মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নানামুখী সংকট বিরাজ করছে। এ সংকটের মধ্যে হাম ছাড়াও দিনে নতুন ও পুরাতন মিলে কয়েকশ’ কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। এতে সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।
এরপরও রহস্যজনক কারণে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অদূরে এই হাসপাতালটির উন্নয়ন বছরের পর বছর থেমে আছে। সরেজমিন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।
চিকিৎসকরা জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি স্বাধীনতার পরপর নির্মাণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসেবে হাসপাতালটি অনেক পুরনো। এ হাসপাতালে বর্তমানে বেড সংখ্যা ১০০। হামসহ অন্যান্য সংক্রমণ রোগী বাড়লে ভর্তি করতে হয় ১শ’ থেকে ১৫০ জন।
বহির্বিভাগে দিনে প্রায় কমপক্ষে এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়। এর মধ্যে হাম, কুকুর-বিড়ালের কামড়, জলবসন্ত, টিটেনাস, জলাতঙ্ক, এইডসসহ যত ধরনের সংক্রমণ রোগী আছে। তাদের বেশিরভাগই এই হাসপাতালে চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন নিতে যায়। আর হাসপাতালে ভর্তির চেয়ে বহির্বিভাগে বেশি রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়।
একজন চিকিৎসক দাবি করছেন, এখন দিনে নতুন ৮শ’-৯শ’ রোগীর ভ্যাকসিন দেয়া হয়। আবার কখনও এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগী হয়ে যায়। ইতোমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহসহ সারাদেশে দিনে ৫-৬ হাজারেরও বেশি কুকুর-বিড়ালের কামড়ের রোগীর ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এভাবে রোগী বাড়ে ও কমে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা দেয়ার ইচ্ছা থাকলেও জনবলের অভাবে সংক্রমণ রোগীদের সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ১০০ বেডের এ হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগীর চাপ, সে হিসাবে পালাক্রমে সিফট অনুযায়ী ডিউটি করার জন্য ডাক্তারের অভাব রয়েছে।
বর্তমানে ডাক্তার আছেন ২৩ জন। দরকার কমপক্ষে ৪০ জন। অনেক সময় এ হাসপাতালের অনেকেই নিজেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। আবার অনেকে ছুটিতে গেলে সংকট আকার ধারণ করে।
হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ডা. আছে ৪ জন। সেখানে কমপক্ষে ১০ জন হলে ভালো হয়, নার্স আছে প্রায় ৭০ জন। দরকার কমপক্ষে ১শ’ জন। এভাবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর জনবলের সংকট আরও বেশি। এমনকি রোগী দেখার টিকেট কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করতে হয় নার্সদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রোগীর চাপ বাড়লেও হাসপাতালটি পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতার উন্নতি হয়নি। একজন তত্বাবধায়ক দিয়ে কোনো মতে বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালটি পরিচালনা করা হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে একটি মাত্র লিফট। তা নিয়ে রোগী ও স্বজনরা ওপরে উঠা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। লিফটে সমস্যা হলে সিড়ি দিয়ে হেটে ওপরে উঠতে হচ্ছে।
পুরনো এ ভবনটিতে বৃষ্টির সময় একটু বৃষ্টি হলে নিচে পানি পড়ে ও পানি জমে থাকে বলে চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা দাবি করছেন। ভবনটির নির্মাণাধীন সময় নিয়ে কেউ বলছেন স্বাধীনতার আগের, আবার কেউ বলছেন ১৯৭২ সালের তৈরি?
একজন চিকিৎসক জানান, বর্তমানে সংক্রমণ রোগী যেভাবে বাড়ছে। তাতে হাসপাতালটি আরও আধুনিকরণ, বেড সংখ্যা বাড়ানো, আইসিইউর চিকিৎসা, বেডসহ অন্যান্য সুবিধা না বাড়ালে হাসপাতালটির সমস্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ঝুঁকি নিয়ে যারা দায়িত্ব পালন করছে। তাদেরকে যে ঝুঁকিভাতা দেয়া হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়। তাদের ঝুঁকিভাতা ৭৫০ টাকা বলে একজন স্টাফ জানিয়েছেন। সংক্রমণ রোগীর কারণে অনেকেই একটু গাফিলতিও করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরও চিকিৎসকরা নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ডা. আরিফুল বাসার বলেন, হামের রোগী ছাড়াও নতুন করে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে রোগীও বাড়ছে। এসব রোগীকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। গত কিছু দিন ধরে সারা বাংলাদেশ মিলে প্রতিদিন প্রায় ৫-৬ হাজার কুকুর-বিড়ালের কামড়ে রোগীকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। জলাতঙ্ক রোগী ভর্তি করা হয়। গত বছর কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত এক লাখের বেশি রোগীকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। সারাদেশ থেকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের রোগীরা চিকিৎসার জন্য যায়। আবার কেউ স্থানীয় ভাবে ভ্যাকসিন নেয়ার সুযোগ থাকলে ভ্যাকসিন নিয়ে দেয়।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক সংবাদকে জানান, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের অদূরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। সমস্যা আছে উনারা হয়তো বিষয়টি দেখবেন। এখন নতুন সরকার আসছে, ডাক্তার সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা তারা দেখবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। হাসপাতালটিতে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু হামের রোগী ভর্তি আছে ৬১ জন। এছাড়াও অন্যান্য সংক্রামক রোগীও রয়েছে। আর বহির্বিভাগে দিনে নতুন ও পুরাতন মিলে ১৪শ’-১৫শ’ পর্যন্ত কুকুর-বিড়ালের কামড়ে রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করে।

মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নানামুখী সংকট বিরাজ করছে। এ সংকটের মধ্যে হাম ছাড়াও দিনে নতুন ও পুরাতন মিলে কয়েকশ’ কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। এতে সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।
এরপরও রহস্যজনক কারণে মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অদূরে এই হাসপাতালটির উন্নয়ন বছরের পর বছর থেমে আছে। সরেজমিন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।
চিকিৎসকরা জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি স্বাধীনতার পরপর নির্মাণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসেবে হাসপাতালটি অনেক পুরনো। এ হাসপাতালে বর্তমানে বেড সংখ্যা ১০০। হামসহ অন্যান্য সংক্রমণ রোগী বাড়লে ভর্তি করতে হয় ১শ’ থেকে ১৫০ জন।
বহির্বিভাগে দিনে প্রায় কমপক্ষে এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়। এর মধ্যে হাম, কুকুর-বিড়ালের কামড়, জলবসন্ত, টিটেনাস, জলাতঙ্ক, এইডসসহ যত ধরনের সংক্রমণ রোগী আছে। তাদের বেশিরভাগই এই হাসপাতালে চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন নিতে যায়। আর হাসপাতালে ভর্তির চেয়ে বহির্বিভাগে বেশি রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়।
একজন চিকিৎসক দাবি করছেন, এখন দিনে নতুন ৮শ’-৯শ’ রোগীর ভ্যাকসিন দেয়া হয়। আবার কখনও এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগী হয়ে যায়। ইতোমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহসহ সারাদেশে দিনে ৫-৬ হাজারেরও বেশি কুকুর-বিড়ালের কামড়ের রোগীর ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এভাবে রোগী বাড়ে ও কমে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা দেয়ার ইচ্ছা থাকলেও জনবলের অভাবে সংক্রমণ রোগীদের সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ১০০ বেডের এ হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগীর চাপ, সে হিসাবে পালাক্রমে সিফট অনুযায়ী ডিউটি করার জন্য ডাক্তারের অভাব রয়েছে।
বর্তমানে ডাক্তার আছেন ২৩ জন। দরকার কমপক্ষে ৪০ জন। অনেক সময় এ হাসপাতালের অনেকেই নিজেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। আবার অনেকে ছুটিতে গেলে সংকট আকার ধারণ করে।
হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ডা. আছে ৪ জন। সেখানে কমপক্ষে ১০ জন হলে ভালো হয়, নার্স আছে প্রায় ৭০ জন। দরকার কমপক্ষে ১শ’ জন। এভাবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর জনবলের সংকট আরও বেশি। এমনকি রোগী দেখার টিকেট কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করতে হয় নার্সদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রোগীর চাপ বাড়লেও হাসপাতালটি পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতার উন্নতি হয়নি। একজন তত্বাবধায়ক দিয়ে কোনো মতে বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালটি পরিচালনা করা হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে একটি মাত্র লিফট। তা নিয়ে রোগী ও স্বজনরা ওপরে উঠা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। লিফটে সমস্যা হলে সিড়ি দিয়ে হেটে ওপরে উঠতে হচ্ছে।
পুরনো এ ভবনটিতে বৃষ্টির সময় একটু বৃষ্টি হলে নিচে পানি পড়ে ও পানি জমে থাকে বলে চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা দাবি করছেন। ভবনটির নির্মাণাধীন সময় নিয়ে কেউ বলছেন স্বাধীনতার আগের, আবার কেউ বলছেন ১৯৭২ সালের তৈরি?
একজন চিকিৎসক জানান, বর্তমানে সংক্রমণ রোগী যেভাবে বাড়ছে। তাতে হাসপাতালটি আরও আধুনিকরণ, বেড সংখ্যা বাড়ানো, আইসিইউর চিকিৎসা, বেডসহ অন্যান্য সুবিধা না বাড়ালে হাসপাতালটির সমস্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ঝুঁকি নিয়ে যারা দায়িত্ব পালন করছে। তাদেরকে যে ঝুঁকিভাতা দেয়া হচ্ছে, তা পর্যাপ্ত নয়। তাদের ঝুঁকিভাতা ৭৫০ টাকা বলে একজন স্টাফ জানিয়েছেন। সংক্রমণ রোগীর কারণে অনেকেই একটু গাফিলতিও করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরও চিকিৎসকরা নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ডা. আরিফুল বাসার বলেন, হামের রোগী ছাড়াও নতুন করে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে রোগীও বাড়ছে। এসব রোগীকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। গত কিছু দিন ধরে সারা বাংলাদেশ মিলে প্রতিদিন প্রায় ৫-৬ হাজার কুকুর-বিড়ালের কামড়ে রোগীকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। জলাতঙ্ক রোগী ভর্তি করা হয়। গত বছর কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত এক লাখের বেশি রোগীকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। সারাদেশ থেকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের রোগীরা চিকিৎসার জন্য যায়। আবার কেউ স্থানীয় ভাবে ভ্যাকসিন নেয়ার সুযোগ থাকলে ভ্যাকসিন নিয়ে দেয়।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক সংবাদকে জানান, মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের অদূরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। সমস্যা আছে উনারা হয়তো বিষয়টি দেখবেন। এখন নতুন সরকার আসছে, ডাক্তার সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা তারা দেখবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। হাসপাতালটিতে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু হামের রোগী ভর্তি আছে ৬১ জন। এছাড়াও অন্যান্য সংক্রামক রোগীও রয়েছে। আর বহির্বিভাগে দিনে নতুন ও পুরাতন মিলে ১৪শ’-১৫শ’ পর্যন্ত কুকুর-বিড়ালের কামড়ে রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করে।

আপনার মতামত লিখুন