উপেক্ষা
নির্মলেন্দু গুণ
অনন্ত বিরহ চাই, ভালবেসে কার্পণ্য শিখিনি।
তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে পারি
সমস্ত বোধের উৎস গ্রাস করা প্রেম, যদি চাও
ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা দেখাও।
আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভিখারী বিরহে?
আমার মেয়ে বন্ধুরা
দিলারা হাফিজ
ছোট ছোট লাভ-লোকসান গনাগনতি শেষ হলে
আমার যত মেয়ে বন্ধু,ফিরে গেছে বানপ্রস্থের বনে!
বয়সী-মেসতা, হাপুস নয়ন,প্রতারক ডিমেনশিয়া
খেয়ে নিচ্ছে স্মৃতি-মাধুরীর সর্বশেষ অমৃতকণা,
নতুন ঋতুর গানে নবায়ন হয় বৃক্ষ, আসে নতুন পাতা
আমার বন্ধুরা টিমটিম করে জ্বলে,অন্তরাত্মার বিভায়।
এখনো কচি কলাপাতা হাত বাড়িয়ে দেয় তুমুল উচ্ছ্বাসে
মুকুলের ঘ্রাণ, লেবু ফুলের গন্ধে উন্মাতাল উঠোন,
বন্ধুদের নিরঙ্কুশ মায়াময় চোখগুলো এইদিনেও
দীপ্তিহীন— নিরাশার গিরিখাদে অপলক...
বিষাদের প্রলেপে আঁকা এ যেন অন্য এক মানবদেহ
কুঁতকুঁতে দিন—, ম্রিয়মাণ ত্বকে কাতর করবীর মায়া
কেবলি অবশেষ ডাকে, নিঃশ্বাসে জারি করা সীমানা।
আলোসত্য
ফারুক মাহমুদ
ব্যস্ততার হাত থেকে সময় বাঁচিয়ে
(পরিস্থিতি যা-ই হোক) অন্ধকার অনুবাদ করি
কালো ভ্রমরের মতো ছোট অন্ধকার—
অনুবাদে হয়ে ওঠে থোকা-থোকা পাখি
চাঁদের তরল হাসি, কবিতার রাগ-অনুরাগ
আঁকাবাঁকা অন্ধকার অনূদিত হলে
নদী হয়। অনেক পথের শেষে পরিতৃপ্ত সাগর সঙ্গমে
অশ্রুতে যে অন্ধকার থাকে
এর পরের পৃষ্ঠায় হাসিটর উদার উদয়
প্রকৃতির সব অঙ্গ, উপ-অঙ্গ আলো দিয়ে মোড়া
এমনকি, অন্ধকার, সে-ও কিন্তু আসন্ন আলোর জন্মধ্বনি
যাও, ইচ্ছে মতো ডেকে যাও, সাড়া দিবো না
আবদুর রাজ্জাক
অসীম অপেক্ষা— অবশেষে এলে—
তোমার কারণে সুনির্দিষ্ট নিঃশ্বাস নিতে পেরেছি।
পিছনে রেখেছি দীর্ঘদিনের দীর্ঘশ্বাস।
তোমার কারণেই জলেভাসা কুমুড়বড়ি, দেখো! ভেসে আছি
বোয়ালমাছের পেটির মতো পাতলা ঝোলে।
চিরকালের একটি নিঃসীম চাঁদ নেমেছি তোমার দিগন্তে,
এই সেদিনও তোমার আকাশ হয়ে, তোমার হৃদয় ছুঁয়ে
অকুণ্ঠ নিবিড়ে ছিলাম।
সহস্র বছর শূন্যতার দিকে তাকিয়ে পার হয়ে গেছে এবং
সেইসব গল্প অলিখিতই রয়ে গেছে।
তোমাকে অশুভ জ্যোৎস্নায় লাল একটি কুসুম হতে দেখেছি,
যেন সেই কুসুমের অসীম নির্জনতা আমাকে পেয়ে বসেছে।
আমরা কেউ কখনো কারো কাছে আসিনি।
এক নেপথ্যচারী কাপালিক— নিশ্চুপ থেকে গভীর অরণ্যে
হাঁটছি... একাকী।
ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে, কোনো প্রত্যাশা নেই, দূর—
সুদূরেই তোমাকে থেকে যেতে হবে।
দেয়ালে অঙ্কিত ঘোর বসতিকাল, ডেকে যাও, ইচ্ছে মতো
ডেকে যাও, সাড়া দিবো না।
আগ্রাসনের এইসব দিনগুলি থেকে হয়তো একদিন বের হবো
সেও তোমার কারণে।
এখনো ভোরের স্বপ্ন
আসাদ মান্নান
বাতাসে মৃত্যুর গন্ধে নড়ে ওঠে গোধূলির আলো;
পাখির ডানার নিচে বসে আছে জীবনপ্রেমিক
অরণ্যের ঘন ছায়া— উল্টোদিকে ছায়ার আড়ালে
আসমুদ্রহিমাচলে কী সুন্দর অদৃশ্য খাঁচায়
মানুষ কিসের টানে পথে নেমে পিছু ফিরে চায়,
চিরন্তন রহস্যের তাঁত কলে কেন বুনতে থাকে
প্রসন্ন রঙিন আর স্বপ্ন মাখা দিনের পোশাক,
প্রাণের আগুন দিয়ে তৈরি করে ঈশ্বরের মায়াবী আশ্রম!
ফাঁসির আদেশনামা হাতে নিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়ে
প্রস্তুত রয়েছে ওই ডানাহীন উড়ন্ত জল্লাদ—
সময়ের গুন টানে অস্তগামী সূর্যের নাবিক।
তবুও নদীর জলে শ্বাস ফেলে যে উঠে দাঁড়ায়
এখনো ভোরের স্বপ্ন তার রক্তে প্রখর উত্তাপে
জ্বালিয়ে রেখেছে রঙ আশা আর মৌন ভালোবাসা।
শব্দ
আশরাফ আহমদ
উচ্চারণ মাত্র ভেঙে যাবে, এই ভয়ে
‘উফ’ শব্দ গিলে খেয়ে শরীরে সমুদ্র—
টিনের চালের মধ্যে সূর্যরাজের পদধূলি
রাগে বা বেরাগে ঘূর্ণি তুলে নাচে,
ব্রহ্মতালু ফাটে,তালপাখা কাজেই লাগে না।
ঘুম যায় অভিসারে, রাত তিনটায়।
রাত তিনটায় ডেভেলাপারের ট্রাক
বমি করে রড, তাতেই বজ্র—
ইট ভাঙানির যত হাতের ফুসকা ফাটে—
গলি ভর্তি হর্নের রুষ্ট সঙ্গীত যত, কর্কশ—
এমনকি দিনের বেলায় কাকের নিরুদ্দেশে
উড়ালের ডানা ঝাপটানো—
বৃষ্টির বদলে আর ভেজে না মীনের চোখ—
অপর পৃষ্ঠায়
বিদ্যুৎহীনতার গল্প, ব্যাংকলুট,অর্থ পাচার,
জলবায়ু, আইনের লম্বা হাত,গণতন্ত্র ইত্যাদি
লুকিয়ে রেখেই দর্শনে মগ্ন হয়ে পড়ি—
ড্যাশের মর্মার্থ হচ্ছে শব্দ,
কবিতা নির্মাণে লাগে,
যদিও খায় না পাবলিক।
দিন-রাত্রির ঠিক মাঝখানে সেতুটায়,
সুতোটায় বসে অথবা ইন্দুরের গর্তের মুখে
ধ্যানমগ্ন বিড়ালেরা বসে বসে
বহুতল শব্দের স্থাপত্য দেখছে! যেনো,
সুবেহ-সাদিকের পথে মুসল্লির পায়ে পায়ে
উত্তাপ ওঠানামা করে।
উচ্চারণ মাঝপথে একেবারে থেমে গেলে,
ধন্য হয় বোবার জীবন, কোনো রা নেই।
স্বপ্নের কারিগর
(নতুন সংসদকে)
মঈনউদ্দিন মুনশী
যে ভূমিতে বেড়ে ওঠে প্রত্যাশা ভারি
আর থাকে প্রচেষ্টার ভ্রূণ সারি সারি
তাঁরা শ্রম দিয়ে চেষ্টা দিয়ে করে সম্পাদন
স্বপ্নকে পরিণত করে সোনার জীবন।
ক্ষুদ্র হাত কিন্তু হৃদয় কী উজ্জ্বল স্বচ্ছ
তাঁরা অনুসরণ করে গন্তব্য
তাই পৌঁছে যায় নতুন উচ্চতায়
ঝড়ে আগুনে তাঁরা ক্লান্ত নয়
কঠিন শ্রম হয় জ্বালানি তাঁদের দীপ্ত উদ্দীপনার
তাই রোপণ করো স্বপ্ন ও ভালবাসা তোমার
যত্নের সাথে, দেখো তারা কেমন মুকুলিত হয় তুলনাহীন
আগামীর পথে, স্বদেশের টান।
স্বপ্ন থেকে থেকে ওঠে জ্বলে
সাফল্য তাঁদের কাছেই আসে যারা স্বপ্ন দেখে।
স্বপ্ন ও বাস্তব
বিমল গুহ
তর্ক চলে দিনরাতভর স্বপ্ন ও বাস্তবে
স্বপ্ন অন্তহীন রূপজাল
দুর্দম বিভোর
বাস্তব কেবল হাহাকার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির
কখনোবা বিপর্যয় অন্ধ মোহ
অতীত প্রশ্রয়;
স্বপ্নের হাত-পা নেই
কেবল নধর
লোভ মোহ অদৃশ্য গরিমা লাল চোখ ক্রোধের আগুন
যদি স্বপ্নবাজ একরোখা কানা লোভাতুর!
বাস্তব অপরিমেয় যজ্ঞসার
কর্মমুখ ভাবনার উল্লাস
কখনো হিংসার রূপ শীর্ণ লোভাতুর।
স্বখাত সলিলে
মাহফুজ আল-হোসেন
ওগো শুনছো, তোমার মাস্কারাচর্চিত চর্মচক্ষুর আশকারা এড়িয়ে বলো তো কী সন্দেশ নিয়ে এসেছি আজ সাড়ে সর্বনাশের এই ঘর্মাক্ত অস্থির বিকালে?
এবারের তৈলতপ্ত ঈদবাজারে অতি আকর্ষক এক প্রমোদ প্যাকেজ: হরমুজ প্রণালির বুকচিরে ভ্রাম্যমাণ জলযানে নৌবিহার— মিলবে কি আদৌ ত্রিকালে?
গড়পড়তা মানুষের তিতকুটে করলা জীবনের আলপথে হঠাৎ হিমহিম মৃত্যুর পুচ্ছদেশ ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এমন সুস্বাদু আইসক্রিম যদি থাকে কপালে!
পারস্য উপসাগরীয় এই রমণীয় অভিযাত্রায় ড্রোনানুভব যদি মিলে যায় অসহনীয় মাত্রায় তবে এর চেয়ে উত্তেজক কোনো বিকল্প আর আছে কিনা কে জানে?
তথাপি ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ —এ কোন দ্বিধায় আজ মনপ্রাণ স্বখাত সলিলে নিমজ্জমান;
অতঃপর সৌম্যদীপ্ত ভানু সিংহ কহে সদা থাকো নির্ভয়ে: ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যামসমান’।
জীবনের মোহ
মাহমুদ কামাল
প্রতিটি রাতের কাছে নিবেদন করি
ভোরের প্রত্যাশা
সুতীব্র রাতের মাঝে যত রসায়ন
ঝড়ের তাণ্ডব শেষে নিষ্কলুষ সকালের রোদ
পরবর্তী রাতের সমীপে
রক্তরথ উদ্দীপিত করে যেন
ভোর চলে আসে
প্রতিটি রাতের কাছে
ভোরের প্রত্যাশা করে
এভাবেই জীবনের মোহ গড়ে তুলি
একাত্তর: শরবিদ্ধ বিপন্ন সময়
সোহরাব পাশা
দুঃসহ বেদনায় নতমুখি জীবন
কেউবা সুতোছেঁড়া পুরনো স্মৃতির ভিতর বিহ্বল
কেউবা অনন্ত দূর দেখে নিজেকেই ছিঁড়েখুঁড়ে
বিনিদ্র জেগে থাকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে তীব্র দহনের ,
পৃথিবীতে নিয়তই তুমুল বসন্ত ফোটে
ভিজে যায় জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ বৃষ্টিতে— পাতারা
আবৃত্তি করে লোরকার ধ্রুপদি কবিতা—
এইসব ঢেকে যায় ক্ষিপ্রতার মেঘের ডানায়।
শূন্যদাহ— অশ্রুভাষা শরবিদ্ধ বিপন্ন সময়
রং উঠে যায় ভালোবাসার
ছেঁড়া তাঁবুর ভিতর ধূর্ত সার্কাসের সংসার
অন্ধেরা দেখে জ্যোৎস্নার ফুল,
মৃত্যু শব্দে ভেঙে যায় গোলাপি সকাল
দুপুরে কালো চিল ওড়ে, ভুল বেলায়
ফিরে যায় অরক্ষিত অপর বাসায়;
সন্ধ্যের নিশ্চুপ নিভৃতের নিবিড় আশ্রয় খোঁজে
শঙ্কিত পা’
মানুষনিঃশব্দে নিদ্রিত থাকে অন্য এক ভোরে।
আমাদের ঈদ উপাখ্যান
খোরশেদ বাহার
ওই দেখা যায় সাদা মেঘের ফাঁকে
আমার চোখে কিছুই পড়ে না।¬¬
সন্ধ্যায় সাইকেলের ক্রিংক্রিং বেল বেজে ওঠে
এক লাফে উঠোনে নেমে আসে বর্ষা।
তিনি ঘর্মাক্ত শরীরে উঠোনের জলচৌকিতে বসলেন
তালপাতার পাখায় শরীর জুড়িয়ে নিলেন কিছুক্ষণ
আমাকে, বর্ষাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন
জানিস, চাঁদ উঠেছে, কাল ঈদ।
আমার জুতো দোকানে ঝুলছে
হাসান দর্জির ঘরে ঝুলছে বর্ষার ফ্রক
বাবা জানতে চাইলেন ভোলা ধুপির খবর
মা তার নতুন শাড়ির কথা বলা না বলার
ফাঁক গলিয়ে দ্রুত রান্নাঘরে উনুন জ্বাললেন।
কমলা রঙের আগুনে মায়ের মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
আমরা দু’জন মায়ের শরীরে লেপটে থাকি।
বাবা এবার উঠলেন, ফিরলেন অনেকটা পরে
ফ্রক-জুতো-শাড়ি-ধোপদুরস্ত পাজামা-পাঞ্জাবি হাতে,
আমরা নতুন জুতোর সাথে, রঙিন ফ্রকের সাথে
যুদ্ধে উঠি মেতে।
ততক্ষণে সেমাই পায়েস জর্দা হালুয়ায়
আমাদের চোখ চকচকে হয়ে উঠেছে
জিহ্বাতে রস ঝরছে
সারা গ্রামে ঈদের বন্যা এসেছে।
অনুশোচনা
হাইকেল হাশমী
প্রিয়তমা, আমি ভেবেছিলাম
আমাদের আঙিনায় ফুটবে লাল গোলাপ,
আর তোমার আঁচলে
ঝিকমিক করবে শত শত তারা।
নীল আকাশে ঝলমলে সূর্যের শপথ,
আমি ভেবেছিলাম—
তোমার গালে নাচবে সূর্যের কিরণ,
আর তোমার স্বচ্ছ চোখে
ঝলমল করবে হীরকের কণা।
আমরা দু’জন অন্তহীন আকাশে
খুঁজতে যাব ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্র।
কিন্তু তা হলো না—
আমাদের উঠোনে ছড়িয়ে পড়ল আগুনের স্ফুলিঙ্গ,
আর তোমার আঁচলে
তীক্ষ্ম কাঁটা ছাড়া কিছুই রইল না আর।
তোমার গালে দেখতে পাই
পুড়তে থাকা শহরের ছায়া,
আর তোমার স্বচ্ছ চোখ
আচ্ছন্ন বারুদের কালো ধোঁয়ায়।
হায় আমরা দু’জন যেতে পারলাম না
অসীম আকাশে তারা খুঁজতে।
এখন তো আকাশও নিরাপদ নয়—
উড়ে বেড়াচ্ছে মিসাইল আর জঙ্গী বিমান।
নীল আকাশে তারার আর দেখা নেই
অজস্র ড্রোনে ছেয়ে গেছে আকাশ পথ।
আমি লজ্জিত— খুবই লজ্জিত প্রিয়তমা,
মাটি আর আকাশে নেই কোনো নিরাপদ ঠিকানা
তুমি আমার চোখের মণিতে নেমে আসো
আসো বসবাস কর আমার কল্পনার উপত্যকায়
তোমাকে লুকিয়ে রাখব আমার হৃদয়ের স্পন্দনে।
জানিস না, লিখতে শুরু করেছি আমরাই
খালেদ হামিদী
আমাদের অভিশাপ ফলেনি কখনও।
কবে যে কৃষির শুরু, সেই থেকে আজও
তোরাই নাছোড় খুব ভয়ংকরতায়।
কাঠের বিরাট যত নৌকায় আটক
বিক্ষুব্ধ কৃষ্ণাঙ্গদের ফেলেছিস জলে,
প্রণীত কানুনানুগ দর্পের সাগরে।
অগণন হননের ইতিহাস বেয়ে
অটুট তোদের দম্ভে বজ্রও পড়েনি!
অভিসম্পাত শব্দটি ভুল তাই আজ।
বিদ্রোহী? কাগুজে কাব্য! জানে নজরুল!
কিন্তু তোরা গণ্ডমূর্খ কাঁপা আস্ফালনে।
জানিস না, লিখতে শুরু করেছি আমরাই।
তোদের যান্ত্রিক প্রতাপের ঢের আগে
গেঁথেছি হাতির দাঁতে, ম্যামথের হাড়ে,
গুহায় বসেও নানা নিজের অক্ষর।
হার্মাদ জল্লাদ হয়ে জলস্থল থেকে
আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্র যতই ছুড়িস
জানবি না পাখির হাড়ে ফুঁ দিয়ে কীভাবে
বাজিয়েছি বেণু। নিয়ান্ডারথাল নিধনে
শামিল হইনি আমি। বোমায় হারিয়ে
যাওয়া কারোর ফেরার আশায় চকিতে,
বাতাসে হেলান দিয়ে সুর তুলি ধীরে
দূর অরিগনেসিয়ান নিজস্ব বাঁশিতে।
বসন্তে সাম্যবাদী বৃষ্টি
হাসান কল্লোল
বসন্তের মাটিতে বৃষ্টি পড়ে আর সোঁদা গন্ধ তার
ঘুমন্ত পাখা মেলে ওড়ে!
তৃষ্ণার্ত বাগান বিলাসের লাল চোখে
কোমলতা এসে বসে! পাশেই বাগানের চেয়ারে
ক্লান্ত বিড়াল বড় বিরক্ত হয়ে চলে যায় মাছের সন্ধানে!
কানে আসে শিলাবৃষ্টির ছন্দ
আসে হলুদ ভেজা শাড়ি বিপুল আনন্দে
সিক্ত বেলীর মালায় জড়িয়ে ছপছপ
উঠোনকে জাগিয়ে। একতারা ঘরের কোন থেকে
আড়চোখে তাকায় মৃদু হেসে!
যারা নৈশ ভ্রমণে যাবে তাদের ব্যাগে
ছাতা নেই বলে অগত্যা দাঁড়িয়ে থাকে
অশ্বত্থ গাছের নিচে
সিক্ত পাখি ও ভেজা মানুষ একই পাত্রে
পান করে ফাল্গুনের গেরুয়া-জল!
বসন্তে অকস্মাৎ তুমুল বৃষ্টির
সাম্যবাদী বলে এক বিচিত্র বিশেষণ আছে!
যুদ্ধে আমার মতি নেই মতি নেই
জিললুর রহমান
যুদ্ধে আমার কোনো ধরনের মতি নেই মতি নেই
এই ভাবনার বোমার মতোন গতি নেই গতি নেই
তবু চারিদিকে গর্জে চলেছে মিসাইল ড্রোন
ঘরে রাস্তায় খণ্ডিত দেহ প্রাণ নেই প্রাণ নেই
মাথার পচন চলছে ভীষণ যতি নেই যতি নেই
যুদ্ধ থামাবো আমাদের হিম্মতিই নেই মতি নেই
অস্ত্র বিমানে থেমে থেমে কাঁপে নগর কোণ
মানুষে মানুষ খুনোখুনি করে প্রীতি নেই প্রীতি নেই
যুদ্ধে আমার কোনো ধরনের মতি নেই মতি নেই
মানুষে মানুষ খুনোখুনি করে প্রীতি নেই প্রীতি নেই
এবং ভেতর কে
মুজতবা আহমেদ মুরশেদ
কবিতার গায়ে লেখা জনমত জরিপের একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যতিরেকই তোমার কাছে যাবো।
কেননা, অজ্ঞাতনামার ভেতর কীভাবে একটি ঠিকানা বেড়ে উঠলো, তাই নিয়ে তল্লাটময় উৎকণ্ঠা এখন।
মুচমুচে ঝুড়ি বেচা লোকটি পায়ে ব্যথা সামলে বলেছিলো— এক উড়ুক্কু জীবনে। উদ্দেশ্যহীন যাত্রার সংকেত শুভও হতে পারে।
এতো বিস্ময় ছিলো
সে কথার হৃৎপিণ্ডে— বুঝতেই চকিতে মনে পড়লো। ওর চোখ এবং অধরের বাম কোণে অতি অপ্রাসঙ্গিক এক চিলতে হাসি একদিন ইঙ্গিতে কী যেনো ইতিহাসের পাতা দেখিয়েছিলো।
তাই যদি হয় সত্যের রূঢ়তা, তাহলে তোমরা যূথবদ্ধতায় এমন কী এক ইতিহাসের চিহ্ন এনে দিতে পারো— যেখানে সাপের পায়ের ছাপ পষ্ট নয়?
ওড়াও হাত
শিহাব শাহরিয়ার
ওড়াও হাত
তাকিও না কাগজের পিঠে
ইউটিউবে তোমার ছবি ভেসে উঠতে পারে?
যেহেতু অনেকগুলো সিসি ক্যামেরা
পার করে এসেছ
বদলি সময়ে
কখনো ভেঙো না হাতের চুড়ি
যে ঘুম চোখ থেকে সরে গেছে
তা নিয়ে পোস্টও দিও নি
ওড়িয়ে যাও হাত
রাতগুলো তোমাকে ডাকছে
সন্ধিক্ষণের সময়কে সন্দেহ করো না?
ছুটি
মুশাররাত
ছুটিতে যাবো
ইচ্ছে কত কালের— পুষে আছি কালে কালে
পাহাড়, সমুদ্র,সবুজ আর আকাশের কানে
বলে দিবো সব জমানো কথা
যা আছে বুকের ভেতরে
হোঁচট খায় যা পাঁজরে পাঁজরে
ভদ্রতাবোধের মুখোশের আড়ালে
চোখের পানি কিছুটা গড়ালে
ভুল হবে না তা একটুও
হাসিতে হাসিতে
লুটোপুটি খেয়ে সোঁদামাটিতে গড়িয়ে পড়লে
কাদামাখা শরীর নির্মোহে ছুটে
শঙ্খ নদীতে ঝাঁপালে
কিছুই হবে না— এমন কোথাও
ছুটিতে যাবো সকালে।
নারকীয় যুগ
পুলক হাসান
পর পর দুইটি দাঁত পড়ে গিয়ে জানান দিলো
পতন আমার শুরু হয়ে গেছে।
তারপরও তুমি বলো
পাতা তো ঝরবেই
বৃক্ষ যেন থাকে অবিচল।
কিন্তু আমি দেখছি অন্ধ গায়কদল
বলে গেল
বৃষ্টি পতন থামাবে কে?
সময় প্রবেশ করেছে নারকীয় যুগে!
নায়ক নেই কোথাও
খল আর খল
চারপাশে।
আর এমন রঙ্গ
যেন পাখি হয়ে গেছে পতঙ্গ!
ফলে কীভাবে আশা করো
বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে সুরতরঙ্গ?
পরিধির দিকে ছুটে গিয়ে
কামরুল হাসান
পরিধির দিকে ছুটে গিয়ে মানুষ কেন এত উদ্ধার চায়?
সমুদ্রে ঝাঁপায় আর দাপিয়ে বেড়ায় তার জলযান
তবু কোনো এক তীরের দিকে চোখ রাখে প্রাণ
অসীম পরিধি ছেড়ে পৌঁছাতে চায় প্রান্তরের সীমায়,
কেন অবিচল অভিজ্ঞতাকেই সে করে না সংগ্রহ?
স্থির হতে তার এতখানি লাগে যে সময়,
কী পরিত্রাণ সে পুঁতে রাখে উদ্ধারের বসতবাটিতে?
প্রান্তরে ছুটে গিয়ে মানুষ কেন পরিধির সন্ধান চায়?
সমুদ্র পেরিয়ে দূর বন্দরের ডাঙ্গায় ভিড়াতে চায় তরী
নভোঃমণ্ডলে তার কোন শান্তি নেই, স্বস্তি নেই কোনো
মানুষ বিছাতে চায় তার চরণজাল মখমল প্রান্তরে
যেন কোনো এক আশ্চর্য উদ্ধার রয়ে গেছে বসন্তমর্মরে
জীবন পরিক্রমায় এক উদ্ধারের মঞ্চ পেয়ে যাবে
সে জানে কোথায় জিরোতে হবে, কোথায় জিরোবে।
বান্ধবহীন প্রেমের দিনে বিবাহকে ভেবেছে উদ্ধার
বিবাহিত জীবনে ভেবেছে সন্তানে শুভ্র শান্তি রয়েছে।
আমরা ভীড়ের মাঝে একাকী নিঃসঙ্গ হতে কত যে চেয়েছি
কত মুখ চলে আসে বুকের প্রান্তরে আর হারিয়ে যায় দূরে
বুঝেছি পরিক্রমা চক্রাকারে ছুটে চলে অনন্তর পরিধিতে ...
পথশেষে বৃষ্টিস্নাতা
শাহীন রেজা
যেখানে যাবো যে পথে
মায়াবী জোছনায় ভিজে ভিজে
সে পথে বৃষ্টি এখন
খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি
লতানো চুলের শীর্ষে জলবিন্দু
আমি তোমাকে দেখতে যাবো
জোছনার ভাষা আছে; রাত্রিরও
সে ভাষায় কথা বলে
আমি মেঘকে কাঁদাবো
যেখানে যাবো যে পথে
সে পথে শুধুই জল; বৃষ্টি এখন
পথশেষে নিশ্চিত তুমি
বৃষ্টিস্নাতা।
স্টিললাইফ
মিহির মুসাকী
চকচকে একটা ছুরি
নিখুঁত, তির্যক, ধারালো প্রান্ত নিয়ে
পড়ে আছে।
চেয়েছিল কেউ তাকে তুলে নিক
ব্যবহার করুক;
রমণীর রমণীয় হাতে সে হতে পারতো
একটা সব্জি কাটার যন্ত্র, হয়নি।
একজন চিকিৎসক একবার ছুরিটা
বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করেছিলেন,
ছুরিটা বেশ আনন্দিত,
সে ব্যবহৃত হতে পারতো শল্যচিকিৎসায়, কিন্তু হয়নি।
দীর্ঘদিন পড়ে থেকে অযত্নে-অবহেলায়
ছুরিটা মলিন হতে চলেছে,
তার জীবনটা যখন প্রায় ব্যর্থ
একটা মাস্তান এসে ছুরিটাকে তুলে নিল
ছুরিটা শিহরিত!
এবার কিছু একটা হবেই...
হিংসার্ত শিরোনাম
ওবায়েদ আকাশ
বাগানবাড়ির আদলে যে সপ্তডিঙ্গা মেধার আগুন ফুটিয়েছে
এই প্রথম জলের নালিশ উঠল তারকা ছাপিয়ে—
ভূমধ্যসাগর ডুবি ডুবি করেও উজিয়ে ফিরে এলো
তবু লবণাক্ততায় বাগানবাড়ির বৃক্ষগুলো কোথায় আশ্রয় পেল
জনপদে জল্পনার কিছুই জবাব দিলে না—
পোস্টারে শোভিত সাকল্য স্লোগান, টুপ টুপ করে ঝরছে সুবাস—
কুলবধূ যারা— সংসারে অকাট সুন্দরী— সমুদ্রের উচ্ছ্বাসের মতো
ঝড়ো হয়ে এলো— জানাল, পুরোটা সাগরই এক ফর্সা বানাবার ক্রিম
তবে আর স্থলে-পদ্মে বাগানবাড়ি উঠবে কেন ফুটে?
হাত দিয়ে টেনে আনা বৃষ্টিতে সকল কান্না ধুয়ে ফেলা যায়
দুঃখেরা যৌবনের উচ্ছ¦াস উজিয়ে সতেজ-সুঠাম
মধ্যরাতের সঙ্গমগৃহ দুলে দুলে পুরোটা সমুদ্র কামার্ত-সতর্ক করে তোলে
এত যে লবণ, ক্ষার... প্রণয়ের স্মারক বসাতে গেলে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়—
ভাবেন তো, কান্নার বিশুদ্ধ নাম লবণাক্ততাই, আনগ্ন সাগর, মানে অশ্রু
এই সপ্তডিঙ্গা— এত সাজ— এত অভিসার— কী অর্থ বহন করে?
মানুষ মূলত সামুদ্রিক উপনাম—
ব্যথা বা বেদনা অশ্রু আনন্দ উচ্ছ¦াস সুখ অভিমান
কাতরতা স্পর্শ বিলাস শৃঙ্খলা আবেগ মর্মার্থে ভালবাসা কিংবা বিরহ
সকলই লবণাক্ততায় মুক্ত— সপ্রতিভ জলধি-প্রমাণ
প্রাসাদ কিংবা বিলাসবাড়ির ঢঙে কোনায় কোনায় আভিজাত্য
ঝুলিয়ে দিলেও মূলত সকলে সমুদ্রগামীই
সৈকতপারের হাওয়া কিংবা উন্মাতাল বালুকাবেলায় একাকার সান্ধ্যগীতি
রঙধনুর প্রসঙ্গ ব্যতীত
বাগানবাড়ি কিংবা সপ্তডিঙ্গা— আমস্তক হিংসার্ত শিরোনাম
বসন্ত বাহার
মুজিব ইরম
বেশ দিন ঘুমে ছিলো
জেগেছে সে নিজস্ব নিয়মে
হলুদ হলুদ
নার্সিসাস
নার্গিস কুসুম...
কী যে ঘোর
জাগে ভোর
ড্যাফোডিল আর
বসন্ত বাহার...
আরো আরো ফুটেছে ক্রোকাস
যেনো সে ঘুমিয়েছিলো
শীতঘুম
জেগেছে সকাশে
নীল নীল
বেগুনি হলুদ ছবি
বসন্ত ভৈরবী...
ভিনদেশে বসন্ত এসেছে
আমার ঘুমন্ত মন হলুদ হলুদ নীল সুরেতে মজেছে।
নির্মিত মুহূর্ত
ভাগ্যধন বড়ুয়া
এক।
পুরুষালি আলিঙ্গন জানে রোদ, লেপ্টে থাকে
অপর ব্যাসার্ধ টেনে পূর্ণ করে বৃত্ত, ঘোরগ্রস্ত প্রাণ।
বান তোলা প্রিয়টান, সমর্পিত ক্ষণ, যাপিত আনন্দ
প্রাণবন্তশ্বাস সুন্দর আশপাশ তুমি আমি সত্য শুধু...
দুই।
অহেতুক কথামালায় পূর্ণ থাকে শূন্য ঘর!
অন্যথায় কবরের ছায়াকপি
একা, বোবা, বিনির্মিত অন্ধকারে হাঁটাচলা
মুখোশের ভেতর মুখ, আকরিক নেই
খননেই দিন যায়, ঠিক লগ্ন আসে না জীবনে!
তিন।
দৃশ্যান্তরেই হাজির বিভাজিত ক্ষণ
ছোট ছোট ঢেউ, তরঙ্গিত একান্ত সমুদ্র
স্বল্প আলো নিয়ে গল্পগুলো বলে যায় কে?
আমি তো ছিলাম, মনে পড়ে কেন এত কথা?
রক্ত ও লবণ সমুদ্র পার হয়ে
শোয়াইব জিবরান
রক্ত ও লবণের সমুদ্র সাঁতরাতে সাঁতরাতে
এ কোন উপত্যকায় এসে পৌঁছালে
বিরান মাঠের ধারে
দাঁড়াতে দাঁড়াতে ক্ষুধার্ত
এখন সন্ধ্যা নেমেছে।
আর জঙ্গল হতে নেমে এসেছে
হায়নারা
মা গেছে মরে
আর তুমি ক্ষুধার্ত, ভীত
এতিম এ উপত্যকায়
উদ্ধারহীন। কাঁদছো।
দিন যায় দ্রুত, রাত্রি দীর্ঘতর
হায়েনা শকুন এ উপত্যকায়
তোমার মুক্তি নেই কোনো।
কী সুন্দর বন্দী
রকিবুল হাসান
অপেক্ষায় নির্ঘুম তেইশে নবেম্বর—কী ভীষণ উজ্জ্বলতা
উড়বো আমরা—ডানায় ডানায় ছায়া মেলে,
বুঝিনি তোমার পিপাসার পরানসুখ অন্যনগরে
দেউলে আমার কর্পূরের ঘ্রাণ-পড়ে আছে নিথর তেইশ।
কী ভীষণ আনন্দে উড়েছ বর্ণিল রশ্মির তৃষ্ণাচোখে
প্রাচীন আসক্তি বুকের বিবরে দেবতা তোমার
বুনো হাওয়ায় উড়েছ আঁচল ছড়িয়ে তৃষ্ণার শাড়ি
তীব্র প্রেমে দিয়েছ নিত্যপূজা গোপন তুলসি তলায়!
চোখের নদীতে এতো চোরাবালি! এ কেমন নদীতিকা!
একই বুকেতে বসবাস তবু যোজন যোজন দূর!
জীবনের কর্নারে যে পড়ে আছে বিবর্ণ তেইশে নবেম্বর
তুমি কী তবে সুন্দরবন্দী মনের পালঙ্কে অন্য অনুরাগে!
ঈদের বাজার
ইকবাল হোসেন বুলবুল
বাজারে আগুন?
আগুন কোথায় নেই?
চন্দ্রে আগুন, সূর্যে আগুন
চুলায় আগুন, ধুলোয় আগুন
স্বর্ণে আগুন, রূপায় আগুন
জলে আগুন, স্থলে আগুন;
আগুনের ভিতরে দেখো জ্বলছে আগুন
প্রেম আর ভালোবাসা
সমাজ সংসার আত্মীয়স্বজন
কোথায় নেই সে?
জীবনের তিন কালে?
চেয়ে দেখো, জ্বলছে সে সমান তালে
রাজার মুখে জ্বলছে আগুন
জ্বলছে যে তা গদির ভিতর;
জণগণের কী সে খবর?
রেহাই কারো নেই যে শোনো
সবাই আছে জ্বলার ভিতর
জ্বলছো যে জন— জেনে রেখো;
আগুন জানে আজব কৌশল
জ্বালায় কেবল; মারে না গো...
চুম্বন
মিলটন রহমান
আমার উৎসব মঞ্চে ঈদের চাঁদের মতো বাঁকা ঠোঁটে
এঁকে দিয়ে যাও প্রেমের উষ্ণ আলিঙ্গন
তোমার অপেক্ষায় সেই যে বাড়ির সম্মুখে রুয়ে ছিলাম
কচি লিকলিকে এক কাঁঠালীচাঁপার গাছ
তার পাতায় পাতায় প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প ধরে
কোন গল্প গেছে শুকিয়ে, আর কোন গল্প প্রচণ্ড জেদে
ডাল বেয়ে এখনো ঝুলে আছে একটা চুম্বনের অপেক্ষায়!
এক একটি দিনের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে সেই গাছের
গজিয়েছে শিকড়-বাকড়, রচিয়াছে অপেক্ষার ইতিহাস
কত উৎসব পার্বণ পেরিয়ে গেলো, অতিক্রান্ত স্রোতের মতো
নতুন দিনের গায়ে লেগে থাকা তোমার গন্ধ শুঁকে শুঁকে
কাঠালীচাঁপার গাছ অনঙ্গ সৌরভে মেলেছে নতুন পাতা
প্রচণ্ড ঝড়-ঝাপটায় নুয়ে পড়তে পড়তে যায়নি ভেঙে
তোমার সেই ঈদের চাঁদের মতো বাঁকা ঠোঁটের চুম্বন
আর দিঘলীয়া নদীতে অবগাহন ছাড়া উৎসব পূর্ণ হয় না
তুমি ঈদের চাঁদের মতো বাঁকা ঠোঁটে
এঁকে দিয়ে যাও প্রেমের উষ্ণ আলিঙ্গন
তোমার অপেক্ষায় পাতায় পাতায় জমেছে যেসব গল্প
তার ছত্রে ছত্রে দেখবে প্রেম ঘুমিয়ে আছে
চাঁদের রেখার মতো তোমার চুম্বনের অপেক্ষায়।
বাড়ি ফেরা শূন্য হাতে
মুমির সরকার
শেষ বিকেলের কনে-দেখা
আলোর মৈথুন অন্তে—
কোনো এক পরিত্যক্ত রাতে
বাড়ি ফেরা, শূন্য হাতে!
নিত্য-যাপন পথক্রমায় নেমে
খচখচ বুকে গুমোট দেখা—
চারিদিকে সংগঠিত মিছিল;
অগনতি মানুষের উদ্যত হাত
উঠছে আর নামছে
মুহুর্মুহু স্লোগানে-স্লোগানে;
বুকের গভীর থেকে বলছে
বাঁচার মতো চাই বাঁচতে!
মিছিলের দুর্বোধ্য সম্মোহনে
সরীসৃপ-দেহে উপগত যেন
এইর আমিও এগিয়ে থাকি
মিছিলের আগেভাগে!
পল্টন ঘুরতেই ডিআইটি
ফিদিন নষ্ট মস্তঘড়ি,
সঠিক সময় মাপে দুইবার!
সবুজ-পার্ক হয়ে টিএসসি
শহীদের মিনার, ধূলিমাখা
অলিগলি বিস্তীর্ণ—
এ নগর জনপদে।
শাহবাগ মোড়ে আসতেই
মিছিল-স্লোগান-মন্ত্র ভুলে
বাহারী যমজ-বন্ধনী-বুকে
বারোমাসী পরাগরেণু,
চকিত দেখা সুবাসহীন—
ফুলের হাট! দু’চোখে।
ঘরকন্নার মোটা চাউল
ম্যাড়ম্যাড়ে সব্জি কিংবা
গোলাপী মোড়কে বিস্কুট
এমনকি, কুঁড়িয়ে পাওয়া
ভাংগাচোরা কোনো খেলনা
আজ জুটবে না জানি।
গন্ধবাস ফেরার অধিকার
ফুলের— সময়ের দাবি!
বিচ্যুত মিছিল হয়ে
এই প্রথম পরিত্যক্ত সে রাতে
বাড়ি ফেরা, শূন্য হাতে!
প্রদোষে সরীসৃপ নদী
রাহমান ওয়াহিদ
পথ হাঁটে না। পথের গন্তব্যেও পথ নেই কোনো,
সে পথেরই আলগা ধুলোয় বেতাল পা রেখে হাঁটি
একাকী,বিদগ্ধ পূর্বপুরুষেরা যদিও বরাবর
বলতেন, এ কোনো পথ নয়,দীর্ঘ পথযাত্রা কেবল।
তোমরা যে হাঁটতে শিখেছো শত পদচিহ্ন ফেলে
যে পথে কদমও ফোটে রোজ, শিশু শিউলিরা
অবিশ্বাস্য বেঁচে থাকে রাতের তীব্র প্রহারেও—
প্রদোষে সেই পথই শুয়ে থাকে সরীসৃপ নদী হয়ে।
আমি ভুলভাল যত্রতত্র হাঁটি দিকহারা ছায়াপথ ধরে,
পতন্নোমুখ নক্ষত্র কিংবা বরফ সন্ধ্যা ছুঁয়ে ছুঁয়ে।
হিসেবের খেরোখাতায় রেখো না আমাকে না হয়,
যেমন কখনও রাখেনি খাঁ পাড়ার অরুণিমা অক্ষয়।
জলের অর্কেস্ট্রা
পুলিন রায়
জলের অর্কেস্ট্রা নিঃসঙ্গ জীবনতারা
জ্বলে মিটিমিটি
আমি চেয়ে দেখি দূরের বল্কলে
ঝুলে আছে স্বপ্নরঙ্গিন ঝালর
দু’চোখে কেবলি সীমানা ছাড়িয়ে
যাবার অভীস্পা
দূরের সমুদ্রে একদিন ছিলে নিজ কল্লোলে
ঘোমটা সরিয়ে আশার আলোতে
উজ্জ্বল হয় দিগন্ত
আসে ঝড় এবং শঙ্কাহীন দ্যুতি
বিষণ্ন বিকেল হাত কচলায়
অতি দূর কোন্ প্রান্তরে যাবার
তোমার রয়েছে তাড়না
জলস্রোত জানে না
কেনো-ই-বা বয়ে চলা নিরন্তর
সাগরের পাড়ে দাঁড়ানো জীবন
একা, বড় একা উদ্বেগী
নির্জনে গহীন গোপন ইশারা করে সমুদ্র
ও লো সাথী ধরো হাত
জলে জলে পাড়ি দেবো
বিপুল বিস্তারি জলের অর্কেস্ট্রায়।
ইন্সপেকশন
নাজমুস সামস
ইন্সপেকশনেই বোঝা যায় বাঁচা মরার কথা
কখনো মার্চেনডাইজার কখনো কিউসি
কখনোবা অন্য কেউ আমাদের তৈরি পোশাক
ইন্সপেকশন করে। যেদিন চূড়ান্তভাবে এ্যাপ্রুভ
হয় আমরা মরার কোকিলে গান গেয়ে নাচা গানা করি
কার্টুনের ইন্সপেকশন সব কিছুই মসৃণ করে
থাকে না কোনো মাপজোখ
পিপাসাসংহিতা
আফরোজা সোমা
নয়নে লেগেছে যার, প্রণয়-আবীর
অবশিত হৃদি তার, পরাণ অধীর।
এই পথে যেতে যেতে, পথ হয় বৃত্ত
ভেদ খুঁজে পাবে না তো, আদি আর অন্ত।
তবু যদি ঘুঘু ডাকে, ঝরে বটফল
মনপোকা করে যদি, খুব কোলাহল;
পাতায় পাতায় যদি, সুর বেজে ওঠে
এর নাম মায়া দিও, এর নাম পৃথ্বী।
ধরণী দ্বিধায় ভরা, প্রেম তবু উষ্ণ,
জাহেলি দুনিয়া ভরা, কত হৃদি-পুষ্প।
আঁখি ভরা কথা যদি, প্রাণ ভরা প্রেম,
বিনিময়ে মায়া আছে, ব্যথাও সামান্য।
তারে ভালো লাগে যদি, পিপাসা জমিও,
যার লাগি কাঁদে মন, তারে ভুলে যেও।
সর্পসঙ্গম
আসিফ নূর
প্রিয় আস্করকাটা গ্রামের বৃক্ষময় আদি বৌদ্ধ মন্দিরের
লালচে টিলার সেই পশ্চিম ঢালুতে দোকানপাড়া পুকুর,
হাফ-প্যান্ট পরা বালকবেলার ঘুঘুডাকা দুপুরের ঘোরে
ঘুরতে ঘুরতে দাঁড়িয়েছিলাম মাছেদের জলকেলি দেখে;
বর্ণিল মাছরাঙার গেরিলা ছোঁ ভাঙছিল বকের তপস্যা।
হঠাৎ পুকুরের উত্তরপাড় থেকে নারীচুলের বেণির
মতো আঁটাআঁটি পাক-খাওয়া সঙ্গমচঞ্চল একজোড়া সাপ
অস্থির গতিতে উঠে গেল রোদজ্বলা কাঁটাঝোপের মাথায়,
তেজি শব্দে কিছুক্ষণ দুমড়েমুচড়ে সুনসান নীরব সব।
একদৌড়ে বাড়ি গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দাদিকে শোনালাম ঘটনা।
পিতলের জমিদারি হুক্কার ধোঁয়া উড়িয়ে আফসোস করে
তিনি বললেন: যদি সাপ দুটির ওপর রুমাল বিছিয়ে
সেটি আবার নিতে পারতি, তাহলে সাতরাজার ধন পেতি।
সে-রাতে দাদির খানদানি শিথানের নিচ থেকে চুরি করি
ফুলতোলা সুগন্ধি রুমাল, তারপর সেটিকে পকেটে নিয়ে
এদিক-সেদিক কতদিন কতভাবে খুঁজেছি; সাপ দেখেছি
বহুবার—কিন্তু সাপের সঙ্গম আবার দেখিনি এ-জীবনে।
নিখোঁজ
আসাদ আহমেদ
কোথাও নেই
হারিয়েছে নদীস্রোতে সমুদ্রে অতলে হয়তোবা
খোঁজ নেই আর
অনেক খুঁজেছি আমি
পাতালে আকাশে নীলচোখ অন্ধ মুহূর্তে
নেই কিছু নাই আর
আমাকে মাতাল ভাবো
ভাবতে পারো অবশেষে যা কিছু তাই
দেখো ছাই-ধুলো উড়ছে পাখি স্বভাবে
আমাকে খুঁজি নাই
অবশিষ্ট যা থাকে— তার তলও কি পাওয়া যায়?
পাখি উড়ছে
উড়ছে যা যা উড়াবার নয়
উড়ে ওঠার প্রাক্কালে মনে পড়ে সমতল-বনভূমি
মায়াজোছনার মতো মায়াময় কিছু... অবশেষ
আফিম বুকের নিঃসীম চৌহদ্দিতে
সোহেল মাহমুদ
ফেরারী বসন্ত যদি ফিরে আসে আবার,
আবার যদি নীল অপরাজিতায়
সুশোভিত হয় নির্বাসিত হৃদয়ের উঠোন,
তবে এই আমি—
নক্ষত্রখচিত প্রাসাদ ছুঁড়ে ফেলে,
অমরাবতীর দুর্ভেদ্য প্রাচীর ডিঙিয়ে আসবোই ছুটে,
তোমার কাঁকন বেষ্টিত অনিন্দ্য কারাগারে!
এখনো হৃদয়ের তল্লাটে বাজে
কোন এক অশরীরী পায়ের সম্মোহনী নূপুরের শব্দ!
আমার সেই সব দিন,
স্বপ্নের ক্যানভাসে আঁকা পুরোনো বিকেল,
আকাশের নীলের মতন টিপ
যদি ফিরে পাই,
আবার যদি বসন্ত বিহগী ডেকে উঠে,
মাতাল কণ্ঠে ঢেলে দেয় গালিবের শরাব,
তবে এই আমি,
হাজার বছরের নিদ্রা ভেঙে উঠবোই জেগে!
আবার যদি ফিরে পাই,
দুর্বোধ্য সেই কালো তিল,
রক্ত জবার মতো রাঙা সেই চঞ্চু যুগল,
যদি ফিরে পাই!
যদি ফিরে পাই, পুরনো আলিঙ্গনের বৃষ্টিস্নাত ভোর,
তবে এই আমি, আসবোই ফিরে,
হিমালয়ের সফেদ করোটি ডিঙিয়ে
আফিম বুকের নিঃসীম চৌহদ্দিতে আবার!
জেরক্স
আদিত্য নজরুল
সেই মাতাল লোকটির কথা ভীষণ মনে পড়ছে—
ঐ মাতাল লোকটি
যে কিনা
দুঃখ পেলেও সরাইখানায় যেতো
এবং আনন্দ পেলেও!
ঐ মাতাল লোকটির কথা মনে পড়ছে
যে কিনা
দুঃখেও কান্না করতো
এবং সুখের উল্লাসেও কান্না করতো—
আমি কি তার জেরক্স!
দুঃখ এবং সুখে
আমার কোনো জল ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে!
লখিন্দরের বাসরে
শেলী সেনগুপ্তা
লখিন্দরের সুরক্ষিত বাসরেও
ছিল গোপন ছিদ্রপথ
জানতো কালীনাগ
মহাবিশ্বের নীরবতার মাঝেও
কেউ কেউ বক্তা,
কিছু কিছু কথা ছড়িয়ে যায়
হঠাৎ খুলে পড়া উলের গোলা
অথবা
দ্রাঘিমা রেখাসম
না বললেও
কিছু কথা প্রবহমান রক্তনালীর
গতিপথে
সুখ অথবা দুঃখও
পথ খুঁজে নেয়
লখিন্দরের বাসরে ঢোকা
কালীনাগের মতো
প্রেম?
তাও বা কম কীসে!
সুরক্ষিত মনের গোপন কোণে
ঠাঁই করে নেয়
নিশ্বাসে ধারণ করা সুবাস হয়ে...
দৃশ্যত
শারদুল সজল
সব সাহস চিৎকার করে না
কিছু সাহস
গোপনে গিলে ফেলে নিজের নামটাও...
আগ্নেয়গিরি যেমন লুক্কায়িত থাকে মাটির গভীরে
কিম্বা ভূমিকম্প হঠাৎ নড়েচড়ে
যেমন জানান দেয় ঘুমন্ত পৃথিবীকে,
তেমনি— দু একটি মুখ পাথরের ছায়া ভেঙে
অন্ধকারে জেগে ওঠে
জ্ঞানী মানুষ কেবল অনুসরণ করে না সূর্য
বরং আত্মস্থ করে অন্ধকার
অন্ধকারে যে হাঁটেনি... সে জানে না
দৃশ্যত চোখের বাইরেই মূলত পৃথিবী
পাখির কুমন্ত্রণা
সোহেল মাজহার
আমি কি পালিয়ে যাবো গ্রহ থেকে?
চারদিকে বিষ বাতাস, আগুন হুল
রাষ্ট্রচরের কুটিল প্ররোচনা
রাজপথের নিচে প্রবহমান মৃত্যুপরিখা
চোরাবালি ফাঁদ, কোন পথে যাবো?
জেগে ওঠে একা এক সূর্যতেজ
মৃদু চাঁদ, মৃদু পূর্ণিমার কথা না বলা ভালো
রক্তের ভিতর লুকানো সূর্য কণিকা
সত্যদ্রষ্টা পথ হয়ে যাও।
ফিরিয়ে দিও রাজার অনুগ্রহ
কলাপাতায় পেতে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ক্ষির।
এই সকল কথা আমি কোথাও বলিনি
কুটিল পাখি তবু কুকথা ছড়ায়, সূর্যালোকে কুমন্ত্রণা...
মায়া পৃথিবীর গান
আহমদ জামাল জাফরী
ম্যাজিক সময় পথের ঠিকানা জানে অন্ধ ডাকঘর
চতুরঙ্গ পথ অবিরল আলো ও আঁধারে নিরুদ্দেশ যায়,
ভেঙে গেলে মুখর সংক্রান্তি উৎসব; পড়ে থাকে ছাই-ভস্ম
চলিষ্ণু মেঘের জড়োয়া ঢেকে দেয় নক্ষত্র দল
আকাশের ব্যালকনিতে ঝুলে থাকে মেঘের বারুদ
বিদ্যুৎ রেখার মতো শব্দ স্ফুলিঙ্গ নেমে আসে আগুন পথের
লিখে রাখি পথে পথে ছুঁয়ে থাকা প্রবাহ জীবনের
ভ্রমণের ছবি হয়ে যায় রঙ ওঠা পোর্ট্রেট,
কণ্টক-আঘাতে ফুলের অর্থও বদলে যায়
স্বপ্নের-বিস্তার ধারালো আলিঙ্গনে লেগে থাকে কাচের গুঁড়ো।
বন্ধ দরজায় টোকা দেয় অনিবার্য যবনিকা
মরচে ধরা লোহার খিলান কেঁপে কেঁপে ওঠে,
দুঃখ-পরমতা, সুখ-শিহরন, স্মৃতি-বিস্মৃতি ধুলায় লুটায়
তবু মানুষের পথে শিলালিপি হয়ে থাকে মায়া পৃথিবীর গান।
না-রোদ ওঠা শহরে
অদ্বৈত মারুত
না, ওসব বাহানামাত্র
দ্রব্যাদির আগুন হওয়ার কালে
সকালকেই অন্ধ করে যায় মেঘ
আলোকে বিদায় জানায় ক্রোধ
আর তাতে আমরা আমাদের নিয়ে
ঘরেতেই থাকি।
ঘরহীন ঘরে অনাদরে পালিত হয়
নিকট অতীতের ঘাস
না, ওসব ঘাস নয়, বিষধর সাপ;
আলোয় ঠুলি পরিয়ে করে মেঘের আলাপ
মশাল হয়ে জ্বলবে না-ফেরা নাবিকেরা।
খরিদের প্রয়োজনে খাতির
আমিরুল হাছান
ব্যথার পাহাড়ে আমি বন্ধুত্বের খরিদের সংলাপ করেছিলাম
প্রেমের বিজ্ঞপ্তি তোমার জন্যে প্রশ্নথেকে প্রশংসা হয়েছে
ভাগ্য আমার বিয়োগ হয়েছে প্রেমের কীর্তন করে
সংলাপে বহুমাত্রিক ঘরের আশীর্বাদ ছিল
সক্ষমে অক্ষম ছিলাম। ব্যর্থতার কোনো দায়িত্বনেই
অনুসন্ধান করে অনুশোচনা হয়নি মনের সংবিধানে
শৈল্পিক হাসিতে অকল্পনীয় এবং অকল্যাণ বিশ্বাসটাই দীর্ঘশ্বাস।
এই চিত্রনাট্য এই ভূমিকা বহুমাত্রার সংলাপে প্রেম সংরক্ষণ হয়
সময় করে মিথ্যা জরিপের মনে জরিমানা কষ্টের।
কারণের ব্যথায় অকারণে প্রেমকালের কথা
খরিদের প্রয়োজনে খাতির হবে তৃতীয় পক্ষের সীমান্তে।
মানবো না কোনো বাৎসায়নের নির্দেশ
সুমন শামস
ভাবছি দুঃখকে আর ছাড় দেবো না। কাছে আসার মাশুল নেবো কড়ায় গণ্ডায়। প্রবেশাধিকার সহজ হলে পিঁপড়েও কাটে হাতির পা। দুঃখকে আর সময় দিতে পারবো না। এখন দ্রোহের কাল। দুঃখগ্রন্থিকে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবো। খুলে দেবো দ্রোহগ্রন্থির সব ফারাক্কা। সমঝোতা চুক্তিতে আমি চাইবো, সুখের খণ্ডিত মাথা। সুললিত গ্রীবাসহ। ছোবলে ছোবলে ঢেলে দেবো ওর গলার ভেতরে শান্তিচুক্তির বিষ।
আমি মানবো না এক্ষেত্রে জাতিসংঘের খবরদারি। সুখের ঠোঁট দুঃখের চুম্বনে নীল করে দেবো।
দুঃখদহ প্রেম রেখে দেবো সুখের বিপুল স্তনে। সঙ্গমে সঙ্গমে বিনির্মাণ করবো নিষিদ্ধ দুঃখ।
এক্ষেত্রে আমি মানবো না কোনো বাৎসায়নের নির্দেশ।
কংক্রিট বোধ
রফিকুল ইসলাম আধার
যন্ত্রচালিত এই ব্যস্ত নগরে
চেনা-অচেনার ঘর্মাক্ত ভিড়ে,
ওষ্ঠাগত প্রাণ কংক্রিট বোধে
ছুটি দিশেহারা নদীটির তীরে।
যাপনে মেলে না স্বস্তির দেখা
পালাবো কোথায় সংগোপনে?
বোহেমিয়ান শ্বাসরুদ্ধ আজিকে
অক্টোপাস বাঁধে আষ্টেপৃষ্ঠে অণুক্ষণে।
সব
ডালিয়া চৌধুরী
সব পাখি উড়ে যায় সুদূরে
গোধূলিতে মিলায় সব ছায়া
দাঁড়িয়ে আছে তবু ক্লান্তিহীন
বুকের ভেতর অনিশ্চয়তা বুনে।
নদীটির মতো পারাপার দেখে
নিজে পার হতে না পেরে
মহাকালের বিষণ্ন অধ্যায়ে
অস্থিরতার অতিরঞ্জন,
অনেক জলের নিবেদনে
আঘাত করে যায় মাটির পাঁজরে।
সব শূন্যতা গাঢ়নীলের জমাটে
আকাশ হয়ে চোখে পুষে থাকে,
ঘর্ষিত জলের যাযাবর মেঘ
বসতি গড়ে দীর্ঘস্থায়ী নোঙরে।
ধুলো জমা ধূসর করিডোরে
লগ্ন টানে আঙুলে আগামী গুনে,
পরিত্যক্তপেন্সিলের ভুল গ্রাফিকে।
সব রাত শেষে কুয়াশা ঘেঁষে
পাণ্ডুলিপির অস্পষ্ট অক্ষরে
এসেছিলো যে আলো,তাও
আকড়ে ছিলো বিস্তৃত ব্যর্থতারে।
যদি জেনে যাই
মনিজা রহমান
দরজাটা খোলাই ছিল। ইচ্ছা করলেই আমি
ভেতরে যেতে পারতাম। কিন্তু যাইনি।
এক আলোকবর্ষ দাঁড়িয়ে আছি দরজার বাইরে
কেউ আমাকে ভেতরে যেতে বারণ করেনি।
কেউ প্রশ্ন করেনি কেন দাঁড়িয়ে আছি
দরজা তো খোলাই ছিল।
ভেতরে যাইনি
কারণ ভেতরে গেলে সব বিস্ময় চলে যাবে।
ভেতরে কি চার হাজার বছরের প্রাচীন মমি?
মহেঞ্জোদারোর বিধ্বস্ত নগরীর শেষ চিহ্ন?
কাঠের ঘোড়ার পেটে উর্বশী হেলেন?
আমি জানতে চাইনা মন খারাপের প্রযুক্তি।
তবে সে কারণে নয়—
ভেতরে গেলেই যদি জেনে যাই, মানুষ কেন কাঁদে
মানুষ আসলে কতটা মানুষ
যদি জেনে যাই, অন্ধকারের ব্যাকরণ
এবং দ্বৈত-চেহারার স্বরূপ।
চাষমনস্ক বিষণ্নতা
বেনজির শিকদার
কথারা এখন ব্যথার দোসর, চুপচাপ কাটে দিন
ধূসর ছবির পেছনে জমেছে, বিগত স্মৃতির ঋণ!
স্মৃতির দরজা হাট করে খোলা, বাতাসের চলাচলে
কিছুই এখন লিখি না তেমন, ঝরাপাতাদের দলে!
গাছেরা এখন দূরগ্রহে থাকে, ছায়ার আদরে থাকি
মনের আধিতে গান গেয়ে যায়, অন্য আরেক পাখি।
অন্ধকারের নাম জানা নেই, আলোর তালাশে মরে
মানুষ যেমন ঝরছে একাকী— কষ্ট-কঠিন জ্বরে!
জ্বরের বিষাদে ভুলভাল বকি, চেনা নাম যাই ভুলে
বৃক্ষ দেখি না, অক্ষ চিনি না, ঘ্রাণ দিয়ে যায় ফুলে।
বিবাদের খাতা ধুলো জমা আজ, আবাদের যোগফলে
চাষমনস্ক বিষণ্নতার ফসল ফলেছে জলে!
জলের আঘাতে ঝরে ঝরে পড়ি, নিভিয়ে দিয়েছি আলো
কথাহীন যত কবিতা আমার, তোমরাও থেকো ভালো।
শীতলক্ষ্যা নদীর কাছে আমাদের শৈশব
বাবলু মওলা
তখনো নক্ষত্রগুলো চেয়ে আছে তোমার দিকে
তখনো আলো আঁধারির সবুজ পাতা চুইয়ে নামে
জোছনার নরম পালক
কতগুলো বুনোফুল নৈঃশব্দ্যে জোনাকির মতোন
সেবিছে বাতাস মায়াবী তৃষ্ণা, তৃষ্ণা তৃষ্ণা...
আহা! কতোদিন ভোর দেখা হয়নি আর!
কদম ফুলের মতো থোকা থোকা মেঘ
তোমার জানালায় তখনো জ্যোৎস্না প্রভা
কতগুলো প্রজাপতি ভাটফুলের মতো
অলক্ষ্যে ঘুমিয়ে আছে তোমার নিষ্পাদ্য ওষ্ট
ভেজা বাতাস ভিজে আছে বহুদিন, বহুদিন
আহা! কতোদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি আর!
শীতলক্ষ্যা নদীর কাছে আমাদের শৈশব
আমরা ধরলার বিধৌত চরের মতোন
আশ্বিনের জোছনায় নিকানো উঠোন
ধান ক্ষেতের আল ধরে চিকন বাঁকাপথ
উত্তরের বাতাসে তুমি উড়ছো ঘুড়ির লেজের মতো!
আহা! কতোদিন স্বপ্ন দেখা হয়নি আর!
তোমার ভেঁজা চুল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায়
গড়িয়ে নামছে অলৌকিক বাসনা
তখন সবেমাত্র নক্ষত্র ছুঁয়েছে রাত
তুমি হাসছো, ভাসছো-দুলছো
তোমার পায়ের কাছে অখণ্ড অবসর
অথচ, অতিদূর নরম অন্ধকার বেয়ে ক্রমশ
আমাদের বিরহের গান ভেসে আসে।
দুঃশাসন
সাজ্জাদুর রহমান
শেষমেশ ক্ষত ও পচনের কাছে
পাঠ শেখে আগুনের কোলাহল
পুড়তে পুড়তে ভস্ম হয় উত্তরাধিকার
পীঠের নীচে বালির উষ্ণ গঙ্গা
জীবন রেস্তোরাঁয় রান্না হতে থাকে
ক্ষতের চচ্চড়ি
পচনের উষ্ণ গঙ্গা সহজে সিদ্ধ করে
শরীর পোড়া মাংসের ঘ্রাণ
ক্ষতের চচ্চড়ি আর পোড়া মাংস
আয়েশ করে খায় দুঃশাসন।
পুনরাবৃত্তি
মাহমুদুজ্জামান জামী
মনকে বলেছি কাল রাতে
কয়েকটি কথা,
কয়েকটি ছবি আর
বিদ্রূপ ব্যথা--
অথচ এমন না যে
এসব নতুন
অথবা অপ্রকাশিত
আহত ফাগুন!
তবু মন বার বার
অহেতু নিষ্ঠায়
নিজেই ঢুকে পড়ে
মধুর ছলনায়!
আমিও আমার মতো
মোহিত ঝঞ্ঝায়
পাক খেয়ে পড়ছি আবারো
নতুন ঝামেলায়!
ফুলের ইশারা নামায়
নতুন রাস্তায়
মন ভোলানো কতগুলো
পুরনো ধান্দায়!
তবুও কেন যে, মন তুমি
কিসের আশায়
করতে থাকো আবারো
সেই আগের ভুলটাই!
বিনির্মাণের স্বপ্ন
মুজাহীদুল ইসলাম নাজিম
আমি কণ্ঠস্থ করি ‘ছেঁড়া জীবন’ উপন্যাস
আনন্দে মুখর ব্যাকুল নায়কের স্বপ্নচোখ
কী যেনো কী ভেবে ভোরের বালিকা টুপ করে গিলে নেয় বকুলসকাল
উৎফুল্ল শালিক ওড়ে বসন্ত দুপুরে
কি যেনো কী ভেবে সময়ের বুক খামচে আনন্দে মাতে দুরন্ত বালক
আনন্দ বিকেল ঘুমিয়ে পড়ে রাতের বুকে
স্বপ্নের অধিকারে চলে যায় রাত
কিছুই থাকে না আমাদের,
শুধু থাকে বিনির্মাণের স্বপ্ন— আগামী সকাল।
অবাঞ্ছিত পলি
শাখাওয়াত তানভীর
চোখে-মুখে খেলে যায় উচ্ছ্বাস
পাথুরে পথের শেষে বিস্তৃত সবুজ ঘাস;
হেঁটে গেলে, তবু শুনলে না— মরা নদীর দীর্ঘশ্বাস
ঘাসের নিচে নদীর গলায় অবাঞ্ছিত পলির মরণ ফাঁস!
রক্তপলাশ চোখ
সঞ্জয় দেওয়ান
কোনো বোধ নেই
অবচেতনে পড়ে থাকে অনিদ্রার পালঙ্কে
রোদের ছায়ায় গম্ভীর হয়ে যায়
করোটিতে দোল খায় শারদীয় মেঘ,অর্থহীন প্রলাপ।
ছাতিমতলার মঞ্চে পড়ে থাকে শবযাত্রী
গোপন দেয়ালের কান শুনে স্বগতোক্তি
সংলাপ শেষে মুছে ফেলে চন্দ্রকলার সজ্জা।
মেঘের গোপন আঁতাত ফাঁস হয় পৌষের আকাশে
দ্রোহের প্রতিলিপি জমা থাকে
অন্ধকার ঐতিহ্যে
মরা গাঙে ভেসে চলে একজোড়া রক্তপলাশ চোখ!
নীল জলের কৌটা
হাশিম কিয়াম
জন্মের আগেই মানুষের বুকের গহিনে কোটি কোটি
আলোকবর্ষের নিঃসঙ্গতার ফুলবাগান জেগে থাকে
কেউ কেউ গন্ধে অন্ধ হয়ে ভুলে যায়
বাগানের স্থায়ী ঠিকানা, রঙের কারুকাজ, কুঁড়ি আর
প্রস্ফুটিত ফুলের মধ্যকার মহাজাগতিক পার্থক্য,
আর তখনই বাগানের দীর্ঘশ্বাস থেকে জন্ম
নেয় রংবেরঙের বিষধর সাপ... প্রথম দংশনের
শিকার হয়ে কঁকিয়ে ওঠে তাদের অনুচ্চারিত শব্দের বরফ...
বাগান রূপান্তরিত হয় জঙ্গলে, আর তারা হারিয়ে গিয়ে
সারাটা জনম নিজেদের খুঁজে বেড়ায়, প্রার্থনা করে,
মানত করে, পূজা দেয়, কিন্তু জানে না কীভাবে
ফুলের রঙে অজস্র গ্রহ সাজাতে হয়, পাপড়ির বাঁশিতে
তুলতে হয় চিকন সুর...
কেউ কেউ প্রস্ফুটিত বাগানে মহাবিশ্বের সব সবুজ
গ্রহ ছোঁ মেরে এনে, গন্ধের সুমুদ্দুর এঁকে, ভেসে বেড়ায়
পাপড়ির নৌকায়, তাদের নীরবতার গদ্য
বন্দি থাকে নীল জলের কৌটায়...
মীরা’র চোখে আমার সর্বস্ব খুঁজি
শাহাদত হোসেন সুজন
একযুগেরও বেশি সময়ের বন্ধুত্ব আমাদের
অজানা কারণে অথবা তার মনের বারণে
আজ দু’জনাতে লম্বালম্বি দাগ এঁকে যায়
আঁধার ঘনিয়ে আসা ডুবুডুবু সন্ধ্যায়
হঠাৎ করে মনের ভেতর জ্বলে ওঠা প্রদীপ
কেরোসিনের অভাবে ধপ করে বন্ধ হয়...
মীরা এখন কাশফুলের ডগায় স্বপ্ন আঁকে
গোধূলির নীলিমায় রঙ তুলির আঁচড় কাটে
অহর্নিশ তার রঙিন ভুবনে বাস।
বুকের গহীনে মোচড় দিয়ে ওঠে
নাটই সুতোয় কাটাকাটি চলে রোজ
ঝরা ফুলের মতো তাতে কার কি এসে যায়?
মীরা’র চোখে যখন আমার সর্বস্ব খুঁজি
সে তখন অন্য দরজায় কড়া নাড়ে...
অবাচ্য শব্দের অভিধান
খৈয়াম কাদের
হাঁটতে নেমে দেখছি
পায়ের সীমানা থেকে সরে যাচ্ছে পথ
উড়ে যাচ্ছে ঘর, বাতাসে আটকে আছে প্রাপ্য সকাল
চোখ মানছে না মগজের নির্দেশনা
দৃশ্যগুলো হয়ে যাচ্ছে বিনয়ী মাতাল!
কথারা ছুটছে অবাচ্য শব্দের অভিধান বুকে নিয়ে
কানে বাজছে না কোনো শ্রাব্য ধ্বনি
অসার বয়ানে দুলছে রক্তে রঞ্জিত স্বপ্নপাড়া
গুণিন খুঁজছে ঘুরে ঘুরে, কোথায় হারালো তার
স্বপ্ন-পুরাণের বসুন্ধরা!
প্রথম দুটি হাত ছুঁয়েছিল মাটি
রওশন রুবী
যখন মানুষের পায়ের শব্দ ছিল না পৃথিবীর বুকে,
অরণ্য নিজেই নিজের শ্বাস শুনত।
ঘন সবুজের ভেতর ছিল ধূপের মতো নিস্তব্ধতা,
পাতার ফাঁকে আলো ঝরত ধীরে।
সমুদ্র ছিল না কোনো সীমানা, কোনো দাবি,
শুধু জলের বিস্তার।
ঢেউ উঠে আবার নিজের গভীরে ভেঙে পড়ত,
অসীমের সঙ্গে কথা বলত।
পাহাড়ি ঝরনা নেমে আসত স্বচ্ছ উচ্চারণে,
পাথর ছুঁয়ে শিখত সংগীতের প্রথম বর্ণ।
দিগন্তের মেঘ ছিল অনামা চিঠি,
আকাশ খুলে দিত নীলের দীর্ঘ পথ।
ভেজা ভোরে মাটির মন্থর ঘ্রাণ,
অদৃশ্য বীজে জেগে উঠত জীবন।
তখন কোনো ভয় ছিল না, বিভাজনও ছিল না,
শুধু পৃথিবী নিজেকে ধারণ করত শান্ত বিস্ময়ে।
আর সেই বিস্ময়ের ভেতর
প্রথম দুটি হাত ছুঁয়েছিল মাটি, নামহীন।
খুদেকাব্য
শাহিনা মিতা
কী হয়?
পড়লে কিছু অনিত্য পাঠ
বুঝলে কিছু সহজ সরল?
দেখলে দু’চোখ উদার খুলে
অনিয়মের হিসেব ভুলে?
কী হয়?
ভাসলে খানিক তুলোর মেঘে
প্রেমের আবীর গাত্রে মেখে?
যেজন ডুবে-ভাসে রুদ্ধশ্বাসে
সেই জীবনের আশে-পাশে
রাখলে তারে ভাসিয়ে খানিক,
কী হয়?
ডাকলে তারে বুকের কাছে?
তোমার জীবন ভরা পূর্ণমানে,
কী হয়?
এক বিকেলের নৈমিত্তিক খাতার
পাতায় পূর্ণ মানের নিম্নে পেলে!?
সত্য
হাসিদা মুন
আকাশ জড়িয়ে থাকে শূন্যতার প্রত্ন ইতিহাসে
থাকা ও না-থাকা থাকে মুগ্ধতার তুমুল প্রকাশে
নড়বড়ে, সমর্থ হোক— বাস্তবতা ক্রমান্বয়ে আসে
আগ্রহ নেই; কিংবা যারা আছে দীর্ঘ অপেক্ষায়
উদাত্ত কে! সঙ্কীর্ণ কে!— সব যাবে এক ঠিকানায়
অহংকার ফোটে শুধু আক্ষেপের ধূসর পৃষ্ঠায়
তার থেকে এই ভালো— ভঙ্গ দাও দখলের রণে
অবমুক্ত করো প্রেম হৃদয়ের অভয়-অরণ্যে
সব তত্ত্ব সত্য নয়, সত্য থাকে প্রীতিময় মনে

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬
উপেক্ষা
নির্মলেন্দু গুণ
অনন্ত বিরহ চাই, ভালবেসে কার্পণ্য শিখিনি।
তোমার উপেক্ষা পেলে অনায়াসে ভুলে যেতে পারি
সমস্ত বোধের উৎস গ্রাস করা প্রেম, যদি চাও
ভুলে যাবো, তুমি শুধু কাছে এসে উপেক্ষা দেখাও।
আমি কি ডরাই সখি, ভালোবাসা ভিখারী বিরহে?
আমার মেয়ে বন্ধুরা
দিলারা হাফিজ
ছোট ছোট লাভ-লোকসান গনাগনতি শেষ হলে
আমার যত মেয়ে বন্ধু,ফিরে গেছে বানপ্রস্থের বনে!
বয়সী-মেসতা, হাপুস নয়ন,প্রতারক ডিমেনশিয়া
খেয়ে নিচ্ছে স্মৃতি-মাধুরীর সর্বশেষ অমৃতকণা,
নতুন ঋতুর গানে নবায়ন হয় বৃক্ষ, আসে নতুন পাতা
আমার বন্ধুরা টিমটিম করে জ্বলে,অন্তরাত্মার বিভায়।
এখনো কচি কলাপাতা হাত বাড়িয়ে দেয় তুমুল উচ্ছ্বাসে
মুকুলের ঘ্রাণ, লেবু ফুলের গন্ধে উন্মাতাল উঠোন,
বন্ধুদের নিরঙ্কুশ মায়াময় চোখগুলো এইদিনেও
দীপ্তিহীন— নিরাশার গিরিখাদে অপলক...
বিষাদের প্রলেপে আঁকা এ যেন অন্য এক মানবদেহ
কুঁতকুঁতে দিন—, ম্রিয়মাণ ত্বকে কাতর করবীর মায়া
কেবলি অবশেষ ডাকে, নিঃশ্বাসে জারি করা সীমানা।
আলোসত্য
ফারুক মাহমুদ
ব্যস্ততার হাত থেকে সময় বাঁচিয়ে
(পরিস্থিতি যা-ই হোক) অন্ধকার অনুবাদ করি
কালো ভ্রমরের মতো ছোট অন্ধকার—
অনুবাদে হয়ে ওঠে থোকা-থোকা পাখি
চাঁদের তরল হাসি, কবিতার রাগ-অনুরাগ
আঁকাবাঁকা অন্ধকার অনূদিত হলে
নদী হয়। অনেক পথের শেষে পরিতৃপ্ত সাগর সঙ্গমে
অশ্রুতে যে অন্ধকার থাকে
এর পরের পৃষ্ঠায় হাসিটর উদার উদয়
প্রকৃতির সব অঙ্গ, উপ-অঙ্গ আলো দিয়ে মোড়া
এমনকি, অন্ধকার, সে-ও কিন্তু আসন্ন আলোর জন্মধ্বনি
যাও, ইচ্ছে মতো ডেকে যাও, সাড়া দিবো না
আবদুর রাজ্জাক
অসীম অপেক্ষা— অবশেষে এলে—
তোমার কারণে সুনির্দিষ্ট নিঃশ্বাস নিতে পেরেছি।
পিছনে রেখেছি দীর্ঘদিনের দীর্ঘশ্বাস।
তোমার কারণেই জলেভাসা কুমুড়বড়ি, দেখো! ভেসে আছি
বোয়ালমাছের পেটির মতো পাতলা ঝোলে।
চিরকালের একটি নিঃসীম চাঁদ নেমেছি তোমার দিগন্তে,
এই সেদিনও তোমার আকাশ হয়ে, তোমার হৃদয় ছুঁয়ে
অকুণ্ঠ নিবিড়ে ছিলাম।
সহস্র বছর শূন্যতার দিকে তাকিয়ে পার হয়ে গেছে এবং
সেইসব গল্প অলিখিতই রয়ে গেছে।
তোমাকে অশুভ জ্যোৎস্নায় লাল একটি কুসুম হতে দেখেছি,
যেন সেই কুসুমের অসীম নির্জনতা আমাকে পেয়ে বসেছে।
আমরা কেউ কখনো কারো কাছে আসিনি।
এক নেপথ্যচারী কাপালিক— নিশ্চুপ থেকে গভীর অরণ্যে
হাঁটছি... একাকী।
ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে, কোনো প্রত্যাশা নেই, দূর—
সুদূরেই তোমাকে থেকে যেতে হবে।
দেয়ালে অঙ্কিত ঘোর বসতিকাল, ডেকে যাও, ইচ্ছে মতো
ডেকে যাও, সাড়া দিবো না।
আগ্রাসনের এইসব দিনগুলি থেকে হয়তো একদিন বের হবো
সেও তোমার কারণে।
এখনো ভোরের স্বপ্ন
আসাদ মান্নান
বাতাসে মৃত্যুর গন্ধে নড়ে ওঠে গোধূলির আলো;
পাখির ডানার নিচে বসে আছে জীবনপ্রেমিক
অরণ্যের ঘন ছায়া— উল্টোদিকে ছায়ার আড়ালে
আসমুদ্রহিমাচলে কী সুন্দর অদৃশ্য খাঁচায়
মানুষ কিসের টানে পথে নেমে পিছু ফিরে চায়,
চিরন্তন রহস্যের তাঁত কলে কেন বুনতে থাকে
প্রসন্ন রঙিন আর স্বপ্ন মাখা দিনের পোশাক,
প্রাণের আগুন দিয়ে তৈরি করে ঈশ্বরের মায়াবী আশ্রম!
ফাঁসির আদেশনামা হাতে নিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়ে
প্রস্তুত রয়েছে ওই ডানাহীন উড়ন্ত জল্লাদ—
সময়ের গুন টানে অস্তগামী সূর্যের নাবিক।
তবুও নদীর জলে শ্বাস ফেলে যে উঠে দাঁড়ায়
এখনো ভোরের স্বপ্ন তার রক্তে প্রখর উত্তাপে
জ্বালিয়ে রেখেছে রঙ আশা আর মৌন ভালোবাসা।
শব্দ
আশরাফ আহমদ
উচ্চারণ মাত্র ভেঙে যাবে, এই ভয়ে
‘উফ’ শব্দ গিলে খেয়ে শরীরে সমুদ্র—
টিনের চালের মধ্যে সূর্যরাজের পদধূলি
রাগে বা বেরাগে ঘূর্ণি তুলে নাচে,
ব্রহ্মতালু ফাটে,তালপাখা কাজেই লাগে না।
ঘুম যায় অভিসারে, রাত তিনটায়।
রাত তিনটায় ডেভেলাপারের ট্রাক
বমি করে রড, তাতেই বজ্র—
ইট ভাঙানির যত হাতের ফুসকা ফাটে—
গলি ভর্তি হর্নের রুষ্ট সঙ্গীত যত, কর্কশ—
এমনকি দিনের বেলায় কাকের নিরুদ্দেশে
উড়ালের ডানা ঝাপটানো—
বৃষ্টির বদলে আর ভেজে না মীনের চোখ—
অপর পৃষ্ঠায়
বিদ্যুৎহীনতার গল্প, ব্যাংকলুট,অর্থ পাচার,
জলবায়ু, আইনের লম্বা হাত,গণতন্ত্র ইত্যাদি
লুকিয়ে রেখেই দর্শনে মগ্ন হয়ে পড়ি—
ড্যাশের মর্মার্থ হচ্ছে শব্দ,
কবিতা নির্মাণে লাগে,
যদিও খায় না পাবলিক।
দিন-রাত্রির ঠিক মাঝখানে সেতুটায়,
সুতোটায় বসে অথবা ইন্দুরের গর্তের মুখে
ধ্যানমগ্ন বিড়ালেরা বসে বসে
বহুতল শব্দের স্থাপত্য দেখছে! যেনো,
সুবেহ-সাদিকের পথে মুসল্লির পায়ে পায়ে
উত্তাপ ওঠানামা করে।
উচ্চারণ মাঝপথে একেবারে থেমে গেলে,
ধন্য হয় বোবার জীবন, কোনো রা নেই।
স্বপ্নের কারিগর
(নতুন সংসদকে)
মঈনউদ্দিন মুনশী
যে ভূমিতে বেড়ে ওঠে প্রত্যাশা ভারি
আর থাকে প্রচেষ্টার ভ্রূণ সারি সারি
তাঁরা শ্রম দিয়ে চেষ্টা দিয়ে করে সম্পাদন
স্বপ্নকে পরিণত করে সোনার জীবন।
ক্ষুদ্র হাত কিন্তু হৃদয় কী উজ্জ্বল স্বচ্ছ
তাঁরা অনুসরণ করে গন্তব্য
তাই পৌঁছে যায় নতুন উচ্চতায়
ঝড়ে আগুনে তাঁরা ক্লান্ত নয়
কঠিন শ্রম হয় জ্বালানি তাঁদের দীপ্ত উদ্দীপনার
তাই রোপণ করো স্বপ্ন ও ভালবাসা তোমার
যত্নের সাথে, দেখো তারা কেমন মুকুলিত হয় তুলনাহীন
আগামীর পথে, স্বদেশের টান।
স্বপ্ন থেকে থেকে ওঠে জ্বলে
সাফল্য তাঁদের কাছেই আসে যারা স্বপ্ন দেখে।
স্বপ্ন ও বাস্তব
বিমল গুহ
তর্ক চলে দিনরাতভর স্বপ্ন ও বাস্তবে
স্বপ্ন অন্তহীন রূপজাল
দুর্দম বিভোর
বাস্তব কেবল হাহাকার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির
কখনোবা বিপর্যয় অন্ধ মোহ
অতীত প্রশ্রয়;
স্বপ্নের হাত-পা নেই
কেবল নধর
লোভ মোহ অদৃশ্য গরিমা লাল চোখ ক্রোধের আগুন
যদি স্বপ্নবাজ একরোখা কানা লোভাতুর!
বাস্তব অপরিমেয় যজ্ঞসার
কর্মমুখ ভাবনার উল্লাস
কখনো হিংসার রূপ শীর্ণ লোভাতুর।
স্বখাত সলিলে
মাহফুজ আল-হোসেন
ওগো শুনছো, তোমার মাস্কারাচর্চিত চর্মচক্ষুর আশকারা এড়িয়ে বলো তো কী সন্দেশ নিয়ে এসেছি আজ সাড়ে সর্বনাশের এই ঘর্মাক্ত অস্থির বিকালে?
এবারের তৈলতপ্ত ঈদবাজারে অতি আকর্ষক এক প্রমোদ প্যাকেজ: হরমুজ প্রণালির বুকচিরে ভ্রাম্যমাণ জলযানে নৌবিহার— মিলবে কি আদৌ ত্রিকালে?
গড়পড়তা মানুষের তিতকুটে করলা জীবনের আলপথে হঠাৎ হিমহিম মৃত্যুর পুচ্ছদেশ ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এমন সুস্বাদু আইসক্রিম যদি থাকে কপালে!
পারস্য উপসাগরীয় এই রমণীয় অভিযাত্রায় ড্রোনানুভব যদি মিলে যায় অসহনীয় মাত্রায় তবে এর চেয়ে উত্তেজক কোনো বিকল্প আর আছে কিনা কে জানে?
তথাপি ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ —এ কোন দ্বিধায় আজ মনপ্রাণ স্বখাত সলিলে নিমজ্জমান;
অতঃপর সৌম্যদীপ্ত ভানু সিংহ কহে সদা থাকো নির্ভয়ে: ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যামসমান’।
জীবনের মোহ
মাহমুদ কামাল
প্রতিটি রাতের কাছে নিবেদন করি
ভোরের প্রত্যাশা
সুতীব্র রাতের মাঝে যত রসায়ন
ঝড়ের তাণ্ডব শেষে নিষ্কলুষ সকালের রোদ
পরবর্তী রাতের সমীপে
রক্তরথ উদ্দীপিত করে যেন
ভোর চলে আসে
প্রতিটি রাতের কাছে
ভোরের প্রত্যাশা করে
এভাবেই জীবনের মোহ গড়ে তুলি
একাত্তর: শরবিদ্ধ বিপন্ন সময়
সোহরাব পাশা
দুঃসহ বেদনায় নতমুখি জীবন
কেউবা সুতোছেঁড়া পুরনো স্মৃতির ভিতর বিহ্বল
কেউবা অনন্ত দূর দেখে নিজেকেই ছিঁড়েখুঁড়ে
বিনিদ্র জেগে থাকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে তীব্র দহনের ,
পৃথিবীতে নিয়তই তুমুল বসন্ত ফোটে
ভিজে যায় জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ বৃষ্টিতে— পাতারা
আবৃত্তি করে লোরকার ধ্রুপদি কবিতা—
এইসব ঢেকে যায় ক্ষিপ্রতার মেঘের ডানায়।
শূন্যদাহ— অশ্রুভাষা শরবিদ্ধ বিপন্ন সময়
রং উঠে যায় ভালোবাসার
ছেঁড়া তাঁবুর ভিতর ধূর্ত সার্কাসের সংসার
অন্ধেরা দেখে জ্যোৎস্নার ফুল,
মৃত্যু শব্দে ভেঙে যায় গোলাপি সকাল
দুপুরে কালো চিল ওড়ে, ভুল বেলায়
ফিরে যায় অরক্ষিত অপর বাসায়;
সন্ধ্যের নিশ্চুপ নিভৃতের নিবিড় আশ্রয় খোঁজে
শঙ্কিত পা’
মানুষনিঃশব্দে নিদ্রিত থাকে অন্য এক ভোরে।
আমাদের ঈদ উপাখ্যান
খোরশেদ বাহার
ওই দেখা যায় সাদা মেঘের ফাঁকে
আমার চোখে কিছুই পড়ে না।¬¬
সন্ধ্যায় সাইকেলের ক্রিংক্রিং বেল বেজে ওঠে
এক লাফে উঠোনে নেমে আসে বর্ষা।
তিনি ঘর্মাক্ত শরীরে উঠোনের জলচৌকিতে বসলেন
তালপাতার পাখায় শরীর জুড়িয়ে নিলেন কিছুক্ষণ
আমাকে, বর্ষাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন
জানিস, চাঁদ উঠেছে, কাল ঈদ।
আমার জুতো দোকানে ঝুলছে
হাসান দর্জির ঘরে ঝুলছে বর্ষার ফ্রক
বাবা জানতে চাইলেন ভোলা ধুপির খবর
মা তার নতুন শাড়ির কথা বলা না বলার
ফাঁক গলিয়ে দ্রুত রান্নাঘরে উনুন জ্বাললেন।
কমলা রঙের আগুনে মায়ের মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
আমরা দু’জন মায়ের শরীরে লেপটে থাকি।
বাবা এবার উঠলেন, ফিরলেন অনেকটা পরে
ফ্রক-জুতো-শাড়ি-ধোপদুরস্ত পাজামা-পাঞ্জাবি হাতে,
আমরা নতুন জুতোর সাথে, রঙিন ফ্রকের সাথে
যুদ্ধে উঠি মেতে।
ততক্ষণে সেমাই পায়েস জর্দা হালুয়ায়
আমাদের চোখ চকচকে হয়ে উঠেছে
জিহ্বাতে রস ঝরছে
সারা গ্রামে ঈদের বন্যা এসেছে।
অনুশোচনা
হাইকেল হাশমী
প্রিয়তমা, আমি ভেবেছিলাম
আমাদের আঙিনায় ফুটবে লাল গোলাপ,
আর তোমার আঁচলে
ঝিকমিক করবে শত শত তারা।
নীল আকাশে ঝলমলে সূর্যের শপথ,
আমি ভেবেছিলাম—
তোমার গালে নাচবে সূর্যের কিরণ,
আর তোমার স্বচ্ছ চোখে
ঝলমল করবে হীরকের কণা।
আমরা দু’জন অন্তহীন আকাশে
খুঁজতে যাব ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্র।
কিন্তু তা হলো না—
আমাদের উঠোনে ছড়িয়ে পড়ল আগুনের স্ফুলিঙ্গ,
আর তোমার আঁচলে
তীক্ষ্ম কাঁটা ছাড়া কিছুই রইল না আর।
তোমার গালে দেখতে পাই
পুড়তে থাকা শহরের ছায়া,
আর তোমার স্বচ্ছ চোখ
আচ্ছন্ন বারুদের কালো ধোঁয়ায়।
হায় আমরা দু’জন যেতে পারলাম না
অসীম আকাশে তারা খুঁজতে।
এখন তো আকাশও নিরাপদ নয়—
উড়ে বেড়াচ্ছে মিসাইল আর জঙ্গী বিমান।
নীল আকাশে তারার আর দেখা নেই
অজস্র ড্রোনে ছেয়ে গেছে আকাশ পথ।
আমি লজ্জিত— খুবই লজ্জিত প্রিয়তমা,
মাটি আর আকাশে নেই কোনো নিরাপদ ঠিকানা
তুমি আমার চোখের মণিতে নেমে আসো
আসো বসবাস কর আমার কল্পনার উপত্যকায়
তোমাকে লুকিয়ে রাখব আমার হৃদয়ের স্পন্দনে।
জানিস না, লিখতে শুরু করেছি আমরাই
খালেদ হামিদী
আমাদের অভিশাপ ফলেনি কখনও।
কবে যে কৃষির শুরু, সেই থেকে আজও
তোরাই নাছোড় খুব ভয়ংকরতায়।
কাঠের বিরাট যত নৌকায় আটক
বিক্ষুব্ধ কৃষ্ণাঙ্গদের ফেলেছিস জলে,
প্রণীত কানুনানুগ দর্পের সাগরে।
অগণন হননের ইতিহাস বেয়ে
অটুট তোদের দম্ভে বজ্রও পড়েনি!
অভিসম্পাত শব্দটি ভুল তাই আজ।
বিদ্রোহী? কাগুজে কাব্য! জানে নজরুল!
কিন্তু তোরা গণ্ডমূর্খ কাঁপা আস্ফালনে।
জানিস না, লিখতে শুরু করেছি আমরাই।
তোদের যান্ত্রিক প্রতাপের ঢের আগে
গেঁথেছি হাতির দাঁতে, ম্যামথের হাড়ে,
গুহায় বসেও নানা নিজের অক্ষর।
হার্মাদ জল্লাদ হয়ে জলস্থল থেকে
আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্র যতই ছুড়িস
জানবি না পাখির হাড়ে ফুঁ দিয়ে কীভাবে
বাজিয়েছি বেণু। নিয়ান্ডারথাল নিধনে
শামিল হইনি আমি। বোমায় হারিয়ে
যাওয়া কারোর ফেরার আশায় চকিতে,
বাতাসে হেলান দিয়ে সুর তুলি ধীরে
দূর অরিগনেসিয়ান নিজস্ব বাঁশিতে।
বসন্তে সাম্যবাদী বৃষ্টি
হাসান কল্লোল
বসন্তের মাটিতে বৃষ্টি পড়ে আর সোঁদা গন্ধ তার
ঘুমন্ত পাখা মেলে ওড়ে!
তৃষ্ণার্ত বাগান বিলাসের লাল চোখে
কোমলতা এসে বসে! পাশেই বাগানের চেয়ারে
ক্লান্ত বিড়াল বড় বিরক্ত হয়ে চলে যায় মাছের সন্ধানে!
কানে আসে শিলাবৃষ্টির ছন্দ
আসে হলুদ ভেজা শাড়ি বিপুল আনন্দে
সিক্ত বেলীর মালায় জড়িয়ে ছপছপ
উঠোনকে জাগিয়ে। একতারা ঘরের কোন থেকে
আড়চোখে তাকায় মৃদু হেসে!
যারা নৈশ ভ্রমণে যাবে তাদের ব্যাগে
ছাতা নেই বলে অগত্যা দাঁড়িয়ে থাকে
অশ্বত্থ গাছের নিচে
সিক্ত পাখি ও ভেজা মানুষ একই পাত্রে
পান করে ফাল্গুনের গেরুয়া-জল!
বসন্তে অকস্মাৎ তুমুল বৃষ্টির
সাম্যবাদী বলে এক বিচিত্র বিশেষণ আছে!
যুদ্ধে আমার মতি নেই মতি নেই
জিললুর রহমান
যুদ্ধে আমার কোনো ধরনের মতি নেই মতি নেই
এই ভাবনার বোমার মতোন গতি নেই গতি নেই
তবু চারিদিকে গর্জে চলেছে মিসাইল ড্রোন
ঘরে রাস্তায় খণ্ডিত দেহ প্রাণ নেই প্রাণ নেই
মাথার পচন চলছে ভীষণ যতি নেই যতি নেই
যুদ্ধ থামাবো আমাদের হিম্মতিই নেই মতি নেই
অস্ত্র বিমানে থেমে থেমে কাঁপে নগর কোণ
মানুষে মানুষ খুনোখুনি করে প্রীতি নেই প্রীতি নেই
যুদ্ধে আমার কোনো ধরনের মতি নেই মতি নেই
মানুষে মানুষ খুনোখুনি করে প্রীতি নেই প্রীতি নেই
এবং ভেতর কে
মুজতবা আহমেদ মুরশেদ
কবিতার গায়ে লেখা জনমত জরিপের একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যতিরেকই তোমার কাছে যাবো।
কেননা, অজ্ঞাতনামার ভেতর কীভাবে একটি ঠিকানা বেড়ে উঠলো, তাই নিয়ে তল্লাটময় উৎকণ্ঠা এখন।
মুচমুচে ঝুড়ি বেচা লোকটি পায়ে ব্যথা সামলে বলেছিলো— এক উড়ুক্কু জীবনে। উদ্দেশ্যহীন যাত্রার সংকেত শুভও হতে পারে।
এতো বিস্ময় ছিলো
সে কথার হৃৎপিণ্ডে— বুঝতেই চকিতে মনে পড়লো। ওর চোখ এবং অধরের বাম কোণে অতি অপ্রাসঙ্গিক এক চিলতে হাসি একদিন ইঙ্গিতে কী যেনো ইতিহাসের পাতা দেখিয়েছিলো।
তাই যদি হয় সত্যের রূঢ়তা, তাহলে তোমরা যূথবদ্ধতায় এমন কী এক ইতিহাসের চিহ্ন এনে দিতে পারো— যেখানে সাপের পায়ের ছাপ পষ্ট নয়?
ওড়াও হাত
শিহাব শাহরিয়ার
ওড়াও হাত
তাকিও না কাগজের পিঠে
ইউটিউবে তোমার ছবি ভেসে উঠতে পারে?
যেহেতু অনেকগুলো সিসি ক্যামেরা
পার করে এসেছ
বদলি সময়ে
কখনো ভেঙো না হাতের চুড়ি
যে ঘুম চোখ থেকে সরে গেছে
তা নিয়ে পোস্টও দিও নি
ওড়িয়ে যাও হাত
রাতগুলো তোমাকে ডাকছে
সন্ধিক্ষণের সময়কে সন্দেহ করো না?
ছুটি
মুশাররাত
ছুটিতে যাবো
ইচ্ছে কত কালের— পুষে আছি কালে কালে
পাহাড়, সমুদ্র,সবুজ আর আকাশের কানে
বলে দিবো সব জমানো কথা
যা আছে বুকের ভেতরে
হোঁচট খায় যা পাঁজরে পাঁজরে
ভদ্রতাবোধের মুখোশের আড়ালে
চোখের পানি কিছুটা গড়ালে
ভুল হবে না তা একটুও
হাসিতে হাসিতে
লুটোপুটি খেয়ে সোঁদামাটিতে গড়িয়ে পড়লে
কাদামাখা শরীর নির্মোহে ছুটে
শঙ্খ নদীতে ঝাঁপালে
কিছুই হবে না— এমন কোথাও
ছুটিতে যাবো সকালে।
নারকীয় যুগ
পুলক হাসান
পর পর দুইটি দাঁত পড়ে গিয়ে জানান দিলো
পতন আমার শুরু হয়ে গেছে।
তারপরও তুমি বলো
পাতা তো ঝরবেই
বৃক্ষ যেন থাকে অবিচল।
কিন্তু আমি দেখছি অন্ধ গায়কদল
বলে গেল
বৃষ্টি পতন থামাবে কে?
সময় প্রবেশ করেছে নারকীয় যুগে!
নায়ক নেই কোথাও
খল আর খল
চারপাশে।
আর এমন রঙ্গ
যেন পাখি হয়ে গেছে পতঙ্গ!
ফলে কীভাবে আশা করো
বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে সুরতরঙ্গ?
পরিধির দিকে ছুটে গিয়ে
কামরুল হাসান
পরিধির দিকে ছুটে গিয়ে মানুষ কেন এত উদ্ধার চায়?
সমুদ্রে ঝাঁপায় আর দাপিয়ে বেড়ায় তার জলযান
তবু কোনো এক তীরের দিকে চোখ রাখে প্রাণ
অসীম পরিধি ছেড়ে পৌঁছাতে চায় প্রান্তরের সীমায়,
কেন অবিচল অভিজ্ঞতাকেই সে করে না সংগ্রহ?
স্থির হতে তার এতখানি লাগে যে সময়,
কী পরিত্রাণ সে পুঁতে রাখে উদ্ধারের বসতবাটিতে?
প্রান্তরে ছুটে গিয়ে মানুষ কেন পরিধির সন্ধান চায়?
সমুদ্র পেরিয়ে দূর বন্দরের ডাঙ্গায় ভিড়াতে চায় তরী
নভোঃমণ্ডলে তার কোন শান্তি নেই, স্বস্তি নেই কোনো
মানুষ বিছাতে চায় তার চরণজাল মখমল প্রান্তরে
যেন কোনো এক আশ্চর্য উদ্ধার রয়ে গেছে বসন্তমর্মরে
জীবন পরিক্রমায় এক উদ্ধারের মঞ্চ পেয়ে যাবে
সে জানে কোথায় জিরোতে হবে, কোথায় জিরোবে।
বান্ধবহীন প্রেমের দিনে বিবাহকে ভেবেছে উদ্ধার
বিবাহিত জীবনে ভেবেছে সন্তানে শুভ্র শান্তি রয়েছে।
আমরা ভীড়ের মাঝে একাকী নিঃসঙ্গ হতে কত যে চেয়েছি
কত মুখ চলে আসে বুকের প্রান্তরে আর হারিয়ে যায় দূরে
বুঝেছি পরিক্রমা চক্রাকারে ছুটে চলে অনন্তর পরিধিতে ...
পথশেষে বৃষ্টিস্নাতা
শাহীন রেজা
যেখানে যাবো যে পথে
মায়াবী জোছনায় ভিজে ভিজে
সে পথে বৃষ্টি এখন
খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি
লতানো চুলের শীর্ষে জলবিন্দু
আমি তোমাকে দেখতে যাবো
জোছনার ভাষা আছে; রাত্রিরও
সে ভাষায় কথা বলে
আমি মেঘকে কাঁদাবো
যেখানে যাবো যে পথে
সে পথে শুধুই জল; বৃষ্টি এখন
পথশেষে নিশ্চিত তুমি
বৃষ্টিস্নাতা।
স্টিললাইফ
মিহির মুসাকী
চকচকে একটা ছুরি
নিখুঁত, তির্যক, ধারালো প্রান্ত নিয়ে
পড়ে আছে।
চেয়েছিল কেউ তাকে তুলে নিক
ব্যবহার করুক;
রমণীর রমণীয় হাতে সে হতে পারতো
একটা সব্জি কাটার যন্ত্র, হয়নি।
একজন চিকিৎসক একবার ছুরিটা
বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করেছিলেন,
ছুরিটা বেশ আনন্দিত,
সে ব্যবহৃত হতে পারতো শল্যচিকিৎসায়, কিন্তু হয়নি।
দীর্ঘদিন পড়ে থেকে অযত্নে-অবহেলায়
ছুরিটা মলিন হতে চলেছে,
তার জীবনটা যখন প্রায় ব্যর্থ
একটা মাস্তান এসে ছুরিটাকে তুলে নিল
ছুরিটা শিহরিত!
এবার কিছু একটা হবেই...
হিংসার্ত শিরোনাম
ওবায়েদ আকাশ
বাগানবাড়ির আদলে যে সপ্তডিঙ্গা মেধার আগুন ফুটিয়েছে
এই প্রথম জলের নালিশ উঠল তারকা ছাপিয়ে—
ভূমধ্যসাগর ডুবি ডুবি করেও উজিয়ে ফিরে এলো
তবু লবণাক্ততায় বাগানবাড়ির বৃক্ষগুলো কোথায় আশ্রয় পেল
জনপদে জল্পনার কিছুই জবাব দিলে না—
পোস্টারে শোভিত সাকল্য স্লোগান, টুপ টুপ করে ঝরছে সুবাস—
কুলবধূ যারা— সংসারে অকাট সুন্দরী— সমুদ্রের উচ্ছ্বাসের মতো
ঝড়ো হয়ে এলো— জানাল, পুরোটা সাগরই এক ফর্সা বানাবার ক্রিম
তবে আর স্থলে-পদ্মে বাগানবাড়ি উঠবে কেন ফুটে?
হাত দিয়ে টেনে আনা বৃষ্টিতে সকল কান্না ধুয়ে ফেলা যায়
দুঃখেরা যৌবনের উচ্ছ¦াস উজিয়ে সতেজ-সুঠাম
মধ্যরাতের সঙ্গমগৃহ দুলে দুলে পুরোটা সমুদ্র কামার্ত-সতর্ক করে তোলে
এত যে লবণ, ক্ষার... প্রণয়ের স্মারক বসাতে গেলে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়—
ভাবেন তো, কান্নার বিশুদ্ধ নাম লবণাক্ততাই, আনগ্ন সাগর, মানে অশ্রু
এই সপ্তডিঙ্গা— এত সাজ— এত অভিসার— কী অর্থ বহন করে?
মানুষ মূলত সামুদ্রিক উপনাম—
ব্যথা বা বেদনা অশ্রু আনন্দ উচ্ছ¦াস সুখ অভিমান
কাতরতা স্পর্শ বিলাস শৃঙ্খলা আবেগ মর্মার্থে ভালবাসা কিংবা বিরহ
সকলই লবণাক্ততায় মুক্ত— সপ্রতিভ জলধি-প্রমাণ
প্রাসাদ কিংবা বিলাসবাড়ির ঢঙে কোনায় কোনায় আভিজাত্য
ঝুলিয়ে দিলেও মূলত সকলে সমুদ্রগামীই
সৈকতপারের হাওয়া কিংবা উন্মাতাল বালুকাবেলায় একাকার সান্ধ্যগীতি
রঙধনুর প্রসঙ্গ ব্যতীত
বাগানবাড়ি কিংবা সপ্তডিঙ্গা— আমস্তক হিংসার্ত শিরোনাম
বসন্ত বাহার
মুজিব ইরম
বেশ দিন ঘুমে ছিলো
জেগেছে সে নিজস্ব নিয়মে
হলুদ হলুদ
নার্সিসাস
নার্গিস কুসুম...
কী যে ঘোর
জাগে ভোর
ড্যাফোডিল আর
বসন্ত বাহার...
আরো আরো ফুটেছে ক্রোকাস
যেনো সে ঘুমিয়েছিলো
শীতঘুম
জেগেছে সকাশে
নীল নীল
বেগুনি হলুদ ছবি
বসন্ত ভৈরবী...
ভিনদেশে বসন্ত এসেছে
আমার ঘুমন্ত মন হলুদ হলুদ নীল সুরেতে মজেছে।
নির্মিত মুহূর্ত
ভাগ্যধন বড়ুয়া
এক।
পুরুষালি আলিঙ্গন জানে রোদ, লেপ্টে থাকে
অপর ব্যাসার্ধ টেনে পূর্ণ করে বৃত্ত, ঘোরগ্রস্ত প্রাণ।
বান তোলা প্রিয়টান, সমর্পিত ক্ষণ, যাপিত আনন্দ
প্রাণবন্তশ্বাস সুন্দর আশপাশ তুমি আমি সত্য শুধু...
দুই।
অহেতুক কথামালায় পূর্ণ থাকে শূন্য ঘর!
অন্যথায় কবরের ছায়াকপি
একা, বোবা, বিনির্মিত অন্ধকারে হাঁটাচলা
মুখোশের ভেতর মুখ, আকরিক নেই
খননেই দিন যায়, ঠিক লগ্ন আসে না জীবনে!
তিন।
দৃশ্যান্তরেই হাজির বিভাজিত ক্ষণ
ছোট ছোট ঢেউ, তরঙ্গিত একান্ত সমুদ্র
স্বল্প আলো নিয়ে গল্পগুলো বলে যায় কে?
আমি তো ছিলাম, মনে পড়ে কেন এত কথা?
রক্ত ও লবণ সমুদ্র পার হয়ে
শোয়াইব জিবরান
রক্ত ও লবণের সমুদ্র সাঁতরাতে সাঁতরাতে
এ কোন উপত্যকায় এসে পৌঁছালে
বিরান মাঠের ধারে
দাঁড়াতে দাঁড়াতে ক্ষুধার্ত
এখন সন্ধ্যা নেমেছে।
আর জঙ্গল হতে নেমে এসেছে
হায়নারা
মা গেছে মরে
আর তুমি ক্ষুধার্ত, ভীত
এতিম এ উপত্যকায়
উদ্ধারহীন। কাঁদছো।
দিন যায় দ্রুত, রাত্রি দীর্ঘতর
হায়েনা শকুন এ উপত্যকায়
তোমার মুক্তি নেই কোনো।
কী সুন্দর বন্দী
রকিবুল হাসান
অপেক্ষায় নির্ঘুম তেইশে নবেম্বর—কী ভীষণ উজ্জ্বলতা
উড়বো আমরা—ডানায় ডানায় ছায়া মেলে,
বুঝিনি তোমার পিপাসার পরানসুখ অন্যনগরে
দেউলে আমার কর্পূরের ঘ্রাণ-পড়ে আছে নিথর তেইশ।
কী ভীষণ আনন্দে উড়েছ বর্ণিল রশ্মির তৃষ্ণাচোখে
প্রাচীন আসক্তি বুকের বিবরে দেবতা তোমার
বুনো হাওয়ায় উড়েছ আঁচল ছড়িয়ে তৃষ্ণার শাড়ি
তীব্র প্রেমে দিয়েছ নিত্যপূজা গোপন তুলসি তলায়!
চোখের নদীতে এতো চোরাবালি! এ কেমন নদীতিকা!
একই বুকেতে বসবাস তবু যোজন যোজন দূর!
জীবনের কর্নারে যে পড়ে আছে বিবর্ণ তেইশে নবেম্বর
তুমি কী তবে সুন্দরবন্দী মনের পালঙ্কে অন্য অনুরাগে!
ঈদের বাজার
ইকবাল হোসেন বুলবুল
বাজারে আগুন?
আগুন কোথায় নেই?
চন্দ্রে আগুন, সূর্যে আগুন
চুলায় আগুন, ধুলোয় আগুন
স্বর্ণে আগুন, রূপায় আগুন
জলে আগুন, স্থলে আগুন;
আগুনের ভিতরে দেখো জ্বলছে আগুন
প্রেম আর ভালোবাসা
সমাজ সংসার আত্মীয়স্বজন
কোথায় নেই সে?
জীবনের তিন কালে?
চেয়ে দেখো, জ্বলছে সে সমান তালে
রাজার মুখে জ্বলছে আগুন
জ্বলছে যে তা গদির ভিতর;
জণগণের কী সে খবর?
রেহাই কারো নেই যে শোনো
সবাই আছে জ্বলার ভিতর
জ্বলছো যে জন— জেনে রেখো;
আগুন জানে আজব কৌশল
জ্বালায় কেবল; মারে না গো...
চুম্বন
মিলটন রহমান
আমার উৎসব মঞ্চে ঈদের চাঁদের মতো বাঁকা ঠোঁটে
এঁকে দিয়ে যাও প্রেমের উষ্ণ আলিঙ্গন
তোমার অপেক্ষায় সেই যে বাড়ির সম্মুখে রুয়ে ছিলাম
কচি লিকলিকে এক কাঁঠালীচাঁপার গাছ
তার পাতায় পাতায় প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প ধরে
কোন গল্প গেছে শুকিয়ে, আর কোন গল্প প্রচণ্ড জেদে
ডাল বেয়ে এখনো ঝুলে আছে একটা চুম্বনের অপেক্ষায়!
এক একটি দিনের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে সেই গাছের
গজিয়েছে শিকড়-বাকড়, রচিয়াছে অপেক্ষার ইতিহাস
কত উৎসব পার্বণ পেরিয়ে গেলো, অতিক্রান্ত স্রোতের মতো
নতুন দিনের গায়ে লেগে থাকা তোমার গন্ধ শুঁকে শুঁকে
কাঠালীচাঁপার গাছ অনঙ্গ সৌরভে মেলেছে নতুন পাতা
প্রচণ্ড ঝড়-ঝাপটায় নুয়ে পড়তে পড়তে যায়নি ভেঙে
তোমার সেই ঈদের চাঁদের মতো বাঁকা ঠোঁটের চুম্বন
আর দিঘলীয়া নদীতে অবগাহন ছাড়া উৎসব পূর্ণ হয় না
তুমি ঈদের চাঁদের মতো বাঁকা ঠোঁটে
এঁকে দিয়ে যাও প্রেমের উষ্ণ আলিঙ্গন
তোমার অপেক্ষায় পাতায় পাতায় জমেছে যেসব গল্প
তার ছত্রে ছত্রে দেখবে প্রেম ঘুমিয়ে আছে
চাঁদের রেখার মতো তোমার চুম্বনের অপেক্ষায়।
বাড়ি ফেরা শূন্য হাতে
মুমির সরকার
শেষ বিকেলের কনে-দেখা
আলোর মৈথুন অন্তে—
কোনো এক পরিত্যক্ত রাতে
বাড়ি ফেরা, শূন্য হাতে!
নিত্য-যাপন পথক্রমায় নেমে
খচখচ বুকে গুমোট দেখা—
চারিদিকে সংগঠিত মিছিল;
অগনতি মানুষের উদ্যত হাত
উঠছে আর নামছে
মুহুর্মুহু স্লোগানে-স্লোগানে;
বুকের গভীর থেকে বলছে
বাঁচার মতো চাই বাঁচতে!
মিছিলের দুর্বোধ্য সম্মোহনে
সরীসৃপ-দেহে উপগত যেন
এইর আমিও এগিয়ে থাকি
মিছিলের আগেভাগে!
পল্টন ঘুরতেই ডিআইটি
ফিদিন নষ্ট মস্তঘড়ি,
সঠিক সময় মাপে দুইবার!
সবুজ-পার্ক হয়ে টিএসসি
শহীদের মিনার, ধূলিমাখা
অলিগলি বিস্তীর্ণ—
এ নগর জনপদে।
শাহবাগ মোড়ে আসতেই
মিছিল-স্লোগান-মন্ত্র ভুলে
বাহারী যমজ-বন্ধনী-বুকে
বারোমাসী পরাগরেণু,
চকিত দেখা সুবাসহীন—
ফুলের হাট! দু’চোখে।
ঘরকন্নার মোটা চাউল
ম্যাড়ম্যাড়ে সব্জি কিংবা
গোলাপী মোড়কে বিস্কুট
এমনকি, কুঁড়িয়ে পাওয়া
ভাংগাচোরা কোনো খেলনা
আজ জুটবে না জানি।
গন্ধবাস ফেরার অধিকার
ফুলের— সময়ের দাবি!
বিচ্যুত মিছিল হয়ে
এই প্রথম পরিত্যক্ত সে রাতে
বাড়ি ফেরা, শূন্য হাতে!
প্রদোষে সরীসৃপ নদী
রাহমান ওয়াহিদ
পথ হাঁটে না। পথের গন্তব্যেও পথ নেই কোনো,
সে পথেরই আলগা ধুলোয় বেতাল পা রেখে হাঁটি
একাকী,বিদগ্ধ পূর্বপুরুষেরা যদিও বরাবর
বলতেন, এ কোনো পথ নয়,দীর্ঘ পথযাত্রা কেবল।
তোমরা যে হাঁটতে শিখেছো শত পদচিহ্ন ফেলে
যে পথে কদমও ফোটে রোজ, শিশু শিউলিরা
অবিশ্বাস্য বেঁচে থাকে রাতের তীব্র প্রহারেও—
প্রদোষে সেই পথই শুয়ে থাকে সরীসৃপ নদী হয়ে।
আমি ভুলভাল যত্রতত্র হাঁটি দিকহারা ছায়াপথ ধরে,
পতন্নোমুখ নক্ষত্র কিংবা বরফ সন্ধ্যা ছুঁয়ে ছুঁয়ে।
হিসেবের খেরোখাতায় রেখো না আমাকে না হয়,
যেমন কখনও রাখেনি খাঁ পাড়ার অরুণিমা অক্ষয়।
জলের অর্কেস্ট্রা
পুলিন রায়
জলের অর্কেস্ট্রা নিঃসঙ্গ জীবনতারা
জ্বলে মিটিমিটি
আমি চেয়ে দেখি দূরের বল্কলে
ঝুলে আছে স্বপ্নরঙ্গিন ঝালর
দু’চোখে কেবলি সীমানা ছাড়িয়ে
যাবার অভীস্পা
দূরের সমুদ্রে একদিন ছিলে নিজ কল্লোলে
ঘোমটা সরিয়ে আশার আলোতে
উজ্জ্বল হয় দিগন্ত
আসে ঝড় এবং শঙ্কাহীন দ্যুতি
বিষণ্ন বিকেল হাত কচলায়
অতি দূর কোন্ প্রান্তরে যাবার
তোমার রয়েছে তাড়না
জলস্রোত জানে না
কেনো-ই-বা বয়ে চলা নিরন্তর
সাগরের পাড়ে দাঁড়ানো জীবন
একা, বড় একা উদ্বেগী
নির্জনে গহীন গোপন ইশারা করে সমুদ্র
ও লো সাথী ধরো হাত
জলে জলে পাড়ি দেবো
বিপুল বিস্তারি জলের অর্কেস্ট্রায়।
ইন্সপেকশন
নাজমুস সামস
ইন্সপেকশনেই বোঝা যায় বাঁচা মরার কথা
কখনো মার্চেনডাইজার কখনো কিউসি
কখনোবা অন্য কেউ আমাদের তৈরি পোশাক
ইন্সপেকশন করে। যেদিন চূড়ান্তভাবে এ্যাপ্রুভ
হয় আমরা মরার কোকিলে গান গেয়ে নাচা গানা করি
কার্টুনের ইন্সপেকশন সব কিছুই মসৃণ করে
থাকে না কোনো মাপজোখ
পিপাসাসংহিতা
আফরোজা সোমা
নয়নে লেগেছে যার, প্রণয়-আবীর
অবশিত হৃদি তার, পরাণ অধীর।
এই পথে যেতে যেতে, পথ হয় বৃত্ত
ভেদ খুঁজে পাবে না তো, আদি আর অন্ত।
তবু যদি ঘুঘু ডাকে, ঝরে বটফল
মনপোকা করে যদি, খুব কোলাহল;
পাতায় পাতায় যদি, সুর বেজে ওঠে
এর নাম মায়া দিও, এর নাম পৃথ্বী।
ধরণী দ্বিধায় ভরা, প্রেম তবু উষ্ণ,
জাহেলি দুনিয়া ভরা, কত হৃদি-পুষ্প।
আঁখি ভরা কথা যদি, প্রাণ ভরা প্রেম,
বিনিময়ে মায়া আছে, ব্যথাও সামান্য।
তারে ভালো লাগে যদি, পিপাসা জমিও,
যার লাগি কাঁদে মন, তারে ভুলে যেও।
সর্পসঙ্গম
আসিফ নূর
প্রিয় আস্করকাটা গ্রামের বৃক্ষময় আদি বৌদ্ধ মন্দিরের
লালচে টিলার সেই পশ্চিম ঢালুতে দোকানপাড়া পুকুর,
হাফ-প্যান্ট পরা বালকবেলার ঘুঘুডাকা দুপুরের ঘোরে
ঘুরতে ঘুরতে দাঁড়িয়েছিলাম মাছেদের জলকেলি দেখে;
বর্ণিল মাছরাঙার গেরিলা ছোঁ ভাঙছিল বকের তপস্যা।
হঠাৎ পুকুরের উত্তরপাড় থেকে নারীচুলের বেণির
মতো আঁটাআঁটি পাক-খাওয়া সঙ্গমচঞ্চল একজোড়া সাপ
অস্থির গতিতে উঠে গেল রোদজ্বলা কাঁটাঝোপের মাথায়,
তেজি শব্দে কিছুক্ষণ দুমড়েমুচড়ে সুনসান নীরব সব।
একদৌড়ে বাড়ি গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দাদিকে শোনালাম ঘটনা।
পিতলের জমিদারি হুক্কার ধোঁয়া উড়িয়ে আফসোস করে
তিনি বললেন: যদি সাপ দুটির ওপর রুমাল বিছিয়ে
সেটি আবার নিতে পারতি, তাহলে সাতরাজার ধন পেতি।
সে-রাতে দাদির খানদানি শিথানের নিচ থেকে চুরি করি
ফুলতোলা সুগন্ধি রুমাল, তারপর সেটিকে পকেটে নিয়ে
এদিক-সেদিক কতদিন কতভাবে খুঁজেছি; সাপ দেখেছি
বহুবার—কিন্তু সাপের সঙ্গম আবার দেখিনি এ-জীবনে।
নিখোঁজ
আসাদ আহমেদ
কোথাও নেই
হারিয়েছে নদীস্রোতে সমুদ্রে অতলে হয়তোবা
খোঁজ নেই আর
অনেক খুঁজেছি আমি
পাতালে আকাশে নীলচোখ অন্ধ মুহূর্তে
নেই কিছু নাই আর
আমাকে মাতাল ভাবো
ভাবতে পারো অবশেষে যা কিছু তাই
দেখো ছাই-ধুলো উড়ছে পাখি স্বভাবে
আমাকে খুঁজি নাই
অবশিষ্ট যা থাকে— তার তলও কি পাওয়া যায়?
পাখি উড়ছে
উড়ছে যা যা উড়াবার নয়
উড়ে ওঠার প্রাক্কালে মনে পড়ে সমতল-বনভূমি
মায়াজোছনার মতো মায়াময় কিছু... অবশেষ
আফিম বুকের নিঃসীম চৌহদ্দিতে
সোহেল মাহমুদ
ফেরারী বসন্ত যদি ফিরে আসে আবার,
আবার যদি নীল অপরাজিতায়
সুশোভিত হয় নির্বাসিত হৃদয়ের উঠোন,
তবে এই আমি—
নক্ষত্রখচিত প্রাসাদ ছুঁড়ে ফেলে,
অমরাবতীর দুর্ভেদ্য প্রাচীর ডিঙিয়ে আসবোই ছুটে,
তোমার কাঁকন বেষ্টিত অনিন্দ্য কারাগারে!
এখনো হৃদয়ের তল্লাটে বাজে
কোন এক অশরীরী পায়ের সম্মোহনী নূপুরের শব্দ!
আমার সেই সব দিন,
স্বপ্নের ক্যানভাসে আঁকা পুরোনো বিকেল,
আকাশের নীলের মতন টিপ
যদি ফিরে পাই,
আবার যদি বসন্ত বিহগী ডেকে উঠে,
মাতাল কণ্ঠে ঢেলে দেয় গালিবের শরাব,
তবে এই আমি,
হাজার বছরের নিদ্রা ভেঙে উঠবোই জেগে!
আবার যদি ফিরে পাই,
দুর্বোধ্য সেই কালো তিল,
রক্ত জবার মতো রাঙা সেই চঞ্চু যুগল,
যদি ফিরে পাই!
যদি ফিরে পাই, পুরনো আলিঙ্গনের বৃষ্টিস্নাত ভোর,
তবে এই আমি, আসবোই ফিরে,
হিমালয়ের সফেদ করোটি ডিঙিয়ে
আফিম বুকের নিঃসীম চৌহদ্দিতে আবার!
জেরক্স
আদিত্য নজরুল
সেই মাতাল লোকটির কথা ভীষণ মনে পড়ছে—
ঐ মাতাল লোকটি
যে কিনা
দুঃখ পেলেও সরাইখানায় যেতো
এবং আনন্দ পেলেও!
ঐ মাতাল লোকটির কথা মনে পড়ছে
যে কিনা
দুঃখেও কান্না করতো
এবং সুখের উল্লাসেও কান্না করতো—
আমি কি তার জেরক্স!
দুঃখ এবং সুখে
আমার কোনো জল ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে!
লখিন্দরের বাসরে
শেলী সেনগুপ্তা
লখিন্দরের সুরক্ষিত বাসরেও
ছিল গোপন ছিদ্রপথ
জানতো কালীনাগ
মহাবিশ্বের নীরবতার মাঝেও
কেউ কেউ বক্তা,
কিছু কিছু কথা ছড়িয়ে যায়
হঠাৎ খুলে পড়া উলের গোলা
অথবা
দ্রাঘিমা রেখাসম
না বললেও
কিছু কথা প্রবহমান রক্তনালীর
গতিপথে
সুখ অথবা দুঃখও
পথ খুঁজে নেয়
লখিন্দরের বাসরে ঢোকা
কালীনাগের মতো
প্রেম?
তাও বা কম কীসে!
সুরক্ষিত মনের গোপন কোণে
ঠাঁই করে নেয়
নিশ্বাসে ধারণ করা সুবাস হয়ে...
দৃশ্যত
শারদুল সজল
সব সাহস চিৎকার করে না
কিছু সাহস
গোপনে গিলে ফেলে নিজের নামটাও...
আগ্নেয়গিরি যেমন লুক্কায়িত থাকে মাটির গভীরে
কিম্বা ভূমিকম্প হঠাৎ নড়েচড়ে
যেমন জানান দেয় ঘুমন্ত পৃথিবীকে,
তেমনি— দু একটি মুখ পাথরের ছায়া ভেঙে
অন্ধকারে জেগে ওঠে
জ্ঞানী মানুষ কেবল অনুসরণ করে না সূর্য
বরং আত্মস্থ করে অন্ধকার
অন্ধকারে যে হাঁটেনি... সে জানে না
দৃশ্যত চোখের বাইরেই মূলত পৃথিবী
পাখির কুমন্ত্রণা
সোহেল মাজহার
আমি কি পালিয়ে যাবো গ্রহ থেকে?
চারদিকে বিষ বাতাস, আগুন হুল
রাষ্ট্রচরের কুটিল প্ররোচনা
রাজপথের নিচে প্রবহমান মৃত্যুপরিখা
চোরাবালি ফাঁদ, কোন পথে যাবো?
জেগে ওঠে একা এক সূর্যতেজ
মৃদু চাঁদ, মৃদু পূর্ণিমার কথা না বলা ভালো
রক্তের ভিতর লুকানো সূর্য কণিকা
সত্যদ্রষ্টা পথ হয়ে যাও।
ফিরিয়ে দিও রাজার অনুগ্রহ
কলাপাতায় পেতে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ক্ষির।
এই সকল কথা আমি কোথাও বলিনি
কুটিল পাখি তবু কুকথা ছড়ায়, সূর্যালোকে কুমন্ত্রণা...
মায়া পৃথিবীর গান
আহমদ জামাল জাফরী
ম্যাজিক সময় পথের ঠিকানা জানে অন্ধ ডাকঘর
চতুরঙ্গ পথ অবিরল আলো ও আঁধারে নিরুদ্দেশ যায়,
ভেঙে গেলে মুখর সংক্রান্তি উৎসব; পড়ে থাকে ছাই-ভস্ম
চলিষ্ণু মেঘের জড়োয়া ঢেকে দেয় নক্ষত্র দল
আকাশের ব্যালকনিতে ঝুলে থাকে মেঘের বারুদ
বিদ্যুৎ রেখার মতো শব্দ স্ফুলিঙ্গ নেমে আসে আগুন পথের
লিখে রাখি পথে পথে ছুঁয়ে থাকা প্রবাহ জীবনের
ভ্রমণের ছবি হয়ে যায় রঙ ওঠা পোর্ট্রেট,
কণ্টক-আঘাতে ফুলের অর্থও বদলে যায়
স্বপ্নের-বিস্তার ধারালো আলিঙ্গনে লেগে থাকে কাচের গুঁড়ো।
বন্ধ দরজায় টোকা দেয় অনিবার্য যবনিকা
মরচে ধরা লোহার খিলান কেঁপে কেঁপে ওঠে,
দুঃখ-পরমতা, সুখ-শিহরন, স্মৃতি-বিস্মৃতি ধুলায় লুটায়
তবু মানুষের পথে শিলালিপি হয়ে থাকে মায়া পৃথিবীর গান।
না-রোদ ওঠা শহরে
অদ্বৈত মারুত
না, ওসব বাহানামাত্র
দ্রব্যাদির আগুন হওয়ার কালে
সকালকেই অন্ধ করে যায় মেঘ
আলোকে বিদায় জানায় ক্রোধ
আর তাতে আমরা আমাদের নিয়ে
ঘরেতেই থাকি।
ঘরহীন ঘরে অনাদরে পালিত হয়
নিকট অতীতের ঘাস
না, ওসব ঘাস নয়, বিষধর সাপ;
আলোয় ঠুলি পরিয়ে করে মেঘের আলাপ
মশাল হয়ে জ্বলবে না-ফেরা নাবিকেরা।
খরিদের প্রয়োজনে খাতির
আমিরুল হাছান
ব্যথার পাহাড়ে আমি বন্ধুত্বের খরিদের সংলাপ করেছিলাম
প্রেমের বিজ্ঞপ্তি তোমার জন্যে প্রশ্নথেকে প্রশংসা হয়েছে
ভাগ্য আমার বিয়োগ হয়েছে প্রেমের কীর্তন করে
সংলাপে বহুমাত্রিক ঘরের আশীর্বাদ ছিল
সক্ষমে অক্ষম ছিলাম। ব্যর্থতার কোনো দায়িত্বনেই
অনুসন্ধান করে অনুশোচনা হয়নি মনের সংবিধানে
শৈল্পিক হাসিতে অকল্পনীয় এবং অকল্যাণ বিশ্বাসটাই দীর্ঘশ্বাস।
এই চিত্রনাট্য এই ভূমিকা বহুমাত্রার সংলাপে প্রেম সংরক্ষণ হয়
সময় করে মিথ্যা জরিপের মনে জরিমানা কষ্টের।
কারণের ব্যথায় অকারণে প্রেমকালের কথা
খরিদের প্রয়োজনে খাতির হবে তৃতীয় পক্ষের সীমান্তে।
মানবো না কোনো বাৎসায়নের নির্দেশ
সুমন শামস
ভাবছি দুঃখকে আর ছাড় দেবো না। কাছে আসার মাশুল নেবো কড়ায় গণ্ডায়। প্রবেশাধিকার সহজ হলে পিঁপড়েও কাটে হাতির পা। দুঃখকে আর সময় দিতে পারবো না। এখন দ্রোহের কাল। দুঃখগ্রন্থিকে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবো। খুলে দেবো দ্রোহগ্রন্থির সব ফারাক্কা। সমঝোতা চুক্তিতে আমি চাইবো, সুখের খণ্ডিত মাথা। সুললিত গ্রীবাসহ। ছোবলে ছোবলে ঢেলে দেবো ওর গলার ভেতরে শান্তিচুক্তির বিষ।
আমি মানবো না এক্ষেত্রে জাতিসংঘের খবরদারি। সুখের ঠোঁট দুঃখের চুম্বনে নীল করে দেবো।
দুঃখদহ প্রেম রেখে দেবো সুখের বিপুল স্তনে। সঙ্গমে সঙ্গমে বিনির্মাণ করবো নিষিদ্ধ দুঃখ।
এক্ষেত্রে আমি মানবো না কোনো বাৎসায়নের নির্দেশ।
কংক্রিট বোধ
রফিকুল ইসলাম আধার
যন্ত্রচালিত এই ব্যস্ত নগরে
চেনা-অচেনার ঘর্মাক্ত ভিড়ে,
ওষ্ঠাগত প্রাণ কংক্রিট বোধে
ছুটি দিশেহারা নদীটির তীরে।
যাপনে মেলে না স্বস্তির দেখা
পালাবো কোথায় সংগোপনে?
বোহেমিয়ান শ্বাসরুদ্ধ আজিকে
অক্টোপাস বাঁধে আষ্টেপৃষ্ঠে অণুক্ষণে।
সব
ডালিয়া চৌধুরী
সব পাখি উড়ে যায় সুদূরে
গোধূলিতে মিলায় সব ছায়া
দাঁড়িয়ে আছে তবু ক্লান্তিহীন
বুকের ভেতর অনিশ্চয়তা বুনে।
নদীটির মতো পারাপার দেখে
নিজে পার হতে না পেরে
মহাকালের বিষণ্ন অধ্যায়ে
অস্থিরতার অতিরঞ্জন,
অনেক জলের নিবেদনে
আঘাত করে যায় মাটির পাঁজরে।
সব শূন্যতা গাঢ়নীলের জমাটে
আকাশ হয়ে চোখে পুষে থাকে,
ঘর্ষিত জলের যাযাবর মেঘ
বসতি গড়ে দীর্ঘস্থায়ী নোঙরে।
ধুলো জমা ধূসর করিডোরে
লগ্ন টানে আঙুলে আগামী গুনে,
পরিত্যক্তপেন্সিলের ভুল গ্রাফিকে।
সব রাত শেষে কুয়াশা ঘেঁষে
পাণ্ডুলিপির অস্পষ্ট অক্ষরে
এসেছিলো যে আলো,তাও
আকড়ে ছিলো বিস্তৃত ব্যর্থতারে।
যদি জেনে যাই
মনিজা রহমান
দরজাটা খোলাই ছিল। ইচ্ছা করলেই আমি
ভেতরে যেতে পারতাম। কিন্তু যাইনি।
এক আলোকবর্ষ দাঁড়িয়ে আছি দরজার বাইরে
কেউ আমাকে ভেতরে যেতে বারণ করেনি।
কেউ প্রশ্ন করেনি কেন দাঁড়িয়ে আছি
দরজা তো খোলাই ছিল।
ভেতরে যাইনি
কারণ ভেতরে গেলে সব বিস্ময় চলে যাবে।
ভেতরে কি চার হাজার বছরের প্রাচীন মমি?
মহেঞ্জোদারোর বিধ্বস্ত নগরীর শেষ চিহ্ন?
কাঠের ঘোড়ার পেটে উর্বশী হেলেন?
আমি জানতে চাইনা মন খারাপের প্রযুক্তি।
তবে সে কারণে নয়—
ভেতরে গেলেই যদি জেনে যাই, মানুষ কেন কাঁদে
মানুষ আসলে কতটা মানুষ
যদি জেনে যাই, অন্ধকারের ব্যাকরণ
এবং দ্বৈত-চেহারার স্বরূপ।
চাষমনস্ক বিষণ্নতা
বেনজির শিকদার
কথারা এখন ব্যথার দোসর, চুপচাপ কাটে দিন
ধূসর ছবির পেছনে জমেছে, বিগত স্মৃতির ঋণ!
স্মৃতির দরজা হাট করে খোলা, বাতাসের চলাচলে
কিছুই এখন লিখি না তেমন, ঝরাপাতাদের দলে!
গাছেরা এখন দূরগ্রহে থাকে, ছায়ার আদরে থাকি
মনের আধিতে গান গেয়ে যায়, অন্য আরেক পাখি।
অন্ধকারের নাম জানা নেই, আলোর তালাশে মরে
মানুষ যেমন ঝরছে একাকী— কষ্ট-কঠিন জ্বরে!
জ্বরের বিষাদে ভুলভাল বকি, চেনা নাম যাই ভুলে
বৃক্ষ দেখি না, অক্ষ চিনি না, ঘ্রাণ দিয়ে যায় ফুলে।
বিবাদের খাতা ধুলো জমা আজ, আবাদের যোগফলে
চাষমনস্ক বিষণ্নতার ফসল ফলেছে জলে!
জলের আঘাতে ঝরে ঝরে পড়ি, নিভিয়ে দিয়েছি আলো
কথাহীন যত কবিতা আমার, তোমরাও থেকো ভালো।
শীতলক্ষ্যা নদীর কাছে আমাদের শৈশব
বাবলু মওলা
তখনো নক্ষত্রগুলো চেয়ে আছে তোমার দিকে
তখনো আলো আঁধারির সবুজ পাতা চুইয়ে নামে
জোছনার নরম পালক
কতগুলো বুনোফুল নৈঃশব্দ্যে জোনাকির মতোন
সেবিছে বাতাস মায়াবী তৃষ্ণা, তৃষ্ণা তৃষ্ণা...
আহা! কতোদিন ভোর দেখা হয়নি আর!
কদম ফুলের মতো থোকা থোকা মেঘ
তোমার জানালায় তখনো জ্যোৎস্না প্রভা
কতগুলো প্রজাপতি ভাটফুলের মতো
অলক্ষ্যে ঘুমিয়ে আছে তোমার নিষ্পাদ্য ওষ্ট
ভেজা বাতাস ভিজে আছে বহুদিন, বহুদিন
আহা! কতোদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি আর!
শীতলক্ষ্যা নদীর কাছে আমাদের শৈশব
আমরা ধরলার বিধৌত চরের মতোন
আশ্বিনের জোছনায় নিকানো উঠোন
ধান ক্ষেতের আল ধরে চিকন বাঁকাপথ
উত্তরের বাতাসে তুমি উড়ছো ঘুড়ির লেজের মতো!
আহা! কতোদিন স্বপ্ন দেখা হয়নি আর!
তোমার ভেঁজা চুল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায়
গড়িয়ে নামছে অলৌকিক বাসনা
তখন সবেমাত্র নক্ষত্র ছুঁয়েছে রাত
তুমি হাসছো, ভাসছো-দুলছো
তোমার পায়ের কাছে অখণ্ড অবসর
অথচ, অতিদূর নরম অন্ধকার বেয়ে ক্রমশ
আমাদের বিরহের গান ভেসে আসে।
দুঃশাসন
সাজ্জাদুর রহমান
শেষমেশ ক্ষত ও পচনের কাছে
পাঠ শেখে আগুনের কোলাহল
পুড়তে পুড়তে ভস্ম হয় উত্তরাধিকার
পীঠের নীচে বালির উষ্ণ গঙ্গা
জীবন রেস্তোরাঁয় রান্না হতে থাকে
ক্ষতের চচ্চড়ি
পচনের উষ্ণ গঙ্গা সহজে সিদ্ধ করে
শরীর পোড়া মাংসের ঘ্রাণ
ক্ষতের চচ্চড়ি আর পোড়া মাংস
আয়েশ করে খায় দুঃশাসন।
পুনরাবৃত্তি
মাহমুদুজ্জামান জামী
মনকে বলেছি কাল রাতে
কয়েকটি কথা,
কয়েকটি ছবি আর
বিদ্রূপ ব্যথা--
অথচ এমন না যে
এসব নতুন
অথবা অপ্রকাশিত
আহত ফাগুন!
তবু মন বার বার
অহেতু নিষ্ঠায়
নিজেই ঢুকে পড়ে
মধুর ছলনায়!
আমিও আমার মতো
মোহিত ঝঞ্ঝায়
পাক খেয়ে পড়ছি আবারো
নতুন ঝামেলায়!
ফুলের ইশারা নামায়
নতুন রাস্তায়
মন ভোলানো কতগুলো
পুরনো ধান্দায়!
তবুও কেন যে, মন তুমি
কিসের আশায়
করতে থাকো আবারো
সেই আগের ভুলটাই!
বিনির্মাণের স্বপ্ন
মুজাহীদুল ইসলাম নাজিম
আমি কণ্ঠস্থ করি ‘ছেঁড়া জীবন’ উপন্যাস
আনন্দে মুখর ব্যাকুল নায়কের স্বপ্নচোখ
কী যেনো কী ভেবে ভোরের বালিকা টুপ করে গিলে নেয় বকুলসকাল
উৎফুল্ল শালিক ওড়ে বসন্ত দুপুরে
কি যেনো কী ভেবে সময়ের বুক খামচে আনন্দে মাতে দুরন্ত বালক
আনন্দ বিকেল ঘুমিয়ে পড়ে রাতের বুকে
স্বপ্নের অধিকারে চলে যায় রাত
কিছুই থাকে না আমাদের,
শুধু থাকে বিনির্মাণের স্বপ্ন— আগামী সকাল।
অবাঞ্ছিত পলি
শাখাওয়াত তানভীর
চোখে-মুখে খেলে যায় উচ্ছ্বাস
পাথুরে পথের শেষে বিস্তৃত সবুজ ঘাস;
হেঁটে গেলে, তবু শুনলে না— মরা নদীর দীর্ঘশ্বাস
ঘাসের নিচে নদীর গলায় অবাঞ্ছিত পলির মরণ ফাঁস!
রক্তপলাশ চোখ
সঞ্জয় দেওয়ান
কোনো বোধ নেই
অবচেতনে পড়ে থাকে অনিদ্রার পালঙ্কে
রোদের ছায়ায় গম্ভীর হয়ে যায়
করোটিতে দোল খায় শারদীয় মেঘ,অর্থহীন প্রলাপ।
ছাতিমতলার মঞ্চে পড়ে থাকে শবযাত্রী
গোপন দেয়ালের কান শুনে স্বগতোক্তি
সংলাপ শেষে মুছে ফেলে চন্দ্রকলার সজ্জা।
মেঘের গোপন আঁতাত ফাঁস হয় পৌষের আকাশে
দ্রোহের প্রতিলিপি জমা থাকে
অন্ধকার ঐতিহ্যে
মরা গাঙে ভেসে চলে একজোড়া রক্তপলাশ চোখ!
নীল জলের কৌটা
হাশিম কিয়াম
জন্মের আগেই মানুষের বুকের গহিনে কোটি কোটি
আলোকবর্ষের নিঃসঙ্গতার ফুলবাগান জেগে থাকে
কেউ কেউ গন্ধে অন্ধ হয়ে ভুলে যায়
বাগানের স্থায়ী ঠিকানা, রঙের কারুকাজ, কুঁড়ি আর
প্রস্ফুটিত ফুলের মধ্যকার মহাজাগতিক পার্থক্য,
আর তখনই বাগানের দীর্ঘশ্বাস থেকে জন্ম
নেয় রংবেরঙের বিষধর সাপ... প্রথম দংশনের
শিকার হয়ে কঁকিয়ে ওঠে তাদের অনুচ্চারিত শব্দের বরফ...
বাগান রূপান্তরিত হয় জঙ্গলে, আর তারা হারিয়ে গিয়ে
সারাটা জনম নিজেদের খুঁজে বেড়ায়, প্রার্থনা করে,
মানত করে, পূজা দেয়, কিন্তু জানে না কীভাবে
ফুলের রঙে অজস্র গ্রহ সাজাতে হয়, পাপড়ির বাঁশিতে
তুলতে হয় চিকন সুর...
কেউ কেউ প্রস্ফুটিত বাগানে মহাবিশ্বের সব সবুজ
গ্রহ ছোঁ মেরে এনে, গন্ধের সুমুদ্দুর এঁকে, ভেসে বেড়ায়
পাপড়ির নৌকায়, তাদের নীরবতার গদ্য
বন্দি থাকে নীল জলের কৌটায়...
মীরা’র চোখে আমার সর্বস্ব খুঁজি
শাহাদত হোসেন সুজন
একযুগেরও বেশি সময়ের বন্ধুত্ব আমাদের
অজানা কারণে অথবা তার মনের বারণে
আজ দু’জনাতে লম্বালম্বি দাগ এঁকে যায়
আঁধার ঘনিয়ে আসা ডুবুডুবু সন্ধ্যায়
হঠাৎ করে মনের ভেতর জ্বলে ওঠা প্রদীপ
কেরোসিনের অভাবে ধপ করে বন্ধ হয়...
মীরা এখন কাশফুলের ডগায় স্বপ্ন আঁকে
গোধূলির নীলিমায় রঙ তুলির আঁচড় কাটে
অহর্নিশ তার রঙিন ভুবনে বাস।
বুকের গহীনে মোচড় দিয়ে ওঠে
নাটই সুতোয় কাটাকাটি চলে রোজ
ঝরা ফুলের মতো তাতে কার কি এসে যায়?
মীরা’র চোখে যখন আমার সর্বস্ব খুঁজি
সে তখন অন্য দরজায় কড়া নাড়ে...
অবাচ্য শব্দের অভিধান
খৈয়াম কাদের
হাঁটতে নেমে দেখছি
পায়ের সীমানা থেকে সরে যাচ্ছে পথ
উড়ে যাচ্ছে ঘর, বাতাসে আটকে আছে প্রাপ্য সকাল
চোখ মানছে না মগজের নির্দেশনা
দৃশ্যগুলো হয়ে যাচ্ছে বিনয়ী মাতাল!
কথারা ছুটছে অবাচ্য শব্দের অভিধান বুকে নিয়ে
কানে বাজছে না কোনো শ্রাব্য ধ্বনি
অসার বয়ানে দুলছে রক্তে রঞ্জিত স্বপ্নপাড়া
গুণিন খুঁজছে ঘুরে ঘুরে, কোথায় হারালো তার
স্বপ্ন-পুরাণের বসুন্ধরা!
প্রথম দুটি হাত ছুঁয়েছিল মাটি
রওশন রুবী
যখন মানুষের পায়ের শব্দ ছিল না পৃথিবীর বুকে,
অরণ্য নিজেই নিজের শ্বাস শুনত।
ঘন সবুজের ভেতর ছিল ধূপের মতো নিস্তব্ধতা,
পাতার ফাঁকে আলো ঝরত ধীরে।
সমুদ্র ছিল না কোনো সীমানা, কোনো দাবি,
শুধু জলের বিস্তার।
ঢেউ উঠে আবার নিজের গভীরে ভেঙে পড়ত,
অসীমের সঙ্গে কথা বলত।
পাহাড়ি ঝরনা নেমে আসত স্বচ্ছ উচ্চারণে,
পাথর ছুঁয়ে শিখত সংগীতের প্রথম বর্ণ।
দিগন্তের মেঘ ছিল অনামা চিঠি,
আকাশ খুলে দিত নীলের দীর্ঘ পথ।
ভেজা ভোরে মাটির মন্থর ঘ্রাণ,
অদৃশ্য বীজে জেগে উঠত জীবন।
তখন কোনো ভয় ছিল না, বিভাজনও ছিল না,
শুধু পৃথিবী নিজেকে ধারণ করত শান্ত বিস্ময়ে।
আর সেই বিস্ময়ের ভেতর
প্রথম দুটি হাত ছুঁয়েছিল মাটি, নামহীন।
খুদেকাব্য
শাহিনা মিতা
কী হয়?
পড়লে কিছু অনিত্য পাঠ
বুঝলে কিছু সহজ সরল?
দেখলে দু’চোখ উদার খুলে
অনিয়মের হিসেব ভুলে?
কী হয়?
ভাসলে খানিক তুলোর মেঘে
প্রেমের আবীর গাত্রে মেখে?
যেজন ডুবে-ভাসে রুদ্ধশ্বাসে
সেই জীবনের আশে-পাশে
রাখলে তারে ভাসিয়ে খানিক,
কী হয়?
ডাকলে তারে বুকের কাছে?
তোমার জীবন ভরা পূর্ণমানে,
কী হয়?
এক বিকেলের নৈমিত্তিক খাতার
পাতায় পূর্ণ মানের নিম্নে পেলে!?
সত্য
হাসিদা মুন
আকাশ জড়িয়ে থাকে শূন্যতার প্রত্ন ইতিহাসে
থাকা ও না-থাকা থাকে মুগ্ধতার তুমুল প্রকাশে
নড়বড়ে, সমর্থ হোক— বাস্তবতা ক্রমান্বয়ে আসে
আগ্রহ নেই; কিংবা যারা আছে দীর্ঘ অপেক্ষায়
উদাত্ত কে! সঙ্কীর্ণ কে!— সব যাবে এক ঠিকানায়
অহংকার ফোটে শুধু আক্ষেপের ধূসর পৃষ্ঠায়
তার থেকে এই ভালো— ভঙ্গ দাও দখলের রণে
অবমুক্ত করো প্রেম হৃদয়ের অভয়-অরণ্যে
সব তত্ত্ব সত্য নয়, সত্য থাকে প্রীতিময় মনে

আপনার মতামত লিখুন