যখন বংশতালিকা, আইন কিংবা বিশেষ বিশেষ কিছু মনে রাখার জন্য ছন্দ মিলিয়ে কবিতা উচ্চারিত হতো মানুষের মুখে মুখে; তারও কিছু সময় আগেই মানুষের মনে কবিতার ধারণার জন্ম হয়। এ বহুকাল আগের কথা। প্রাচীন যুগে এভাবে প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছিল কবিতার। তবে কবিতা তো আর এমন কিছু নয় যে, ইচ্ছা করলেই তাকে মুখে মুখে উচ্চারণ করা যাবে কিংবা যার ইচ্ছা তিনিই কবিতা মুখে উচ্চারণ করতে পারবেন। এর জন্য প্রয়োজন একটি ভাবুক মন কিংবা একটি কাব্যিক হৃদয়। এই কাব্যিক মনের অধিকারী হয় খুবই বিরল সংখ্যক মানুষ। এ এক অলৌকিক শক্তি। আর এই অলৌকিক শক্তি বহন করেই যুগে যুগে আবির্ভূত হয়েছেন কবিরা। সেই মৌখিক রূপ থেকে কবিতা খোদিত হতে থাকল মনোলিথ, রানস্টোন এবং স্টিলে। আরো পরে পত্রপল্লবে ও গুহাগাত্রে। তারও আগে কিংবা একই সময় থেকেই বুঝি অঙ্কিত হয়েছিল গুহাচিত্র। এ সবই মানুষের নন্দন চিন্তার ফল। মানুষের ভাবনাগুলো যখন পরিশুদ্ধ ও মহত্ত্বকে ধারণ করে তখন বহির্প্রকাশও হয় নান্দনিক। যা আমরা একজন কবি কিংবা শিল্পীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করি এবং পেয়েও যাই। তাই কবিরা সময়ের বিশিষ্ট সন্তান। কবিরা যে কোনো সৌন্দর্য ভাবনার উৎস-মনন। যে কোনো বিশেষ মুহূর্ত এলেই মানুষ কবিতার মতো করে কথা বলতে চায়। বিশেষ আবেগ তাড়িত হয়ে মানুষ কবি হয়ে ওঠে। আর তার প্রতিফলন দেখি মানুষের বিশুদ্ধ চর্চায়।
বাংলা কবিতার বয়স হাজার বছর হলেও, তারও বহু আগে থেকে বাঙালির মনে ঠাঁই নিয়েছিল কবিতা। তাই এ জাতির ললাটে আবির্ভূত হয়েছেন যুগে যুগে কত না কবি। কোনো কোনো কবি তো কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন সময়ান্তরে। এখনো জীবন্ত কিংবদন্তি কবিও আছেন বাংলা ভাষায়। আমরা বাঁচি এমন সব সৃষ্টিশীলদের ছায়াতলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম লিখছে কবিতা। দশক, যুগ, শতক পেরিয়ে কবিতা তার রূপ পাল্টায়। তাই আমরা সময়ান্তরে দেখি স্বতন্ত্র সব কবিদের আবির্ভাব। তাদের কবিতাই তাদেরকে স্বাতন্ত্র্য দেয়। তারা হয়ে ওঠেন স্বকীয়। তবে প্রকৃত কবি কিন্তু প্রকৃত কবিতার মৌলস্বর বিচ্যুত নন।
অতঃপর ভাষাবদলের হুমকি থেকেই তো শুরু হলো
স্বপ্নবাজ পাখিদের স্বতন্ত্র কূজন।
রাজপথ থেকে রক্তপলাশ মেখে নেয় বিপ্লবের লাল রঙ;
আর সেপথ বেয়েই জনস্রোত মিশে যায় রক্তস্রোতে।
প্রতিটি প্রত্যুষেই প্রলম্বিত হতে থাকে
স্বপ্নহীন শৃঙ্খলিত রাত;
অবশেষে তাঁর অগ্নিবাণীতে হয় নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।
চলে মরণপন সম্মুখসমর দুরন্ত দুর্বার...
ত্রিশত অযুত রক্তমূল্য আর নারকীয় হিমাগ্নির প্রস্তরিত কান্না এনে দ্যায় সহস্রাব্দের
নতুন ভোর।
[অক্লেশের অভিমুখে অনিরুদ্ধ স্বপ্নযাত্রা, পৃষ্ঠা: ০৯]
উদ্ধৃত কবিতাটি এ সময়ের একজন সক্রিয় ও শক্তিমান কবি, নন্দনতাত্ত্বিক, অনুবাদক মাহফুজ আল-হোসেনের। আর কাব্যগ্রন্থের নাম “একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে”। গ্রন্থের নামকরণের মধ্যে একটা প্রাকৃতিক, মাটিঘেঁষা, শেকড়সন্ধানী ব্যাপার লক্ষ্যণীয়। এবং উচ্চারণের মহত্ত্বে আধুনিক-উত্তর সময়ের মনোভাবকে ধারণ করে। আলোচ্য কবির স্বউদ্ভাবিত অধুনাবাদী নামকরণও বলতে পারি। যেহেতু অধুনাবাদ সদাপ্রবহমান ও প্রকৃতিমুগ্ধ ধারণাকেন্দ্রিক একটি চিন্তাপদ্ধতি।
উদ্ধৃত কবিতায় কবি তার আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের চরম মুহূর্তকে ধারণ করেছেন; যা আমাদের গর্বের শ্রেষ্ঠতম এলাকাকে ও সময়কে নির্দেশ করে। মাত্র এই কয়েকটি লাইনের মধ্যে একটি জাতির স্বাধীনতাকে, তার ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করেছেন কবি। এত স্বল্পপরিসরে এত বৃহৎ প্রেক্ষাপট বর্ণনা কেবল একজন কবির পক্ষেই সম্ভব। আর কবি মাহফুজ আল-হোসেনের কলমে এমন উচ্চারণ তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বপ্নবাজ বাঙালির যাত্রা শুরু হয়েছিল— যার শেষ পরিণতি শত্রুকে ঘায়েল করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন ও একটি জাতির জন্ম এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এর চেয়ে বড় অর্জন কোনো জাতির জন্য আর কী হতে পারে! “একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে” কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই কবি মাহফুজ আল-হোসেন বাংলাদেশ নামক দেশ ও একটি জাতির জন্মের ইতিহাস বর্ণনা করে তাঁর দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়েছেন অকাট্যে।
আলোচ্য গ্রন্থ সম্পর্কে আমরা ব্লার্বের একটা অংশ পাঠ করে পাঠককে বইটি সম্পর্কে ধারণাটা আরও স্পষ্ট করতে চাই:
“যুদ্ধোন্মত্ত পৃথিবীতে শান্তির অন্বেষায় তথাগত মৌন পদযাত্রায় কবি শরণাপন্ন আজ পথের ধারে অবহেলায় পড়ে থাকা ‘একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে’; শৈশবস্মৃতির সাম্যবাদী ইউটোপিয়ায় ঘোরগ্রস্ত অধুনাবাদী কবি নিজ গ্রামের প্রাকৃতিক সারল্যের পাললিক মনোভূমির এখানে সেখানে এখনো খুঁজে বেড়ান শ্রেণিহীন এক কল্যাণ রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক মডেল, আর সে কারণেই হয়তো স্বভূমের আশাবাদিী অগণন মানুষের মতোই তিনি স্থির অচঞ্চল কাব্যপরিক্রমায় অব্যাহত রেখেছেন চিরআরাধ্য অক্লেশের অভিমুখে স্বপ্নযাত্রা।”
এই সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ বর্ণনায় পুরো গ্রন্থটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। পাওয়া যায় কবিমনের মহত্ত্বকে। এখানে কবিকে যেমন শৈশবের স্মৃতিকাতর বলে বর্ণনা করা হয়েছে তেমনি কবিরও প্রত্যাশা একটি শ্রেণিহীন কল্যাণ রাষ্ট্র। আর এ লক্ষ্যে তিনি স্থির অটল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসলে কবি তো এমনই উপায়ে মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখান। এই মহত্ত্বর উপলব্ধি দ্বারাই কবিতাকে গণমানুষের জন্য বাঁচিয়ে রাখেন। এই গ্রন্থে কবি অসংখ্য কবিতায় যেমন প্রকৃতিমুগ্ধতার বর্ণনা দিয়েছেন, তেমনি প্রেম, নস্টালজিয়া, বিপ্লব, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথাও উচ্চারণ করেছেন।
প্রতিদিন মানুষ নিত্যনতুন অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে। রোগা-মানিব্যাগ নিয়ে বাজারে গিয়ে হয়ে পড়ছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দ্রব্যমূল্য যেন বিষধর সাপের মতো ফণা তুলে এগিয়ে আসছে। ‘রোগা ওয়ালেটের ঝুলবারান্দায় মুখ টিপে হাসছে— / সাদাকালো ছবির এক প্রাগৈতিহাসিক সুলোচনা / পারফিউমের সুরভী ছড়িয়েছে সে সুতন্বীর অবস্থিতি।”
কবি সময়টাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক আখ্যায়িত করে নব্য শোষণের ফর্মুলাকে তুলে ধরেছেন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির অসামঞ্জস্যতা দিয়ে:
মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে হাসি কিনতে গিয়ে—
ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলে পড়েছেন প্রায় প্রেমান্ধ কবি।
অপ্সরা ‘বিক্রয়কর্মী’র সাথে সাপলুডু খেলতে হবে
তাকে, উত্তর-ঔপনিবেশিক এক অভিজাত মলে।
[অপ্রস্তুত নিজস্বী, পৃষ্ঠা: ১৪]
কবির এই যে রূপকার্থ বর্ণনা, তা মোটে সামান্য কিছু নয়। এতটা কাব্যিক উপস্থাপনায় এভাবে সময়কে ধারণ কবির শক্তিমত্তাকে যেমন নির্দেশ করে; তেমনি কবিও হয়ে ওঠেন ঔপনিবেশিকোত্তর সময়ের একজন মধ্যবিত্ত-বান্ধব ভাষ্যকার। মনে হয় মধ্যবিত্তের এমন কোনো সময় নেই যখন তারল্যসঙ্কট থাকে না। আর নিম্নবিত্তের কথা তো বলাই বাহুল্য। অপ্রস্তুত নিজস্বী কবিতায় কবি প্রখর দৃষ্টি রেখেছেন মধ্যবিত্তকে ঘিরেই। এখানে তিনি তাদের এটিএম কার্ড কিংবা ক্রেডিট কার্ডে তারল্য সঙ্কটকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছেন: যা কবির দৃষ্টিতে গোল্ডকার্ড বলে বর্ণিত। তারল্যহীন এই গোল্ডকার্ডকে কবি বলছেন ‘গবেট’ গোল্ডকার্ড। কী অসামান্য বক্রোক্তি। এ জাতীয় উপস্থাপন মাহফুজ আল-হোসেনের কবিতায় সহজাত।
মাহফুজের কবিতা পড়লে বোঝা যায় তাঁর উপস্থাপনার স্বাতন্ত্র্য, সরলতার ভিতর দিয়ে অসরল বক্রোক্তি, বর্ণনার নবতর পদ্ধতি, এবং বাংলা কবিতার ঐতিহ্যিক ধারাবাহিকতাকে রক্ষার এক চমৎকার ক্ষমতা। হঠাৎ করে মনে হতে পারে কবি হয়তো চমকে দেবার জন্য এভাবে শুরুটা করেছেন। কিন্তু আদতে কোনো চমক সৃষ্টি কবির অভিপ্রায় নয়। তিনি আসলে প্রচলিতকে এড়িয়ে নতুন কোনো পথের যাত্রীর বেশে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান। আসলে লক্ষ্যে পৌঁছানোটাই বড় কথা। আর প্রচলিত পথকে না এড়াতে পারলে অজানাকে কীভাবে জানা যাবে। নতুন পথেই কেবল মেলে অজানার সন্ধান। আর যদি কোনো নবতর যাত্রায় নবতর বর্ণনায় লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, তা সমকালীন পাঠকে তো কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করতে পারে। কিন্তু সেই বিভ্রান্তি কবি মাহফুজ আল-হোসেন খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেন না। তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম যে, নব আবিষ্কৃত এই পথ পাঠককে আরো বেশি সমসাময়িক করে তুলবে। কারণ কবি তো নিরন্তর কবিতাতেই বসবাস করেন। আর পাঠক কবিতা পাঠ করেন তার সময়-সুবিধা বিবেচনায়। কবির এই কবিতা-মগ্নতা সম্পর্কে তাঁর নিজের মুখ থেকেই শুনি:
কবিতার সাথে তার নিরবচ্ছিন্ন কথকতা কখনোই
হয়না মলিন কর্তব্যের কর্মক্লান্ত বিনিদ্র রজনীতে
কিংবা দাবার কৌশলী চালের স্নায়ুক্ষয়ী মগ্নতায়
অথবা পেশল ক্রীড়াশৈলীর ঘর্মাক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্তে;
[অদম্য একজন, পৃষ্ঠা: ১৭]
ভাবতে ভালো লাগে যে, দাবার কৌশলী চাল কিংবা সীমাহীন কর্মক্লান্তিও কবিকে নিরত করতে পারে না। কবি কবিতার প্রতি অদম্য। তাই হয়তো কবিতার নামও হয়েছে ‘অদম্য একজন’। যিনি সার্বক্ষণিক কবিতার সঙ্গে বাস করেন— অফিসে, আড্ডায়, বাড়িতে, সংসারে, দেশে, বিদেশে, ভ্রমণে, ঘুমে... তিনিই কেবল বুঝতে পারেন কবিতার ক্ষুধা। তিনি অনুভব করেন সময়কে। এবং ধারণ করেন অগ্রসর কালকে। তিনি জানেন সেই অচেনা পথের সন্ধান, যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আর তিনি তা আবিষ্কার করেন নিজের জন্যই মূলত, যা একসময় হয়ে ওঠে পাঠকের বা সর্বসাধারণের।
এই কবিকে আরো বিশেষভাবে জানতে তাঁর আরও কিছু কবিতাংশ আমরা পাঠ করতে পারি এবং আমরা এখানে অনুভব করবো এই কবি কী করে অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা উপস্থাপনায় নিমগ্ন রেখেছেন।
১
উৎসবের রঙ যে বলেছে কালো নয়
তাকে বলে দাও প্রচলিত সব হরফেই
কালো কালিতে লাল লেখা যায়...
শস্যশীর্ষ ট্রেন্ডি টপে শিশিরের শব্দের মতো
আসুক না রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল
[উৎসবের কালো রঙ, পৃষ্ঠা: ২১]
২
অবিশ্রান্ত বৃষ্টিফোঁটার মতো
ধুয়ে দিচ্ছ সবুজ মনোভূমি
দিগভ্রান্ত দিনান্তগামী মন
সূর্যের সাথেই হেঁটে চলেছ তুমি...
[তুমি, পৃষ্ঠা: ৩১]
৩
হায় বরষা— না করুণার খুদকুঁড়ো আর নয়,
ভালোবাসার দাবিও যে ছিল সহৃদয় সকাশে!
জলমগ্ন পর্ণকুটিরে মৃতপ্রায় যক্ষপ্রিয়া,
হেঁয়ালি ছেড়ে বলো— কাগজের নৌকোয় তুমি
কোন সন্দেশ পাঠাবে আজ
সে সুদূরিকা সমীপে?
[বৃহন্নলা বরষা, পৃষ্ঠা: ৪১]
৪
বাসের জানালা থেকে প্রক্ষেপিত পানের পিক
সফেদ পাঞ্জাবি কিংবা টপসের গায়ে এঁকে
দিতে পারে সন্দেহের শানদার আল্পনা
সেইসব স্পর্শ আর দাগগুলো প্রতিনিয়ত
রুজু করে যায় আনুগত্যের শপথ
ভঙ্গের ক্ষণভঙ্গুর মোকদ্দমা
[জাদুবাস্তব অভিযোগনামা, পৃষ্ঠা: ৫১]
৫
বোধবুদ্ধিসম্পন্ন এক রোবট রিচার্জ করার জন্য
ছদ্মশিরোনামের একটি কবিতা প্রয়োজন
বেজোড় সংখ্যার শব্দহীন বাক্যে লেখা আর
মাইনাস শূন্য দ্বারা বিভাজ্য হতে হবে কবিতাটি
[রোবটিক কবিতার বিজ্ঞপ্তি, পৃষ্ঠা: ৫৪]
পাঠাক ইতোমধ্যে অনুধাবন করেছেন কবি মাহফুজ আল-হোসেনের উপস্থাপন, বিন্যাস, বিষয় নির্বাচন থেকে তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত চিত্রকল্প, রূপক ও বিবিধ কলাকৌশল। ৫ নং উদ্ধৃতিতে তিনি কিন্তু একটি রোবোটিক কবিতারও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দিলেন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কবি কতটা আপডেট, কতটা কনটেম্পরারি কনসেপ্ট ধারণ করেন, সেটাও প্রমাণিত হলো। এই যে এতটা ভ্রমণ, এতটা ক্ষরণ, এতটা হাতছানি— কোনো কিছুই কি কবিকে তাঁর স্থির কাব্যবিন্দু থেকে সরাতে পেরেছে? একবার তিনি মাটির কাছে যান; আবার যান প্রযুক্তির কাছে; আর তাঁর শেষ আশ্রয় হয় প্রকৃতি। যে প্রকৃতিতে লুকিয়ে আছে কবির ঐকান্তিক স্নেহাশ্রয়। যেভাবে বর্ষানিবিষ্ট যক্ষপ্রিয়া। অধুনাবদী চিন্তন পদ্ধতির অন্যতম প্রবক্তা, প্রকৃতিমুগ্ধ প্রথাহীন চিন্তার সসিদ্ধ ভাবুক কবি মাহফুজ আল-হোসেন তাঁর কবিতাকে এই চেতনার স্ফুরণ ছড়িয়ে দিয়ে মাটিতে আশ্রয় খুঁজেছেন; যে মাটিতে ছড়ানো আছে কুচিলা ফুলের হাসি।
“পথের ধারে নিদারুণ অবহেলায় থোকায় থোকায় ফুটে থাকা কুচিলা ফুলের মুচকি হাসি দেখেছ কি কখনো?
সহস্র বর্ষের শৃঙ্খল ভেঙেছে ওরা,
আর উপেক্ষার তন্তুতে অবিরাম বুনে চলেছে শ্বেতশুভ্র পাড়বিহীন শাড়ির বোষ্টমী জীবন;
সমাজ-সংসার-শাস্ত্রের অনুদার ঔদ্ধত্যকে ওরা অজানা এক মন্ত্রবলে জয় করেছে— অধিবিদ্যক পরমার্থ দিয়ে।
শরণাগত আমি আজ এ নিস্তব্ধ নিরালোক মহারাত্রিতে, একগুচ্ছ শুচিস্নিগ্ধ কুচিলা ফুলের সমীপে—”
[একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে, পৃষ্ঠা: ১১]
অবশেষে জানা হয়ে গেল কবির অভিপ্রায়ও। কবি আজ সেই কুচিলা ফুলের শরণাগত। যারা পথের ধারে অবহেলায় ফুটে থাকে। এই সাব-অল্টার্ন ভাবনা, এই যে প্রান্তিকে মিশে গিয়ে ভাল থাকার অভিপ্রায়— এটাই তো কবিতার মহত্ত্ব। এই শক্তিতেই কবিতা সর্বজনীন। কবিতা গণমানুষের। কবিতা প্রেমিক-প্রেমিকার। যে প্রেমের উৎপত্তি প্রকৃতি থেকে। যে প্রেম মানুষের জন্য, মানবিকতায় নিবেদিত। প্রকৃতিকে ঘিরেই একদিন বড় হয়; নারী-প্রকৃতি, কিংবা পুরুষ-প্রকৃতি। সব কিছু আবার একদিন প্রকৃতিতেই মিশে যাবে।
“তুমি কি আমার নির্ঘুম রাতের সঙ্গী হবে এই তথাগত শান্তিযাত্রায়— এক মনোময় হিমাদ্রি-অটল সংকল্পে?” [প্রাগুক্ত]
প্রচলিত ছন্দকে ভেঙে দিয়েছেন সময়ের অগ্রসর কবি মাহফুজ আল-হোসেন। তিনি আস্থা রেখেছেন কবিতায়, কোনো ব্যাকরণ বা শৃঙ্খলায় নয়। তাঁর শব্দ নির্বাচন আলঙ্কারিক ও পরিশুদ্ধ। কখনো আটপৌরে শব্দও ঢুকে পড়েছে প্রয়োজনে। তাঁর চিত্রকল্পগুলো সচরাচর ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যায়নি। নতুন মেটাফর আর নতুন নতুন উপমা রূপক চিত্রকে তিনি অনন্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁর কবিতা তাই সমকালের বিশিষ্ট সংযুক্তি।
একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে। মাহফুজ আল-হোসেন। প্রকাশক: বেহুলা বাংলা। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৩। প্রচ্ছদ: চন্দন চৌধুরী। মূল্য: ২৫০ টাকা।

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
যখন বংশতালিকা, আইন কিংবা বিশেষ বিশেষ কিছু মনে রাখার জন্য ছন্দ মিলিয়ে কবিতা উচ্চারিত হতো মানুষের মুখে মুখে; তারও কিছু সময় আগেই মানুষের মনে কবিতার ধারণার জন্ম হয়। এ বহুকাল আগের কথা। প্রাচীন যুগে এভাবে প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছিল কবিতার। তবে কবিতা তো আর এমন কিছু নয় যে, ইচ্ছা করলেই তাকে মুখে মুখে উচ্চারণ করা যাবে কিংবা যার ইচ্ছা তিনিই কবিতা মুখে উচ্চারণ করতে পারবেন। এর জন্য প্রয়োজন একটি ভাবুক মন কিংবা একটি কাব্যিক হৃদয়। এই কাব্যিক মনের অধিকারী হয় খুবই বিরল সংখ্যক মানুষ। এ এক অলৌকিক শক্তি। আর এই অলৌকিক শক্তি বহন করেই যুগে যুগে আবির্ভূত হয়েছেন কবিরা। সেই মৌখিক রূপ থেকে কবিতা খোদিত হতে থাকল মনোলিথ, রানস্টোন এবং স্টিলে। আরো পরে পত্রপল্লবে ও গুহাগাত্রে। তারও আগে কিংবা একই সময় থেকেই বুঝি অঙ্কিত হয়েছিল গুহাচিত্র। এ সবই মানুষের নন্দন চিন্তার ফল। মানুষের ভাবনাগুলো যখন পরিশুদ্ধ ও মহত্ত্বকে ধারণ করে তখন বহির্প্রকাশও হয় নান্দনিক। যা আমরা একজন কবি কিংবা শিল্পীর কাছ থেকে প্রত্যাশা করি এবং পেয়েও যাই। তাই কবিরা সময়ের বিশিষ্ট সন্তান। কবিরা যে কোনো সৌন্দর্য ভাবনার উৎস-মনন। যে কোনো বিশেষ মুহূর্ত এলেই মানুষ কবিতার মতো করে কথা বলতে চায়। বিশেষ আবেগ তাড়িত হয়ে মানুষ কবি হয়ে ওঠে। আর তার প্রতিফলন দেখি মানুষের বিশুদ্ধ চর্চায়।
বাংলা কবিতার বয়স হাজার বছর হলেও, তারও বহু আগে থেকে বাঙালির মনে ঠাঁই নিয়েছিল কবিতা। তাই এ জাতির ললাটে আবির্ভূত হয়েছেন যুগে যুগে কত না কবি। কোনো কোনো কবি তো কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন সময়ান্তরে। এখনো জীবন্ত কিংবদন্তি কবিও আছেন বাংলা ভাষায়। আমরা বাঁচি এমন সব সৃষ্টিশীলদের ছায়াতলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম লিখছে কবিতা। দশক, যুগ, শতক পেরিয়ে কবিতা তার রূপ পাল্টায়। তাই আমরা সময়ান্তরে দেখি স্বতন্ত্র সব কবিদের আবির্ভাব। তাদের কবিতাই তাদেরকে স্বাতন্ত্র্য দেয়। তারা হয়ে ওঠেন স্বকীয়। তবে প্রকৃত কবি কিন্তু প্রকৃত কবিতার মৌলস্বর বিচ্যুত নন।
অতঃপর ভাষাবদলের হুমকি থেকেই তো শুরু হলো
স্বপ্নবাজ পাখিদের স্বতন্ত্র কূজন।
রাজপথ থেকে রক্তপলাশ মেখে নেয় বিপ্লবের লাল রঙ;
আর সেপথ বেয়েই জনস্রোত মিশে যায় রক্তস্রোতে।
প্রতিটি প্রত্যুষেই প্রলম্বিত হতে থাকে
স্বপ্নহীন শৃঙ্খলিত রাত;
অবশেষে তাঁর অগ্নিবাণীতে হয় নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।
চলে মরণপন সম্মুখসমর দুরন্ত দুর্বার...
ত্রিশত অযুত রক্তমূল্য আর নারকীয় হিমাগ্নির প্রস্তরিত কান্না এনে দ্যায় সহস্রাব্দের
নতুন ভোর।
[অক্লেশের অভিমুখে অনিরুদ্ধ স্বপ্নযাত্রা, পৃষ্ঠা: ০৯]
উদ্ধৃত কবিতাটি এ সময়ের একজন সক্রিয় ও শক্তিমান কবি, নন্দনতাত্ত্বিক, অনুবাদক মাহফুজ আল-হোসেনের। আর কাব্যগ্রন্থের নাম “একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে”। গ্রন্থের নামকরণের মধ্যে একটা প্রাকৃতিক, মাটিঘেঁষা, শেকড়সন্ধানী ব্যাপার লক্ষ্যণীয়। এবং উচ্চারণের মহত্ত্বে আধুনিক-উত্তর সময়ের মনোভাবকে ধারণ করে। আলোচ্য কবির স্বউদ্ভাবিত অধুনাবাদী নামকরণও বলতে পারি। যেহেতু অধুনাবাদ সদাপ্রবহমান ও প্রকৃতিমুগ্ধ ধারণাকেন্দ্রিক একটি চিন্তাপদ্ধতি।
উদ্ধৃত কবিতায় কবি তার আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের চরম মুহূর্তকে ধারণ করেছেন; যা আমাদের গর্বের শ্রেষ্ঠতম এলাকাকে ও সময়কে নির্দেশ করে। মাত্র এই কয়েকটি লাইনের মধ্যে একটি জাতির স্বাধীনতাকে, তার ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করেছেন কবি। এত স্বল্পপরিসরে এত বৃহৎ প্রেক্ষাপট বর্ণনা কেবল একজন কবির পক্ষেই সম্ভব। আর কবি মাহফুজ আল-হোসেনের কলমে এমন উচ্চারণ তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বপ্নবাজ বাঙালির যাত্রা শুরু হয়েছিল— যার শেষ পরিণতি শত্রুকে ঘায়েল করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন ও একটি জাতির জন্ম এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এর চেয়ে বড় অর্জন কোনো জাতির জন্য আর কী হতে পারে! “একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে” কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই কবি মাহফুজ আল-হোসেন বাংলাদেশ নামক দেশ ও একটি জাতির জন্মের ইতিহাস বর্ণনা করে তাঁর দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়েছেন অকাট্যে।
আলোচ্য গ্রন্থ সম্পর্কে আমরা ব্লার্বের একটা অংশ পাঠ করে পাঠককে বইটি সম্পর্কে ধারণাটা আরও স্পষ্ট করতে চাই:
“যুদ্ধোন্মত্ত পৃথিবীতে শান্তির অন্বেষায় তথাগত মৌন পদযাত্রায় কবি শরণাপন্ন আজ পথের ধারে অবহেলায় পড়ে থাকা ‘একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে’; শৈশবস্মৃতির সাম্যবাদী ইউটোপিয়ায় ঘোরগ্রস্ত অধুনাবাদী কবি নিজ গ্রামের প্রাকৃতিক সারল্যের পাললিক মনোভূমির এখানে সেখানে এখনো খুঁজে বেড়ান শ্রেণিহীন এক কল্যাণ রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক মডেল, আর সে কারণেই হয়তো স্বভূমের আশাবাদিী অগণন মানুষের মতোই তিনি স্থির অচঞ্চল কাব্যপরিক্রমায় অব্যাহত রেখেছেন চিরআরাধ্য অক্লেশের অভিমুখে স্বপ্নযাত্রা।”
এই সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ বর্ণনায় পুরো গ্রন্থটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। পাওয়া যায় কবিমনের মহত্ত্বকে। এখানে কবিকে যেমন শৈশবের স্মৃতিকাতর বলে বর্ণনা করা হয়েছে তেমনি কবিরও প্রত্যাশা একটি শ্রেণিহীন কল্যাণ রাষ্ট্র। আর এ লক্ষ্যে তিনি স্থির অটল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসলে কবি তো এমনই উপায়ে মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখান। এই মহত্ত্বর উপলব্ধি দ্বারাই কবিতাকে গণমানুষের জন্য বাঁচিয়ে রাখেন। এই গ্রন্থে কবি অসংখ্য কবিতায় যেমন প্রকৃতিমুগ্ধতার বর্ণনা দিয়েছেন, তেমনি প্রেম, নস্টালজিয়া, বিপ্লব, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথাও উচ্চারণ করেছেন।
প্রতিদিন মানুষ নিত্যনতুন অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে। রোগা-মানিব্যাগ নিয়ে বাজারে গিয়ে হয়ে পড়ছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দ্রব্যমূল্য যেন বিষধর সাপের মতো ফণা তুলে এগিয়ে আসছে। ‘রোগা ওয়ালেটের ঝুলবারান্দায় মুখ টিপে হাসছে— / সাদাকালো ছবির এক প্রাগৈতিহাসিক সুলোচনা / পারফিউমের সুরভী ছড়িয়েছে সে সুতন্বীর অবস্থিতি।”
কবি সময়টাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক আখ্যায়িত করে নব্য শোষণের ফর্মুলাকে তুলে ধরেছেন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির অসামঞ্জস্যতা দিয়ে:
মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে হাসি কিনতে গিয়ে—
ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলে পড়েছেন প্রায় প্রেমান্ধ কবি।
অপ্সরা ‘বিক্রয়কর্মী’র সাথে সাপলুডু খেলতে হবে
তাকে, উত্তর-ঔপনিবেশিক এক অভিজাত মলে।
[অপ্রস্তুত নিজস্বী, পৃষ্ঠা: ১৪]
কবির এই যে রূপকার্থ বর্ণনা, তা মোটে সামান্য কিছু নয়। এতটা কাব্যিক উপস্থাপনায় এভাবে সময়কে ধারণ কবির শক্তিমত্তাকে যেমন নির্দেশ করে; তেমনি কবিও হয়ে ওঠেন ঔপনিবেশিকোত্তর সময়ের একজন মধ্যবিত্ত-বান্ধব ভাষ্যকার। মনে হয় মধ্যবিত্তের এমন কোনো সময় নেই যখন তারল্যসঙ্কট থাকে না। আর নিম্নবিত্তের কথা তো বলাই বাহুল্য। অপ্রস্তুত নিজস্বী কবিতায় কবি প্রখর দৃষ্টি রেখেছেন মধ্যবিত্তকে ঘিরেই। এখানে তিনি তাদের এটিএম কার্ড কিংবা ক্রেডিট কার্ডে তারল্য সঙ্কটকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছেন: যা কবির দৃষ্টিতে গোল্ডকার্ড বলে বর্ণিত। তারল্যহীন এই গোল্ডকার্ডকে কবি বলছেন ‘গবেট’ গোল্ডকার্ড। কী অসামান্য বক্রোক্তি। এ জাতীয় উপস্থাপন মাহফুজ আল-হোসেনের কবিতায় সহজাত।
মাহফুজের কবিতা পড়লে বোঝা যায় তাঁর উপস্থাপনার স্বাতন্ত্র্য, সরলতার ভিতর দিয়ে অসরল বক্রোক্তি, বর্ণনার নবতর পদ্ধতি, এবং বাংলা কবিতার ঐতিহ্যিক ধারাবাহিকতাকে রক্ষার এক চমৎকার ক্ষমতা। হঠাৎ করে মনে হতে পারে কবি হয়তো চমকে দেবার জন্য এভাবে শুরুটা করেছেন। কিন্তু আদতে কোনো চমক সৃষ্টি কবির অভিপ্রায় নয়। তিনি আসলে প্রচলিতকে এড়িয়ে নতুন কোনো পথের যাত্রীর বেশে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান। আসলে লক্ষ্যে পৌঁছানোটাই বড় কথা। আর প্রচলিত পথকে না এড়াতে পারলে অজানাকে কীভাবে জানা যাবে। নতুন পথেই কেবল মেলে অজানার সন্ধান। আর যদি কোনো নবতর যাত্রায় নবতর বর্ণনায় লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, তা সমকালীন পাঠকে তো কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করতে পারে। কিন্তু সেই বিভ্রান্তি কবি মাহফুজ আল-হোসেন খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেন না। তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম যে, নব আবিষ্কৃত এই পথ পাঠককে আরো বেশি সমসাময়িক করে তুলবে। কারণ কবি তো নিরন্তর কবিতাতেই বসবাস করেন। আর পাঠক কবিতা পাঠ করেন তার সময়-সুবিধা বিবেচনায়। কবির এই কবিতা-মগ্নতা সম্পর্কে তাঁর নিজের মুখ থেকেই শুনি:
কবিতার সাথে তার নিরবচ্ছিন্ন কথকতা কখনোই
হয়না মলিন কর্তব্যের কর্মক্লান্ত বিনিদ্র রজনীতে
কিংবা দাবার কৌশলী চালের স্নায়ুক্ষয়ী মগ্নতায়
অথবা পেশল ক্রীড়াশৈলীর ঘর্মাক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্তে;
[অদম্য একজন, পৃষ্ঠা: ১৭]
ভাবতে ভালো লাগে যে, দাবার কৌশলী চাল কিংবা সীমাহীন কর্মক্লান্তিও কবিকে নিরত করতে পারে না। কবি কবিতার প্রতি অদম্য। তাই হয়তো কবিতার নামও হয়েছে ‘অদম্য একজন’। যিনি সার্বক্ষণিক কবিতার সঙ্গে বাস করেন— অফিসে, আড্ডায়, বাড়িতে, সংসারে, দেশে, বিদেশে, ভ্রমণে, ঘুমে... তিনিই কেবল বুঝতে পারেন কবিতার ক্ষুধা। তিনি অনুভব করেন সময়কে। এবং ধারণ করেন অগ্রসর কালকে। তিনি জানেন সেই অচেনা পথের সন্ধান, যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আর তিনি তা আবিষ্কার করেন নিজের জন্যই মূলত, যা একসময় হয়ে ওঠে পাঠকের বা সর্বসাধারণের।
এই কবিকে আরো বিশেষভাবে জানতে তাঁর আরও কিছু কবিতাংশ আমরা পাঠ করতে পারি এবং আমরা এখানে অনুভব করবো এই কবি কী করে অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা উপস্থাপনায় নিমগ্ন রেখেছেন।
১
উৎসবের রঙ যে বলেছে কালো নয়
তাকে বলে দাও প্রচলিত সব হরফেই
কালো কালিতে লাল লেখা যায়...
শস্যশীর্ষ ট্রেন্ডি টপে শিশিরের শব্দের মতো
আসুক না রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকাল
[উৎসবের কালো রঙ, পৃষ্ঠা: ২১]
২
অবিশ্রান্ত বৃষ্টিফোঁটার মতো
ধুয়ে দিচ্ছ সবুজ মনোভূমি
দিগভ্রান্ত দিনান্তগামী মন
সূর্যের সাথেই হেঁটে চলেছ তুমি...
[তুমি, পৃষ্ঠা: ৩১]
৩
হায় বরষা— না করুণার খুদকুঁড়ো আর নয়,
ভালোবাসার দাবিও যে ছিল সহৃদয় সকাশে!
জলমগ্ন পর্ণকুটিরে মৃতপ্রায় যক্ষপ্রিয়া,
হেঁয়ালি ছেড়ে বলো— কাগজের নৌকোয় তুমি
কোন সন্দেশ পাঠাবে আজ
সে সুদূরিকা সমীপে?
[বৃহন্নলা বরষা, পৃষ্ঠা: ৪১]
৪
বাসের জানালা থেকে প্রক্ষেপিত পানের পিক
সফেদ পাঞ্জাবি কিংবা টপসের গায়ে এঁকে
দিতে পারে সন্দেহের শানদার আল্পনা
সেইসব স্পর্শ আর দাগগুলো প্রতিনিয়ত
রুজু করে যায় আনুগত্যের শপথ
ভঙ্গের ক্ষণভঙ্গুর মোকদ্দমা
[জাদুবাস্তব অভিযোগনামা, পৃষ্ঠা: ৫১]
৫
বোধবুদ্ধিসম্পন্ন এক রোবট রিচার্জ করার জন্য
ছদ্মশিরোনামের একটি কবিতা প্রয়োজন
বেজোড় সংখ্যার শব্দহীন বাক্যে লেখা আর
মাইনাস শূন্য দ্বারা বিভাজ্য হতে হবে কবিতাটি
[রোবটিক কবিতার বিজ্ঞপ্তি, পৃষ্ঠা: ৫৪]
পাঠাক ইতোমধ্যে অনুধাবন করেছেন কবি মাহফুজ আল-হোসেনের উপস্থাপন, বিন্যাস, বিষয় নির্বাচন থেকে তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত চিত্রকল্প, রূপক ও বিবিধ কলাকৌশল। ৫ নং উদ্ধৃতিতে তিনি কিন্তু একটি রোবোটিক কবিতারও বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দিলেন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে কবি কতটা আপডেট, কতটা কনটেম্পরারি কনসেপ্ট ধারণ করেন, সেটাও প্রমাণিত হলো। এই যে এতটা ভ্রমণ, এতটা ক্ষরণ, এতটা হাতছানি— কোনো কিছুই কি কবিকে তাঁর স্থির কাব্যবিন্দু থেকে সরাতে পেরেছে? একবার তিনি মাটির কাছে যান; আবার যান প্রযুক্তির কাছে; আর তাঁর শেষ আশ্রয় হয় প্রকৃতি। যে প্রকৃতিতে লুকিয়ে আছে কবির ঐকান্তিক স্নেহাশ্রয়। যেভাবে বর্ষানিবিষ্ট যক্ষপ্রিয়া। অধুনাবদী চিন্তন পদ্ধতির অন্যতম প্রবক্তা, প্রকৃতিমুগ্ধ প্রথাহীন চিন্তার সসিদ্ধ ভাবুক কবি মাহফুজ আল-হোসেন তাঁর কবিতাকে এই চেতনার স্ফুরণ ছড়িয়ে দিয়ে মাটিতে আশ্রয় খুঁজেছেন; যে মাটিতে ছড়ানো আছে কুচিলা ফুলের হাসি।
“পথের ধারে নিদারুণ অবহেলায় থোকায় থোকায় ফুটে থাকা কুচিলা ফুলের মুচকি হাসি দেখেছ কি কখনো?
সহস্র বর্ষের শৃঙ্খল ভেঙেছে ওরা,
আর উপেক্ষার তন্তুতে অবিরাম বুনে চলেছে শ্বেতশুভ্র পাড়বিহীন শাড়ির বোষ্টমী জীবন;
সমাজ-সংসার-শাস্ত্রের অনুদার ঔদ্ধত্যকে ওরা অজানা এক মন্ত্রবলে জয় করেছে— অধিবিদ্যক পরমার্থ দিয়ে।
শরণাগত আমি আজ এ নিস্তব্ধ নিরালোক মহারাত্রিতে, একগুচ্ছ শুচিস্নিগ্ধ কুচিলা ফুলের সমীপে—”
[একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে, পৃষ্ঠা: ১১]
অবশেষে জানা হয়ে গেল কবির অভিপ্রায়ও। কবি আজ সেই কুচিলা ফুলের শরণাগত। যারা পথের ধারে অবহেলায় ফুটে থাকে। এই সাব-অল্টার্ন ভাবনা, এই যে প্রান্তিকে মিশে গিয়ে ভাল থাকার অভিপ্রায়— এটাই তো কবিতার মহত্ত্ব। এই শক্তিতেই কবিতা সর্বজনীন। কবিতা গণমানুষের। কবিতা প্রেমিক-প্রেমিকার। যে প্রেমের উৎপত্তি প্রকৃতি থেকে। যে প্রেম মানুষের জন্য, মানবিকতায় নিবেদিত। প্রকৃতিকে ঘিরেই একদিন বড় হয়; নারী-প্রকৃতি, কিংবা পুরুষ-প্রকৃতি। সব কিছু আবার একদিন প্রকৃতিতেই মিশে যাবে।
“তুমি কি আমার নির্ঘুম রাতের সঙ্গী হবে এই তথাগত শান্তিযাত্রায়— এক মনোময় হিমাদ্রি-অটল সংকল্পে?” [প্রাগুক্ত]
প্রচলিত ছন্দকে ভেঙে দিয়েছেন সময়ের অগ্রসর কবি মাহফুজ আল-হোসেন। তিনি আস্থা রেখেছেন কবিতায়, কোনো ব্যাকরণ বা শৃঙ্খলায় নয়। তাঁর শব্দ নির্বাচন আলঙ্কারিক ও পরিশুদ্ধ। কখনো আটপৌরে শব্দও ঢুকে পড়েছে প্রয়োজনে। তাঁর চিত্রকল্পগুলো সচরাচর ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যায়নি। নতুন মেটাফর আর নতুন নতুন উপমা রূপক চিত্রকে তিনি অনন্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁর কবিতা তাই সমকালের বিশিষ্ট সংযুক্তি।
একগুচ্ছ কুচিলা ফুলের সমীপে। মাহফুজ আল-হোসেন। প্রকাশক: বেহুলা বাংলা। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৩। প্রচ্ছদ: চন্দন চৌধুরী। মূল্য: ২৫০ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন