সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

গল্প / ঈদ সংখ্যা ২০২৬

অনিঃশেষ স্মৃতির ভেতর


মঈনুল হাসান
মঈনুল হাসান
প্রকাশ: ৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

অনিঃশেষ স্মৃতির ভেতর
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন

চোখ বন্ধ করলে কেবল একটাই দৃশ্য কিংবা এমনও হতে পারে যে বন্ধ নয়, চোখের সামনেই ঘটমান বর্তমানের মতো দৃশ্যটা উজ্জ্বল স্থির। কতগুলো বছর কেটে গেল তবু মস্তিষ্ক ঘটনাটিকে এক মুহূর্তের জন্যও মুছে দেয়নি রেহানের মন থেকে। হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্ট্রেচারে শুয়ে আছে একটা নিথর শরীর। রেহান গত চব্বিশ বছর ধরে স্মৃতিরূপী সেই হিমশীতল নিথর শরীরটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। কখনও কখনও একটা সুতীব্র গন্ধও নাকে এসে ঠেকে রেহানের। গন্ধটা মগজ অবশ করে দেওয়া দোলনচাঁপা ফুলের সুগন্ধের মতো। 

আজকাল যেকোনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়ালেই এমন সুগন্ধের অস্তিত্ব টের পান রেহানউদ্দিন। তাঁর মস্তিষ্কের কোষগুলো কি উল্টো সিগনাল দিতে শুরু করেছে? মধুরিমার সঙ্গে দেখা হলে অবশ্যই জিজ্ঞেস করে নেবে যে, কোনো পুরানো স্মৃতি এমন গন্ধবাহী আচরণ করতে পারে কি না!

সেদিন সোমবারের বিকেল। বারডেম হাসপাতালের চৌদ্দতলা থেকে লিফটে নিচে নামার সময় ছলছল চোখে রেহানের বড়ো বোন বলেছিল, আব্বার অবস্থা বেশি ভালো নয়। হাত-পা ফুলে উঠেছে। হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত দুই পায়ের চামড়ায় লাল ছোপ ছোপ দাগ। ডাক্তার আজ সকালেই বলেছে, রেনাল ফেইলিউর— অবস্থা সংকটজনক। দ্রুত ডায়ালাইসিস শুরু করা প্রয়োজন। 

রেহান শুধু এক আকাশ শূন্যতা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। আবদুল আউয়াল গত সাতদিন ধরে চৌদ্দতলার একটা কেবিনে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা নিয়ে ভর্তি আছেন। ডায়ালাইসিস ব্যাপারটা কী এটা ও তখনও ভালো করে জানে না। কিছুদিন ধরে সেভাবেই চলল। 

রেহানের ফাইনাল পরীক্ষা সামনে— অনার্স থার্ড ইয়ার। ইনকোর্স, টিউটোরিয়াল, ক্লাস পার্সেন্টেজ নিয়ে ব্যস্ততা একেবারে কম নয়। তবু ক্লাসের ফাঁকে সময় করে দুপুর কিংবা বিকেলে ঠিকই বাবাকে নিয়ে যেত বারডেমে, কখনও অন্য হসপিটালে। ডাক্তাররা যখন যেটা পরামর্শ দিতেন সে অনুযায়ী নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হতো। স্মৃতিগুলো এখনও ঠিক মনে আছে রেহানের। তারপর একদিন শুরু হলো ডায়ালাইসিস। সপ্তাহে দুদিন— রবি আর বৃহস্পতিবার হলেই দ্রুত ক্লাস শেষ করে তাড়াহুড়ো দুপুরের পরপরই চলে যেত বাসায়। অসুস্থ বাবাকে ট্যাক্সিতে চড়িয়ে সরাসরি নিয়ে যেত ধানমন্ডিতে। রেহানরা দুই ভাইই তখন ছাত্র। কী ভীষণ আর্থিক টানাপড়েন! একদিকে সামাল দিতে গেলে আরেকদিক শূন্য হয়ে যায়। তবু বেঁচে থাকার জন্য এমন সংকটেই ঝাঁপিয়ে পড়ল রেহান।

ডায়ালাইসিস শুরুর পর তখন কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। একদিন রোববার। ডায়ালাইসিস সেন্টারের ইনচার্জ ডাক্তার সাখাওয়াত অন্য একজন ডাক্তারকে দায়িত্ব দিলেন পেশেন্টের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যেন যথারীতি ডায়ালাইসিস শুরু করা হয়। রেহানের মা, বোন দুজনেই এসেছেন। একমাত্র ভগ্নীপতিও তখন বাইরে অপেক্ষায়। ডায়ালাইসিস শেষ হওয়ার পর পেশেন্টের শরীর খুব দুর্বল হয়ে ওঠে। চার ঘণ্টার ধকল শরীরে নেওয়া যায় না। বিপর্যস্ত শরীরে আবদুল আউয়াল সেটা নিতেও পারেন না। তবু স্বস্তির মধ্যে এতটুকুই হয়তো পরের কয়েকটা দিন তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করবেন। আর মন্দের ভালো হিসেবে পরিবারের ছোটোখাটো একটা জমায়েত হয়ে যেত সেখানে। এমন সংকটময় মুহূর্তে সবাই একসঙ্গে থাকলে সেটা পরিবারের মনোবল বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। 

একজন কমবয়সি ডাক্তার সমস্ত কিছু ঠিকঠাক করে পেশেন্টকে শুইয়ে দিলেন বিছানায়। তারপর ব্লাড প্রেশার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নিরীক্ষা শেষ করে ডায়ালাইসিস শুরু হলো। চৌকোমতো বিশাল মেশিনটা দেখতে ভয়ংকর— শরীরের দূষিত রক্ত একদিকে নলের মাধ্যমে বের হয়ে পরিশোধিত হয়ে আবার অন্য একটি নলের মাধ্যমে শরীরের ভেতর প্রবেশ করছে বিশুদ্ধ রক্ত হিসেবে। কিডনির ছাঁকার কাজটা হচ্ছে মেশিনে। শরীরে নিশ্চয় ঝিমঝিম অনুভূতি হয়; কারণ আবদুল আউয়াল মাঝে মাঝেই থরথর করে কাঁপলেন। কয়েকবার তাঁর প্রেশার কমে গেল। হালকা খিঁচুনি দিয়ে একবার মুখ বাঁকা করলেন। 

পেশেন্টের বেড থেকে অদূরেই বসে আছে রেহানের মা ও বোন। বিষণ্ন ও ক্লান্তিকর মুখ দুজনের। নিচু স্বরে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। এসব রেহান চোখে সহ্য করতে পারে না। তাই ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চুপচাপ বসে ভিড় দেখছিল রাস্তার।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। নার্স স্টেশনে কর্তব্যরত ডাক্তার ও কয়েকজন নার্স মিলে বসে সন্ধ্যার চা-সিঙ্গারা খাচ্ছিল। মৃদু আলাপচারিতার মধ্যেই কখনও চাপাস্বরে হাসি। বাইরে হেঁটে এসে রেহান আবদুল আউয়ালের বেডের পাশে দাঁড়াতেই মনে হলো কোনো অস্বাভাবিক কিছু ঘটে গেছে ততক্ষণে। শরীরে হালকা খিঁচুনির পর তাঁর ঠোঁট যেন ক্রমেই বেঁকে উঠছে এবং এর মধ্যেই তিনি বুঝি অস্ফুট মুখে কিছু বলতে চাইছেন। চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছে।  

রেহানের বুকটায় ধড়াস করে উঠল। বুকের ধুঁকপুকানি নিয়ে কাউকে ডাকবে কি না ভাবতেই দেখল ওর বড়ো বোনেরও বিষয়টি নজর এড়ায়নি। তারা দৌড়ে গেল ডাক্তারের কাছে। চোখে মুখে অসহায় উদ্বিগ্নতা নিয়েই জানাল... প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন... কিছু একটা করুন... পেশেন্ট যেন কেমন করছে!

ডাক্তার ও নার্সদের মধ্যে চাপা হুল্লোড়ের রেশ তখনও কাটেনি। সেদিন সেন্টারে আরও বেশ কয়েকজন ক্রিটিকাল পেশেন্ট ভর্তি ছিল। এসব দেখে দেখে তারাও অভ্যস্ত। তাই কিছুটা বিরক্তি নিয়েই ডাক্তার জানাল, ঠিক আছে যান, অত আতঙ্কিত হবার কিছু নেই... আমরা দেখছি। 

রেহানের চোখ দুটো তখন জলে ঝাপসা। বারান্দার কাছাকাছি কোথাও একঝাড় দোলনচাঁপা ফুটেছিল। সেদিন থেকেই ফুলের সুগন্ধটা মনের ভেতর এপিটাফ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

অসংলগ্ন চিন্তার মধ্যেই সেই ভয়াল কণ্ঠের কাতর আর্তিটা প্রতিধ্বনির মতো আবারও ফিরে এলো অনেকদিন পর। জিপ থেকে নেমে তবু ধাতস্থ হয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন রেহানউদ্দিন। আজকের দিনটি অন্যরকম হলেও চারপাশের চিরচেনা পরিবেশের ওপর পুরানো স্মৃতির পর্দা খুব পাতলা আবরণ ফেলে যাচ্ছে। ফলে বদলে যাওয়া পরিবেশও আগের মতোই লাগছে রেহানউদ্দিনের। পুরো প্রাঙ্গণ যথেষ্ট গোছানো। এটা আজই এমন পরিপাটি করে রাখা হয়েছে কি না কে জানে! এছাড়া হাসপাতালের একধারে মেডিকেল কলেজ— সাদা এপ্রোন পরা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কত প্রাণচাঞ্চল্য! ঘুরেফিরে এসব দেখতেই দুজন ভদ্রলোক স্মিতহেসে ফুল হাতে তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন।

সম্ভাষণ জানিয়ে ফুল হাতে দিয়েই বললেন, চলুন স্যার আমাদের সঙ্গে। জরুরি বিভাগ পেরিয়ে বাঁ দিকে চেয়ারম্যান স্যারের অফিস। ওখানে অপেক্ষা করা যেতে পারে। রেহানউদ্দিন শুধু তাদের অনুসরণ করলেন।

জরুরি বিভাগের দরজাটা পেরোতেই বহুদিন পর একই আর্তনাদ আবারও শুনতে পেলেন রেহানউদ্দিন। ওর স্মৃতিতে তীব্রভাবে আঘাত করে সেটা এসে মুখ থুবড়ে পড়ল কাছাকাছি কোথাও। একজন নারীর আর্তকণ্ঠে ছুটোছুটি, চিৎকার। 

ডাক্তার, প্লিজ... কিছু একটা করুন। বাবা যেন কেমন করছেন... আমার বাবা বেঁচে আছে তো?

চলমান সময়ের মধ্যে একটা ঘোরতর নিস্তব্ধতার মধ্যে ডুবে গেলেন রেহানউদ্দিন। অতীতের সাথে হঠাৎ বর্তমানের একটা যোগসূত্র তৈরি হলো। তিনি যেন শুনতে পেলেন, তাঁর বড়ো বোন রুনি ধরাকণ্ঠে ক্রমাগত ডাকছে। 

রেহান...তাড়াতাড়ি আয়... আব্বা এমন করছে কেন? ডায়ালাইসিস কি বন্ধ? তবে কি আব্বা স্ট্রোক... না, রেহান বাকিটা আর শুনতে চায় না।  

রেহানের মা শামসুন নাহার কঠিন চিত্তের মানুষ— উদ্বিগ্ন চোখে-মুখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছেন স্বামীর শয্যার পাশে। গত চার মাসের মধ্যে কখনও এমন হয়নি। এই স্থবির মুহূর্তে কী করণীয় বা কাকেইবা ডাকবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ছোটো ছেলে সঙ্গে নেই, ওর বোর্ড পরীক্ষা চলছে। বড়ো ছেলেও আর কী এমন বড়ো! ছাত্র বলে সংসারের দায়িত্বের বোঝা তো সেভাবে কাঁধে ওঠেনি। তাই তিনি সকল কাজে আস্থা ও ভরসা হিসেবে একমাত্র মেয়ের জামাইকেই কাছে ডেকে নেন।

শীতল স্বরেই বললেন, ...মাহবুব... এদিকে আসো বাবা। দ্যাখো তো ডাক্তাররা কী বলছে? ওদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু হয়েছে। ডায়ালাইসিস বন্ধ কেন? তোমার শ্বশুরের অবস্থা মনে হয় ভালো নয়। যা করার কিছু একটা করো বাবা। 

কেমন ধীর-শান্ত কণ্ঠে শক্ত কথাগুলো বললেন শামসুন নাহার। অনেকগুলো বছর ঘরে-বাইরে দৌড়-ঝাঁপ করে তিনি যেন আজ অনেকটাই পাষাণ-পাথর। 

রেহানের বোনের আশঙ্কাই ঠিক। ডাক্তারদের খানিক অবহেলার পরই জানা গেল আবদুল আউয়াল ডায়ালাইসিস চলাকালীন স্ট্রোক করেছেন। কর্তব্যরত ডাক্তার পরামর্শ দিলেন এখনই সিটিস্ক্যান করাতে হবে। ডায়ালাইসিস চলতে থাকলে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারত। তাই আপাতত সেসব বন্ধ আছে।

রাস্তার অপর ধারের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দ্রুতই নিয়ে যাওয়া হলো মানুষটাকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যখন সিটিস্ক্যান রিপোর্ট হাতে পাওয়া গেল তাতে ভালো কিছু লেখা ছিল না। তাঁকে জরুরি এডমিট করা প্রয়োজন। রাত দশটার মধ্যেই আবদুল আউয়ালের নিথর শরীরটা নিয়ে সবাই ছুটে গেল হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। হাসপাতালে আনার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রেহান চরম এক ঘোরের মধ্যে ছিল। ওর বর্তমানের সময়টা ভীষণভাবে তছনছ হয়ে যাচ্ছে এ উপলব্ধিটাও যেন নেই। শুধু মনে আছে রাতেই মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের একজন ডাক্তারের অধীনে আবদুল আউয়াল ভর্তি হয়ে গেলেন সেখানে।

একটা জরুরি দরকারে বেশ কিছুদিন আগে একবার এখানে এসেছিল রেহান। ব্যবসার কাজ গোছানোর ক্ষেত্রে বাবার মৃত্যুসনদটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কোথায় যে খুব যত্ন করে রেখেছিল এখন আর মনে পড়ছে না কিছুতেই। ওরই এক ছোটো বোন সেখানে সাইকিয়াট্রির ডাক্তার। একদিন রাতে জিজ্ঞেস করেছিল, মধুরিমা, আব্বার মৃত্যুসনদটা খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও; নতুন আরেকটা সনদ দরকার। তোমাদের ওখানে কি পাওয়া যাবে?

ভাইয়া, চাচা তো অনেক আগে মারা গেছেন। প্রায় বিশ বছর আগের ডকুমেন্টস এখন পাওয়া যাবে কি না কে জানে! তবু সংশয়ের মধ্যেই জানাল, আমি খোঁজ নিয়ে আপনাকে দ্রুতই জানাব।

ঠিক আছে, ভালো করে খুঁজে দেখো। তোমাদের নিয়মের মধ্যে যেভাবে পাওয়া যায় আমি না হয় সেভাবেই ব্যবস্থা করব। 

মধুরিমা তারপর খুব তাড়াতাড়িই বিষয়টি জানিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আবদুল আউয়ালের এডমিশনের তথ্যটি পাওয়া গেছে। তবে রিলিজের বিষয়টি পাওয়া যায়নি। তার ভিত্তিতেই মৃত্যুসনদ নতুন করে ইস্যু করা যাবে।

কথামতো একদিন চলেও গিয়েছিল রেহান। সেদিনও প্রবল শূন্যতার ভেতর আজকের মতো এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়েছিল। চারদিকে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য, মানুষের অবিরাম আনাগোনা, দিনের চলমান ব্যস্ততা। হাসপাতাল পরিচালকের অনুমতি নিয়ে টাকা জমা দিয়ে মেডিকেল শাখা থেকে রেহান মৃত্যুসনদটা নিয়েছিল। আর কৌতূহলবশে একতলার বারান্দা ধরে খুঁজে আসতে চেয়েছিল সেই পরিচিত শোকজমা জায়গাটি। না, অনেক মানুষের ভিড়ে সেই স্মৃতি আর মাড়ানো হয়নি— সেদিনও অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে।  

রেহান আজ অনেক পরিণত ও প্রতিষ্ঠিত। চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে, মস্তিষ্কে অনেক স্মৃতিও জমেছে। ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কথায় সেদিনের বিপর্যস্ত রেহান আবার যেন বর্তমানে ফিরে এলেন। স্মৃতির দোলাচলে এদিকে সময় হোঁচট খাচ্ছে বারবার। তবু তিনি শান্ত, কিছুটা কি অপ্রকৃতিস্থ? রেহান তো আজ গুরুগম্ভীর রেহানউদ্দিন।

স্যার, অনেকক্ষণ ধরে আপনি জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবছেন! আর বিড়বিড় করছেন।

না, কই? এই তো চলুন... কোনদিকে যাব আমরা?

একটু এগিয়ে গেলে বাঁয়েই চেয়ারম্যান স্যারের দপ্তর। আমরা আগে ওখানেই যাব।

ঠিক আছে, চলুন...।

রেহানউদ্দিনের মনে আজ অন্যরকম ঘোর। মনটা বারবার বাঁয়ের সেই বারান্দা ধরে সেদিকেই যেতে চাইছে। চব্বিশ বছর আগে ওদিকের কোণের একটি কক্ষে শেষ নিশ্বাস রেখে গিয়েছিলেন আবদুল আউয়াল। তখন খুব ভোরবেলা। বাতাসে যখন ফজরের আজান ভাসছিল চারপাশে, মৃদৃমন্দ শীতল হাওয়া ছিল চরাচরের সর্বত্র, এমন সময়ে খুব ছোট্ট একটি নিশ্বাস গোপনে মিশে গিয়েছিল বিশ্বচরাচরের তুমুল বাতাসের মধ্যে। এমনই এক সকালবেলা ছিল সেদিন— যেদিন উজ্জ্বল আলোর ছড়াছড়ি ছিল পৃথিবীময়। মানুষের আনাগোনা ও সপ্রাণ ব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎই এক ঘোরতম বিপদ ও জীবনের তুমুল অনিশ্চয়তায় ডুবে গিয়েছিল রেহান। আজ রেহানউদ্দিনের বারবার মনে হলো, সেই বাতাসটুকু কি এখনও আছে? চব্বিশ বছর ধরে কি অবিকল খেলা করছে হাসপাতালের এই প্রাঙ্গন ধরে, চমৎকার একফালি বারান্দাজুড়ে?

পাশ থেকে কেউ একজন বলল, স্যার বোধহয় বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন। আপনি কি আগেও কোনোদিন এখানে এসেছিলেন?

রেহানউদ্দিন কোনো জবাব দিলেন না। হাসপাতালের ডাক্তার, অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আজ মধুরিমাও এসেছে। নিজ আত্মীয় বা বড়ো ভাইকে বরণ করার জন্য সে আসেনি। হাসপাতালে যোগদান করতে আসা নতুন পরিচালককে বরণ করতে অন্য সবার মতো সেও সেখানে উপস্থিত। তবে লোকজনের ভিড়ের মধ্যে তেমন কিছুই বলছে না। শুধু হাসপাতালের করিডোরের ভিড়ের মধ্যে ফিরে গেছে দুঃসহ কোনো স্মৃতির মধ্যে।

চেয়ারম্যানের দপ্তর ছাড়িয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পরিচিত বারান্দা ধরে রেহানউদ্দিন আরেকটু এগিয়ে গেলেন। হাসপাতালের চেয়ারম্যান তখনও এসে পৌঁছাননি। তাই সবাই এদিক-ওদিক ইতস্তত দাঁড়িয়ে। রেহানউদ্দিন এগিয়ে গিয়ে একটি কক্ষের সামনে থামলেন। তাঁর পিছু পিছু কয়েকজন ছুটে গেলেন। তাদের একজনকে প্রশ্ন করলেন, এখানে বোধহয় একটি কেবিন ছিল আগে। নম্বরটি মনে নেই। সেটি কি এখন নেই?

রেহানের স্পষ্ট মনে পড়ছে বারান্দাঘেঁষে ঠিক এখানটাতেই ছিল। কক্ষের সামনে এই তো প্রশস্ত বারান্দা— যেখানে চাদর পেতে রেহান ও ওর ভগ্নীপতি ভোরবেলা শুয়ে ছিল। ভোরের আলো ফোটার সময় একটা-দুটো কাক ডাকছিল তখন। অথচ এখন সব ঝকঝকে নতুন— অফিসের মতন চেহারা।

যে মানুষটি ফুলহাতে বরণ করে রেহানউদ্দিকে এতক্ষণ সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে সে বলল, নিচতলার বারান্দার বাঁ দিকটায় পরিচালকদের বসার জন্য নতুন অফিস করা হয়েছে। আর রেহানউদ্দিন ছলছল চোখে যে ঘরটিকে ইঙ্গিত করে দেখাচ্ছেন ওটাই তাঁর বসবার নতুন জায়গা। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬


অনিঃশেষ স্মৃতির ভেতর

প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

চোখ বন্ধ করলে কেবল একটাই দৃশ্য কিংবা এমনও হতে পারে যে বন্ধ নয়, চোখের সামনেই ঘটমান বর্তমানের মতো দৃশ্যটা উজ্জ্বল স্থির। কতগুলো বছর কেটে গেল তবু মস্তিষ্ক ঘটনাটিকে এক মুহূর্তের জন্যও মুছে দেয়নি রেহানের মন থেকে। হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্ট্রেচারে শুয়ে আছে একটা নিথর শরীর। রেহান গত চব্বিশ বছর ধরে স্মৃতিরূপী সেই হিমশীতল নিথর শরীরটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। কখনও কখনও একটা সুতীব্র গন্ধও নাকে এসে ঠেকে রেহানের। গন্ধটা মগজ অবশ করে দেওয়া দোলনচাঁপা ফুলের সুগন্ধের মতো। 

আজকাল যেকোনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়ালেই এমন সুগন্ধের অস্তিত্ব টের পান রেহানউদ্দিন। তাঁর মস্তিষ্কের কোষগুলো কি উল্টো সিগনাল দিতে শুরু করেছে? মধুরিমার সঙ্গে দেখা হলে অবশ্যই জিজ্ঞেস করে নেবে যে, কোনো পুরানো স্মৃতি এমন গন্ধবাহী আচরণ করতে পারে কি না!


সেদিন সোমবারের বিকেল। বারডেম হাসপাতালের চৌদ্দতলা থেকে লিফটে নিচে নামার সময় ছলছল চোখে রেহানের বড়ো বোন বলেছিল, আব্বার অবস্থা বেশি ভালো নয়। হাত-পা ফুলে উঠেছে। হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত দুই পায়ের চামড়ায় লাল ছোপ ছোপ দাগ। ডাক্তার আজ সকালেই বলেছে, রেনাল ফেইলিউর— অবস্থা সংকটজনক। দ্রুত ডায়ালাইসিস শুরু করা প্রয়োজন। 

রেহান শুধু এক আকাশ শূন্যতা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। আবদুল আউয়াল গত সাতদিন ধরে চৌদ্দতলার একটা কেবিনে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা নিয়ে ভর্তি আছেন। ডায়ালাইসিস ব্যাপারটা কী এটা ও তখনও ভালো করে জানে না। কিছুদিন ধরে সেভাবেই চলল। 

রেহানের ফাইনাল পরীক্ষা সামনে— অনার্স থার্ড ইয়ার। ইনকোর্স, টিউটোরিয়াল, ক্লাস পার্সেন্টেজ নিয়ে ব্যস্ততা একেবারে কম নয়। তবু ক্লাসের ফাঁকে সময় করে দুপুর কিংবা বিকেলে ঠিকই বাবাকে নিয়ে যেত বারডেমে, কখনও অন্য হসপিটালে। ডাক্তাররা যখন যেটা পরামর্শ দিতেন সে অনুযায়ী নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হতো। স্মৃতিগুলো এখনও ঠিক মনে আছে রেহানের। তারপর একদিন শুরু হলো ডায়ালাইসিস। সপ্তাহে দুদিন— রবি আর বৃহস্পতিবার হলেই দ্রুত ক্লাস শেষ করে তাড়াহুড়ো দুপুরের পরপরই চলে যেত বাসায়। অসুস্থ বাবাকে ট্যাক্সিতে চড়িয়ে সরাসরি নিয়ে যেত ধানমন্ডিতে। রেহানরা দুই ভাইই তখন ছাত্র। কী ভীষণ আর্থিক টানাপড়েন! একদিকে সামাল দিতে গেলে আরেকদিক শূন্য হয়ে যায়। তবু বেঁচে থাকার জন্য এমন সংকটেই ঝাঁপিয়ে পড়ল রেহান।

ডায়ালাইসিস শুরুর পর তখন কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। একদিন রোববার। ডায়ালাইসিস সেন্টারের ইনচার্জ ডাক্তার সাখাওয়াত অন্য একজন ডাক্তারকে দায়িত্ব দিলেন পেশেন্টের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যেন যথারীতি ডায়ালাইসিস শুরু করা হয়। রেহানের মা, বোন দুজনেই এসেছেন। একমাত্র ভগ্নীপতিও তখন বাইরে অপেক্ষায়। ডায়ালাইসিস শেষ হওয়ার পর পেশেন্টের শরীর খুব দুর্বল হয়ে ওঠে। চার ঘণ্টার ধকল শরীরে নেওয়া যায় না। বিপর্যস্ত শরীরে আবদুল আউয়াল সেটা নিতেও পারেন না। তবু স্বস্তির মধ্যে এতটুকুই হয়তো পরের কয়েকটা দিন তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করবেন। আর মন্দের ভালো হিসেবে পরিবারের ছোটোখাটো একটা জমায়েত হয়ে যেত সেখানে। এমন সংকটময় মুহূর্তে সবাই একসঙ্গে থাকলে সেটা পরিবারের মনোবল বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। 

একজন কমবয়সি ডাক্তার সমস্ত কিছু ঠিকঠাক করে পেশেন্টকে শুইয়ে দিলেন বিছানায়। তারপর ব্লাড প্রেশার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নিরীক্ষা শেষ করে ডায়ালাইসিস শুরু হলো। চৌকোমতো বিশাল মেশিনটা দেখতে ভয়ংকর— শরীরের দূষিত রক্ত একদিকে নলের মাধ্যমে বের হয়ে পরিশোধিত হয়ে আবার অন্য একটি নলের মাধ্যমে শরীরের ভেতর প্রবেশ করছে বিশুদ্ধ রক্ত হিসেবে। কিডনির ছাঁকার কাজটা হচ্ছে মেশিনে। শরীরে নিশ্চয় ঝিমঝিম অনুভূতি হয়; কারণ আবদুল আউয়াল মাঝে মাঝেই থরথর করে কাঁপলেন। কয়েকবার তাঁর প্রেশার কমে গেল। হালকা খিঁচুনি দিয়ে একবার মুখ বাঁকা করলেন। 

পেশেন্টের বেড থেকে অদূরেই বসে আছে রেহানের মা ও বোন। বিষণ্ন ও ক্লান্তিকর মুখ দুজনের। নিচু স্বরে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। এসব রেহান চোখে সহ্য করতে পারে না। তাই ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চুপচাপ বসে ভিড় দেখছিল রাস্তার।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। নার্স স্টেশনে কর্তব্যরত ডাক্তার ও কয়েকজন নার্স মিলে বসে সন্ধ্যার চা-সিঙ্গারা খাচ্ছিল। মৃদু আলাপচারিতার মধ্যেই কখনও চাপাস্বরে হাসি। বাইরে হেঁটে এসে রেহান আবদুল আউয়ালের বেডের পাশে দাঁড়াতেই মনে হলো কোনো অস্বাভাবিক কিছু ঘটে গেছে ততক্ষণে। শরীরে হালকা খিঁচুনির পর তাঁর ঠোঁট যেন ক্রমেই বেঁকে উঠছে এবং এর মধ্যেই তিনি বুঝি অস্ফুট মুখে কিছু বলতে চাইছেন। চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছে।  

রেহানের বুকটায় ধড়াস করে উঠল। বুকের ধুঁকপুকানি নিয়ে কাউকে ডাকবে কি না ভাবতেই দেখল ওর বড়ো বোনেরও বিষয়টি নজর এড়ায়নি। তারা দৌড়ে গেল ডাক্তারের কাছে। চোখে মুখে অসহায় উদ্বিগ্নতা নিয়েই জানাল... প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন... কিছু একটা করুন... পেশেন্ট যেন কেমন করছে!

ডাক্তার ও নার্সদের মধ্যে চাপা হুল্লোড়ের রেশ তখনও কাটেনি। সেদিন সেন্টারে আরও বেশ কয়েকজন ক্রিটিকাল পেশেন্ট ভর্তি ছিল। এসব দেখে দেখে তারাও অভ্যস্ত। তাই কিছুটা বিরক্তি নিয়েই ডাক্তার জানাল, ঠিক আছে যান, অত আতঙ্কিত হবার কিছু নেই... আমরা দেখছি। 

রেহানের চোখ দুটো তখন জলে ঝাপসা। বারান্দার কাছাকাছি কোথাও একঝাড় দোলনচাঁপা ফুটেছিল। সেদিন থেকেই ফুলের সুগন্ধটা মনের ভেতর এপিটাফ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


অসংলগ্ন চিন্তার মধ্যেই সেই ভয়াল কণ্ঠের কাতর আর্তিটা প্রতিধ্বনির মতো আবারও ফিরে এলো অনেকদিন পর। জিপ থেকে নেমে তবু ধাতস্থ হয়ে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন রেহানউদ্দিন। আজকের দিনটি অন্যরকম হলেও চারপাশের চিরচেনা পরিবেশের ওপর পুরানো স্মৃতির পর্দা খুব পাতলা আবরণ ফেলে যাচ্ছে। ফলে বদলে যাওয়া পরিবেশও আগের মতোই লাগছে রেহানউদ্দিনের। পুরো প্রাঙ্গণ যথেষ্ট গোছানো। এটা আজই এমন পরিপাটি করে রাখা হয়েছে কি না কে জানে! এছাড়া হাসপাতালের একধারে মেডিকেল কলেজ— সাদা এপ্রোন পরা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কত প্রাণচাঞ্চল্য! ঘুরেফিরে এসব দেখতেই দুজন ভদ্রলোক স্মিতহেসে ফুল হাতে তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন।

সম্ভাষণ জানিয়ে ফুল হাতে দিয়েই বললেন, চলুন স্যার আমাদের সঙ্গে। জরুরি বিভাগ পেরিয়ে বাঁ দিকে চেয়ারম্যান স্যারের অফিস। ওখানে অপেক্ষা করা যেতে পারে। রেহানউদ্দিন শুধু তাদের অনুসরণ করলেন।

জরুরি বিভাগের দরজাটা পেরোতেই বহুদিন পর একই আর্তনাদ আবারও শুনতে পেলেন রেহানউদ্দিন। ওর স্মৃতিতে তীব্রভাবে আঘাত করে সেটা এসে মুখ থুবড়ে পড়ল কাছাকাছি কোথাও। একজন নারীর আর্তকণ্ঠে ছুটোছুটি, চিৎকার। 

ডাক্তার, প্লিজ... কিছু একটা করুন। বাবা যেন কেমন করছেন... আমার বাবা বেঁচে আছে তো?

চলমান সময়ের মধ্যে একটা ঘোরতর নিস্তব্ধতার মধ্যে ডুবে গেলেন রেহানউদ্দিন। অতীতের সাথে হঠাৎ বর্তমানের একটা যোগসূত্র তৈরি হলো। তিনি যেন শুনতে পেলেন, তাঁর বড়ো বোন রুনি ধরাকণ্ঠে ক্রমাগত ডাকছে। 

রেহান...তাড়াতাড়ি আয়... আব্বা এমন করছে কেন? ডায়ালাইসিস কি বন্ধ? তবে কি আব্বা স্ট্রোক... না, রেহান বাকিটা আর শুনতে চায় না।  

রেহানের মা শামসুন নাহার কঠিন চিত্তের মানুষ— উদ্বিগ্ন চোখে-মুখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছেন স্বামীর শয্যার পাশে। গত চার মাসের মধ্যে কখনও এমন হয়নি। এই স্থবির মুহূর্তে কী করণীয় বা কাকেইবা ডাকবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ছোটো ছেলে সঙ্গে নেই, ওর বোর্ড পরীক্ষা চলছে। বড়ো ছেলেও আর কী এমন বড়ো! ছাত্র বলে সংসারের দায়িত্বের বোঝা তো সেভাবে কাঁধে ওঠেনি। তাই তিনি সকল কাজে আস্থা ও ভরসা হিসেবে একমাত্র মেয়ের জামাইকেই কাছে ডেকে নেন।

শীতল স্বরেই বললেন, ...মাহবুব... এদিকে আসো বাবা। দ্যাখো তো ডাক্তাররা কী বলছে? ওদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু হয়েছে। ডায়ালাইসিস বন্ধ কেন? তোমার শ্বশুরের অবস্থা মনে হয় ভালো নয়। যা করার কিছু একটা করো বাবা। 

কেমন ধীর-শান্ত কণ্ঠে শক্ত কথাগুলো বললেন শামসুন নাহার। অনেকগুলো বছর ঘরে-বাইরে দৌড়-ঝাঁপ করে তিনি যেন আজ অনেকটাই পাষাণ-পাথর। 

রেহানের বোনের আশঙ্কাই ঠিক। ডাক্তারদের খানিক অবহেলার পরই জানা গেল আবদুল আউয়াল ডায়ালাইসিস চলাকালীন স্ট্রোক করেছেন। কর্তব্যরত ডাক্তার পরামর্শ দিলেন এখনই সিটিস্ক্যান করাতে হবে। ডায়ালাইসিস চলতে থাকলে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারত। তাই আপাতত সেসব বন্ধ আছে।

রাস্তার অপর ধারের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দ্রুতই নিয়ে যাওয়া হলো মানুষটাকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যখন সিটিস্ক্যান রিপোর্ট হাতে পাওয়া গেল তাতে ভালো কিছু লেখা ছিল না। তাঁকে জরুরি এডমিট করা প্রয়োজন। রাত দশটার মধ্যেই আবদুল আউয়ালের নিথর শরীরটা নিয়ে সবাই ছুটে গেল হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। হাসপাতালে আনার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রেহান চরম এক ঘোরের মধ্যে ছিল। ওর বর্তমানের সময়টা ভীষণভাবে তছনছ হয়ে যাচ্ছে এ উপলব্ধিটাও যেন নেই। শুধু মনে আছে রাতেই মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের একজন ডাক্তারের অধীনে আবদুল আউয়াল ভর্তি হয়ে গেলেন সেখানে।


একটা জরুরি দরকারে বেশ কিছুদিন আগে একবার এখানে এসেছিল রেহান। ব্যবসার কাজ গোছানোর ক্ষেত্রে বাবার মৃত্যুসনদটা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কোথায় যে খুব যত্ন করে রেখেছিল এখন আর মনে পড়ছে না কিছুতেই। ওরই এক ছোটো বোন সেখানে সাইকিয়াট্রির ডাক্তার। একদিন রাতে জিজ্ঞেস করেছিল, মধুরিমা, আব্বার মৃত্যুসনদটা খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও; নতুন আরেকটা সনদ দরকার। তোমাদের ওখানে কি পাওয়া যাবে?

ভাইয়া, চাচা তো অনেক আগে মারা গেছেন। প্রায় বিশ বছর আগের ডকুমেন্টস এখন পাওয়া যাবে কি না কে জানে! তবু সংশয়ের মধ্যেই জানাল, আমি খোঁজ নিয়ে আপনাকে দ্রুতই জানাব।

ঠিক আছে, ভালো করে খুঁজে দেখো। তোমাদের নিয়মের মধ্যে যেভাবে পাওয়া যায় আমি না হয় সেভাবেই ব্যবস্থা করব। 

মধুরিমা তারপর খুব তাড়াতাড়িই বিষয়টি জানিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আবদুল আউয়ালের এডমিশনের তথ্যটি পাওয়া গেছে। তবে রিলিজের বিষয়টি পাওয়া যায়নি। তার ভিত্তিতেই মৃত্যুসনদ নতুন করে ইস্যু করা যাবে।

কথামতো একদিন চলেও গিয়েছিল রেহান। সেদিনও প্রবল শূন্যতার ভেতর আজকের মতো এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়েছিল। চারদিকে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য, মানুষের অবিরাম আনাগোনা, দিনের চলমান ব্যস্ততা। হাসপাতাল পরিচালকের অনুমতি নিয়ে টাকা জমা দিয়ে মেডিকেল শাখা থেকে রেহান মৃত্যুসনদটা নিয়েছিল। আর কৌতূহলবশে একতলার বারান্দা ধরে খুঁজে আসতে চেয়েছিল সেই পরিচিত শোকজমা জায়গাটি। না, অনেক মানুষের ভিড়ে সেই স্মৃতি আর মাড়ানো হয়নি— সেদিনও অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে।  


রেহান আজ অনেক পরিণত ও প্রতিষ্ঠিত। চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে, মস্তিষ্কে অনেক স্মৃতিও জমেছে। ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কথায় সেদিনের বিপর্যস্ত রেহান আবার যেন বর্তমানে ফিরে এলেন। স্মৃতির দোলাচলে এদিকে সময় হোঁচট খাচ্ছে বারবার। তবু তিনি শান্ত, কিছুটা কি অপ্রকৃতিস্থ? রেহান তো আজ গুরুগম্ভীর রেহানউদ্দিন।

স্যার, অনেকক্ষণ ধরে আপনি জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবছেন! আর বিড়বিড় করছেন।

না, কই? এই তো চলুন... কোনদিকে যাব আমরা?

একটু এগিয়ে গেলে বাঁয়েই চেয়ারম্যান স্যারের দপ্তর। আমরা আগে ওখানেই যাব।

ঠিক আছে, চলুন...।

রেহানউদ্দিনের মনে আজ অন্যরকম ঘোর। মনটা বারবার বাঁয়ের সেই বারান্দা ধরে সেদিকেই যেতে চাইছে। চব্বিশ বছর আগে ওদিকের কোণের একটি কক্ষে শেষ নিশ্বাস রেখে গিয়েছিলেন আবদুল আউয়াল। তখন খুব ভোরবেলা। বাতাসে যখন ফজরের আজান ভাসছিল চারপাশে, মৃদৃমন্দ শীতল হাওয়া ছিল চরাচরের সর্বত্র, এমন সময়ে খুব ছোট্ট একটি নিশ্বাস গোপনে মিশে গিয়েছিল বিশ্বচরাচরের তুমুল বাতাসের মধ্যে। এমনই এক সকালবেলা ছিল সেদিন— যেদিন উজ্জ্বল আলোর ছড়াছড়ি ছিল পৃথিবীময়। মানুষের আনাগোনা ও সপ্রাণ ব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎই এক ঘোরতম বিপদ ও জীবনের তুমুল অনিশ্চয়তায় ডুবে গিয়েছিল রেহান। আজ রেহানউদ্দিনের বারবার মনে হলো, সেই বাতাসটুকু কি এখনও আছে? চব্বিশ বছর ধরে কি অবিকল খেলা করছে হাসপাতালের এই প্রাঙ্গন ধরে, চমৎকার একফালি বারান্দাজুড়ে?

পাশ থেকে কেউ একজন বলল, স্যার বোধহয় বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন। আপনি কি আগেও কোনোদিন এখানে এসেছিলেন?

রেহানউদ্দিন কোনো জবাব দিলেন না। হাসপাতালের ডাক্তার, অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আজ মধুরিমাও এসেছে। নিজ আত্মীয় বা বড়ো ভাইকে বরণ করার জন্য সে আসেনি। হাসপাতালে যোগদান করতে আসা নতুন পরিচালককে বরণ করতে অন্য সবার মতো সেও সেখানে উপস্থিত। তবে লোকজনের ভিড়ের মধ্যে তেমন কিছুই বলছে না। শুধু হাসপাতালের করিডোরের ভিড়ের মধ্যে ফিরে গেছে দুঃসহ কোনো স্মৃতির মধ্যে।

চেয়ারম্যানের দপ্তর ছাড়িয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পরিচিত বারান্দা ধরে রেহানউদ্দিন আরেকটু এগিয়ে গেলেন। হাসপাতালের চেয়ারম্যান তখনও এসে পৌঁছাননি। তাই সবাই এদিক-ওদিক ইতস্তত দাঁড়িয়ে। রেহানউদ্দিন এগিয়ে গিয়ে একটি কক্ষের সামনে থামলেন। তাঁর পিছু পিছু কয়েকজন ছুটে গেলেন। তাদের একজনকে প্রশ্ন করলেন, এখানে বোধহয় একটি কেবিন ছিল আগে। নম্বরটি মনে নেই। সেটি কি এখন নেই?

রেহানের স্পষ্ট মনে পড়ছে বারান্দাঘেঁষে ঠিক এখানটাতেই ছিল। কক্ষের সামনে এই তো প্রশস্ত বারান্দা— যেখানে চাদর পেতে রেহান ও ওর ভগ্নীপতি ভোরবেলা শুয়ে ছিল। ভোরের আলো ফোটার সময় একটা-দুটো কাক ডাকছিল তখন। অথচ এখন সব ঝকঝকে নতুন— অফিসের মতন চেহারা।

যে মানুষটি ফুলহাতে বরণ করে রেহানউদ্দিকে এতক্ষণ সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে সে বলল, নিচতলার বারান্দার বাঁ দিকটায় পরিচালকদের বসার জন্য নতুন অফিস করা হয়েছে। আর রেহানউদ্দিন ছলছল চোখে যে ঘরটিকে ইঙ্গিত করে দেখাচ্ছেন ওটাই তাঁর বসবার নতুন জায়গা। 



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত