এক
আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল। সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে যাই। আজ যাইনি। বিকেলে বাসার পেছনে ডেকে বসে আমার সহধর্মিণীর সঙ্গে চা খাচ্ছিলাম আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। তখনই আমার বন্ধুর ফোনটি আসে।
আমার যে বন্ধুটি ফোন করেছে, ওর নাম এল্টন জন। আমি সেই ব্রিটিশ পপ সঙ্গীত শিল্পী এল্টন জনের কথা বলছি না। আমার বন্ধুটির পুরো নাম— এল্টন জোসেফ এডওয়ার্ড জন। আমেরিকার টেক্সাসের মিডল্যান্ড থেকে এসেছে। অস্ট্রেলিয়াতে তিন বছর ধরে ওয়ার্ক ভিসায় আছে। এখানেই স্থায়ী হওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। অস্ট্রেলিয়াতে তার নাকি ভালো লেগে গেছে। বিশেষ করে কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্ট শহরে। টেক্সাস মিডল্যান্ডের মতো এত উচ্চ তাপমাত্রা এখানে নেই। আবার এখানকার মানুষগুলো ওখানকার মানুষদের মতো এতটা উগ্র নয়।
এল্টন জন আমাদের অফিসে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করে। প্যাসিফিক পাইন্স সাবার্বে থাকে। আমাদের বাসা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। আমরা থাকি প্যাসিফিক পাইন্স সাবার্বের দক্ষিণে, সে থাকে উত্তরে। সে একটি অস্ট্রেলিয়ান পরিবারের সঙ্গে সাবলেটে থাকে। অবশ্য সে সাবলেট হিসেবে বাসাটা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই নিয়েছে।
এল্টনের সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য প্রায় কুড়ি বছরের হলেও অফিসের কলিগ হিসেবেই হোক আর যেকোনো কারণেই হোক আমাদের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এমন বন্ধুত্ব যে সে তার পেটের কথা আমাকে না বললে যেন তার খাবার হজম হয় না। বিশেষ করে তার মেয়েবন্ধুদের কথা। কিন্তু একটা দুর্ভাগ্য তার, কোনো মেয়েবন্ধুকেই সে দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারে না। সে যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের জন্য মেয়েবন্ধু চায় না, তা নয়। প্রচণ্ডভাবেই চায়। এই তিন বছর তার পাঁচটা মেয়েবন্ধু চলে গেছে। এগুলোর মধ্যে তিনটা গেছে কুকুর ও বিড়ালের জন্য। আর দুটো গেছে তার স্বভাবের খামখেয়ালিপনার জন্য।
এল্টন বেশ খামখেয়ালি ধরনের মানুষ হলেও মেয়েবন্ধুর ব্যাপারে সে বেশ আন্তরিক। তার একেকটা মেয়েবন্ধু সম্পর্ক ছেদ করে চলে গেলে সে সত্যি কষ্ট পায়। আমাকে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘কাজী, তুমি তেইশ বছর ধরে একজনের সঙ্গে এমন সুন্দর সম্পর্ক গড়ে সংসার করছ কীভাবে, আমাকে একটু বলো না, প্লিজ!’
আমি এল্টনকে বোঝাতে চেষ্টা করি, আমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আর ওয়েস্টার্ন দাম্পত্য সম্পর্ক এক নয়। কিন্তু সে মানতে রাজি নয়। সে মনেপ্রাণেই চায় তার একজন স্থায়ী মেয়েবন্ধু হোক, যাকে নিয়ে সে সারাজীবন বিশ্বস্তভাবে পার করে দিতে পারবে।
দুই
এল্টনের যে মেয়েবন্ধু দুটো তার খামখেয়ালিপনার জন্য চলে গেছে, সেই দু’জনের গল্প এত গুরুত্বপুর্ণ নয়। পশ্চিমা দেশে এগুলো অহরহই হচ্ছে। ভালো লাগলে একদিন, একসপ্তাহ বা বড়জোর একমাস থাকে। তারপর ভালো না লাগলে চলে যায়। এটা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, দু’জনের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। কিন্তু এদেশে স্থায়ী সম্পর্ক যে হয় না, তা নয়। প্রচুর হয়। কোনো কোনো পুরুষ বা মহিলা একজনের সঙ্গেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়।
এল্টন এমন তিনজনকে সেভাবেই পেয়েছিল। বেশ ভালোভাবেই পেয়েছিল। যাদের সঙ্গে সে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারত। কিন্তু বিধিবাম। কুকুর-বিড়াল এসে এতে বাগড়া দেয়।
আমি এল্টনের প্রত্থম মেয়েবন্ধুর গল্পটা বলি। তার নাম ছিল ড্যাফিনি ডাক্সফোর্ড। বয়স এল্টন জনের কাছাকাছি। কোলস সুপার মার্কেটের চেকআউটে কাজ করত। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রণয়। বেশ কয়েকদিন নাইটক্লাবে নিয়ে যায়। ডিনারেও নিয়ে যায় কয়েকবার। একদিন অফিসে এসে আনন্দে গদগদ হয়ে বলে, ‘কাজী, ড্যাফিনির সঙ্গে আমি সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী করতে যাচ্ছি’।
আমি বলি, ‘ভালো তো। কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে?’
‘ড্যাফিনিই চাচ্ছে। সে একটা টাউনহাউজে একা থাকে। নিজের টাউনহাউজ। আমাকে স্থায়ীভাবে উঠে যেতে বলছে’।
‘এ তো তোমার জন্য সুখের সংবাদ। তুমি তো তা-ই চাচ্ছিলে, তাই না?’
এল্টন মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ’।
আমি বলি, ‘তাহলে উঠে যাও’।
এল্টন এক সপ্তাহের মধ্যেই তল্পিতল্পা নিয়ে ড্যাফিনির বাসায় উঠে যায়। তাদের সুখের সংসার শুরু হয়। প্রতিদিন অফিসে ও ফোনে আমাকে তার সুখের সংসারের গল্প শুনতে হয়।
আমি একদিন জিজ্ঞেস করি, ‘এল্টন, তুমি ড্যাফিনিকে বিয়ে করবে?’
এল্টন বলে, ‘অবশ্যই। আগে এক-দুই বছর লিভিং রিলেশন করে নিই’।
‘তুমি যদি সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী করতে চাও, তাহলে বিয়ে করে ফেলাটা ভালো নয়? একটা কমিটমেন্ট থাকবে’।
‘বিয়ে করলে কি ড্যাফিনি অন্য আরেকজন ড্যাফিনি হয়ে যাবে? একই তো ড্যাফিনি থাকবে, তাই না?’
আমি কথা বাড়াই না।
এর তিন মাস পরের গল্প। একদিন এল্টন অফিসে এসে হাঁসফাঁস করে বলে, ‘কাজী, আর পারছি না’।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কী হয়েছে?’
‘ড্যাফিনির বিড়ালটা নিয়ে আর পারছি না’।
‘ড্যাফিনির বিড়াল, ঘটনাটা খুলে বলো তো!’
এল্টন ঘটনা খুলে বলে। ঘটনাটা তেমন বড় কিছু, তা নয়। একটা বিড়াল মাত্র। বিড়ালটার নাম নাকি টমি। পুরুষ বিড়াল। রাতে ঘুমাতে গেলে টমি ওদের মাঝখানে শোয়।
এল্টন যে বিড়াল পছন্দ করে না, তা নয়। বেশ পছন্দ করে। টমিকেও সে পছন্দ করত। কিন্তু বিড়ালটা তাকে পছন্দ করত না। বিশেষ করে সে ড্যাফিনির পাশে শোয় বলে। প্রথম প্রথম নাকি চোখ পিটপিট করে তাকাত। পরে দেখা যায়, সে ড্যাফিনির পাশে ঘুমোলে বিড়ালটা তাকে নখের আঁচড় কাটতে শুরু করে।
এল্টন এ পর্যন্ত বিড়ালটাকে সহ্য করেছে। কিন্তু এখন নাকি বিড়ালটা তাকে ড্যাফিনির পাশে ভিড়তেই দিচ্ছে না। ড্যাফিনির সঙ্গে পাশাপাশি শোয়া থাক দূরের কথা সে বিছানায় গেলেও জোরে মিউ মিউ করে আক্রমণ করতে আসে। গতকাল সকালে বিড়ালটা রুমে নেই দেখে সে পাশে শুয়ে ড্যাফিনিকে আদর করতে যায়। ঠিক তখনই বিড়ালটা কোথায় থেকে যেন উদয় হয়। রুমে ঢুকেই বিছানায় তাকে দেখে জোরে ডেকে উঠে তার পায়ে নখ দিয়ে আঁচড়াতে শুরু করে। সে আর সহ্য করতে না পেরে বিড়ালটাকে দেয় এক লাথি। লাথিটা বেশ জোরেই হয়। বিড়ালটা ছিটকে গিয়ে দেয়ালে আছড়ে পড়ে। তারপর জোরে একটা মিউ ডাক দিয়ে ক্যাট ডোর দিয়ে ঘরের বাইরে চলে যায়। সারাদিন আর বাসায় ফিরেনি। সন্ধ্যার পর ফিরে আসে। আর তখনই ড্যাফিনি জানিয়ে যেয়, সে যেন বাসা ছেড়ে দেয়...।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘এর মানে কী, তোমাদের সম্পর্ক শেষ?’
এল্টন বলে, ‘শেষ মানে, একেবারে শেষ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেছে’।
‘একটা বিড়ালের জন্য?’
‘হ্যাঁ, শুধুমাত্র একটা বিড়ালের জন্য’।
তিন
এল্টন যে বিড়াল সংক্রান্ত ঝামেলায় পড়ে দ্বিতীয় মেয়েবন্ধুটি হারায়, সেটার গল্পটি বলি। এই গল্পটি আগেরটির চেয়ে অবশ্য সাধারণ।
ড্যাফিনির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ হওয়ার মাস দুয়েক পর এল্টন একদিন অফিসে খুশি খুশি চেহারা করে বলে, ‘কাজী, আরেকটা গার্লফ্রেন্ড পেয়েছি। গুডলাইফে জিম করতে গিয়ে পরিচয়।
আমি বলি, ‘ভালো তো। এবার কে সে? কী নাম?’
এল্টন বলে, ‘ওর নাম জেনিফার’।
‘কে, জেনিফার লোপেজ?’
‘আরে না, কার সঙ্গে কাকে মিলাও। ওর নাম জেনিফার ম্যানিং। আগে পুরুষ ছিল। পরে হরমোন পরিবর্তন করে মেয়ে হয়েছে। বেশ ভালো। শুধু একটাই সমস্যা’।
‘কী সমস্যা?’
‘তার পাঁচটা বিড়াল’।
‘বলো কী, আগের গার্লফ্রেন্ডের একটা বিড়াল সামলাতে পারোনি, এখন পাঁচটা বিড়াল সামলাবে কীভাবে?’
এল্টন হেসে বলে, ‘ওই বিড়ালগুলো জেনিফারের বিছানায় ঘুমায় না। বিড়ালগুলোর জন্য আলাদা রুম আছে’।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘ওর সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী করবে তো?’
এল্টন বলে, ‘এজন্যই তোমাকে জানাচ্ছি। জেনিফার আমার টাইপের মেয়ে। সম্পর্কের ব্যাপারে সিরিয়াস’।
আমি বলি, ‘ভালো, চালিয়ে যাও’।
কিন্তু এল্টন এই সম্পর্কটাও চালিয়ে যেতে পারে না। এই সম্পর্কটা চার মাস টিকে। সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পেছনে একটাই কারণ, সে বসে থাকলে বা শুয়ে থাকলে বিড়ালগুলো তার গায়ে বা পায়ের ওপর হিসু করে। আর এতে নাকি জেনিফার আনন্দ পায়। একদিন সে এজন্য মেজাজ খারাপ করে একটা বিড়ালকে জোরে লাত্থি মেরে বাসা থেকে বের হয়ে আসে। পরে এ নিয়ে জেনিফার পুলিশের কাছে গিয়েও এল্টনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে।
চার
এল্টন এখানে-ওখানে নাক ডোবায় ঠিকই, কিন্তু এরপর তার স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রায় বছর খানেক লেগে যায়। একদিন অফিসের কফি খাওয়ার সময় ফিসফিস করে বলে, ‘কাজী, এবার নিশ্চিত পার্মানেন্ট রিলেশনের জন্য একটা ভালো একটা মেয়ে পেয়ে গেছি’।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘মেয়েটা কে?’
এল্টন বলে, ‘আসলে মেয়ে বললে ভুল হবে। সে আমার চেয়ে সাত বছরের বড়। তবে খুব সুন্দর। সবচেয়ে বড় কথা, তার কোনো বিড়াল নেই’।
‘বিড়াল নেই, ভালো কথা। কিন্তু তাই বলে তোমার চেয়ে সাত বছরের বড় একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছ?
‘তাতে কী? নিক জোন্স প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে বিয়ে করেনি? প্রিয়াঙ্কা চোপড়া তো নিক জোন্সের চেয়ে এগারো বছরের বড়’।
আমি হেসে বলি, ‘ভালোই রেফারেন্স টেনেছ। তা তোমার নতুন গার্লফ্রেন্ডের নাম কী?’
এল্টন বলে, ‘লিন্ডা নাইট। ডিভোর্সি। তবে কোনো সন্তান নেই। অনেক বড়লোক। মাউন্ট ট্যাম্বোরিনে ফার্ম হাউজ আছে। ওখানে ওর দাদা-দাদি থাকে। সে থাকে বেশ বড় একটি বাড়ি নিয়ে ওক্সেনফোর্ডে’।
আমি বলি, ‘বেশ বেশ’।
এল্টনের এই সম্পর্কটা প্রায় এক বছরের মতো টিকে যায়। কথাবার্তা ও চালচলনে তার মধ্যে একটা জৌলুসভাব আসে। নতুন ইলেকট্রিক টেসলার গাড়ি কিনে।
আমি একদিন তাকে বলি, ‘যাক এল্টন, এবার তোমার মনের আশা পূর্ণ হয়েছে। শেষপর্যন্ত সম্পর্কটা স্থায়ী করতে পারলে।’
এল্টন খুশিতে গদগদ হয়ে বলে, ‘ইয়েস, ইয়েস। লিন্ডার বিড়াল নেই যে, এজন্যই মনে হয়’।
আমি বলি, ‘তা তো অবশ্যই’।
কিন্তু এল্টনের বিধিবাম। তার ও লিন্ডার সম্পর্কের মধ্যে এবার বিড়াল নয়, একটা কুকুর এসে হাজির হয়। সেই কুকুরটা আবার লিন্ডার নয়, তার দাদা-দাদির। একটি গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুরছানা।
লিন্ডার দাদা-দাদি গিয়েছিল সাত দিনের জন্য একটা ক্রুজে। ক্রুজে করে ব্রিসবেন থেকে ফিজি, আবার রিটার্ন। সঙ্গে লিন্ডাও যায়। মাউন্ট ট্যাম্বোরিনের তার দাদা-দাদির বাসা ও কুকুরটার দায়িত্ব দিয়ে যায় এল্টনকে। এল্টন সেই দায়িত্ব খুশি মনেই নেয়।
কিন্তু এল্টনকে তো অফিস করতে হয়। সে কুকুরটাকে পর্যাপ্ত খাবারদাবার দিয়ে একটা রুমে ভেতর রেখে দরজা আটকে দিয়ে অফিসে আসে। বিকেলে খুশিমনে ফিরে গিয়ে দেখে, কুকুরটা রুমের ভেতর হাগু-হিসু করে ভরিয়ে ফেলে রেখেছে। অফিস থেকে ফিরে সে বিরক্ত হলেও কুকুরের হাগু ও হিসু পরিষ্কার করে। দ্বিতীয় দিন ফিরে দেখে, রুমের শুধু মেঝ নয়, দেয়াল পর্যন্ত হাগু ও হিসু দিয়ে ভরে ফেলেছে। তাই সে তৃতীয় দিন বের হওয়ার আগে কুকুরটাকে ঘরের বাইরে একটা গার্ডেন শ্যাডে রেখে যায়। সে ফিরে এসে দেখে কুকুরটা গার্ডেন শ্যাডে নেই। কীভাবে যেন বের হয়ে গেছে। সে সন্ধ্যা অব্ধি খুঁজে কুকুরটাকে পায় না। এর পরেরদিন অফিস কামাই করে কুকুর খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাউন্ট ট্যাম্বোরিন হলো বিশাল এরিয়া। পাহাড়, জঙ্গল আর বহু দূরে দূরে একেকটা কৃষকের বাড়ি। তিনদিন খুঁজেও আর কুকুরটাকে পায় না। ফেসবুকের কমিউনিটি পেজে কুকুরটার ছবি দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়। পুলিশকেও কুকুরটা হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে রিপোর্ট করে।
এভাবে সময় চলে যায়। ওদিকে লিন্ডা ক্রুজশিপে ভ্রমণ শেষে দাদা-দাদিকে নিয়ে ফিরে এসে তো মাথায় হাত। সবাই মিলে গাড়ি নিয়ে কুকুর খুঁজতে বের হয়। আরও দুইদিন খোঁজার পর প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের এক বাড়ি থেকে কুকুরটা পায়। কিন্তু ততক্ষণে বেচারা এল্টনের সঙ্গে লিন্ডার সম্পর্ক শেষ।
পাঁচ
এখন এল্টন কেন এই বিকেলে ফোন দিয়েছে, সেই গল্পটা বলি। সে হেলেন্সভ্যাল শপিং সেন্টার থেকে বাসায় ফিরতে গিয়ে স্প্রিংওড এভিনিউতে তার গাড়ির নিচে ফেলে একটা বিড়াল মেরে ফেলেছে। আমি ফোনে হাসতে গিয়েও হাসতে পারি না। আবারও তার সেই বিড়াল নিয়ে সমস্যা!
অস্ট্রেলিয়ার আইনে আছে, কারও গাড়ির নিচে পড়ে বিড়াল মারা গেলে তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে হয়। পুলিশ এসে সেটার তদন্ত করে। বিড়ালের মালিককে খুঁজে বের করে। অনেকে অবশ্য এসব বিড়াল মেরে দিয়ে গাড়ি টেনে চলে যায়। এটাকে ‘হিট এ্যান্ড রান’ বলে। সেটা বেআইনি। কিন্তু কে তোয়াক্কা করে? একটা বিড়ালই তো!
আমি ফোন পাওয়ার পর দেরি না করে গাড়ি নিয়ে টেনে চলে যাই। খুব বেশি দূরে নয়। তিন-চার মিনিটের ড্রাইভ। স্প্রিংওড এভিনিউতে এসে দেখি, একটা রক্তাক্ত বিড়াল ফুটপাতে পড়ে আছে। এল্টনের গাড়িটা সেখানেই। এরই মধ্যে পুলিশ চলে এসেছে। এল্টন পুলিশের সঙ্গে কথা বলছে।
আমি যেতেই এল্টন পুলিশের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার চোখ ভেজা। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কীভাবে বিড়াল মারলে?’
এল্টনের চোখ এমনিতে ভেজা। সে এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, ‘আমার তাড়া ছিল, তাই একটু স্পীডে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। গাড়ির স্পীড যদি একটু কম থাকত, তাহলে বিড়ালটা বাঁচাতে পারতাম’।
আমি এল্টনকে সান্ত্বনা দিতে গেলাম। কিন্তু কী সান্ত্বনা দিব, বুঝতে পারলাম। তবে একটা ব্যাপার অবাক হয়ে ভাবলাম, একই আমেরিকান। যে আমেরিকানরা সারাবিশ্বে যুদ্ধ বাঁধিয়ে মানুষ মেরে চলছে। কিন্তু এল্টন একটা বিড়াল মেরে কাঁদছে...!

মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬
এক
আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিল। সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে যাই। আজ যাইনি। বিকেলে বাসার পেছনে ডেকে বসে আমার সহধর্মিণীর সঙ্গে চা খাচ্ছিলাম আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। তখনই আমার বন্ধুর ফোনটি আসে।
আমার যে বন্ধুটি ফোন করেছে, ওর নাম এল্টন জন। আমি সেই ব্রিটিশ পপ সঙ্গীত শিল্পী এল্টন জনের কথা বলছি না। আমার বন্ধুটির পুরো নাম— এল্টন জোসেফ এডওয়ার্ড জন। আমেরিকার টেক্সাসের মিডল্যান্ড থেকে এসেছে। অস্ট্রেলিয়াতে তিন বছর ধরে ওয়ার্ক ভিসায় আছে। এখানেই স্থায়ী হওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। অস্ট্রেলিয়াতে তার নাকি ভালো লেগে গেছে। বিশেষ করে কুইন্সল্যান্ডের গোল্ড কোস্ট শহরে। টেক্সাস মিডল্যান্ডের মতো এত উচ্চ তাপমাত্রা এখানে নেই। আবার এখানকার মানুষগুলো ওখানকার মানুষদের মতো এতটা উগ্র নয়।
এল্টন জন আমাদের অফিসে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করে। প্যাসিফিক পাইন্স সাবার্বে থাকে। আমাদের বাসা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। আমরা থাকি প্যাসিফিক পাইন্স সাবার্বের দক্ষিণে, সে থাকে উত্তরে। সে একটি অস্ট্রেলিয়ান পরিবারের সঙ্গে সাবলেটে থাকে। অবশ্য সে সাবলেট হিসেবে বাসাটা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই নিয়েছে।
এল্টনের সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য প্রায় কুড়ি বছরের হলেও অফিসের কলিগ হিসেবেই হোক আর যেকোনো কারণেই হোক আমাদের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এমন বন্ধুত্ব যে সে তার পেটের কথা আমাকে না বললে যেন তার খাবার হজম হয় না। বিশেষ করে তার মেয়েবন্ধুদের কথা। কিন্তু একটা দুর্ভাগ্য তার, কোনো মেয়েবন্ধুকেই সে দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারে না। সে যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের জন্য মেয়েবন্ধু চায় না, তা নয়। প্রচণ্ডভাবেই চায়। এই তিন বছর তার পাঁচটা মেয়েবন্ধু চলে গেছে। এগুলোর মধ্যে তিনটা গেছে কুকুর ও বিড়ালের জন্য। আর দুটো গেছে তার স্বভাবের খামখেয়ালিপনার জন্য।
এল্টন বেশ খামখেয়ালি ধরনের মানুষ হলেও মেয়েবন্ধুর ব্যাপারে সে বেশ আন্তরিক। তার একেকটা মেয়েবন্ধু সম্পর্ক ছেদ করে চলে গেলে সে সত্যি কষ্ট পায়। আমাকে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘কাজী, তুমি তেইশ বছর ধরে একজনের সঙ্গে এমন সুন্দর সম্পর্ক গড়ে সংসার করছ কীভাবে, আমাকে একটু বলো না, প্লিজ!’
আমি এল্টনকে বোঝাতে চেষ্টা করি, আমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আর ওয়েস্টার্ন দাম্পত্য সম্পর্ক এক নয়। কিন্তু সে মানতে রাজি নয়। সে মনেপ্রাণেই চায় তার একজন স্থায়ী মেয়েবন্ধু হোক, যাকে নিয়ে সে সারাজীবন বিশ্বস্তভাবে পার করে দিতে পারবে।
দুই
এল্টনের যে মেয়েবন্ধু দুটো তার খামখেয়ালিপনার জন্য চলে গেছে, সেই দু’জনের গল্প এত গুরুত্বপুর্ণ নয়। পশ্চিমা দেশে এগুলো অহরহই হচ্ছে। ভালো লাগলে একদিন, একসপ্তাহ বা বড়জোর একমাস থাকে। তারপর ভালো না লাগলে চলে যায়। এটা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, দু’জনের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। কিন্তু এদেশে স্থায়ী সম্পর্ক যে হয় না, তা নয়। প্রচুর হয়। কোনো কোনো পুরুষ বা মহিলা একজনের সঙ্গেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়।
এল্টন এমন তিনজনকে সেভাবেই পেয়েছিল। বেশ ভালোভাবেই পেয়েছিল। যাদের সঙ্গে সে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারত। কিন্তু বিধিবাম। কুকুর-বিড়াল এসে এতে বাগড়া দেয়।
আমি এল্টনের প্রত্থম মেয়েবন্ধুর গল্পটা বলি। তার নাম ছিল ড্যাফিনি ডাক্সফোর্ড। বয়স এল্টন জনের কাছাকাছি। কোলস সুপার মার্কেটের চেকআউটে কাজ করত। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রণয়। বেশ কয়েকদিন নাইটক্লাবে নিয়ে যায়। ডিনারেও নিয়ে যায় কয়েকবার। একদিন অফিসে এসে আনন্দে গদগদ হয়ে বলে, ‘কাজী, ড্যাফিনির সঙ্গে আমি সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী করতে যাচ্ছি’।
আমি বলি, ‘ভালো তো। কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে?’
‘ড্যাফিনিই চাচ্ছে। সে একটা টাউনহাউজে একা থাকে। নিজের টাউনহাউজ। আমাকে স্থায়ীভাবে উঠে যেতে বলছে’।
‘এ তো তোমার জন্য সুখের সংবাদ। তুমি তো তা-ই চাচ্ছিলে, তাই না?’
এল্টন মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ’।
আমি বলি, ‘তাহলে উঠে যাও’।
এল্টন এক সপ্তাহের মধ্যেই তল্পিতল্পা নিয়ে ড্যাফিনির বাসায় উঠে যায়। তাদের সুখের সংসার শুরু হয়। প্রতিদিন অফিসে ও ফোনে আমাকে তার সুখের সংসারের গল্প শুনতে হয়।
আমি একদিন জিজ্ঞেস করি, ‘এল্টন, তুমি ড্যাফিনিকে বিয়ে করবে?’
এল্টন বলে, ‘অবশ্যই। আগে এক-দুই বছর লিভিং রিলেশন করে নিই’।
‘তুমি যদি সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী করতে চাও, তাহলে বিয়ে করে ফেলাটা ভালো নয়? একটা কমিটমেন্ট থাকবে’।
‘বিয়ে করলে কি ড্যাফিনি অন্য আরেকজন ড্যাফিনি হয়ে যাবে? একই তো ড্যাফিনি থাকবে, তাই না?’
আমি কথা বাড়াই না।
এর তিন মাস পরের গল্প। একদিন এল্টন অফিসে এসে হাঁসফাঁস করে বলে, ‘কাজী, আর পারছি না’।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কী হয়েছে?’
‘ড্যাফিনির বিড়ালটা নিয়ে আর পারছি না’।
‘ড্যাফিনির বিড়াল, ঘটনাটা খুলে বলো তো!’
এল্টন ঘটনা খুলে বলে। ঘটনাটা তেমন বড় কিছু, তা নয়। একটা বিড়াল মাত্র। বিড়ালটার নাম নাকি টমি। পুরুষ বিড়াল। রাতে ঘুমাতে গেলে টমি ওদের মাঝখানে শোয়।
এল্টন যে বিড়াল পছন্দ করে না, তা নয়। বেশ পছন্দ করে। টমিকেও সে পছন্দ করত। কিন্তু বিড়ালটা তাকে পছন্দ করত না। বিশেষ করে সে ড্যাফিনির পাশে শোয় বলে। প্রথম প্রথম নাকি চোখ পিটপিট করে তাকাত। পরে দেখা যায়, সে ড্যাফিনির পাশে ঘুমোলে বিড়ালটা তাকে নখের আঁচড় কাটতে শুরু করে।
এল্টন এ পর্যন্ত বিড়ালটাকে সহ্য করেছে। কিন্তু এখন নাকি বিড়ালটা তাকে ড্যাফিনির পাশে ভিড়তেই দিচ্ছে না। ড্যাফিনির সঙ্গে পাশাপাশি শোয়া থাক দূরের কথা সে বিছানায় গেলেও জোরে মিউ মিউ করে আক্রমণ করতে আসে। গতকাল সকালে বিড়ালটা রুমে নেই দেখে সে পাশে শুয়ে ড্যাফিনিকে আদর করতে যায়। ঠিক তখনই বিড়ালটা কোথায় থেকে যেন উদয় হয়। রুমে ঢুকেই বিছানায় তাকে দেখে জোরে ডেকে উঠে তার পায়ে নখ দিয়ে আঁচড়াতে শুরু করে। সে আর সহ্য করতে না পেরে বিড়ালটাকে দেয় এক লাথি। লাথিটা বেশ জোরেই হয়। বিড়ালটা ছিটকে গিয়ে দেয়ালে আছড়ে পড়ে। তারপর জোরে একটা মিউ ডাক দিয়ে ক্যাট ডোর দিয়ে ঘরের বাইরে চলে যায়। সারাদিন আর বাসায় ফিরেনি। সন্ধ্যার পর ফিরে আসে। আর তখনই ড্যাফিনি জানিয়ে যেয়, সে যেন বাসা ছেড়ে দেয়...।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘এর মানে কী, তোমাদের সম্পর্ক শেষ?’
এল্টন বলে, ‘শেষ মানে, একেবারে শেষ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে বলেছে’।
‘একটা বিড়ালের জন্য?’
‘হ্যাঁ, শুধুমাত্র একটা বিড়ালের জন্য’।
তিন
এল্টন যে বিড়াল সংক্রান্ত ঝামেলায় পড়ে দ্বিতীয় মেয়েবন্ধুটি হারায়, সেটার গল্পটি বলি। এই গল্পটি আগেরটির চেয়ে অবশ্য সাধারণ।
ড্যাফিনির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ হওয়ার মাস দুয়েক পর এল্টন একদিন অফিসে খুশি খুশি চেহারা করে বলে, ‘কাজী, আরেকটা গার্লফ্রেন্ড পেয়েছি। গুডলাইফে জিম করতে গিয়ে পরিচয়।
আমি বলি, ‘ভালো তো। এবার কে সে? কী নাম?’
এল্টন বলে, ‘ওর নাম জেনিফার’।
‘কে, জেনিফার লোপেজ?’
‘আরে না, কার সঙ্গে কাকে মিলাও। ওর নাম জেনিফার ম্যানিং। আগে পুরুষ ছিল। পরে হরমোন পরিবর্তন করে মেয়ে হয়েছে। বেশ ভালো। শুধু একটাই সমস্যা’।
‘কী সমস্যা?’
‘তার পাঁচটা বিড়াল’।
‘বলো কী, আগের গার্লফ্রেন্ডের একটা বিড়াল সামলাতে পারোনি, এখন পাঁচটা বিড়াল সামলাবে কীভাবে?’
এল্টন হেসে বলে, ‘ওই বিড়ালগুলো জেনিফারের বিছানায় ঘুমায় না। বিড়ালগুলোর জন্য আলাদা রুম আছে’।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘ওর সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী করবে তো?’
এল্টন বলে, ‘এজন্যই তোমাকে জানাচ্ছি। জেনিফার আমার টাইপের মেয়ে। সম্পর্কের ব্যাপারে সিরিয়াস’।
আমি বলি, ‘ভালো, চালিয়ে যাও’।
কিন্তু এল্টন এই সম্পর্কটাও চালিয়ে যেতে পারে না। এই সম্পর্কটা চার মাস টিকে। সম্পর্কটা ভেঙে যাওয়ার পেছনে একটাই কারণ, সে বসে থাকলে বা শুয়ে থাকলে বিড়ালগুলো তার গায়ে বা পায়ের ওপর হিসু করে। আর এতে নাকি জেনিফার আনন্দ পায়। একদিন সে এজন্য মেজাজ খারাপ করে একটা বিড়ালকে জোরে লাত্থি মেরে বাসা থেকে বের হয়ে আসে। পরে এ নিয়ে জেনিফার পুলিশের কাছে গিয়েও এল্টনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে।
চার
এল্টন এখানে-ওখানে নাক ডোবায় ঠিকই, কিন্তু এরপর তার স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রায় বছর খানেক লেগে যায়। একদিন অফিসের কফি খাওয়ার সময় ফিসফিস করে বলে, ‘কাজী, এবার নিশ্চিত পার্মানেন্ট রিলেশনের জন্য একটা ভালো একটা মেয়ে পেয়ে গেছি’।
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘মেয়েটা কে?’
এল্টন বলে, ‘আসলে মেয়ে বললে ভুল হবে। সে আমার চেয়ে সাত বছরের বড়। তবে খুব সুন্দর। সবচেয়ে বড় কথা, তার কোনো বিড়াল নেই’।
‘বিড়াল নেই, ভালো কথা। কিন্তু তাই বলে তোমার চেয়ে সাত বছরের বড় একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছ?
‘তাতে কী? নিক জোন্স প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে বিয়ে করেনি? প্রিয়াঙ্কা চোপড়া তো নিক জোন্সের চেয়ে এগারো বছরের বড়’।
আমি হেসে বলি, ‘ভালোই রেফারেন্স টেনেছ। তা তোমার নতুন গার্লফ্রেন্ডের নাম কী?’
এল্টন বলে, ‘লিন্ডা নাইট। ডিভোর্সি। তবে কোনো সন্তান নেই। অনেক বড়লোক। মাউন্ট ট্যাম্বোরিনে ফার্ম হাউজ আছে। ওখানে ওর দাদা-দাদি থাকে। সে থাকে বেশ বড় একটি বাড়ি নিয়ে ওক্সেনফোর্ডে’।
আমি বলি, ‘বেশ বেশ’।
এল্টনের এই সম্পর্কটা প্রায় এক বছরের মতো টিকে যায়। কথাবার্তা ও চালচলনে তার মধ্যে একটা জৌলুসভাব আসে। নতুন ইলেকট্রিক টেসলার গাড়ি কিনে।
আমি একদিন তাকে বলি, ‘যাক এল্টন, এবার তোমার মনের আশা পূর্ণ হয়েছে। শেষপর্যন্ত সম্পর্কটা স্থায়ী করতে পারলে।’
এল্টন খুশিতে গদগদ হয়ে বলে, ‘ইয়েস, ইয়েস। লিন্ডার বিড়াল নেই যে, এজন্যই মনে হয়’।
আমি বলি, ‘তা তো অবশ্যই’।
কিন্তু এল্টনের বিধিবাম। তার ও লিন্ডার সম্পর্কের মধ্যে এবার বিড়াল নয়, একটা কুকুর এসে হাজির হয়। সেই কুকুরটা আবার লিন্ডার নয়, তার দাদা-দাদির। একটি গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুরছানা।
লিন্ডার দাদা-দাদি গিয়েছিল সাত দিনের জন্য একটা ক্রুজে। ক্রুজে করে ব্রিসবেন থেকে ফিজি, আবার রিটার্ন। সঙ্গে লিন্ডাও যায়। মাউন্ট ট্যাম্বোরিনের তার দাদা-দাদির বাসা ও কুকুরটার দায়িত্ব দিয়ে যায় এল্টনকে। এল্টন সেই দায়িত্ব খুশি মনেই নেয়।
কিন্তু এল্টনকে তো অফিস করতে হয়। সে কুকুরটাকে পর্যাপ্ত খাবারদাবার দিয়ে একটা রুমে ভেতর রেখে দরজা আটকে দিয়ে অফিসে আসে। বিকেলে খুশিমনে ফিরে গিয়ে দেখে, কুকুরটা রুমের ভেতর হাগু-হিসু করে ভরিয়ে ফেলে রেখেছে। অফিস থেকে ফিরে সে বিরক্ত হলেও কুকুরের হাগু ও হিসু পরিষ্কার করে। দ্বিতীয় দিন ফিরে দেখে, রুমের শুধু মেঝ নয়, দেয়াল পর্যন্ত হাগু ও হিসু দিয়ে ভরে ফেলেছে। তাই সে তৃতীয় দিন বের হওয়ার আগে কুকুরটাকে ঘরের বাইরে একটা গার্ডেন শ্যাডে রেখে যায়। সে ফিরে এসে দেখে কুকুরটা গার্ডেন শ্যাডে নেই। কীভাবে যেন বের হয়ে গেছে। সে সন্ধ্যা অব্ধি খুঁজে কুকুরটাকে পায় না। এর পরেরদিন অফিস কামাই করে কুকুর খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাউন্ট ট্যাম্বোরিন হলো বিশাল এরিয়া। পাহাড়, জঙ্গল আর বহু দূরে দূরে একেকটা কৃষকের বাড়ি। তিনদিন খুঁজেও আর কুকুরটাকে পায় না। ফেসবুকের কমিউনিটি পেজে কুকুরটার ছবি দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়। পুলিশকেও কুকুরটা হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে রিপোর্ট করে।
এভাবে সময় চলে যায়। ওদিকে লিন্ডা ক্রুজশিপে ভ্রমণ শেষে দাদা-দাদিকে নিয়ে ফিরে এসে তো মাথায় হাত। সবাই মিলে গাড়ি নিয়ে কুকুর খুঁজতে বের হয়। আরও দুইদিন খোঁজার পর প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের এক বাড়ি থেকে কুকুরটা পায়। কিন্তু ততক্ষণে বেচারা এল্টনের সঙ্গে লিন্ডার সম্পর্ক শেষ।
পাঁচ
এখন এল্টন কেন এই বিকেলে ফোন দিয়েছে, সেই গল্পটা বলি। সে হেলেন্সভ্যাল শপিং সেন্টার থেকে বাসায় ফিরতে গিয়ে স্প্রিংওড এভিনিউতে তার গাড়ির নিচে ফেলে একটা বিড়াল মেরে ফেলেছে। আমি ফোনে হাসতে গিয়েও হাসতে পারি না। আবারও তার সেই বিড়াল নিয়ে সমস্যা!
অস্ট্রেলিয়ার আইনে আছে, কারও গাড়ির নিচে পড়ে বিড়াল মারা গেলে তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে হয়। পুলিশ এসে সেটার তদন্ত করে। বিড়ালের মালিককে খুঁজে বের করে। অনেকে অবশ্য এসব বিড়াল মেরে দিয়ে গাড়ি টেনে চলে যায়। এটাকে ‘হিট এ্যান্ড রান’ বলে। সেটা বেআইনি। কিন্তু কে তোয়াক্কা করে? একটা বিড়ালই তো!
আমি ফোন পাওয়ার পর দেরি না করে গাড়ি নিয়ে টেনে চলে যাই। খুব বেশি দূরে নয়। তিন-চার মিনিটের ড্রাইভ। স্প্রিংওড এভিনিউতে এসে দেখি, একটা রক্তাক্ত বিড়াল ফুটপাতে পড়ে আছে। এল্টনের গাড়িটা সেখানেই। এরই মধ্যে পুলিশ চলে এসেছে। এল্টন পুলিশের সঙ্গে কথা বলছে।
আমি যেতেই এল্টন পুলিশের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার চোখ ভেজা। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কীভাবে বিড়াল মারলে?’
এল্টনের চোখ এমনিতে ভেজা। সে এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, ‘আমার তাড়া ছিল, তাই একটু স্পীডে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। গাড়ির স্পীড যদি একটু কম থাকত, তাহলে বিড়ালটা বাঁচাতে পারতাম’।
আমি এল্টনকে সান্ত্বনা দিতে গেলাম। কিন্তু কী সান্ত্বনা দিব, বুঝতে পারলাম। তবে একটা ব্যাপার অবাক হয়ে ভাবলাম, একই আমেরিকান। যে আমেরিকানরা সারাবিশ্বে যুদ্ধ বাঁধিয়ে মানুষ মেরে চলছে। কিন্তু এল্টন একটা বিড়াল মেরে কাঁদছে...!

আপনার মতামত লিখুন