শতভাগ বাস্তবায়নে বিএনপি অঙ্গীকারাবদ্ধ: সরকারি দল
জনগণের রায়ের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে: বিরোধী দল
জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ ও জুলাই আন্দোলন নিয়ে আবারো পাল্টাপাল্টি বিতর্ক হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দলীয় জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোটের সদস্যরা এই বিতর্কে অংশ নেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। অন্যদিকে জুলাই সনদের নির্দেশনা অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা।
রোববার (৫ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত মূলতুবি প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা যুক্তি, পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে মূলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সরকারি দলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ ‘ভবিষ্যতের পথ রেখা’-একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইন-কানুন প্রণয়ন, সংশোধন, সংযোজন পরিমার্জনের বিষয়ে প্রস্তাব’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ব্যারিষ্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, আখতার হোসেন, কাজী এনামুল হক, মীর মো. হেলালউদ্দিন, মসিউর রহমান প্রমূখ।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিরোধী দলের গণভোটের প্রস্তাবকে সরাসরি ‘সংবিধানের ওপর প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। এসময় পানের বিড়ায় ভালো পানের ভেতরে পচা পান লুকিয়ে রাখার গল্পের উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, আইনের ক্ষমতা না থাকলেও আছে বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ বা চাতুর্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের কোনো সুযোগ নেই। জুলাই সনদ একটি স্ব-ব্যাখ্যায়িত দলিল এবং এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এই সনদের ভেতরেই স্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে।
আইনমন্ত্রী সংস্কার ও সংশোধনের আইনি মারপ্যাঁচ নিয়ে বলেন, এভরি অ্যামেন্ডমেন্ট অফ দি কনস্টিটিউশন ইজ এ রিফর্ম, বাট এভরি রিফর্ম ইজ নট অ্যান অ্যামেন্ডমেন্ট। জনআকাঙ্ক্ষা থেকে রিফর্ম আসতে পারে, কিন্তু তাকে আইনি রূপ দিতে হলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারেই সংসদে সংশোধন করতে হবে। এর বাইরে অন্য কোনো ফরম্যাট বা শর্টকাট নেই।
ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের এই সংসদ। তাই জুলাই যোদ্ধাদের দাবির বিষয়ে সরকারকে আরো ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। একই সঙ্গে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ‘সংস্কার পরিষদ’ নয়, বরং সংবিধানের রীতিনীতি মেনেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন।
বক্তব্যের শুরুতে পার্থ বলেন, ‘আমাদের জুলাই যোদ্ধাদের সাথে ডিল করার জন্য আরও অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। উনারা আহত হয়েছেন, অনেকে নিহত হয়েছেন। উনারা মূল্য দিয়েছেন বলেই আমরা আজ এখানে আছি। তাই আমাদের সহ্য ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।’
৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে একটি কোয়াজাই কনস্টিটিউশনাল (আধা-সাংবিধানিক) পরিস্থিতি ছিল। কারণ আমাদের সংবিধানে বলা নেই যে প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেলে কী করতে হবে। সংবিধানে গ্যাপ ছিল বলেই অনেক কিছু করতে হয়েছে। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই।
সংস্কার ও সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জবাবে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, সংস্কার আর সংশোধনের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। আমরা চাচ্ছি জুলাই সনদের বিষয়গুলো সংবিধানের ভেতরে থেকেই আসবে এবং সাংবিধানিক রীতিনীতি মেনেই আসবে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে অন্য কিছুর পায়তারা করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে শব্দের মারপ্যাঁচ দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
আইন না বুঝে গণভোট বা সংবিধান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সমালোচনা করে আন্দালিব পার্থ একটি রূপক গল্প শোনান। তিনি বলেন, ‘এক আইন ছিল অতিথি পাখি মারলে ১০ বছর জেল। এখন একজনের বাড়ির মুরগি প্রতিবেশী জবাই করে খেয়ে ফেলেছে। সেই প্রতিবেশী মামলা ঠুকে দিল ১০ বছরের জেলের দাবিতে, কারণ তার যুক্তি-মুরগিও তো এক প্রকার পাখি আর অন্যের বাড়িতে সে ছিল অতিথি! যারা আইন বোঝেন না, তাদের এভাবে বারবার বোঝানো বৃথা।’
বিরোধী দলের সমালোচনা করে পার্থ বলেন, আপনারাই একমাত্র জুলাইয়ের টেন্ডার নিয়েছেন বিষয়টি এমন নয়। আমরা গণভোট মানি কারণ আমরা জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করি। আমাদের সংসদ নেতাও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। ২১৭টা সিট নিয়ে আমরা এই সংসদে এসেছি আইন পরিবর্তন ও সংশোধনের জন্য। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই আমরা সংবিধানের ভেতর থেকে পরিবর্তন করব। তিনি বলেন, যে সংবিধান জনগণের কথা বলে না, জনগণ সেই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আমরা জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে চাই এবং সবাইকে সাথে নিয়েই এই পথ চলতে চাই।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ঐক্যমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ধাপগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন বিএনপি সেই আলোচনা থেকে পিছিয়ে গিয়ে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম’ বা পুরোনো অবস্থায় ফিরে যেতে চাইছে।
এনসিপি নেতা আরও বলেন, গত ৩১ জুলাই ঐক্যমত্য কমিশনে যখন সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা শেষ হলো, সেদিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথরেখা নিয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল। কিন্তু আজকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, সেই আলোচনার ফলাফল বিএনপি মানতে চাইছে না। সংস্কারের ঘোড়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু এখন তাকে লাগাম পরানোর চেষ্টা চলছে।
সংসদ প্লাজার সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে একটি বিশেষ ‘নোট’ অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে তদন্ত দাবি করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ঐক্যমত্য কমিশন আমাদের যে খসড়া দিয়েছিল, সেখানে কোনো নোটের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো সেখানে বিশেষ একটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা দল ইতিহাস বিকৃত করে এই নোটটি সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমরা তদন্ত করে বের করতে চাই, কারা এই কাজ করেছে।
সংবিধানের বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ৫ আগস্টের পর একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা সংবিধান পুরোপুরি মানতেও পারছি না, আবার পুরোপুরি ছাড়তেও পারছি না। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি বা অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগ—এগুলো কোনো প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে হয়েছিল। সেই জনগণের অভিপ্রায়কে টেকসই করতেই ‘জুলাই সনদ আদেশ’ জারি করা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবটি গ্রহণ না করার জন্য স্পিকারের প্রতি বিনীত আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, আজকে স্বাধীন সার্বভৌমে শুধু জুলাই আগস্ট বিপ্লবের যোদ্ধাদের স্মরণ না, আমরা স্মরণ করি ১৭ বছরে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন সংগ্রাম করার সাহস দিয়েছেন উনি আজকে আমাদের সংসদের নেতা প্রধানমন্ত্রী। এই সংসদে চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এই চোখ কান দিয়ে ১৯৭১ সালে কারা পাকিস্তান বাহিনীর সাথে আঁতাত করে সেদিন স্বাধীনতার যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন আজকে তাদের স্মরণ করতে হবে।
জয়নুল আবদিন ফারুক আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন, একদিন জিরো আওয়ার করেন। কার দোষ কার দোষ না সেগুলা বলার সময় পাব। তাই আজ জুলাই বিপ্লবের যে মূলতুবি প্রস্তাবটা আমি এনেছি সেটা আমরা আমাদের দল, আমাদের সংসদীয় দল আমরা ঠিক করেছি- একটা অক্ষরও বাদ যাবে না। দেখেন বইতে কি লেখা আছে- এক হইতে ৩৬ পর্যন্ত প্রত্যেকখানে নোট অফ ডিসেন্ট লেখা আছে।

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬
শতভাগ বাস্তবায়নে বিএনপি অঙ্গীকারাবদ্ধ: সরকারি দল
জনগণের রায়ের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে: বিরোধী দল
জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ ও জুলাই আন্দোলন নিয়ে আবারো পাল্টাপাল্টি বিতর্ক হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দলীয় জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোটের সদস্যরা এই বিতর্কে অংশ নেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। অন্যদিকে জুলাই সনদের নির্দেশনা অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা।
রোববার (৫ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত মূলতুবি প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা যুক্তি, পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে মূলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সরকারি দলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ ‘ভবিষ্যতের পথ রেখা’-একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইন-কানুন প্রণয়ন, সংশোধন, সংযোজন পরিমার্জনের বিষয়ে প্রস্তাব’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ব্যারিষ্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, আখতার হোসেন, কাজী এনামুল হক, মীর মো. হেলালউদ্দিন, মসিউর রহমান প্রমূখ।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিরোধী দলের গণভোটের প্রস্তাবকে সরাসরি ‘সংবিধানের ওপর প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। এসময় পানের বিড়ায় ভালো পানের ভেতরে পচা পান লুকিয়ে রাখার গল্পের উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, আইনের ক্ষমতা না থাকলেও আছে বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ বা চাতুর্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের কোনো সুযোগ নেই। জুলাই সনদ একটি স্ব-ব্যাখ্যায়িত দলিল এবং এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এই সনদের ভেতরেই স্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে।
আইনমন্ত্রী সংস্কার ও সংশোধনের আইনি মারপ্যাঁচ নিয়ে বলেন, এভরি অ্যামেন্ডমেন্ট অফ দি কনস্টিটিউশন ইজ এ রিফর্ম, বাট এভরি রিফর্ম ইজ নট অ্যান অ্যামেন্ডমেন্ট। জনআকাঙ্ক্ষা থেকে রিফর্ম আসতে পারে, কিন্তু তাকে আইনি রূপ দিতে হলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারেই সংসদে সংশোধন করতে হবে। এর বাইরে অন্য কোনো ফরম্যাট বা শর্টকাট নেই।
ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের এই সংসদ। তাই জুলাই যোদ্ধাদের দাবির বিষয়ে সরকারকে আরো ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। একই সঙ্গে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ‘সংস্কার পরিষদ’ নয়, বরং সংবিধানের রীতিনীতি মেনেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন।
বক্তব্যের শুরুতে পার্থ বলেন, ‘আমাদের জুলাই যোদ্ধাদের সাথে ডিল করার জন্য আরও অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। উনারা আহত হয়েছেন, অনেকে নিহত হয়েছেন। উনারা মূল্য দিয়েছেন বলেই আমরা আজ এখানে আছি। তাই আমাদের সহ্য ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।’
৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর দেশে একটি কোয়াজাই কনস্টিটিউশনাল (আধা-সাংবিধানিক) পরিস্থিতি ছিল। কারণ আমাদের সংবিধানে বলা নেই যে প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেলে কী করতে হবে। সংবিধানে গ্যাপ ছিল বলেই অনেক কিছু করতে হয়েছে। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি নেই।
সংস্কার ও সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জবাবে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, সংস্কার আর সংশোধনের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। আমরা চাচ্ছি জুলাই সনদের বিষয়গুলো সংবিধানের ভেতরে থেকেই আসবে এবং সাংবিধানিক রীতিনীতি মেনেই আসবে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে অন্য কিছুর পায়তারা করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে শব্দের মারপ্যাঁচ দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
আইন না বুঝে গণভোট বা সংবিধান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সমালোচনা করে আন্দালিব পার্থ একটি রূপক গল্প শোনান। তিনি বলেন, ‘এক আইন ছিল অতিথি পাখি মারলে ১০ বছর জেল। এখন একজনের বাড়ির মুরগি প্রতিবেশী জবাই করে খেয়ে ফেলেছে। সেই প্রতিবেশী মামলা ঠুকে দিল ১০ বছরের জেলের দাবিতে, কারণ তার যুক্তি-মুরগিও তো এক প্রকার পাখি আর অন্যের বাড়িতে সে ছিল অতিথি! যারা আইন বোঝেন না, তাদের এভাবে বারবার বোঝানো বৃথা।’
বিরোধী দলের সমালোচনা করে পার্থ বলেন, আপনারাই একমাত্র জুলাইয়ের টেন্ডার নিয়েছেন বিষয়টি এমন নয়। আমরা গণভোট মানি কারণ আমরা জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করি। আমাদের সংসদ নেতাও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। ২১৭টা সিট নিয়ে আমরা এই সংসদে এসেছি আইন পরিবর্তন ও সংশোধনের জন্য। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েই আমরা সংবিধানের ভেতর থেকে পরিবর্তন করব। তিনি বলেন, যে সংবিধান জনগণের কথা বলে না, জনগণ সেই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আমরা জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে চাই এবং সবাইকে সাথে নিয়েই এই পথ চলতে চাই।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ঐক্যমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ধাপগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন বিএনপি সেই আলোচনা থেকে পিছিয়ে গিয়ে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম’ বা পুরোনো অবস্থায় ফিরে যেতে চাইছে।
এনসিপি নেতা আরও বলেন, গত ৩১ জুলাই ঐক্যমত্য কমিশনে যখন সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা শেষ হলো, সেদিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথরেখা নিয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল। কিন্তু আজকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, সেই আলোচনার ফলাফল বিএনপি মানতে চাইছে না। সংস্কারের ঘোড়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু এখন তাকে লাগাম পরানোর চেষ্টা চলছে।
সংসদ প্লাজার সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে একটি বিশেষ ‘নোট’ অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে তদন্ত দাবি করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ঐক্যমত্য কমিশন আমাদের যে খসড়া দিয়েছিল, সেখানে কোনো নোটের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো সেখানে বিশেষ একটি পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা দল ইতিহাস বিকৃত করে এই নোটটি সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমরা তদন্ত করে বের করতে চাই, কারা এই কাজ করেছে।
সংবিধানের বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ৫ আগস্টের পর একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা সংবিধান পুরোপুরি মানতেও পারছি না, আবার পুরোপুরি ছাড়তেও পারছি না। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি বা অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগ—এগুলো কোনো প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে হয়েছিল। সেই জনগণের অভিপ্রায়কে টেকসই করতেই ‘জুলাই সনদ আদেশ’ জারি করা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবটি গ্রহণ না করার জন্য স্পিকারের প্রতি বিনীত আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, আজকে স্বাধীন সার্বভৌমে শুধু জুলাই আগস্ট বিপ্লবের যোদ্ধাদের স্মরণ না, আমরা স্মরণ করি ১৭ বছরে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন সংগ্রাম করার সাহস দিয়েছেন উনি আজকে আমাদের সংসদের নেতা প্রধানমন্ত্রী। এই সংসদে চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এই চোখ কান দিয়ে ১৯৭১ সালে কারা পাকিস্তান বাহিনীর সাথে আঁতাত করে সেদিন স্বাধীনতার যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন আজকে তাদের স্মরণ করতে হবে।
জয়নুল আবদিন ফারুক আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন, একদিন জিরো আওয়ার করেন। কার দোষ কার দোষ না সেগুলা বলার সময় পাব। তাই আজ জুলাই বিপ্লবের যে মূলতুবি প্রস্তাবটা আমি এনেছি সেটা আমরা আমাদের দল, আমাদের সংসদীয় দল আমরা ঠিক করেছি- একটা অক্ষরও বাদ যাবে না। দেখেন বইতে কি লেখা আছে- এক হইতে ৩৬ পর্যন্ত প্রত্যেকখানে নোট অফ ডিসেন্ট লেখা আছে।

আপনার মতামত লিখুন