপ্রকাশ করে। এর সঙ্গে প্রাচীন মরমীবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। বাউল ও বাউল মতবাদের উৎপত্তিকাল আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ। ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ গ্রন্থে প্রফেসর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এ মত প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন, বৌদ্ধদের মহাযান পন্থা থেকে বাউলদের উদ্ভব। 

কমিউনিজমে স্বশাসিত সমাজ গঠনের লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে— কোথাও স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ও শ্রমিকদের স্ব-পরিচালনার ওপর জোর দেয়া হয়, আবার কোথাও রাষ্ট্রনির্ভর পদ্ধতির কথা বলা হয়। রাজনৈতিক পরিসরে কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোকে সাধারণত বাম বা দূর-বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উল্লেখ করেন, ১৮৪৮ সালে ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশের সময় ইউরোপে সোশালিজম ছিল গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কমিউনিজম ততটা নয়। প্রাচীন বাংলার সমাজব্যবস্থার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্যবাদী প্রথার চর্চা ছিল। উত্তর ভারতের যোদ্ধেয় জাতির জীবনব্যবস্থায়ও সাম্যবাদী উপাদান লক্ষ্য করা যায়। 

বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেকেই দেশীয় সংস্কৃতির চেয়ে সোভিয়েত সংস্কৃতির প্রভাব বেশি গ্রহণ করেছেন। একটি প্রচলিত প্রবাদ ছিল— সোভিয়েত রাশিয়ায় বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের বামপন্থীরা এখানে ছাতা মেলে ধরতেন। দেশীয় বাস্তবতায় রাজনীতি অনুশীলন করেছেন এমন বামপন্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। 

১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার আগ পর্যন্ত এদেশে বামপন্থীরা কমিউনিস্ট আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। সোভিয়েত ভাঙনের পরও অনেকেই বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে বামপন্থী পরিচয় ব্যবহার করছেন— এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, এদেশের অনেক বামপন্থী বাস্তবিক অর্থে সাম্যবাদকে অন্তরে ধারণ করতে পারেননি। এক অর্থে বাউলরাই তাদের জীবনাচরণ ও দর্শনের মাধ্যমে সাম্যের বাণী বাংলার জনপদে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সুতরাং, প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার ধারক হিসেবে বাউলদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। 

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬


বাউল ও সাম্যবাদ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে সাম্যবাদী সমাজ গড়ার আন্দোলন দীর্ঘদিনের। ইউরোপীয় ও রুশ নানা দর্শনের ভিত্তিতে বাংলা অঞ্চলে সাম্যবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত। তবে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার বহু আগে ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্যবাদী প্রথা চালু ছিল। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকায়িত আছে সাম্যবাদের অনুশীলন। 

ইংরেজ শাসনের পূর্বে বাংলা জনপদের প্রতিটি গ্রাম ছিল স্বনির্ভর। এই অঞ্চলে ইংরেজ শাসনের আগে পণ্যবিনিময় প্রথা চালু ছিল। প্রতিটি গ্রাম ছিল বহুমাত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং এখানকার গ্রামগুলো গড়ে উঠেছিল বহুবিধ পেশার শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে। মানুষের চাহিদাভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা ছিল প্রতিটি গ্রামে। যেমন— কৃষকরা খাদ্যের চাহিদা মেটাতেন, তাঁতিরা কাপড়ের, জেলেরা মাছের, গোয়ালারা দুধের যোগান দিতেন। এছাড়া ধোপা, নাপিত, কামার, স্বর্ণকার, কুমোর, চিকিৎসার জন্য কবিরাজসহ নানা পেশার মানুষ একই গ্রামে বাস করত। গ্রামের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এসব পেশার মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদান করত। এই সময়টায় প্রাচীন বাংলার গ্রামগুলো এক ধরনের সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার আওতাধীন ছিল। 

ইংরেজ শাসনের পর থেকে মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন ঘটে এবং আদি সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। তবে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকারীরা প্রাচীন বাংলার এই সমাজব্যবস্থার ওপর অনুশীলন করে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেননি। তারা সাম্যবাদ অনুশীলনের প্রক্রিয়া চালিয়েছেন রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আদলে। তাই বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্যবাদী রাজনীতি অনেকটা তলানিতে পড়ে আছে। এর মূল কারণ হলো, সমাজতান্ত্রিক নেতারা এই দেশের সংস্কৃতির হাজার বছরের সাম্যবাদী ঐতিহ্যের কথা রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসেন না। 

সাম্যবাদী বিষয়গুলো অনুধাবন করা যায় বাউল সমাজের জীবনপ্রণালী পর্যবেক্ষণ করলে। বাউল হলো বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের এক অনন্য সাধন-ভজন গোষ্ঠী ও লোকজ সংগীতধারা। বাউলরা মূলত সুফিবাদ ও বৈষ্ণব সহজিয়া মতের মিশ্রণে মানবপ্রেম ও আত্মার সন্ধানের গান গেয়ে বেড়ায়। অনেকেই বলেন, ‘বাউল’ শব্দের অর্থ সাধারণত উন্মাদ বা পাগল— যারা সামাজিক বিধিনিষেধ মানে না। প্রকৃতপক্ষে তারা আদি সাম্যবাদের কথা বলে বলেই কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের পাগল বলে আখ্যা দেয়। 

বাউল গান মূলত মানুষের জীবন ও প্রকৃতির কথা বলে। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাউল গান কেন সাম্যবাদী ধারা বহন করে, তার কয়েকটি দিক উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, বাউল মতবাদ দেহের ভেতরেই ঈশ্বরের অবস্থান বা ‘আত্মা’র সন্ধানে বিশ্বাসী, যা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় বহন করে। দ্বিতীয়ত, বাউল গানে মানবতাবাদ প্রবল, যেখানে জাত-পাত বা ধর্মের কড়াকড়ি নেই। তৃতীয়ত, বাউলরা একতারা, দোতারা, ঢোল, খঞ্জনি, বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে গান পরিবেশন করেন, যেখানে পুঁজিবাদী তথাকথিত আধুনিকতার প্রভাব নেই। চতুর্থত, বাউলদের সাধনা সংগীতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়; এই সাধনায় জাত, কাল, পাত্র, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ থাকে না। পঞ্চমত, বাউল গানে মাটি, মানুষ, সাম্য, মানবতাবাদ এবং আধ্যাত্মিক ভাবের গভীর প্রকাশ পাওয়া যায়। 

অন্যদিকে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম (ল্যাটিন শব্দ থেকে উদ্ভূত, অর্থ ‘সাধারণ’ বা ‘সর্বজনীন’) একটি সামাজিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং অর্থনৈতিক মতবাদ, যা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ। এর লক্ষ্য একটি কমিউনিস্ট সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে উৎপাদন, বিতরণ ও বিনিময়ের উপায়গুলো সাধারণ মালিকানাধীন হবে এবং পণ্য বণ্টন হবে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী। একটি কমিউনিস্ট সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সামাজিক শ্রেণী এবং পরবর্তীকালে অর্থ ও রাষ্ট্র (বা জাতিররাষ্ট্র) বিলুপ্ত হবে। 

‘দ্য অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব কার্ল মার্ক্স’-এর মতে, মার্ক্স পুঁজিবাদ-পরবর্তী সমাজ বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন— যেমন পজিটিভ হিউম্যানিজম, সোশালিজম, কমিউনিজম, মুক্ত ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্র, উৎপাদকদের মুক্ত সমিতি ইত্যাদি। তিনি এগুলোকে প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ‘সোশালিজম’ ও ‘কমিউনিজম’কে পৃথক ঐতিহাসিক ধাপ হিসেবে দেখার ধারণা তাঁর মূল লেখায় ছিল না; এটি পরবর্তীতে মার্ক্সবাদী পরিভাষায় যুক্ত হয়। 

অন্যদিকে বাউল দর্শন ধর্মীয় চিন্তা থেকে উদ্ভূত আত্ম-অন্বেষণের এক বিশেষ রূপ, যা মূলত আত্মার আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের লোকসাহিত্য ও লোকঐতিহ্য বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, আরব অঞ্চলের রাজনৈতিক শক্তির প্রতিক্রিয়ায় সুফিবাদের জন্ম, যা পরে পারস্যে বিকশিত হয় এবং ইরান ও মধ্য এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। ক্রমে এটি পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় এসে চর্যাগীতির সঙ্গে মিশে নতুন রূপ লাভ করে। তুর্কি বিজয়ের পর সুফি দরবেশদের আগমনে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের মানবতাবাদ ও সুফিবাদ মিলিত হয়ে মরমি ভাবধারার জন্ম দেয়। 

গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল, ড. আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখের মতে, মধ্যযুগের শুরুতে বাংলায় অদ্বৈতবাদের প্রভাবে চৈতন্যবাদ বিকশিত হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে। ভাগবতধর্ম, আদি রামধর্ম ও কৃষ্ণধর্মের মিলনে বৈষ্ণবধর্ম আত্মপ্রকাশ করে। এর সঙ্গে প্রাচীন মরমীবাদের সংমিশ্রণ ঘটে। বাউল ও বাউল মতবাদের উৎপত্তিকাল আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ। ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ গ্রন্থে প্রফেসর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এ মত প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন, বৌদ্ধদের মহাযান পন্থা থেকে বাউলদের উদ্ভব। 

কমিউনিজমে স্বশাসিত সমাজ গঠনের লক্ষ্য থাকলেও তা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে— কোথাও স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ও শ্রমিকদের স্ব-পরিচালনার ওপর জোর দেয়া হয়, আবার কোথাও রাষ্ট্রনির্ভর পদ্ধতির কথা বলা হয়। রাজনৈতিক পরিসরে কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোকে সাধারণত বাম বা দূর-বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উল্লেখ করেন, ১৮৪৮ সালে ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশের সময় ইউরোপে সোশালিজম ছিল গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কমিউনিজম ততটা নয়। প্রাচীন বাংলার সমাজব্যবস্থার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্যবাদী প্রথার চর্চা ছিল। উত্তর ভারতের যোদ্ধেয় জাতির জীবনব্যবস্থায়ও সাম্যবাদী উপাদান লক্ষ্য করা যায়। 

বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে অনেকেই দেশীয় সংস্কৃতির চেয়ে সোভিয়েত সংস্কৃতির প্রভাব বেশি গ্রহণ করেছেন। একটি প্রচলিত প্রবাদ ছিল— সোভিয়েত রাশিয়ায় বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের বামপন্থীরা এখানে ছাতা মেলে ধরতেন। দেশীয় বাস্তবতায় রাজনীতি অনুশীলন করেছেন এমন বামপন্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। 

১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার আগ পর্যন্ত এদেশে বামপন্থীরা কমিউনিস্ট আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। সোভিয়েত ভাঙনের পরও অনেকেই বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে বামপন্থী পরিচয় ব্যবহার করছেন— এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, এদেশের অনেক বামপন্থী বাস্তবিক অর্থে সাম্যবাদকে অন্তরে ধারণ করতে পারেননি। এক অর্থে বাউলরাই তাদের জীবনাচরণ ও দর্শনের মাধ্যমে সাম্যের বাণী বাংলার জনপদে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সুতরাং, প্রকৃত সাম্যবাদী চেতনার ধারক হিসেবে বাউলদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। 

[লেখক: উন্নয়নকর্মী]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত