অতি সম্প্রতি নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক নাহিদ সরকারকে হত্যার অভিযোগে এক ট্রাক চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার সুজাত আলী পাম্পের ম্যানেজারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন, এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ম্যানেজারকে হত্যা করার হুমকি দেন। অভিযোগ ওঠেছে যে, রাত ২টার দিকে পেট্রল পাম্প বন্ধ করে ম্যানেজার নাহিদ সরদার ও তার সহকর্মী জিহাদ ইসলাম তাদের মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা দিলে পেছন দিক থেকে সুজাত আলী তার ট্রাক দিয়ে মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেন, ঘটনাস্থলেই নাহিদ সরদার নিহত হন, তার সহকর্মী জিহাদ ইসলামের অবস্থাও গুরুতর। জ্বালানি তেলের জন্য সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত দীর্ঘ আট ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি ট্রাকচালক সুজাত আলী।
বেশ কিছুদিন যাবত দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে যানবাহনের বিরাট বিরাট লাইন পরিলক্ষিত হচ্ছে, কয়েক কিলোমিটার লম্বা। চাহিদা মোতাবেক তেল না থাকায় মবের ভয়ে বহু পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। যানবাহনের চালকদের মধ্যে লাইনের আগেপরের অবস্থান নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও মারামারি হচ্ছে। সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি মনিটরিং বৃদ্ধি ও বিশৃঙ্খলা রোধে উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছে পেট্রাল পাম্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তেল সরবরাহ করতে গিয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষও হিমশিম খাচ্ছে। পুলিশ ও পাম্পের কর্মীরা ক্রেতাদের শান্ত রাখতে হ্যাণ্ডমাইক ব্যবহার করছেন। মোটরসাইকেলের চাপে পাম্পে অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে পারছে না। ক্রেতারা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে শুধু অতীষ্ট হয়ে ওঠে না, উদ্বিগ্নও থাকে; কারণ যে কোনো মুহুর্তে পাম্প কর্তৃপক্ষ হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিতে পারে ‘তেল নাই’। বিভিন্ন পাম্পে প্রতিদিন হঠাৎ ‘নাই’ ঘোষণা শুনতে শুনতে ক্রেতারা আর ধৈর্য রাখতে পারছে না। ‘নাই’ ঘোষণার আগেই তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে কেউ কেউ লাইন ভাঙছেন, কেউ কেউ ক্ষমতা জাহির করে বিশেষ ব্যবস্থায় লাইন ছাড়াই তেল পেয়ে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেল এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটাছুটি করছে, কিন্তু তেল পাচ্ছে না, কারণ ফিলিং স্টেশনগুলোকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কসকরের ট্রাকের মতো তেলের গাড়ি কোন একটি ফিলিং স্টেশনে পৌঁছার সংবাদ পেলেই সব ক্রেতারা সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একাধিক আদেশ জারি করেছে সরকার। শুধু প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাতি, পাখা চালু করে অফিস ছাড়ার সময় তা বন্ধ করা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারের আরেকটি ইন্টারেস্টিং নির্দেশনা হচ্ছে, এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, জ্বালানি খরচ কমাতে বেশিরভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋত চাওয়া হয়েছে। এত পদক্ষেপ নিয়েও সরকার সামাল দিতে পারছে না, বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে হানা দিয়ে বোতলে রাখা তেলও জব্দ করা হচ্ছে। এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। বিএনপি সরকার কেন এই দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা আগে থেকে গ্রহণ করেনি তা স্পষ্ট নয়।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে কত ধূর্ত তা প্রতিপন্ন হয় ১৯৭১ সনে অবলম্বিত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আরেকটি ধূর্তামি থেকে। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার পরও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। আন্দোলনকে দমন করতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র আনার সুবিধার্থে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েই ঢাকায় চলে আসেন। আলোচনা একই প্রক্রিয়া ট্রাম্প যখন ইরানের ক্ষেত্রে অবলম্বন করে যাচ্ছিলেন তখনই প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহে আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। তারপরও দৃশ্যমান তেল সঙ্কট কৃত্রিম, সরকারের অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে ভোক্তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তাদের মধ্যে এই মর্মে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে যে, শীঘ্র আর তেল পাওয়া যাবে না, পাওয়া গেলেও দাম বেশি হবে।
পেট্রল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের ভিড় বেশি, কারণ অনেকেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের মোটরসাইকেল দিয়ে। তাই তারা শুধু দৈনন্দিনের প্রয়োজনীয় তেল নয়, ছোট ছোট পানির বোতলেও তেল ভরে মজুত করছেন। তাদের যদি প্রথমেই এই মর্মে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়া হতো যে, পেট্রল এবং অকটেন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না, বাংলাদেশে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের সিংহভাগ আমাদের গ্যাস খনির উপজাত বা কনডেনসেট থেকে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কনডেনসেট অনেক সময় পুড়িয়ে ফেলতে হয়, কারণ পেট্রল এবং অকটেনের চাহিদা মোট জ্বালানি তেলের মাত্র ৬ শতাংশ। এছাড়াও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে শোধন করেও ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়। সমস্যা এখন কিছুটা এলপিজি এবং ডিজেল নিয়ে, বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ডিজেল নিয়েও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে ইতোমধ্যে ডিজেল আনা হয়েছে। তবে এলপিজির পুরোটাই বেসরকারি খাতে আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিক্রি মূল্য নির্ধারণ নিয়ে ইতস্তত থাকায় বেসরকারি খাত এলপিজি আমদানিতে উৎসাহী নাও হতে পারে। যুদ্ধের মধ্যেও পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েলও ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে কেনার চেষ্টা হচ্ছে। তারপরও পেট্রল, অকটেন এবং ডিজেল নিয়ে দেশব্যাপী এত হাহাকার কেন ?
দেশে জ্বালানি সংকট নেই মর্মে সংসদে বিবৃতি দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তার মতে পেট্রল পাম্পে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যায় তা প্রকৃত চিত্র নয়। ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার পেট্রল পাম্পের ম্যানেজারকে হত্যা করলো, আর মন্ত্রী বলছেন তা প্রকৃত চিত্র নয়। মন্ত্রীর কথা হচ্ছে গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, এ বছর তার চেয়ে বেশি সরবরাহ করা হয়েছে। কথা মিথ্যা নয়, কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে রেশনিং বা সাশ্রয়ের কথা বলে ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। একই কাজ করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। গভর্নর হয়েই তিনি তারল্য সঙ্কটের সম্মুখীন কোন ব্যাংককে একটি টাকাও দেবেন না বলে ঘোষণা দেন; কিন্তু তিনি যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েও ব্যাংকগুলোকে আর রক্ষা করতে পারলেন না। তেলের মজুত রোধ করতে অবৈধ মজুতদারির তথ্যদাতাকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় মজুত করার প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অপশাসনে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, এই অবস্থায় জ্বালানি তেলের সঙ্কট আরও গভীর হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে, লোডশেডিং হবে যখন তখন, শিল্পকারখানায় নেমে আসবে বিপর্যয়। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পারঙ্গম, ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কট তৎকালীন সরকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্ব দেখেছে, করোনা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি, উন্নত দেশগুলোর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মধ্যেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮ শতাংশ।
বিএনপি সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশের বিবৃতি ইরানের পক্ষে যায়নি, গেছে বিপক্ষে। এছাড়াও আমেরিকার ওপর বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ইরানকে রুষ্ট করে তুলতে পারে, তাই হরমুজ প্রণালী বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে কি না তা অনিশ্চিত। ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার পর অর্থনৈতিক স্থাপনায় ব্যাপক আঘাত হানা হলে ইরানও শেষ মরণকামড় দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর তেলক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো আক্রান্ত হলে প্রাবাসীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। এভাবে ইরানকে ধ্বংস করতে গিয়ে বাংলাদেশের মতো গরীব দেশগুলোকে ধ্বংস করে দেবে মি. ডনাল্ড ট্রাম্প। সন্ধ্যা ৬টার পর ঢাকা শহর এখন প্রায় অন্ধকার; যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু অন্ধকার নয়, উৎপাদন প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি ঘটবে, দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় এই দুর্যোগেও সংসদে যা নিয়ে আলোচনা চলছে তা গতানুগতিক, কারোর মধ্যে শোনার আগ্রহ নেই; তেল নিয়ে উদ্ভুত সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনা হলে সংসদের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ত।
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
অতি সম্প্রতি নড়াইলে জ্বালানি তেল না পেয়ে তানভীর ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক নাহিদ সরকারকে হত্যার অভিযোগে এক ট্রাক চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার সুজাত আলী পাম্পের ম্যানেজারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন, এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ম্যানেজারকে হত্যা করার হুমকি দেন। অভিযোগ ওঠেছে যে, রাত ২টার দিকে পেট্রল পাম্প বন্ধ করে ম্যানেজার নাহিদ সরদার ও তার সহকর্মী জিহাদ ইসলাম তাদের মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা দিলে পেছন দিক থেকে সুজাত আলী তার ট্রাক দিয়ে মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেন, ঘটনাস্থলেই নাহিদ সরদার নিহত হন, তার সহকর্মী জিহাদ ইসলামের অবস্থাও গুরুতর। জ্বালানি তেলের জন্য সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত দীর্ঘ আট ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি ট্রাকচালক সুজাত আলী।
বেশ কিছুদিন যাবত দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে যানবাহনের বিরাট বিরাট লাইন পরিলক্ষিত হচ্ছে, কয়েক কিলোমিটার লম্বা। চাহিদা মোতাবেক তেল না থাকায় মবের ভয়ে বহু পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে। যানবাহনের চালকদের মধ্যে লাইনের আগেপরের অবস্থান নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও মারামারি হচ্ছে। সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি মনিটরিং বৃদ্ধি ও বিশৃঙ্খলা রোধে উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছে পেট্রাল পাম্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তেল সরবরাহ করতে গিয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষও হিমশিম খাচ্ছে। পুলিশ ও পাম্পের কর্মীরা ক্রেতাদের শান্ত রাখতে হ্যাণ্ডমাইক ব্যবহার করছেন। মোটরসাইকেলের চাপে পাম্পে অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে পারছে না। ক্রেতারা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে শুধু অতীষ্ট হয়ে ওঠে না, উদ্বিগ্নও থাকে; কারণ যে কোনো মুহুর্তে পাম্প কর্তৃপক্ষ হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিতে পারে ‘তেল নাই’। বিভিন্ন পাম্পে প্রতিদিন হঠাৎ ‘নাই’ ঘোষণা শুনতে শুনতে ক্রেতারা আর ধৈর্য রাখতে পারছে না। ‘নাই’ ঘোষণার আগেই তেল পাওয়া নিশ্চিত করতে কেউ কেউ লাইন ভাঙছেন, কেউ কেউ ক্ষমতা জাহির করে বিশেষ ব্যবস্থায় লাইন ছাড়াই তেল পেয়ে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেল এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটাছুটি করছে, কিন্তু তেল পাচ্ছে না, কারণ ফিলিং স্টেশনগুলোকে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কসকরের ট্রাকের মতো তেলের গাড়ি কোন একটি ফিলিং স্টেশনে পৌঁছার সংবাদ পেলেই সব ক্রেতারা সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একাধিক আদেশ জারি করেছে সরকার। শুধু প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাতি, পাখা চালু করে অফিস ছাড়ার সময় তা বন্ধ করা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারের আরেকটি ইন্টারেস্টিং নির্দেশনা হচ্ছে, এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, জ্বালানি খরচ কমাতে বেশিরভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋত চাওয়া হয়েছে। এত পদক্ষেপ নিয়েও সরকার সামাল দিতে পারছে না, বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে হানা দিয়ে বোতলে রাখা তেলও জব্দ করা হচ্ছে। এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। বিএনপি সরকার কেন এই দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা আগে থেকে গ্রহণ করেনি তা স্পষ্ট নয়।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে কত ধূর্ত তা প্রতিপন্ন হয় ১৯৭১ সনে অবলম্বিত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আরেকটি ধূর্তামি থেকে। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার পরও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। আন্দোলনকে দমন করতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র আনার সুবিধার্থে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েই ঢাকায় চলে আসেন। আলোচনা একই প্রক্রিয়া ট্রাম্প যখন ইরানের ক্ষেত্রে অবলম্বন করে যাচ্ছিলেন তখনই প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহে আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। তারপরও দৃশ্যমান তেল সঙ্কট কৃত্রিম, সরকারের অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে ভোক্তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তাদের মধ্যে এই মর্মে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে যে, শীঘ্র আর তেল পাওয়া যাবে না, পাওয়া গেলেও দাম বেশি হবে।
পেট্রল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের ভিড় বেশি, কারণ অনেকেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের মোটরসাইকেল দিয়ে। তাই তারা শুধু দৈনন্দিনের প্রয়োজনীয় তেল নয়, ছোট ছোট পানির বোতলেও তেল ভরে মজুত করছেন। তাদের যদি প্রথমেই এই মর্মে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়া হতো যে, পেট্রল এবং অকটেন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না, বাংলাদেশে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের সিংহভাগ আমাদের গ্যাস খনির উপজাত বা কনডেনসেট থেকে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কনডেনসেট অনেক সময় পুড়িয়ে ফেলতে হয়, কারণ পেট্রল এবং অকটেনের চাহিদা মোট জ্বালানি তেলের মাত্র ৬ শতাংশ। এছাড়াও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে শোধন করেও ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়। সমস্যা এখন কিছুটা এলপিজি এবং ডিজেল নিয়ে, বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ডিজেল নিয়েও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে ইতোমধ্যে ডিজেল আনা হয়েছে। তবে এলপিজির পুরোটাই বেসরকারি খাতে আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিক্রি মূল্য নির্ধারণ নিয়ে ইতস্তত থাকায় বেসরকারি খাত এলপিজি আমদানিতে উৎসাহী নাও হতে পারে। যুদ্ধের মধ্যেও পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েলও ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে কেনার চেষ্টা হচ্ছে। তারপরও পেট্রল, অকটেন এবং ডিজেল নিয়ে দেশব্যাপী এত হাহাকার কেন ?
দেশে জ্বালানি সংকট নেই মর্মে সংসদে বিবৃতি দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তার মতে পেট্রল পাম্পে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যায় তা প্রকৃত চিত্র নয়। ৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে ট্রাক ড্রাইভার পেট্রল পাম্পের ম্যানেজারকে হত্যা করলো, আর মন্ত্রী বলছেন তা প্রকৃত চিত্র নয়। মন্ত্রীর কথা হচ্ছে গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, এ বছর তার চেয়ে বেশি সরবরাহ করা হয়েছে। কথা মিথ্যা নয়, কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে রেশনিং বা সাশ্রয়ের কথা বলে ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। একই কাজ করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। গভর্নর হয়েই তিনি তারল্য সঙ্কটের সম্মুখীন কোন ব্যাংককে একটি টাকাও দেবেন না বলে ঘোষণা দেন; কিন্তু তিনি যখন তার ভুল বুঝতে পারলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েও ব্যাংকগুলোকে আর রক্ষা করতে পারলেন না। তেলের মজুত রোধ করতে অবৈধ মজুতদারির তথ্যদাতাকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় মজুত করার প্রবনতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের ১৮ মাসের অপশাসনে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, এই অবস্থায় জ্বালানি তেলের সঙ্কট আরও গভীর হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে, লোডশেডিং হবে যখন তখন, শিল্পকারখানায় নেমে আসবে বিপর্যয়। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পারঙ্গম, ২০২২ সনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কট তৎকালীন সরকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্ব দেখেছে, করোনা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্ব মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি, উন্নত দেশগুলোর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মধ্যেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮ শতাংশ।
বিএনপি সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশের বিবৃতি ইরানের পক্ষে যায়নি, গেছে বিপক্ষে। এছাড়াও আমেরিকার ওপর বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ইরানকে রুষ্ট করে তুলতে পারে, তাই হরমুজ প্রণালী বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে কি না তা অনিশ্চিত। ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার পর অর্থনৈতিক স্থাপনায় ব্যাপক আঘাত হানা হলে ইরানও শেষ মরণকামড় দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর তেলক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো আক্রান্ত হলে প্রাবাসীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। এভাবে ইরানকে ধ্বংস করতে গিয়ে বাংলাদেশের মতো গরীব দেশগুলোকে ধ্বংস করে দেবে মি. ডনাল্ড ট্রাম্প। সন্ধ্যা ৬টার পর ঢাকা শহর এখন প্রায় অন্ধকার; যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু অন্ধকার নয়, উৎপাদন প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি ঘটবে, দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতীয় এই দুর্যোগেও সংসদে যা নিয়ে আলোচনা চলছে তা গতানুগতিক, কারোর মধ্যে শোনার আগ্রহ নেই; তেল নিয়ে উদ্ভুত সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনা হলে সংসদের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ত।
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন