রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একেবারে নাকে ডগায় অবস্থিত দেশের একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি এখন নিজেই যেন রোগাক্রান্ত। জরাজীর্ণ ভবন, প্রকট জনবল সংকট আর উপচে পড়া রোগীর ভিড়ে এখানে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে।
প্রতিদিন কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত কয়েকশ রোগীর পাশাপাশি হাম ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় বাড়ছে জনভোগান্তি।
জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকির চিকিৎসাসেবা
স্বাধীনতার ঠিক পরেই নির্মিত হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়লে ১৫০ জনেরও বেশি রোগীকে ভর্তি রাখতে হয়। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগী ভিড় করেন।
কুকুর
ও বিড়ালের কামড়, জলবসন্ত, জলাতঙ্ক ও এইডস আক্রান্ত রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই পুরনো এই ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে এবং নিচে পানি জমে থাকে। মাত্র একটি লিফট থাকায় রোগী ও স্বজনদের ওঠানামায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। লিফটটি প্রায়ই নষ্ট থাকে, ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিতে হয়।
তীব্র জনবল সংকট ও নার্সদের দিয়ে টিকিট কাটানো
হাসপাতালটিতে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২৩ জন, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৪০ জন। আইসিইউতে ১০ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৪ জন। নার্সিং স্টাফের চিত্র আরও ভয়াবহ; ৭০ জন নার্স দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে যেখানে প্রয়োজন ১০০ জনেরও বেশি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট এতটাই তীব্র যে, নার্সদের দিয়ে টিকিট কাউন্টার পরিচালনা করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে শিফট অনুযায়ী ডিউটি করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। চিকিৎসক ও কর্মীরা নিজেরাও সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে কাজ করছেন। অথচ তাদের জন্য বরাদ্দ ঝুঁকিভাতা মাত্র ৭৫০ টাকা, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত নগণ্য।
কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্তদের ভিড়
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিনের জন্য ছুটছেন। মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ নতুন রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে, যা মাঝে মাঝে দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। গত এক বছরে এক লাখেরও বেশি রোগীকে এই সেবা দেওয়া হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাসপাতালে শুধু হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিলেন ৬১ জন।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আরিফুল বাসার পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, হামের রোগী ছাড়াও নতুন করে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের রোগী বাড়ছে। ওই সব রোগীকে নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। গত কিছু দিন ধরে সারা বাংলাদেশ মিলে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। জলাতঙ্ক রোগীও ভর্তি করা হয়। গত বছর এক লাখের বেশি রোগীকে আমরা ভ্যাকসিন দিয়েছি।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগা এই হাসপাতালটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আধুনিকায়ন, শয্যা সংখ্যা বাড়ানো এবং আইসিইউ সুবিধা পর্যাপ্ত না করলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের অদূরেই আমাদের হাসপাতাল। সমস্যাগুলো হয়তো উনারা দেখবেন। এখন নতুন সরকার আসছে, ডাক্তার সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে আমরা আশা করছি।
নানা প্রতিকূলতা আর সংকটের পাহাড় থাকলেও চিকিৎসকরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিকায়ন ও জনবল নিয়োগ না করলে এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একেবারে নাকে ডগায় অবস্থিত দেশের একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি এখন নিজেই যেন রোগাক্রান্ত। জরাজীর্ণ ভবন, প্রকট জনবল সংকট আর উপচে পড়া রোগীর ভিড়ে এখানে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে।
প্রতিদিন কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত কয়েকশ রোগীর পাশাপাশি হাম ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় বাড়ছে জনভোগান্তি।
জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকির চিকিৎসাসেবা
স্বাধীনতার ঠিক পরেই নির্মিত হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়লে ১৫০ জনেরও বেশি রোগীকে ভর্তি রাখতে হয়। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগী ভিড় করেন।
কুকুর
ও বিড়ালের কামড়, জলবসন্ত, জলাতঙ্ক ও এইডস আক্রান্ত রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই পুরনো এই ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে এবং নিচে পানি জমে থাকে। মাত্র একটি লিফট থাকায় রোগী ও স্বজনদের ওঠানামায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। লিফটটি প্রায়ই নষ্ট থাকে, ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিতে হয়।
তীব্র জনবল সংকট ও নার্সদের দিয়ে টিকিট কাটানো
হাসপাতালটিতে বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২৩ জন, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৪০ জন। আইসিইউতে ১০ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ৪ জন। নার্সিং স্টাফের চিত্র আরও ভয়াবহ; ৭০ জন নার্স দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে যেখানে প্রয়োজন ১০০ জনেরও বেশি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট এতটাই তীব্র যে, নার্সদের দিয়ে টিকিট কাউন্টার পরিচালনা করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে শিফট অনুযায়ী ডিউটি করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে। চিকিৎসক ও কর্মীরা নিজেরাও সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে কাজ করছেন। অথচ তাদের জন্য বরাদ্দ ঝুঁকিভাতা মাত্র ৭৫০ টাকা, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত নগণ্য।
কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্তদের ভিড়
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সারা দেশে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিনের জন্য ছুটছেন। মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ নতুন রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে, যা মাঝে মাঝে দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। গত এক বছরে এক লাখেরও বেশি রোগীকে এই সেবা দেওয়া হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাসপাতালে শুধু হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিলেন ৬১ জন।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আরিফুল বাসার পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, হামের রোগী ছাড়াও নতুন করে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের রোগী বাড়ছে। ওই সব রোগীকে নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। গত কিছু দিন ধরে সারা বাংলাদেশ মিলে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের রোগীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। জলাতঙ্ক রোগীও ভর্তি করা হয়। গত বছর এক লাখের বেশি রোগীকে আমরা ভ্যাকসিন দিয়েছি।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগা এই হাসপাতালটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আধুনিকায়ন, শয্যা সংখ্যা বাড়ানো এবং আইসিইউ সুবিধা পর্যাপ্ত না করলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের অদূরেই আমাদের হাসপাতাল। সমস্যাগুলো হয়তো উনারা দেখবেন। এখন নতুন সরকার আসছে, ডাক্তার সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে আমরা আশা করছি।
নানা প্রতিকূলতা আর সংকটের পাহাড় থাকলেও চিকিৎসকরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিকায়ন ও জনবল নিয়োগ না করলে এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন