বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। নিজের মালিকানাধীন গাড়ি সংস্থাটিকে ভাড়া দেওয়া, বেতন-ভাতা নিজে নির্ধারণ, অব্যবহৃত পদে নিয়োগ ও কর্মীদের হয়রানির অভিযোগের তদন্ত করছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি পদত্যাগের পর গত ১ এপ্রিল তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দুই বছরের জন্য বাসসের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছিল।
নথিপত্র বলছে, মাহবুব মোর্শেদের মালিকানাধীন টয়োটা এলিয়ন মডেলের একটি গাড়ি ‘রেন্ট-এ-কার সার্ভিস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাসসের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করা হয়। এই গাড়ির জন্য মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় দেড় লাখ টাকা। এতে জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গাড়িটি সপ্তাহে সাত দিন ও ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের সুবিধা ছিল মাহবুব মোর্শেদের। অথচ বাসসের নিজস্ব একটি গাড়ি থাকার পরও তিনি এটি খুব কম ব্যবহার করতেন বলে সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গাড়ি বাসসে ভাড়ায় চলছে, যার মাসিক ভাড়া মাত্র ৭০ হাজার টাকা- অর্থাৎ অর্ধেকের কম। দ্বিতীয় গাড়ির চুক্তিতে সপ্তাহে সাত দিন ও ২৪ ঘণ্টার শর্ত উল্লেখ নেই।
গাড়িভাড়ার চুক্তিকৃত প্রতিষ্ঠানের মালিক আবদুল কাদের বলেন, ‘একটা প্রতিষ্ঠানের এমডি যদি ডেকে বলে যে এই গাড়িটা তোমার নামে চালাও, তখন আসলে আমার কিছু করার থাকে না।’ পুরো দেড় লাখ টাকাই মাহবুব মোর্শেদ নিতেন বলেও জানান তিনি। অভিযোগ প্রসঙ্গে মাহবুব মোর্শেদ প্রথমে বলেন, ‘এ রকম কিছু ঘটে নাই।’
নিয়োগের সময় মাহবুব মোর্শেদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। তিনি নিজ উদ্যোগে একটি চুক্তিনামা তৈরি করেন। তাতে মূল বেতন নবম ওয়েজ বোর্ডের বিশেষ গ্রেডের সর্বোচ্চ সিলিং ১ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ টাকা নির্ধারণ করেন। এর সঙ্গে যুক্ত করেন- বাড়িভাড়া, ডেস্কভাতা, আপ্যায়নভাতা, দায়িত্বভাতা ও চিকিৎসাভাতা। সব মিলিয়ে তাঁর মাসিক বেতন দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৩৮ টাকা। এ ছাড়া তিনি আলাদাভাবে পত্রিকা, মুঠোফোন, ইন্টারনেট ও জার্নাল বিল বাবদ মাসিক প্রায় ২৪ হাজার টাকা ভাউচার করতেন।
বেতন-ভাতা নির্ধারণের পর দেখা যায়, তার চেয়ে বাসসের কয়েকজন সাংবাদিকের বেতন বেশি। তখন তিনি ‘বিশেষ ভাতা’ হিসেবে মাসিক ২২ হাজার টাকা আরও বাড়িয়ে নেন।অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয় বাসসের পরিচালনা পর্ষদ বা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি।
এমডি থাকাকালে মাহবুব মোর্শেদ ২২ জনকে স্থায়ী ও ৪১ জনকে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেন। সংস্থার বিদ্যমান জনবলকাঠামোতে অনুমোদিত পদ নয়, সেগুলোতে কর্মীদের পদায়ন করেন। যেমন- ‘সিটি এডিটর’ ও ‘বাংলা সার্ভিসের চিফ রিপোর্টার’ পদ জনবলকাঠামোতে নেই। বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে এমন পদ থাকলেও সরকারি সংস্থায় পদ তৈরি না করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পরদিনই বাসসে গিয়ে কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন মাহবুব মোর্শেদ। তিনি ফেসবুক পোস্টে ‘মব তৈরি করে’ তাকে অপসারণের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। পরে তার পদত্যাগের খবর আসে।
এর আগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল নিজের গাড়ি ভাড়া দেওয়া, বেতন নিজে নির্ধারণ, অব্যবহৃত পদে নিয়োগ ও কর্মীদের দুর্ব্যবহার। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মাহবুব মোর্শেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলার মতো মানসিকতা নাই বলে জানিয়ে দেন। বাসসের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অনিয়ম সংস্থার ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। সরকারি সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা। সূত্র: প্রথম আলো।

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। নিজের মালিকানাধীন গাড়ি সংস্থাটিকে ভাড়া দেওয়া, বেতন-ভাতা নিজে নির্ধারণ, অব্যবহৃত পদে নিয়োগ ও কর্মীদের হয়রানির অভিযোগের তদন্ত করছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি পদত্যাগের পর গত ১ এপ্রিল তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দুই বছরের জন্য বাসসের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছিল।
নথিপত্র বলছে, মাহবুব মোর্শেদের মালিকানাধীন টয়োটা এলিয়ন মডেলের একটি গাড়ি ‘রেন্ট-এ-কার সার্ভিস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাসসের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করা হয়। এই গাড়ির জন্য মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় দেড় লাখ টাকা। এতে জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গাড়িটি সপ্তাহে সাত দিন ও ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের সুবিধা ছিল মাহবুব মোর্শেদের। অথচ বাসসের নিজস্ব একটি গাড়ি থাকার পরও তিনি এটি খুব কম ব্যবহার করতেন বলে সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গাড়ি বাসসে ভাড়ায় চলছে, যার মাসিক ভাড়া মাত্র ৭০ হাজার টাকা- অর্থাৎ অর্ধেকের কম। দ্বিতীয় গাড়ির চুক্তিতে সপ্তাহে সাত দিন ও ২৪ ঘণ্টার শর্ত উল্লেখ নেই।
গাড়িভাড়ার চুক্তিকৃত প্রতিষ্ঠানের মালিক আবদুল কাদের বলেন, ‘একটা প্রতিষ্ঠানের এমডি যদি ডেকে বলে যে এই গাড়িটা তোমার নামে চালাও, তখন আসলে আমার কিছু করার থাকে না।’ পুরো দেড় লাখ টাকাই মাহবুব মোর্শেদ নিতেন বলেও জানান তিনি। অভিযোগ প্রসঙ্গে মাহবুব মোর্শেদ প্রথমে বলেন, ‘এ রকম কিছু ঘটে নাই।’
নিয়োগের সময় মাহবুব মোর্শেদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। তিনি নিজ উদ্যোগে একটি চুক্তিনামা তৈরি করেন। তাতে মূল বেতন নবম ওয়েজ বোর্ডের বিশেষ গ্রেডের সর্বোচ্চ সিলিং ১ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ টাকা নির্ধারণ করেন। এর সঙ্গে যুক্ত করেন- বাড়িভাড়া, ডেস্কভাতা, আপ্যায়নভাতা, দায়িত্বভাতা ও চিকিৎসাভাতা। সব মিলিয়ে তাঁর মাসিক বেতন দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৩৮ টাকা। এ ছাড়া তিনি আলাদাভাবে পত্রিকা, মুঠোফোন, ইন্টারনেট ও জার্নাল বিল বাবদ মাসিক প্রায় ২৪ হাজার টাকা ভাউচার করতেন।
বেতন-ভাতা নির্ধারণের পর দেখা যায়, তার চেয়ে বাসসের কয়েকজন সাংবাদিকের বেতন বেশি। তখন তিনি ‘বিশেষ ভাতা’ হিসেবে মাসিক ২২ হাজার টাকা আরও বাড়িয়ে নেন।অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয় বাসসের পরিচালনা পর্ষদ বা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি।
এমডি থাকাকালে মাহবুব মোর্শেদ ২২ জনকে স্থায়ী ও ৪১ জনকে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেন। সংস্থার বিদ্যমান জনবলকাঠামোতে অনুমোদিত পদ নয়, সেগুলোতে কর্মীদের পদায়ন করেন। যেমন- ‘সিটি এডিটর’ ও ‘বাংলা সার্ভিসের চিফ রিপোর্টার’ পদ জনবলকাঠামোতে নেই। বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে এমন পদ থাকলেও সরকারি সংস্থায় পদ তৈরি না করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পরদিনই বাসসে গিয়ে কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন মাহবুব মোর্শেদ। তিনি ফেসবুক পোস্টে ‘মব তৈরি করে’ তাকে অপসারণের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। পরে তার পদত্যাগের খবর আসে।
এর আগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল নিজের গাড়ি ভাড়া দেওয়া, বেতন নিজে নির্ধারণ, অব্যবহৃত পদে নিয়োগ ও কর্মীদের দুর্ব্যবহার। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মাহবুব মোর্শেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলার মতো মানসিকতা নাই বলে জানিয়ে দেন। বাসসের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অনিয়ম সংস্থার ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। সরকারি সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা। সূত্র: প্রথম আলো।

আপনার মতামত লিখুন